আকাশ অংশত মেঘলা। ঠান্ডা হাওয়া চামড়ার গভীর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। চারপাশ শুনশান। জঙ্গলের গভীরে তিনজন মেয়ে কাঠ আর শুকনো পাতা কুড়োচ্ছিল। মনের গভীরে হয়তো ভয় ছিল। কিন্তু পেটের টান বড় বিষম বস্তু! হঠাৎ… একটা আকাশ ফাটানো গর্জন! একটা প্রকাণ্ড থাবা সজোরে আছড়ে পড়ল মেয়েটির পায়ে! শেষপর্যন্ত তাকে নিয়ে ঘন জঙ্গলে চলে গেল ‘শয়তান’! এক মানুষখেকো বাঘিনীর ৪৩৪তম শিকার। শেষপর্যন্ত জিম করবেটের বুলেট তাকে না থামালে সংখ্যাটা কোথায় পৌঁছত বলা মুশকিল। কুমায়ুনের এই মানুষখেকোর মৃত্যু হয় ১৯০৭ সালে। কিন্তু সোয়াশো বছর পরও সে বেঁচে আছে! গল্পে, কিংবদন্তিতে!
আসলে সে এক অদ্ভুত সময়। উনিশ শতকে অরণ্যের অধিকার নিয়ে মানুষ ও বাঘের এক রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছিল। ধীরে ধীরে শহুরে সভ্যতা নাক গলাচ্ছে জঙ্গলে। দেখতে দেখতে শুরু হয়ে গিয়েছে বিংশ শতক। নরখাদকের প্রবল অত্যাচারে অসহায় কুমায়ুনের মানুষ বাইরে বেরলে গোধূলি নামলেই মশাল হাতে দল বেঁধে পথ হাঁটত দুরু দুরু বুকে। নেপাল থেকে শ দুয়েক মানুষ মারার পর সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়েছিল সেই ‘শয়তান’! এখানেও একই ভাবে হত্যালীলা চালাতে লাগল সে। এর আগে নেপালে থাকাকালীন সেখানকার সেনা চেষ্টা করেছিল তাকে শায়েস্তা করতে। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি। নেপাল থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর, নরখাদক বাঘিনী এদেশে চম্পাওয়াত ও পালি গ্রামে আস্তানা গেড়েছিল। চার বছর ধরে হাড়হিম আতঙ্ক ছড়িয়ে গিয়েছিল ওই গ্রামগুলিতে। এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও। সরকার পুরস্কার ঘোষণা করল। বড় বড় শিকারিরা এল। কিন্তু অত্যন্ত চতুর ও ধূর্ত বাঘিনীর টিকিটিও ছোঁয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস ছিল, ওই বাঘিনী মানুষ নয়, সে ‘শয়তান’! আসলে এমনটা বারবারই দেখা গিয়েছে।
বেঙ্গল টাইগার প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়! এর শক্তি অতুলনীয়। চোয়ালের ওজন প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে হাজার পাউন্ডেরও বেশি হতে পারে! এবং ‘বিগ ক্যাট’ পরিবারে তাদেরই শ্বদন্ত সবচেয়ে লম্বা। নিজের ওজনের দ্বিগুণ ওজনের শিকারকে হেলায় মাইলকে মাইল টেনে নিয়ে যেতে পারে বাঘ! ঘণ্টায় ৪০ মাইল পর্যন্ত গতিতে দৌড়াতেও পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, বাঘেরা অপমান বা আঘাত কখনও ভোলে না। আঘাত পেলে তারা বেছে বেছে প্রতিশোধ নেয়। এই শক্তি ও প্রতিশোধস্পৃহার মিশেল তাকে করে তুলেছিল ‘লার্জার দ্যান লাইফ’!
নেপাল থেকে শ দুয়েক মানুষ মারার পর সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকে পড়েছিল সেই ‘শয়তান’! এখানেও একই ভাবে হত্যালীলা চালাতে লাগল সে। এর আগে নেপালে থাকাকালীন সেখানকার সেনা চেষ্টা করেছিল তাকে শায়েস্তা করতে। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি।
আর এই পরিস্থিতিতেই এই ‘আখ্যানে’ প্রবেশ ‘নায়ক’-এর। তাঁর নাম জিম করবেট। কিংবদন্তি শিকারি। তখন তাঁর বয়স বছর বত্রিশ। ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘ম্যান-ইটার্স অফ কুমায়ুন’। সেখানেই রয়েছে বাঘিনী শিকারের এই অবিশ্বাস্য আখ্যান। তখন জিম করবেট একেবারেই অনভিজ্ঞ। কিন্তু তাঁর ছিল অটল সাহস। তিনি প্রথমেই জানালেন, ঘোষিত পুরস্কার তুলে নিতে হবে। তিনি বাঘিনীটিকে মারবেন। তবে অর্থের বিনিময়ে অবলা জীবকে হত্যা করবেন না।
চার দিনের প্রখর রোদ আর ঘন জঙ্গল পেরিয়ে করবেট যখন পালি গ্রামে পৌঁছালেন, তখন সেখানে শ্মশানের নীরবতা। লোকজন জানাল, তারা ঘরের ভিতরে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ ঘরে দানাপানি নেই আর! কিন্তু চম্পাওয়াত যাওয়ার রাস্তায় যে টহল দিচ্ছে কুমায়ুনের মানুষখেকো! ঘরে বসে তার অমানুষিক গর্জন শুনলে আর বেরনোর সাহস হচ্ছে না। করবেট বুঝতে পারলেন পরিস্থিতি সত্যিই ভয়াবহ। তাঁকে যা করার তাড়াতাড়িই করতে হবে। বাঘিনীর পায়ের ছাপ দেখে তিনি বুঝতে পারলেন বাঘটা মোটেই বাচ্চা নয়। বরং সে বয়স্কা… বৃদ্ধাও বলা চলে। সম্ভবত সেই কারণেই সহজ শিকার হিসেবে মানুষকে বেছে নিয়েছে সে। কিন্তু পরে করবেট বুঝতে পারেন, স্রেফ সেটাই কারণ ছিল না। বরং এর নেপথ্যে ছিল এক বিশ্রী অতীত।
চম্পাওয়াতে এক মূক তরুণীর দেখা পেলেন তিনি। সে জন্মগত বোবা নয়। চোখের সামনে দেখেছে তার বোনকে মুখে করে নিয়ে জঙ্গলের গভীরে পালাচ্ছে ‘শয়তান’! বারবার কাকুতি মিনতে করতে করতে দৌড়েছিল সেও। আর এরপরই কথা বলার শক্তি হারিয়ে গিয়েছে তার! তার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই খবর এল বাঘিনী তার পরের শিকারও পেয়ে গিয়েছে।
বেঙ্গল টাইগার প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়! এর শক্তি অতুলনীয়। চোয়ালের ওজন প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে হাজার পাউন্ডেরও বেশি হতে পারে! এবং ‘বিগ ক্যাট’ পরিবারে তাদেরই শ্বদন্ত সবচেয়ে লম্বা।
রাইফেল নিয়ে ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করলেন জিম করবিট। তিনি ভালোই জানতেন সামান্য ভুলেই খোয়াতে হবে প্রাণ। কেননা বাঘিনীটি কার্যতই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। হাঁটতে হাঁটতে আচমকাই ঝোপের মধ্যে নড়াচড়া টের পেলেন তিনি। বাঘিনী বসে আছে খুব কাছে, ঝোপের মধ্যে! তবে সেই সময় সূর্য পাটে বসেছে। ক্রমশ পৃথিবীর এই প্রান্তের দখল নিচ্ছে অন্ধকার। এই অবস্থায় রাইফেল হাতেও নিজেকে নিরাপদ অনুভব করলেন না তরুণ করবেট। দ্রুত জঙ্গল ছেড়ে ফিরে এলেন তিনি। নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করলেন ঠান্ডা মাথায়। অপেক্ষা করলেন সূর্যোদয়ের। সমস্ত গ্রামবাসীকে এক পাহাড়ের চুড়োয় তুলে দিয়ে নিজে আশ্রয় নিতে গেলেন আরেক পাহাড় চুড়োয়। সংকেত পেলেই গ্রামবাসীরা ঢোল, ক্যানেস্তারা বাজাবেন- এরকমই পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তার আগেই গ্রামবাসীরা অধৈর্য হয়ে চিৎকার করতে শুরু করল।
করবেট দ্রুত লম্বা ঘাসের মধ্যে শুয়ে পড়লেন। আর তারপরই ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সেই বাঘিনী… সাক্ষাৎ মৃত্যু। এক মুহূর্তও দেরি না করে করবেট গুলি করলেন। সেটা লাগল তার পশ্চাৎদেশে। দ্বিতীয় গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে লাগল পাথরে। করবেট দেখলেন বাঘিনীর দুই চোখ পাথরের মতো স্থির। শরীরে ক্লান্তির আভাস। হয়তো সেও নাসারন্ধ্রে মৃত্যুর ঘ্রাণ পাচ্ছিল। অতএব সামনে দাঁড়ানো ‘বিপদ’কে নিশ্চিহ্ন করতে সে একটা লাফ দিল। যেন মরণঝাঁপ। করবেট চালালেন গুলি। যদি গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হত বাঘের থাবায় মাথা থেঁতো হয়ে যেত। কিন্তু গুলিটা জায়গামতোই লেগেছিল। বাঘিনীর থাবা ভেদ করে বেরিয়ে গেল তপ্ত সিসা। সামান্য ছটফট করে একটা পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিল ‘শয়তান’… তারপর চিরকালের মতো স্থির হয়ে গেল।
করবেট দ্রুত লম্বা ঘাসের মধ্যে শুয়ে পড়লেন। আর তারপরই ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সেই বাঘিনী… সাক্ষাৎ মৃত্যু। এক মুহূর্তও দেরি না করে করবেট গুলি করলেন।
বাঘিনীকে পরীক্ষা করে করবেট বুঝলেন কোনও এক আনাড়ি শিকারির গুলিতে দুই চোয়াল ভেঙে গিয়েছিল তার। এরপরও প্রাণ বেরিয়ে যায়নি শরীর থেকে। বরং সে সুস্থ হয়ে উঠেছে। কিন্তু ওই ভাঙা চোয়ালে শিকার ধরা সম্ভব নয়। একমাত্র উপায় সহজ শিকার ধরা। আর মানুষের চেয়ে সহজ শিকার আর কে আছে! গ্রামবাসীরা মৃত বাঘিনীর দিকে তেড়ে এসেছিল ‘শয়তান! শয়তান!’ বলে চিৎকার করতে করতে। পরিবারের আপনজনকে শেষ করেছে যে, সেই চারপেয়ে প্রাণীটাকে দেখে মাথা ঠিক রাখাই ছিল মুশকিল। তাদের নিরস্ত করেন করবেট। তবে এরই মধ্যে তাঁর নজরে পড়ে সেই মূক তরুণী মুখের ভাষা ফিরে পেয়েছে। বোনের হত্যাকারীর মৃত চামড়া দেখার পর উত্তেজনায় তাঁর জিভ আবার ফিরে পেয়েছে নিজেকে প্রকাশ করার ভাষা!
সর্বশেষ খবর
-
নেপালের বন্যায় নিখোঁজ ইনফোসিসের সিইও গোপিসেট্টি, উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি সংস্থার
-
দ্বিতীয় হুগলি সেতুর নিচে পরপর প্রতিমা ভাঙচুর! শিবপুরে গ্রেপ্তার যুবক
-
দেহদান নিয়ে এবার ভিন্ন ব্যাখ্যা স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বতের, বললেন ‘ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল’
-
‘নিজেদের ঈশ্বর ভাবছেন নাকি’, তুকারাম মুণ্ডের নির্দেশ বাতিল করে ক্ষোভপ্রকাশ বম্বে হাই কোর্টের
-
সন্দেশখালির হোটেলে জঙ্গিদের হাতে পণবন্দি পর্যটকরা, এলাকা ঘিরল এনএসজি! হতবাক স্থানীয়রা

