গৌতম ব্রহ্ম: বন্দন রাহার তাসের মণ্ডপ দেখতে গিয়ে বউয়ের মুখ ঝামটা জুটেছিল। অঙ্কিতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্বাস করেননি তাঁর ‘নীরস’ স্বামী শিল্পরসে টইটুম্বুর। স্বামী সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে শিল্পকর্মের কথা শোনার পর রেগে গিয়ে বলে ফেলেছিলেন, “তুমি আবার আর্টের কী বোঝ? এমন বাজে রসিকতা করলে তোমার সঙ্গে আর ঠাকুর দেখব না।”
এখন সেই অঙ্কিতাই তাঁর শিল্পকর্মের সব থেকে বড় গুণগ্রাহী। বাড়ি-অফিস সামলে রিয়েলিটি শো-তে প্রথম হচ্ছেন। আবার আনন্দের সঙ্গে স্বামীর পুজোর কাজও সামলাচ্ছেন। একটা সময় সুব্রতর মা-ও অবাক হয়েছিলেন ছেলের হাতের কাজ দেখে। আসলে অজ্ঞাতবাসেই ছিল সুব্রতর শিল্পকর্ম। সুন্দরী বান্ধবীদের এড়াতে টুপি-তোয়ালেতে মুখ ঢেকে দেওয়ালে কর্পোরেট সংস্থার বিজ্ঞাপনী পোস্টার আঁকতেন। কুড়ি টাকা রোজে মেলার কাজও করেছেন। কখনও সখনও সেই টাকা মেরে পালিয়েছে ঠিকাদার। বাবার ওষুধ কেনার টাকা জোগাড় করতে জুতোও বিক্রি করেছেন সুব্রত। তারই মধ্যে নিভৃতে চলেছে শিল্পসাধনা। আর্ট কলেজে যাননি। বিশিষ্ট কারও কাছে তালিমও নেননি। অথচ, একটা সময় সিপিএমের কেন্দ্রীয় সমাবেশের মঞ্চের ডিজাইনও করেছেন। বন্ধুরা যখন চামড়ার ব্যবসা করে দু’হাতে টাকা কামাচ্ছে, আমোদ-আহ্লাদে দু’হাতে টাকা উড়িয়েছেন তখন তুলি হাতে ক্যানভাসে নিজের ভবিষ্যৎ এঁকেছেন সুব্রত।

অদম্য জেদের সামনে মাথা নত করেছে দুঃসময়। একইসঙ্গে দু-দু’টো সরকারি চাকরি পেয়েছেন সুব্রত। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি নিয়ে অতঃপর নতুন ইনিংস শুরু। কর্মসূত্রে গুজরাত। টানা সাতবছর আমেদাবাদে কাটিয়েছেন। সলতে পাকানো শুরু ২০০০ সাল থেকে। ওই বছরই সুব্রতর ঘুমিয়ে থাকা ‘শিল্পীসত্তা’-কে জাগিয়ে তোলেন অঙ্কিতা। মজা করে তাই বলেই ফেললেন, “কয়লার ভিতরে থাকা হিরেটাকে তো আমিই খুঁজে বের করেছি!” থিমশিল্পী হিসাবে পুরোদস্তুর কাজ শুরু ২০০৫-এ, নিজের পাড়া তিলজলায়। ২০০৬-এ ট্যাংরা ঘোলপাড়া। থিম খননকার্য। ’০৭-এ মিনেকারি। ’০৮-এ খড়ের সেই বিখ্যাত কাজ। ওই একটি থিমেই নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন সুব্রত। বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি ‘বি’ ডিভিশন নন, আই লিগের প্লেয়ার!
এরপর কলকাতার থিমপুজোর মানচিত্র অনেকটাই বদলে দিয়েছেন সুব্রত। কখনও শিবমন্দিরে কলাগাছের আশ থেকে মণ্ডপ গড়ে উৎসবের ভেলা ভাসিয়েছেন। কখনও ট্যাংরায় ফিরে কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগিয়ে সেরা পুজোর শিরোপা জিতেছেন। কখনও আবার টালা পার্কে ‘জেনেটিক্যালি মডিফায়েড’ বীজ নিয়ে অন্ধকার ভবিষ্যতের ছবি তুলে ধরেছেন, কখনও ‘ক্লোনিং’-এর বিপদ বোঝাতে ‘রক্তবীজ’-কে জীবন্ত করেছেন। ফলশ্রুতি? বিদেশ থেকেও স্বীকৃতি জুটেছে সুব্রতর।
এবছরও টালার ‘৫০ বছর এগিয়ে’, ভবানীপুরের অবসরের ‘কাচের মণ্ডপ’ নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। নিউ আলিপুরের সুরুচি সংঘ তো রয়েছেই। সেই ২০১১ সাল থেকে থিম পুজোর ‘তেণ্ডুলকর’ সুরুচি-র থিমমেকার হিসাবে কাজ করছেন। সুব্রতর ভাষায়, “টানা সাত বছর সুরুচিতে কাজ করা ‘অস্কার’ পাওয়ার থেকে কোনও অংশে কম নয়।” এমন কোনও শারদীয়া পুরস্কার নেই যা সুব্রত পাননি। কলকাতার পুজোকে বিস্ময়কর সব থিম উপহার দিয়েছেন তিনি। নিজের পকেট থেকে পয়সা দিয়েও পুজো করেছেন দিনের পর দিন। বহুবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দে্যাপাধ্যায়ের হাত থেকে সেরা শিল্পীর পুরস্কার নিয়েছেন। যুব ফুটবল বিশ্বকাপের সৌন্দর্যায়নে প্রিয় শিল্পীর উপর অনেকটাই নির্ভর করছেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। মণ্ডপের সঙ্গে জোরকদমে চলছে সল্টলেক স্টেডিয়ামের সেই কাজও।
পুজো থেকে বিশ্বকাপ কী অদ্ভুত এক পরিক্রমা। অথচ এক বন্ধুর ‘উপর চালাকি’ না থাকলে সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পী হয়ে ওঠাই হত না। শিল্পীর কথায়, “আমার এক বন্ধু ‘ট্রেসিং পেপার’-এ আকবর-বাবরের ছবি এঁকে আমার মধ্যে হীনমন্যতার জন্ম দিয়েছিল। আমি জানতাম না ‘ট্রেসিং পেপার’-এর ব্যাপারটা। আমি ওর মতো আঁকার চেষ্টা করতাম। সেই চেষ্টাই আমার আঁকার হাত তৈরি করেছে।” অবসর-এর শ্যামলনাথ দাস থেকে টালা বারোয়ারির কৌশিক ঘোষ একবাক্যে মেনে নিয়েছেন সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপ্রতিরোধ্য জেদের কথা। ওঁদের কথায়, “কাজের সময় মানুষটা নিজের শরীর-স্বাস্থ্য, বউ-মেয়ে, পরিবার, চাকরি সব ভুলে যান। যখন যেখানে কাজ করেন সেখানকার লোক হয়ে যান। এক অতিজাগতিক শক্তি যেন ভর করে তখন।”
সর্বশেষ খবর
-
দুই ‘সেরা’ গোলের ম্যাচে বাজিমাত ‘গোলদস্যু’ হালান্ডের, প্রি কোয়ার্টারে ব্রাজিলের সামনে নরওয়ে
-
বাড়িতে পাথর ছুড়ছে দুষ্কৃতী! সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করে তোপ অভিষেকের
-
ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপ প্রধানমন্ত্রী মোদির, কী কথা হল, চাপ বাড়বে ট্রাম্পের?
-
নীচু জাত! কলেজের অশিক্ষক কর্মীকে নির্যাতন, ঘরে ঢুকতে বাধা অধ্যক্ষার! বিতর্ক পুরুলিয়ায়
-
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সস্ত্রীক দিলীপ ঘোষের সাক্ষাৎ, উপহার আম ও সন্দেশ! কী কথা হল?