নিজস্ব সংবাদদাতা, হুগলি: বদলে যাওয়া সময়ের যে দুনিয়া নারীকে ‘পূর্ণ আকাশ’ করে তুলতে সাহস জুগিয়েছে, সেই সময়ে তিনি একটু অন্য জীবনে বিশ্বাসী ছিলেন। হয়তো ‘পুরনোপন্থী’। তাই হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন একজন ঘরকন্না সামলানো সফল জায়া, দরদি জননী। কিন্তু যাকে আঁকড়ে তিনি ভিন্ন পথে হাঁটতে চেয়েছিলেন, সে-ই যে হাত ছেড়ে দিয়েছিল। তার অত্যাচার, অপমানে ভরিয়ে দেওয়া জীবনকে তাই ‘আলবিদা’ জানালেন উত্তরপাড়ার পারমিতা বক্সি। যাঁর ঘর থেকে পাওয়া ডায়েরির পাতায় পাতায় রহস্য। শিউরে ওঠার মতো এক নারীজীবনের বিবরণ। শুক্রবার সকালে বন্ধ ঘর থেকে ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের পর থানায় অভিযোগ, তার জেরে তদন্ত শুরু হলেও বালির বাসিন্দা অভিযুক্ত স্বামী ও তাঁর পরিবারের কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। কিন্তু ঘটনা ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আপাতত সূত্র সেই ডায়েরি, যা ধরে রেখেছে এক হেরে যাওয়া ‘অর্ধেক আকাশে’র মেঘে ছেয়ে যাওয়া দিনলিপি।
[ঘূর্ণাবর্তের জেরে আজ বৃষ্টির পূর্বাভাস, কমতে পারে তাপমাত্রা]
পারমিতা। যাঁর নামের মানে হল পূণর্তা, তাঁর সবকিছু ঘিরে শুধুই শূন্যতা। কন্যা। আত্মমুখী জীবনযাপন। বিয়ের পর চাওয়া বলতে স্বামী, সন্তান-সহ সুখী গৃহকোণ। কিন্তু তাঁর স্বামীর উচ্চবিত্ত জীবনচর্যা ঘিরে ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা তাঁকে এনে ফেলেছিল কর্পোরেট কর্ম-বৃত্তে। সন্তানহীন, প্রেমহীন যে আবহে বড়ই অক্সিজেনের অভাব বোধ হচ্ছিল পারমিতার। চাকরি ছাড়তে চেয়ে, পুণে থেকে বেঙ্গালুরুতে তাঁর ভালবাসার মানুষটির কাছে ফিরতে চেয়ে মার খেতে হয়েছে। এমনকী জেল খাটতে হয়েছে স্বামীর অভিযোগের ভিত্তিতে। শেষ পর্যন্ত উত্তরপাড়ায় সেই যে রেখে গিয়েছিল স্বামী, আর নিয়ে যায়নি। উল্টে ডিভোর্সের নোটিস পাঠিয়ে দিয়েছে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। ভেঙে যাওয়া মন। অপমানের বোঝা হালকা হওয়ার পথ না পেয়ে জীবনযুদ্ধের লড়াইয়ে ইতি টানলেন হুগলির উত্তরপাড়ার মাখলার ৩০ বছরের পারমিতা। যিনি বড় হয়েছেন পালক বাবা-মার কাছে। যাঁরা শিখিয়েছিলেন, মাথা উঁচু করে বাঁচার মন্ত্র। সেই মন্ত্র জপে ‘বাবা’ কালীপদ দাস অন্য লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে থানার দ্বারস্থ। অভিযোগ করেছেন জামাই কৌস্তুভ বক্সি, শ্বশুর কৃষ্ণেন্দু, শাশুড়ি ছন্দা ও ননদ কমলিকার বিরুদ্ধে।
পারমিতার সুইসাইডাল নোট, “তোমার জন্যই আমার এই চরম পরিণতি। তোমার হয়তো কোনও শাস্তি হবে না। কিন্তু মনের অনুতাপে তুমি শেষ হবে। ভাল থেকো।” তাঁর ডায়েরি বলছে আরও অনেক কিছু। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, কীভাবে পুণেতে তাঁকে জোর করে পরিচিত একটি অফিসে কাজে ঢুকিয়ে কৌস্তুভ ব্যাঙ্গালোরে কাজ নিয়ে চলে যান, প্রতিবাদ করায় সহকর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়, মিথ্যা অভিযোগে জেল যেতে হয়, সবই লেখা রয়েছে। গতবছর ২৪ নভেম্বর রেজিস্ট্রি বিয়ের পর পারমিতাকে নিয়ে কৌস্তুভ পুণে চলে যায়। সেখানে পারমিতা চাকরি করতে না চাওয়ায় বারবার মারধর করা হয়। শেষ পর্যন্ত চাকরি করলে মাইনের সব টাকা বালিতে শ্বশুরবাড়িতে পাঠাতে হত পারমিতাকে। এ নিয়ে ঝামেলা চলাকালীন কৌস্তুভ পুণেতে আসে ও স্ত্রীকে মারধর করে। অর্থ নয়, চাকরি নয়, সুখী গৃহকোণ তাঁর কাছে মুক্ত আকাশ, সে কথা বললেই ডিভোর্সের হুমকি দেওয়া হত। শেষ পর্যন্ত শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে পারমিতা। ঠিক করে চাকরি ছেড়ে দেবে। তাঁর মা বনানী দেবীর আরও অভিযোগ, এক সময় কৌস্তুভ পুণেতে এসে অফিসের লোকজনকে নিয়ে মারধর করে থানায় পারমিতার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযাগ করে। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এতে পুরোপুরি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত পারমিতা চাকরি ছেড়ে দেয়। কৌস্তুভ পারমিতাকে পুণে থেকে নিয়ে এসে ১৫ অক্টোবর এখানে রেখে যায়। বলে যায়, ৩ মাস বাদে এসে নিয়ে যাবে। কিন্তু কথা রাখেনি।
[নগ্ন ছবিতে চেনা মহিলাদের মুখ, জগাছায় গ্রেপ্তার মূল অভিযুক্ত]
বালিতে কৌস্তুভের বাড়ির সঙ্গে কালীপদবাবু যোগাযোগ করলে তারা ডিভোর্স পেপারে মেয়েকে সই করে দিতে বলে। পারমিতা গেলে তাঁর স্বামী ও পরিবারের অন্যান্যরা ঢুকতেই দেয়নি বলে অভিযোগ। এরপরই বৃহস্পতিবার বাড়িতে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় দড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মঘাতী হন পারমিতা। শুক্রবার সকালে দরজা ভেঙে উদ্ধার হয় তাঁর মৃতদেহ, সুইসাইড নোট ও ডায়েরি। উত্তরপাড়া থানা যোগাযোগ করেছে হাওড়ার বালি থানার সঙ্গে। তদন্ত শুরু হয়েছে। বালিতে অভিযুক্তের বাড়ির তরফে অবশ্য পুলিশের কাছে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ অভিযুক্তদের জেরা করে ব্যবস্থা নিতে চায়।
সর্বশেষ খবর
-
নেশাই কাড়ল প্রাণ! বাইকে চড়ে বেড়াতে গিয়ে নেপালে পথের বলি বাংলার যুবক
-
কাঁকুড়গাছি বিজেপি কর্মী অভিজিৎ খুনের মামলায় চার্জগঠন! নাম পরেশ-স্বপন-সহ ১৯ জনের
-
স্থির আয়ের বিকল্প খুঁজছেন? হদিশ রইল পাঁচ ‘রত্নে’র
-
ইছামতীর তীরে বুলডোজার! আদালতের নির্দেশে সরকারি জমিতে ওঠা বেআইনি হোটেল ভাঙা শুরু
-
হোয়াটসঅ্যাপের নতুন ফিচারে বাড়বে সাইবার জালিয়াতি! উদ্বিগ্ন কেন্দ্র, মেটার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ?