বিশ্বদীপ দে: আবার এসেছে তেনাদের দিন। ভূত চতুর্দশী। সামনেই হ্যালোইন। বাতাসে হেমন্তের শিরশিরানি। কিন্তু কলেজ স্ট্রিট কী বলছে? আজকাল গোয়েন্দা-থ্রিলারের রমরমাও কিছু কম নয়। তাদের দাপাদাপিতে আদৌ কি তেনাদের প্রতি সমান মনোযোগ রয়েছে পাঠকদের? এই আলো ঝলমলে সময়ে কি ভূতের গল্পের বাজার একই রকম আছে? এই প্রশ্ন নিয়ে সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল পৌঁছে গিয়েছিল লেখক-প্রকাশকদের কাছে। দেখে নেওয়া যাক তাঁরা কী বলছেন।
সাহিত্যিক সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় বলছেন, ”ভূত অল্প হলেও কোণঠাসা। তবে খুব ভয়ংকর ভূত-টূত এখনও চলছে। কিন্তু শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা আরও অনেকের লেখায় যে মজার ভূত অর্থাৎ যে ভূতেরা মানুষেরই দোসর, তাদের দেখা পাই না। সেই ‘বন্ধু’ ভূতরা যেন অদৃ্শ্য। থ্রিলারের ভিড়ে সত্যিই তেনারা কিন্তু এখন খানিক কোণঠাসা।”

এদিকে এই সময়ের আরেক জনপ্রিয় সাহিত্যিক সৈকত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বললেন, ”সত্যিই ভূত কিছুটা চাপে। এখন আমাদের চারপাশে যেভাবে ক্রাইমের পরিবেশ রয়েছে, ভূতের পরিবেশ কিন্তু সেই তুলনায় অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। আমরা যারা ভূতের গল্প লিখি, আমাদের যে কী সমস্যায় পড়তে হচ্ছে কহতব্য নয়! ভূতুড়ে বাড়ি খুঁজে পাওয়াই তো ঝক্কির। তিস্তা-তোর্ষার ধারের যে জঙ্গলগুলো ছিল সেখানেও এখন হাউসিং কমপ্লেক্স উঠছে! মনে পড়ছে অনীশদা (অনীশ দেব) একটা গল্প লিখেছিলেন… দারুণ গল্প! সেখানে দেখা যায়, ভূতে বাসা বেঁধেছে জল না ওঠা ডিপ টিউবঅয়েলের ভিতরে ভূত বাসা বেঁধেছে! যাই হোক, ধরা যাক খুঁজেপেতে একটা বাড়ি পাওয়া গেল, গল্পের চরিত্রকে সেখানে পাঠিয়েও দিলাম। তার গাড়ি খারাপ, সে বাধ্যতই সেখানে গেল রাত্তিরটা কাটাতে। কিন্তু তার কাছে তো মোবাইল ফোন রয়েছে। সে তো সেটা দিয়েই যোগাযোগ করতে পারবে। সাহায্য চাইতে পারবে। তাছাড়া এখন শহরে সিসিটিভি সর্বত্র। ভূত যদি হেঁটে যায়, তার ছবিও তো ওঠা উচিত। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, প্রযুক্তির দাপাদাপি ভূতকে কোণঠাসা করে দিয়েছে। বরং এখন বিদেশের গ্রামে ভূত পাওয়ার চান্স বেশি। এবার আমি এক পত্রিকার শারদ সংখ্যায় যে উপন্যাসটা লিখলাম, সেটা লিখতে পটভূমি আমাকে করতে হল ইংল্যান্ডের গ্রাম। উপন্যাসের ভিতরে একজায়গায় আমি দুঃখ করে লিখেছিও- আমাদের ভারতের গ্রামের চেয়ে ইংল্যান্ডের গ্রাম অনেক বেশি ভৌতিক।”

মজার কথা হল, লেখকরা বাংলার ভূতেদের পাশে সেভাবে না দাঁড়ালেও প্রকাশকরা কিন্তু বলছেন উলটো কথা। সাহিত্যিক এবং পত্রভারতী প্রকাশণার কর্ণধার ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ভূতেরা স্বমহিমাতেই আছেন বইপাড়ায়। তিনি বলেন, ”সেই ভূত তো আর নেই। এখন তো অলৌকিক, তার সঙ্গে একটু তন্ত্র, কিছুটা রহস্য, খানিক ইতিহাস মিলেমিশে গিয়েছে। একটা নতুন জঁর তৈরি হয়েছে। এই জঁরই এখন কলেজস্ট্রিট শাসন করছে। শুধু রহস্য গল্পের দিন ফুরিয়েছে! কিছুটা রহস্য, কিছুটা প্যারানর্মাল… একটা অন্য ধরনের সাহিত্যের প্রতি পাঠকের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “একটা সময় কতকটা এই ধরনের চর্চা করেছিলেন অনীশ দেব, অদ্রীশ বর্ধনের মতো লেখকরা। সেটা মাঝখানে স্তিমিত ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে তার সাংঘাতিক বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। বহু নতুন লেখক লিখছেন।” ত্রিদিবের আরও দাবি, “পত্রপত্রিকার ভূত সংখ্য়ার বাজার এত বছরেও বিন্দুমাত্র কমেনি। ফলে ভূতের হাবিজাবি লেখাও মানুষ পড়ে ফেলছে। আসলে অপার্থিবের প্রতি টান!”
দে’জ পাবলিশিংয়ের অন্যতম কর্ণধার শুভঙ্কর দে জানাচ্ছেন, ”এখন যা ট্রেন্ড দেখছি লেখার, সেখানে রহস্যের সঙ্গে অলৌকিককে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা এতকাল যেরকম ভূতের গল্প পড়ে এসেছি, যেমন ধরো প্রেমেন্দ্র মিত্রর অসাধারণ গল্প ‘কলকাতার গলিতে’… কিংবা হেমেন্দ্রকুমার রায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বা আরও অনেকের লেখা, সেরকম ভূতের গল্প এখন পাচ্ছি না। মানে একেবারেই কেবল মাত্র বিশুদ্ধ ভৌতিক রসের গল্পের কথা যদি বলি। তবে বিক্রির কথা যদি ধরতে হয়, সেক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট যে, গোয়েন্দা বইয়ের থেকে ভূতের গল্পের বিক্রি এখনও বেশি। বিশেষ করে পুরনো ভূতের গল্পের সংকলন যা বেরচ্ছে (আমরাও করেছি) সেই সমস্ত বইয়ের বিক্রি এখনও বেশি। তবে একেবারে নতুন লেখা এই ধাঁচের গল্পের বিক্রিটা হয়তো তত বেশি নয়। কিন্তু সামগ্রিক হিসেবে ভূত ঢের এগিয়ে।”
একই সুর বুক ফার্ম পাবলিকেশনসের কর্ণধার শান্তনু ঘোষের গলাতেও। তিনি বলছেন, ”ভূতের বিক্রি মোটেই কম নয়। বরং সেটাই বেশি বিকোয়। আমরা ২০১৭ সালে প্রথম প্রকাশ করি ‘ভয় সমগ্র’। এই নামের কোনও সিরিজ তার আগে ছিল না। এখন অবশ্য কলেজ স্ট্রিট, বাংলাদেশের বইবাজার এই ধরনের বই অনেকে করেছে। যাই হোক, এই সিরিজের পাশাপাশি আমরা আরেকটা সিরিজও শুরু করেছি। পেত্নি সমগ্র। দু’টো সিরিজই আমাদের বেস্ট সেলার। অন্য বইয়ের চেয়ে এর বিক্রি অনেক বেশি। অবশ্য আজকে বলে নয়, ভূতের কাহিনির বিক্রি চিরকালই বেশি। আসলে মানুষ ভয় পেতে ভালোবাসে। বিশেষ করে, আমি লক্ষ করে দেখেছি কমবয়সিরা কিংবা মহিলারা ভূতের গল্প পড়তে দারুণ ভালোবাসে। সিনেমা কিংবা ওয়েব সিরিজও যদি দেখেন, সেগুলোও মানুষ খুব ভালোবাসে।”
কথা বলতে বলতে মনে হচ্ছিল, বিক্রির নিরিখে ভূতের বাজার এখনও পুরোদস্তুর জমজমাট। কিন্তু সেটা হয়তো রাজশেখর-গজেন্দ্রকুমার-শরদিন্দু-হেমেন্দ্রকুমারদের লেখা অর্থাৎ কাল্ট হয়ে যাওয়া লেখার বাজার। নতুন ভূতের গল্প-উপন্যাসকে টক্কর দিচ্ছে গোয়েন্দা-থ্রিলার। পাশাপাশি মিশ্র জঁর, অর্থাৎ রহস্যের সঙ্গে অলৌকিকের কুয়াশা মিশে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের আখ্যান। সেখানে এই ভূত বনাম গোয়েন্দা ‘ফেস অফ’ খোঁজাটাই গোলমেলে হয়ে যায়। তবে মানুষের রক্তে মিশে রয়েছে রোমাঞ্চ। সেই রোমাঞ্চের পিপাসা তাকে অলৌকিক রসে ডুবিয়ে রেখেছে এতকাল। ভবিষ্যতেও তার ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা নেই। একথা জোর দিয়ে বলাই যায়।
সর্বশেষ খবর
-
মৌচাকে ঢিল! অবৈধ বালি থেকে কয়লা পাচার, গ্রেপ্তার ‘প্রভাবশালী’ তৃণমূল নেতা
-
নতুন তৃণমূল আত্মপ্রকাশের পরদিনই সন্দীপনের বাড়িতে বিক্ষোভ, কাটমানি-তোলাবাজিতে সরব বিজেপি
-
আরজিকর কাণ্ড এবার বড়পর্দায়, পরিচালনায় শঙ্কুদেব পণ্ডা, ‘অভিশপ্ত’ আগস্টেই শুরু শুটিং
-
বিশ্বজয়ের ৩ মাসের মধ্যে অধিনায়কত্ব যাচ্ছে সূর্যকুমারের, নেতৃত্বের দৌড়ে আপাতত ৩
-
দিল্লির পর বিহার, বিধ্বংসী আগুন হাসপাতালে, ঝলসে মৃত অন্তত ৪