পুজো প্রায় এসেই গেল৷ পাড়ায় পাড়ায় পুজোর বাদ্যি বেজে গিয়েছে৷ সেরা পুজোর লড়াইয়ে এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায়৷ এমনই কিছু বাছাই করা সেরা পুজোর প্রস্তুতির সুলুকসন্ধান নিয়ে হাজির Sangbadpratidin.in৷ আজ পড়ুন সমাজসেবী সংঘের পুজো প্রস্তুতি৷
শুভময় মণ্ডল: টালিগঞ্জ থেকে টালা, মায় বেহালা, শহরের বিভিন্ন রাস্তায় একটাই শোরগোল। ফুটপাথের ধারে, রেলিংয়ের গায়ে, ব্যানার-হোর্ডিংয়ে সর্বত্র সবুজ ফ্লেক্সে লেখা, ‘এবার সমাজসেবীর পুজোয়’। যেই দেখছে তারই একটাই প্রশ্ন, ব্যাপারটা কী? টিজার যুদ্ধে শহরের পুজো কমিটিগুলি বিজ্ঞাপনী চমককেও হার মানাচ্ছে। সেই লড়াইয়ে বিগত কয়েক বছর ধরে উঠে আসছে এমনই সব চমকে দেওয়া টিজার। লড়াই অভিনবত্বেরও। কিন্তু সবুজ ফ্লেক্সে লেখা এবার সমাজসেবীর পুজোয় মানেটা কী?
অভিনবই বটে। পুজোর শহরে উত্তর থেকে দক্ষিণ এমন টিজারেই মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে লেক রোডের সমাজসেবী সংঘ। এবছর তাদের ভাবনায় সবুজের যে একটা ছোঁয়া রয়েছে তা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বোঝা গিয়েছে। খোলসা করেই বলি, এবছর তাদের থিম-সবুজের অভিযান। সবুজের অভিযান মানেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সবুজায়নের কথা। হয়তো উষ্ণায়নের থাবা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করার বার্তা দেওয়া হচ্ছে সবুজায়নের কথা বলে। না তেমন কিন্তু নয়। এখানেই তো চমক। এ সবুজের অভিযান বাঁধনমুক্তির কথা বলবে। ধূসর হয়ে যাওয়া শৈশব সবুজে রাঙিয়ে দেওয়ার পথ দেখাবে। পরিবারের চাপে জীবনে সফল হওয়ার কারখানায় পিষে যে শৈশব আজ লুপ্তপ্রায়। শৈশবের যে সহজ পাঠ আজ ভুলতে বসেছে শিশুরা। সেই হারিয়ে যাওয়া অনাবিল আনন্দের কথাই বলবে এবার সমাজসেবী সংঘ। এবার ৭২তম বর্ষে পা দিয়েছে সমাজেসেবী। কয়েকবছর হল থিম পুজোয় নাম লিখিয়েছে দক্ষিণের এই নামী পুজো। গতবারও থিম-সাবেকিয়ানার সংমিশ্রণ ছিল। তবে এবার পুরোপুরি থিম পুজোর মহাযজ্ঞে শামিল সমাজসেবী। থিমের পোশাকি নাম- সবুজের অভিযান।

থিম পুজোর প্রতি ধীরে ধীরে শহরের পুজোপ্রেমীদের অন্যরকম ভালবাসা তৈরি হয়েছে। সেই কথা মাথায় রেখেই এবার দর্শকদের চমকে দেওয়ার জন্য সবরকম বন্দোবস্তই করেছে সমাজসেবী। মণ্ডপসজ্জার দায়িত্বে থিমমেকার শিল্পী দেবাশিস ভট্টাচার্য। তাঁর সৃজনে এবার এক শৈশব পেষা কারখানার আদলে তৈরি হচ্ছে সমাজসেবীর মণ্ডপ। যে কারখানায় শিশুদের যন্ত্রে পরিণত করা হয়। থিম ভাবনায় গোটা মণ্ডপকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। শিশুর জন্মমুহূর্ত থেকে তাঁর জীবনসংগ্রামের কাহিনি বর্ণিত হবে গোটা মণ্ডপে। প্রথম ধাপে দেখানো হবে শিশুর জন্মমুহূর্ত। শিল্পী অভিষেক বসুর আবহে শিশুর জন্মলগ্নের সারল্যতাকে ফুটিয়ে তোলা হবে। তারপর মণ্ডপের দ্বিতীয় পর্যায়। সেখানে দেখানো হবে, কীভাবে নিজেদের ইচ্ছে সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার নামে শৈশব পেষা কারখানায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে অভিভাবকরা। মরচে ধরা জীর্ণ, পুরনো কারখানায় শৈশব ভুলে ভবিষ্যৎ গড়ার ইঁদুরদৌড়ে যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে শিশুরা। কেউ বা ডাক্তার, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার আবার কেউ নামী সংস্থায় চাকরি পাওয়ার জন্য জাঁতাকলে পড়ে পিষছে।

তৃতীয় পর্যায়ে দেখানো হবে, পরিবারের চাপে খাঁচায় বন্দি শৈশব। যে শৈশবের সামনে পড়ে সবুজ মাঠ, মুক্ত আকাশ। তাদের হাতছানি দিচ্ছে গাছের ফুল, পাখি। কিন্তু বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে পারছে না শিশুরা। নিজেদের ঘরেই তারা বন্দি। খাঁচা যে তালাবন্দি। তা খোলার উপায় নেই। তাই গুমরে মরে শৈশব। এভাবেই ধীরে ধীরে কৈশোর জীবন পার করে বড় হয়ে ওঠে জেনারেশন ওয়াই। ভারচুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ তাদের চলাফেরা। পরিবার-সামাজিক দায়বদ্ধতা-পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে যাঁদের মাথাব্যাথা নেই। জীবনে সফল হওয়ার ইঁদুরদৌড়ে অংশ নিয়ে এখন বাবা-মাকেই ভুলে গিয়েছে তাঁরা। অধিকাংশ সময়ই থাকে বিদেশে বা শহরের বাইরে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করার ফুরসতটুকু নেই তাঁদের। টাকা পাঠিয়েই দায় সেরে ফেলে তাঁরা। নিজেদের ভুল বুঝতে পারে অশীতিপর বাবা-মা। একদিন তো তাঁরাই সন্তানদের শৈশবকে নষ্ট করে ভবিষ্যৎ গড়ার কারখানায় তাদের যন্ত্রে পরিণত করেছিল। সেই আত্মোপলব্ধিকেও আবহ সংগীতের মধ্যে দিয়ে মণ্ডপের চতুর্থ ও শেষ পর্যায়ে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।

শেষে রয়েছে মাতৃপ্রতিমা। শিল্পী দেবাশিস ভট্টাচার্যের ভাবনায় তৈরি হচ্ছে সাবেকি প্রতিমা। শেষ পর্যায়ে দেখা যাবে হারিয়ে যাওয়া শৈশবই সবুজের ডাকে সাড়া দিয়ে সমস্ত বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা তথা কমিটির সম্পাদক অরিজিৎ মৈত্র জানিয়েছেন, মূলত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনায় রাজ্য সরকারের ‘সবুজ সাথী’ প্রকল্পের অনুপ্রেরণায় এই সবুজের অভিযান থিম। সরকার যেমন পড়ুয়াদের স্কুলে যাওয়ার সুবিধার্থে পড়ুয়াদের সাইকেল প্রদান করছে, তেমনই এবার ভাবনায় শিক্ষাব্যবস্থাকে দেখানো হয়েছে। পড়াশোনা যেন যান্ত্রিক না হয়, তা বোঝাতেই এবারের এই থিম।

গোটা মণ্ডপই তৈরি হচ্ছে লোহা দিয়ে। লোহার বাতিল যন্ত্রাংশ, সাইকেল, লোহার শিট দিয়ে মণ্ডপ সাজানো হচ্ছে। আরও একটি আকর্ষণ রয়েছে। তা হল, ফ্যাশন ডিজাইনার তেজস গান্ধীর সৃজনে বিশেষ পরিধানে সেজে উঠছে প্রতিমা। এক বিশেষ ধরনের বেনারসি শাড়ি থাকবে প্রতিমার পরনে। গত বছর শিল্পী সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের সৃজনে ‘আমার দুগ্গা’ দেখিয়েছিল সমাজসেবী। এবছর এই অভিনব সবুজের অভিযান পুজোপ্রেমীদের মনে কতটা দাগ কাটে সেটাই দেখার। তবে তার আগে পুজোর আমেজ পেতে বিশ্বকর্মা পুজোতেই ঢুঁ মারতে হবে সমাজসেবীতে। বিশ্বকর্মা পুজো মানেই আশ্বিনের আবাহন। শরতের ঝকঝকে নীল আকাশ আর রংবেরঙের ঘুড়ির ঝাঁক। সেই ঘুড়ি উৎসবের আনন্দে মাতবে সমাজসেবীও। পেটকাঠি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগ্গাদের ভিড়ে ঝলমলে আকাশ দেখতে হলে ঢুঁ মারতেই হবে লেক রোডের এই পুজোয়। প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে এখনই প্রস্তুত হোন।
কেমন চলছে পুজোর প্রস্তুতি, দেখুন ভিডিওয়-
সর্বশেষ খবর
-
দুই ‘সেরা’ গোলের ম্যাচে বাজিমাত ‘গোলদস্যু’ হালান্ডের, প্রি কোয়ার্টারে ব্রাজিলের সামনে নরওয়ে
-
বাড়িতে পাথর ছুড়ছে দুষ্কৃতী! সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করে তোপ অভিষেকের
-
ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপ প্রধানমন্ত্রী মোদির, কী কথা হল, চাপ বাড়বে ট্রাম্পের?
-
নীচু জাত! কলেজের অশিক্ষক কর্মীকে নির্যাতন, ঘরে ঢুকতে বাধা অধ্যক্ষার! বিতর্ক পুরুলিয়ায়
-
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সস্ত্রীক দিলীপ ঘোষের সাক্ষাৎ, উপহার আম ও সন্দেশ! কী কথা হল?