স্টাফ রিপোর্টার: অযৌক্তিক চিকিৎসা-ব্যয়ের অভিযোগ ঘিরে কোভিড-বিধ্বস্ত আবহ এমনিতেই উত্তাল। এবার তাতে আরও অশান্তির মাত্রা জুড়ল হাসপাতাল ভাঙচুর এবং ডাক্তার নিগ্রহে উসকানির অভিযোগ, যার কেন্দ্রে এক খ্যাতনামা অভিনেতা। তিনি রুদ্রনীল ঘোষ (Rudranil Ghosh)। ঘটনার জেরে আপাতত যিনি সমালোচনার বাণে জর্জরিত। “এবার কোনও হাসপাতালে ভাঙচুর হলে বা কোনও ডাক্তার নিগৃহীত হলে ওঁকেই দায় নিতে হবে”, এমন তোপের মুখেও পড়তে হচ্ছে অভিনেতাকে।
বিতর্কের সূত্রপাত সোশ্যাল মিডিয়ায় রুদ্রনীলের একটি পোস্ট। সম্প্রতি তিনি ফেসবুকে লিখেছিলেন, “ধৈর্যের বাধ ভেঙে একদিন কিছু মানুষ কিছু রক্তচোষা বেসরকারি হাসপাতাল ভাঙবে। মালিকরা হাসপাতালে ভরতির সময় পাবেন না। কাঠের বদলে লুঠের টাকা দিয়ে দাহ করা হবে ধাপার মাঠে। ঘিয়ের বদলে ছড়ানো থাকবে থুতু..।” শোরগোল ফেলে এই পোস্টটি ভাইরাল হয়েছে। অভিনেতার লেখা পড়ে শিউরে উঠেছেন বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকরা। তাঁদের আক্ষেপ, এমনিতেই রোগীর কিছু হয়ে গেলে পরিজনের স্বাভাবিক রোষ গিয়ে পরে ডাক্তারের উপর। এমতাবস্থায় এক সেলিব্রিটির এহেন বিষোদ্গার তো আগুনে ঘি ঢালার শামিল!
“মৃতপ্রায় রোগী হাসপাতালে এসে পৌঁছলে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। চিকিৎসা করতেই হয়। মারা গেলেই ডাক্তারের কলার ধরেন বাড়ির লোক। অনেক সময়ে বিলের টাকাও দিতে চান না।”- অভিযোগ ওঁদের, “এই পরিস্থিতিতে পেশেন্ট পার্টির ক্ষোভে অনুঘটকের কাজ করতে পারে এই লেখা।” অতঃপর বেসরকারি হাসপাতালের ডাক্তারকূল উদ্বিগ্ন। ওঁদের পর্যবেক্ষণ, এমনিতেই জনমানসে অভিনেতাদের একটা প্রভাব থাকে। সাধারণ মানুষ তাঁদের অনুকরণ করেন। সেখানে তাঁরাই হাসপাতাল ভাঙচুরের নিদান দিলে কাজ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। “এ অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।”- বলছেন তাঁরা। বস্তুত পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনা গা সওয়া।
ফি বছর গড়ে তিনশোরও বেশি চিকিৎসক নিগৃহীত হন। সম্প্রতি বহরমপুর কোভিড হাসপাতালে রোগীর পরিবারের হাতে হেনস্থা হয়েছেন এক চিকিৎসক। অভিনেতার দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য এই প্রবণতা আরও বাড়াবে বলেই মনে করছে ওয়েস্টবেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম। ফোরামের সম্পাদক ডা. কৌশিক চাকীর প্রতিক্রিয়া, “ভয়ংকর উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন অভিনেতা। করোনা আবহে এখনও পর্যন্ত রাজ্যে ২২ জন চিকিৎসক মারা গিয়েছেন। ছ’শোর উপর স্বাস্থ্যকর্মী করোনা আক্রান্ত। দিনে কুড়ি ঘন্টা পিপিই কিট পরে ডিউটি করতে হচ্ছে। সেসব না লিখে কীভাবে বেসরকারি হাসপাতাল ভাঙা হবে, তা লিখলেন! ভাবা যায় না।”
[আরও পড়ুন: কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে ২৫ করোনা যোদ্ধাকে সংবর্ধনা, মুখ্যমন্ত্রীর লেখা গান গাইবেন বাংলার শিল্পীরা]
অভিনেতা নিজে কী বলছেন?
রুদ্রনীলের ব্যাখ্যা, “আমি মালিককে মারধর করতে বলেছি। যদি সত্যিই কোনও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের খারাপ লেগে থাকে, তাঁরও আমার মতো প্রতিবাদ করা উচিত।” ঘটনা হল, বেসরকারি হাসপাতালের মালিকরা সাধারণত নেপথ্যে থাকেন। রোগীর পরিজন তাঁদের নাগাল পান না। তাই রোগীর কিছু হয়ে গেলে প্রথম আঘাতটা আসে ডাক্তারবাবুর উপরে। অনেক সময় হাসপাতালের দামি দামি সম্পত্তিও তছনছ করা হয়।
মেডিকা সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. কুণাল সরকারের কথায়, “অভিনেতাদের আমি সম্মান করি। কিন্তু এই মন্তব্য কাম্য নয়। রাজ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করেন। বেসরকারি হাসপাতাল ভাঙার ডাক দিয়ে পরোক্ষে এঁদের পেটে লাথি মারার উসকানিও উনি দিয়েছেন।” তথ্য বলছে, গত সাত বছরে রাজ্যে নতুন কোনও বেসরকারি হাসপাতাল মাথা তোলেনি। চিকিৎসকদের বড় অংশ এর নেপথ্যের কারণ হিসেবে আঙুল তুলছেন ভাঙচুরের মানসিকতার দিকে। তাঁদের মতে, বেডের সংখ্যা বাড়ানো যে কত জরুরি, করোনা আবহে যা হাড়ে হাড়ে মালুম। অথচ অভিনেতার এহেন মন্তব্য শুনলে উদ্যোগপতিরা নতুন হাসপাতাল তৈরি করার আগে দশ বার ভাববেন। এবং রাজ্যের সিংহভাগ মানুষকে জায়গা দেওয়ার মতো বেড সরকারি হাসপাতালগুলোয় নেই। যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা বেসরকারি হাসপাতালে যাবেন।
এসএসকেএম হাসপাতালের বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. দীপ্তেন্দ্র সরকার বলেন, “এমন একটা সময় এই ধরনের মন্তব্য করা অনুচিত। সরকারি হাসপাতালে অত বেড কোথায়? মানুষকে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। ১৩৫ কোটির জন্য সরকারি হাসপাতাল তো নেই। সেটা উনি অনুধাবন করুন। কিছু হলেই বেসরকারি হাসপাতাল ভাঙচুর করব, এটা অসুস্থ মানসিকতা।” অভিনেতার মন্তব্যে বর্বরতাই দেখছেন ডা. অরুণিমা ঘোষ। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকের প্রশ্ন, “কোন সভ্য দেশে এভাবে হাসপাতাল ভাঙচুরের নিদান দেওয়া যায়?” উডল্যান্ডস হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জন ডা. অনুপম গোলাসের কটাক্ষ, “রাজ্য সরকারের তরফে করোনা চিকিৎসার খরচ, পিপিই কিট বাবদ কত নেওয়া যাবে, সব বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তার পরেও অভিনেতা বেসরকারি হাসপাতালকে রক্তচোষা বলছেন!” রুদ্রনীল অবশ্য নির্বিকার। “আগে ডাক্তারবাবুরা বলুন, হাসপাতাল যে বিল নিচ্ছে, সেটা সব ক্ষেত্রে ন্যায্য।”- পালটা চ্যালেঞ্জ অভিনেতার, “তা হলে আমিও মেনে নেব, আমার মন্তব্য উসকানিমূলক।”
[আরও পড়ুন: লালবাজারেও করোনার থাবা, আক্রান্ত কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার]
সর্বশেষ খবর
-
আকাশছোঁয়া দাম, তবু বিনামূল্যে টিকিট কাটলেন ফুটবলপ্রেমীরা! ফিফার ভূমিকায় তুঙ্গে বিতর্ক
-
প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়কের কার্যালয়ে বিছানা-বালিশ, ড্রয়ারে ভর্তি কন্ডোম! শোরগোল পাণ্ডবেশ্বরে
-
বিশ্বকাপে ডাক পেয়েও খেলতে নারাজ ফরাসি তারকা! কারণ জানলে স্যালুট করবেন
-
সন্দীপনের বাড়িতে জনরোষে প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়ালকে নিশানা ঋতব্রতের, মৃদুস্বরে তোপ বিজেপিকে
-
রুখতে পারলেন না অমিত শাহও! তামিলনাড়ুর ‘পোস্টার বয়ে’র সঙ্গে বিচ্ছেদে সিলমোহর বিজেপির