Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৪ জুন ২০২৬
Operation Searchlight

এক ফোনেই ‘অপারেশন সার্চলাইটে’র সবুজ সংকেত! ইতিহাসের অন্যতম নির্মম গণহত্যার ক্ষত আজও দগদগে

টিক্কা খান বলেছিলেন, 'পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না।'

Advertisement
বিশ্বদীপ দে
বিশ্বদীপ দে

শেষ আপডেট: মার্চ ২৮, ২০২৬, ১৮:২১

link
বিশ্বদীপ দে
বিশ্বদীপ দে

শেষ আপডেট: মার্চ ২৮, ২০২৬, ১৮:২১

options
link
এক ফোনেই ‘অপারেশন সার্চলাইটে’র সবুজ সংকেত! ইতিহাসের অন্যতম নির্মম গণহত্যার ক্ষত আজও দগদগে zoom
একরাতেই প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল!

“খাদিম, আজ রাতেই।” ১৯৭১, ২৫ মার্চ। টেলিফোনে এমনটাই বলেছিলেন টিক্কা খান। পাকিস্তানের তৎকালীন লেফটেন্যান্ট জেনারেল। ফোনের ওপারে মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন। তখনই ঠিক হয়ে যায় রাত একটায় শুরু হবে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ (Operation Searchlight)। ক্যালেন্ডারের হিসেবে ২৬ তারিখ পড়ে গেলেও ওই দিনটাকেই ধরা হয় ইতিহাসের অন্যতম নির্মম গণহত্যার দিন হিসেবে। একরাতেই প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষকে মেরে ফেলার এক নিষ্ঠুর পরিকল্পনা। যা পরবর্তী কয়েক মাস ধরে চলতে থাকবে। প্রাণ নেবে কয়েক লক্ষ বাঙালির!

সদ্য ৫৫ বছর পূর্ণ হল সেই অপারেশনের। কিন্তু সেই নির্মম গণহত্যার ক্ষত আজও দগদগে। গত বুধবার বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা একটি কড়া বার্তা দিয়েছেন। জানিয়েছেন, ”ঢাকা কখনওই ১৯৭১ সালে পাক সেনার সেই নৃশংসতাকে ভুলবে না।” তাঁর এহেন মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। ইউনুস আমলে মনে হচ্ছিল, ক্রমেই যেন অতীতের দগদগে ক্ষত ভুলে পাকিস্তানের সঙ্গেই হাত মেলাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু তারেকের মন্তব্য যেন বুঝিয়ে দিল, বাংলাদেশ আবার আগের অবস্থানেই ফিরছে। খান সেনার সেদিনের বর্বরতার বিরুদ্ধে তাঁর দেশের মানুষ আজও একই রকমের ঘৃণা বহন করে চলেন।

Advertisement
১৯৭১, ৭ মার্চ: রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিচ্ছেন মুজিবর রহমান।

৫৫ বছর পূর্ণ হল সেই অপারেশনের। কিন্তু সেই নির্মম গণহত্যার ক্ষত আজও দগদগে। গত বুধবার বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা একটি কড়া বার্তা দিয়েছেন। জানিয়েছেন, ”ঢাকা কখনওই ১৯৭১ সালে পাক সেনার সেই নৃশংসতাকে ভুলবে না।”

যে সময়ে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ঘটে তখন বাংলাদেশে (তখন অবশ্য পূর্ব পাকিস্তান) রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিচ্ছেন শেখ মুজিবর রহমান। তিনি তখন আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটছেন। তাঁর ভাষণের পরই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল, পশ্চিম পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্তি স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর আওয়ামি লিগ অবিশ্বাস্য ফলাফল করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনেই জয়লাভ করেছে তারা। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে একাত্তরের ঘটনাবহুল মার্চে বৈঠকে বসেন মুজিব-ইয়াহিয়া। এমনকী জুলফিকার আলি ভুট্টোও হাজির ঢাকায়।

কিন্তু আলোচনা পাকিস্তানের মনঃপুত হচ্ছে না। আর সেই সময়ই ইয়াহিয়া সেনাকে জানিয়ে দেন ‘মিলিটারি অ্যাকশন’ ছাড়া পথ নেই। তবে এও জানা যায়, আকস্মিক কোনও সিদ্ধান্ত নয়, ইয়াহিয়া খান সেবছরের ফেব্রুয়ারিতেই মনস্থির করে ফেলেছিলেন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর। সেই সময়ে পাক আর্মি চিফ জেনারেল আবদুল হামিদ খান তৈরি করেছিলেন সেই বীভৎস হত্যার পরিকল্পনা। তবে এই অভিযানটি চূড়ান্ত করা হয় ১৮ মার্চ। কীভাবে অপারেশন চালানো হবে, ঢাকার বাইরেই বা সেনার পজিশন কী থাকবে সবই ঠিক করা হয়। হালকা নীল কাগজের অফিসিয়াল প্যাডের উপরে পেন্সিল দিয়েই লেখা হয়েছিল শিরশিরে নির্যাতনের ঘৃণালিপি।

Zulfikar Ali Bhutto was the foreign minister of pakistan during Bangladesh Genocide
জুলফিকার আলি ভুট্টো

যে সময়ে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ঘটে তখন বাংলাদেশে (তখন অবশ্য পূর্ব পাকিস্তান) রাজনৈতিক উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিচ্ছেন শেখ মুজিবর রহমান। তিনি তখন আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটছেন। তাঁর ভাষণের পরই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল, পশ্চিম পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্তি স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।

পাক সেনার সেই ব্লু প্রিন্ট ছিল শিউরে ওঠার মতো। মনে রাখতে হবে স্রেফ খুন নয়, ধর্ষণও হয়ে উঠেছিল যুদ্ধের অস্ত্র! গ্রামে হোক শহরে, শয়ে শয়ে মেয়েদের টেনে নিয়ে যাওয়া হত ক্যাম্পে। দিনের পর দিন চলত নারকীয় অত্যাচার। তারপর নৃশংস হত্যা! আসলে পাকিস্তানের লক্ষ্যই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বঙ্গ ভাষাভাষী মানুষদের চেতনার গভীরে খুন ও ধর্ষণের জোড়া ফলা গেঁথে দেওয়া।

তবে এটা জানা যায়, ঠিক কোনদিন থেকে ‘অ্যাকশন’ শুরু হবে তা নাকি প্রথমে ঠিক করা যায়নি। খুব গোপনীয়তার সঙ্গে পরিকল্পনা সাড়া হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে পাক সামরিক বাহিনী আটটি স্থায়ী ও অস্থায়ী ক্যান্টনমেন্টে বিন্যস্ত ছিল। ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, রাজশাহী, রংপুর, সৈয়দপুর। সব ক’টি ক্যান্টনমেন্টে একসঙ্গে অ্যাকশন শুরু হবে বলে পরিকল্পনা করা হয়। সেই সঙ্গেই ঠিক করে ফেলা হয় শেখ মুজিবকে জীবিত অবস্থায় ধরতে হবে। পাশাপাশি নজরে ছিলেন অন্য আওয়ামি লিগের নেতারাও। অবশেষে ইয়াহিয়া খান করাচির উদ্দেশে রওয়ানা দিতেই টিক্কা খানের সেই ফোন, “খাদিম, আজ রাতেই।”
মনে রাখতে হবে টিক্কা খানের আরও এক মন্তব্য, ”পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না।”

Bangladesh Genocide was the one of the worst killings of innocent people
সেই নৃশংসতার স্মারক- আজও টিকে আছে

নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে ট্যাঙ্ক, মেশিনগানের আস্ফালনের নেপথ্যে এই ঘৃণ্য মানসিকতাই! রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাঁখারি বাজারে চলে প্রথম আক্রমণ। নির্বিচারে গুলির স্রোত বয়ে যায় নিরীহ মানুষদের উপর দিয়ে। সেই ভয়াবহ স্মৃতির কথা ধরা রয়েছে অসংখ্য বইয়ে। শাঁখারি বাজারে সেরাতে বাড়ির পর বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রাণভয়ে পালাতে থাকা সাধারণ মানুষদের দিকে তাক করে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানের ‘বীরপুঙ্গব’রা! পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত পরাভূত হয়। যুদ্ধে প্রাণ হারান অনেকেই। সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় শয়ে শয়ে যোদ্ধাকে। শোনা যায়, দেহের পর দেহ জুড়ে পথ এমন ঢেকে ফেলেছিল, দ্রুত গর্ত খুঁড়ে গণকবর দিতে হয়। জেনারেল নিয়াজি তাঁর ‘দ্য বিট্রেয়াল অফ ইস্ট পাকিস্তান’ বইয়ে লেখেন, ‘২৫ মার্চের সেই সামরিক অভিযান হিংস্রতা ও নৃশংসতায় বুখারায় চেঙ্গিস খান, বাগদাদে হালাকু খান এবং জালিয়ানওয়ালাবাগের ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের নিষ্ঠুরতাকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল।’

ইয়াহিয়া খান করাচির উদ্দেশে রওয়ানা দিতেই টিক্কা খানের সেই ফোন, “খাদিম, আজ রাতেই।”
মনে রাখতে হবে টিক্কা খানের আরও এক মন্তব্য, ”পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না।”

Tikka was a pakistani general appointed in East Pakistan during genocide
টিক্কা খান

উষ্ণ রক্তস্রোতের সেই প্রবাহ আসলে বাঙালি জাতিসত্তাকেই বোধহয় মুছে দিতে চেয়েছিল সেদিন। রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবসভ্যতার ইতিহাসে যত ভয়ংকর গণহত্যা হয়েছে, স্বল্প সময়ে ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে হত্যায় সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছে ‘অপারেশন সার্চলাইট’। তাই সময় পেরিয়ে গেলেও সেই গণহত্যার প্রসঙ্গ উঠলেই আজও পুঁজরক্ত বেরিয়ে আসে ইতিহাসের পাতা থেকে। অসহায় নরনারীর আর্তনাদ, রক্তমাখা লাশ, ধর্ষিতা রমণীর অসহায় কান্না ও পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতার এক নিষ্ঠুর কোলাজ জেগে ওঠে চরাচর জুড়ে। যে ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়া যাবে না। যে ইতিহাস সভ্যতার হৃদয়ে কুঠারাঘাতের বীভৎসতা নিয়ে জেগে থাকবে। মানুষের নিষ্ঠুরতার এক প্রকাণ্ড স্মারক হয়ে ভাবী পৃথিবীকে সতর্ক করে দিতে।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.