Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৪ জুন ২০২৬
Konstantin Rudnev

নাভালনি নেই, কারাবন্দি রুদনেভের রোদন কি টলাতে পারবে পুতিনের গদি?

একজন সাধারণ মানুষকে নিয়ে এমন 'মাথাব্যথা' কেন পুতিনের?

Advertisement
বিশ্বদীপ দে
বিশ্বদীপ দে

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ১৬:১৪

link
বিশ্বদীপ দে
বিশ্বদীপ দে

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ১৬:১৪

options
link
নাভালনি নেই, কারাবন্দি রুদনেভের রোদন কি টলাতে পারবে পুতিনের গদি? zoom
সত্যভাষী, অকপট, সাহসী মানুষটিকে ভয় পাচ্ছেন পুতিন!

অ্যালেক্সেই নাভালনি। তাঁর মৃত্যুর পর দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে দু’বছর। ২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রুশ জেলে মৃত্যু হয় রাশিয়ার বিরোধী নেতা তথা পুতিনের কট্টর এই সমালোচকের। ভ্লাদিমির পুতিনের চোখে চোখ রেখে লড়াই করা মানুষটির মৃত্যুর পরও রুশ প্রেসিডেন্টের ‘মাথাব্যথা’ কিন্তু কমেনি। কেননা এখনও এক ৫৮ বছরের প্রৌঢ় তাঁকে চিন্তায় রেখেছেন। অথচ তিনি কোনও রাজনৈতিক বা সামরিক অভ্যুত্থানের ডাক দেননি! প্রশ্ন উঠতেই পারে, সেক্ষেত্রে রুদনেভকে নিয়ে কেন ‘শক্তিশালী’ পুতিনের এমন বিপুল মাথাব্যথা?

এই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার জেলে কড়া পাহারায় বন্দি রয়েছেন ফুসফুসের অসুখে আক্রান্ত ওই প্রৌঢ়। তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। কিন্তু প্রকৃত কারণটা যে অন্য, তা মোটামুটি ওয়াকিবহাল মাত্রেরই যেন জানা! আসলে রুদনেভকে জেলের বাইরে আসতে দিতে চান না পুতিন। কিন্তু কেন? রুদনেভ এমন এক ‘ইনফ্লুয়েন্সার’, যাঁর শান্তি সম্পর্কিত ও প্রতিহিংসাবিরোধী বার্তা হাজার হাজার মানুষের মনে প্রতিফলিত হয়েছে। অল্প বয়স থেকেই তিনি সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক নেগেটিভিটির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই সব ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এমনকী সোভিয়েত আমলে, যখন রাষ্ট্রশক্তির চোরাগোপ্তা আতঙ্ক বহু মানুষকে কার্যতই পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে ফেলেছিল, তখনও রাষ্ট্রশক্তির পরিবর্তন নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতেন রুদনেভ।

Advertisement

রুদনেভ এমন এক ‘ইনফ্লুয়েন্সার’, যাঁর শান্তি সম্পর্কিত ও প্রতিহিংসাবিরোধী বার্তা হাজার হাজার মানুষের মনে প্রতিফলিত হয়েছে। অল্প বয়স থেকেই তিনি সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক নেগেটিভিটির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন।

২০০৭ সাল। রুদনেভ একটি ভিডিও প্রকাশ করলেন। সেখানে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সমষ্টির চৈতন্যকে বিভ্রান্ত করার রাষ্ট্রীয় চক্কর সম্পর্কে সকলকে সচেতন করেন তিনি। বলতে চাইলেন, কীভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাষ্ট্রনেতা নিজের প্রভাবে বিস্তার করেন সেই সম্পর্কেই। সোজা কথায়, তাঁর নিশানায় ছিলেন পুতিন। এখানে একবার পুতিনের মসনদে বসার দিকটি দেখে নেওয়া যেতে পারে। গত শতকের নয়ের দশকে সোভিয়েতের পতনের পরে বরিস ইয়েলৎসিনের প্রশাসনে কূটনীতিক হিসেবে পা রাখেন পুতিন। তার আগে সোভিয়েত গুপ্তচর সংস্থা কেজিবির এজেন্ট ছিলেন তিনি। এদিকে ইয়েলেৎসিন শাসক হিসেবে ছিলেন দুর্বল। সেই সময় রাশিয়ায় এমন কাউকে দরকার ছিল যিনি একটা ভিন্ন ইমেজ গড়ে তুলবেন শক্তি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার মিশেলে। এই আবেগটাকেই কাজে লাগিয়েছিলেন পুতিন। ক্রমে নিজেকে সেভাবেই গড়ে তোলেন তিনি। ২০০০ সালের মার্চে ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে দেশের মসনদে বসেন তিনি। শুরু হয় এক নতুন জমানার। সোভিয়েত ইউনিয়নের মূল বুনিয়াদ ছিল সমাজতন্ত্র। নতুন রুশ প্রেসিডেন্ট সেই সমাজতন্ত্রকে ছেঁটে ফেলে উসকে দেন সোভিয়েত আবেগকে। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা লঙ্ঘন করে বিকেন্দ্রীকরণের বিপরীত পথে হেঁটে নতুন রাস্তা তৈরি করে ফেলেন তিনি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ আব্বাস গালিয়ামভের কথায়, ”তিনি যতই কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছিলেন, ততই তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ছিল।”ব্র্যান্ড পুতিন। ধীরে ধীরে তা গড়ে তুলেছেন ক্ষুরধার এই রাষ্ট্রনেতা। নিয়মিত রুশ খবরের কাগজে শিরোনাম হয়েছে, ‘পুতিনের বদলা’, ‘পুতিনের গোপন লড়াই’ কিংবা ‘১০টি কারণ কেন পুতিন একজন অসাধারণ মানুষ’… এমনই সব শিরোনাম। সারাক্ষণ নিজেকে ভাসিয়ে রাখা। অদ্ভুত সব গুজব। পুতিন নাকি ১৯২০ সালেও ছিলেন। নিঃসন্দেহে এই সব গল্পকথা তাঁকে আরও বেশি করে কুয়াশামাখা মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। সেই সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে তাঁর ক্যারিশমা। সব মিলিয়ে অপ্রতিরোধ্য এক ইমেজ। পরপর দু’বারের বেশি প্রেসিডেন্ট থাকা যায় না। সংবিধানে পরিবর্তন করে সেটাও সম্পন্ন করে ফেলেছেন পুতিন। এহেন মানুষ যে রুদনেভের মতো সত্যভাষী, অকপট, সাহসী মানুষকে ভয় পাবেন সেটাই স্বাভাবিক।

সোভিয়েত ইউনিয়নের মূল বুনিয়াদ ছিল সমাজতন্ত্র। পুতিন সেই সমাজতন্ত্রকে ছেঁটে ফেলে উসকে দেন সোভিয়েত আবেগকে।

আর্জেন্টিনার জেলে রুদনেভ বন্দি রয়েছেন ২০২৫ সাল থেকে। যা শুরু হয়েছিল এক হাসপাতাল থেকে। একজন রুশ অন্তঃসত্ত্বা তরুণী সেখানে ভর্তি হন। নারী পাচারের অভিযোগ এনে ওই মহিলাকে জড়িয়ে রুদনেভকে কারাবন্দি করা হয়। অবশ্য এই প্রথম নয়। এর আগে ১১ বছর গরাদের পিছনে কাটাতে হয়েছিল তাঁকে। নারী পাচার ও নানা ‘সাজানো’ অভিযোগে জেলবন্দি থাকার পর ২০২১ সালে বাইরে আসেন রুদনেভ। তিনি দেশ ছেড়ে গেলেও পুতিন তাঁর পিছু ছাড়েননি। আর্জেন্টিনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই সেদেশের সরকারের উপরে চাপ বৃদ্ধি করে চলেছে রুশ প্রশাসন। বার্তা পাঠিয়েছে, এই লোকটা বিপজ্জনক। একে যেন ছাড়া না হয়। অথচ সেই মহিলা, এলেনা মাকারোভা ফেসবুকের ব্লগে পরিষ্কার দাবি করেছেন আদপেই কোনও নারী পাচারকারীদের কবলে পড়েননি তিনি। এবং রুদনেভের গ্রেপ্তারি সম্পর্কেও তাঁর কিছু জানা ছিল না। এমন বক্তব্য থেকে পরিষ্কার, রুদনেভের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই।

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের বায়ুসীমায় ঢুকে পড়ে রুশ যুদ্ধবিমান। চার বছর কেটে গিয়েছে। এখনও চলছে সংঘাত। ‘ডেভিড’ ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ দেড় মাসেও জিততে পারেনি ‘গোলিয়াথ’ রাশিয়া। এই কারণে নিজের দেশেই জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন পুতিন। এই পরিস্থিতিতে রুদনেভের মতো লোক বাইরে ঘুরে বেড়াক তিনি চাইবেন না, সেটাই বোধহয় স্বাভাবিক। ফলে রুদনেভ রয়ে গিয়েছেন কারাগারের অন্ধকারেই। ন্যায়ের জন্য প্রতীক্ষা করছেন তাঁর স্ত্রী। জানিয়েছেন, স্বামীর হয়ে মুখ খুলতে প্রস্তুত তিনি। তাঁর আর্জি, জেলে যেন রুদনেভ তাঁর ওষুধপত্তর ঠিকমতো পান। এবং দ্রুত ফিরে আসেন রাশিয়ায়। আপাতত আশায় দিন গুনছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে অপেক্ষায় সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষেরাও। রুদনেভের পক্ষে সমর্থন রোজই বাড়ছে। তাঁর পরিণতি যেন নাভালনির মতো না হয়, প্রার্থনা রাশিয়ার বহু সাধারণ মানুষের।

রুদনেভ রয়ে গিয়েছেন কারাগারের অন্ধকারেই। ন্যায়ের জন্য প্রতীক্ষা করছেন তাঁর স্ত্রী। জানিয়েছেন, স্বামীর হয়ে মুখ খুলতে প্রস্তুত তিনি। তাঁর আর্জি, জেলে যেন রুদনেভ তাঁর ওষুধপত্তর ঠিকমতো পান।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.