সরোজ দরবার ও শুভময় মণ্ডল: বাঙালি জেগে উঠেছে শারদপ্রাতে। আর কে বলে সেই প্রভাতে তিনি নেই! সেই সনাতন দিন্দা যিনি অনায়াসে পুজোর আধুনিকতায় ছুঁইয়ে দেন ঐতিহ্যের স্বর্ণসিন্দুর। ভিড়চঞ্চল মুহূর্তরা নতজানু হয় তাঁর সৃষ্টির সামনে। উদ্যোক্তারা খুশি হন ভিড়ের কলরোলে। আর রসিকজন জানেন, শিল্পের শোকেস থেকে বাঙালির পুজোকে তিনি নিয়ে তুলে নিয়ে যান শিল্পিত মহাকাশে, যেখানে সমসাময়িকতা করমর্দন করে ইতিহাসের সঙ্গে। বাঙালি সাক্ষী থেকেছে এই পুজোর। নলিন সরকার স্ট্রিট হোক বা বড়িশা, হাতিবাগান বা ৯৫ পল্লি, সনাতন দিন্দা মানেই এক মেলবন্ধন, স্বতন্ত্র ঘরানা। অথচ গতবারের মতো এই সতেরোর পুজোর লেখচিত্রেও তাঁর নামে কোনও বিন্দু নেই। কোনও হোর্ডিংয়ে, প্রচারে কোথাও নেই এই আন্তর্জাতিক বাঙালি শিল্পী। এও কি আত্মবিস্মৃতি! নাকি অনীহা! হয়তো বা, কিংবা নয়। তবু শিল্পী বিস্মৃত হননি তাঁর ভূমিকা। তাই কোথাও না থেকেও আছেন তিনি। এবারও হাতে উঠে এসেছে তুলি। তৈরি হয়েছে রঙ। আর পুজোর প্রচারের অন্তরালে থেকেই ফুটিয়ে তুলছেন মায়ের চোখ।

এই বছর কয়েক আগেও কলকাতার পুজো আর সেরার পুরস্কার যদি সমীকরণের এপাশে থাকত, অন্যপাশে তবে অবধারিত নাম সনাতন দিন্দা। বারোয়ারি পুজোর বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন থিম। স্রেফ কোনওকিছুর আদলে মণ্ডপ তৈরি নয়। বরং ভাবনার আকাশ খুলে দিয়ে শিল্পে রূপান্তরের পক্রিয়া শুরু হয় মোটামুটি দু’দশক আগে থেকে। খুলে যায় নতুন নতুন সম্ভাবনা। এই পর্বে অবশ্যই অগ্রণি সনাতন দিন্দা। তাঁর শিল্প ভাবনা এক ঝটকায় কলকাতার পুজোকে শুধু ভিড়ে নয়, শিল্পেও আন্তর্জাতিক মানের করে তুলেছিল। বছর বছর তার সাক্ষী থেকেছে মানুষ। পুজো তার বাণিজ্য, পুরস্কার প্রাপ্তিকে পাখির চোখ করেও যে শিল্পের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে পারে, সনাতন তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর পুজোয় ভিড় বাঁধা, তবু থিমের ভিড় থেকে তিনি তাঁর কাজকে তুলে রাখতে পারেন অন্য কোটিতে। পরবর্তীতে বহু শিল্পীই ভিন দেশ বা রাজ্যের অনুকৃতি সরিয়ে সৃজনে মন দিয়েছেন। বহু ব্যতিক্রমী ও স্মরণীয় পুজোর সাক্ষী থেকেছে কলকাতা। কালে কালে থিম আজ অনেকাংশেই পুজোর পাঠক্রমে অতিরেক। হয় নিছক অনুসরণ নয় তুষ্টিকরণের স্তবস্তুতি। এই সন্ধিক্ষণে সনাতনের অনুপস্থিতি যুগপৎ বিস্মিত ও হতাশ করেছিল পুজোপাগলদের। যদিও শেষমেশ তিনি ফিরলেন।

কালীঘাটের যে পুজোর জন্য হাতে তুলি সনাতনের, তাকে পুজোর বনেদিয়ানায় নিতান্ত অকুলীনই বলা যায়। তবে গুরু-শিষ্য পরম্পরা এই পুজোকেই শিরোনামে এনেছে। ডোমপাড়ার রাজু মানিক এই পুজোর শিল্পী। যিনি এককালে সনাতনের বহু পুজোর সঙ্গী। এবার নিজে প্রতিমা গড়তে গিয়ে চক্ষুদানের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন গুরুকে। ফেলতে পারেননি সনাতন। আর তাই পুজোয় না থেকেও এবার থেকে গেলেন তিনি। কেমন লাগছে? সনাতন জানালেন, তাঁর থেকেও হয়তো বেশি ভাল লাগছে রাজুর। লাগারই কথা। তাঁর প্রতিমায় সনাতনের হাত পড়া নিঃসন্দেহে প্রাপ্তি। তবে এ নিছক অনুরোধের আসর নয়। শিল্পী সনাতন দ্বিধাহীন জানালেন, ‘আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে যাঁরা ঠাকুর গড়ছেন, তাঁদের প্রতি সম্ভ্রম জানিয়েই বলছি, অসাধারণ কাজ করেছে রাজু। আমি ওকে তোল্লাই দিচ্ছি না, দেওয়ার প্রয়োজনও নেই। জনগণই আমার কথা মিলিয়ে নেবেন। ও এই প্রতিমার ছবি পাঠাতেই আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। তারপর চোখ দেওয়ার কথা বলতে সানন্দে রাজি হই। এবং আমি চাই রাজুর এ কাজ প্রচারের আলোয় আসুক। কেননা কাজটা দেখলেই বুঝবেন, কতটা ভাল হয়েছে।’ রাজুও জানাচ্ছেন, প্রতিমায় চক্ষুদান সত্যিই কঠিন চ্যালেঞ্জ। গুরুর হাতে সে দায়িত্ব সঁপে তিনি খুশিই হয়েছেন। হয়তো গুরুদক্ষিণাও বটে। সনাতন জানিয়েছিলেন, কোনও পুজো, কোনও শিল্পী তাঁকে সসম্মানে আহ্বান করলে তিনি হাত লাগাতে দ্বিধা করবেন না। এই নিয়ে দু’বছর তবু তাঁর ছোঁয়া থেকে বঞ্চিতই থেকেছে কলকাতার পুজো। রাজুর গুরুদক্ষিণায় ফের বাঙালির পুজো পেল সনাতনী ছোঁয়া। তুলির টানে মাতৃপ্রতিমার চোখ ফুটল। আর আদ্যন্ত পেশাদার এই সময়ে চক্ষুদান হল পরম্পরারও। এরই তো নাম শরৎকাল। ঝকঝকে, মালিন্যহীন। বাংলার শারদীয়া যে এমনটাই।

দেখুন চক্ষুদানের সেই ভিডিও-
সর্বশেষ খবর
-
দুই ‘সেরা’ গোলের ম্যাচে বাজিমাত ‘গোলদস্যু’ হালান্ডের, প্রি কোয়ার্টারে ব্রাজিলের সামনে নরওয়ে
-
বাড়িতে পাথর ছুড়ছে দুষ্কৃতী! সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করে তোপ অভিষেকের
-
ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপ প্রধানমন্ত্রী মোদির, কী কথা হল, চাপ বাড়বে ট্রাম্পের?
-
নীচু জাত! কলেজের অশিক্ষক কর্মীকে নির্যাতন, ঘরে ঢুকতে বাধা অধ্যক্ষার! বিতর্ক পুরুলিয়ায়
-
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সস্ত্রীক দিলীপ ঘোষের সাক্ষাৎ, উপহার আম ও সন্দেশ! কী কথা হল?