সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: পাহাড়ের উপর উড়ছে মেঘ। আর ফাঁক পেয়ে সেই মেঘই কটেজের জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ছে ঘরে। সেই কটেজের কাঁচের জানালায় রঙবাহারি নাম না জানা ছোট-ছোট পাখি। তাদের ঠোঁটের টোকায় ঘুম ভাঙবে। ভরা বর্ষায় এভাবেই গহন অরণ্যে ডুব দিয়ে দূষণহীন প্রকৃতিতে হারিয়ে যাওয়ার জন্য আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে পুরুলিয়া (Purulia)।
পুরুলিয়া মানে যেমন চোখের সামনে ভাসে রুখাশুখা, ধূ ধূ প্রান্তর। আর ছোট ছোট টিলা। তেমনই আবার ঘন জঙ্গলে ঢেউ খেলানো পাহাড়। বর্ষায় আরও সবুজ। পাহাড়ি বান্দু, শোভা, সাতগুড়ুমের স্রোতে কানে ধাক্কা লাগে। যদি ভাগ্য সহায় হয়, সাক্ষাৎ হয়ে যেতে পারে কোনও বন্যপ্রাণীর সঙ্গেও। এখন তাদের মিলনের মরশুম। তাই গোপন জীবনযাপন করলেও, বৃষ্টি নামলে তাদের অনেক সময়েই দেখা যাচ্ছে রাস্তা পারাপার হতে। তালিকায় কে নেই? গোল্ডেন জ্যাকেল, কাঁকর হরিণ, এমনকি হায়নাও! আর বুনো হাতির দল তো রয়েইছে। বৈচিত্র্যে ভরা মালভূমি পুরুলিয়ায় বর্ষায় যেন এক অন্যরূপ মেলে ধরে। সবুজ উপত্যকায় যেন অ্যাডভেঞ্চারের নেশা। প্রায় ‘কোভিড ফ্রি’ (COVID-19) পুরুলিয়ায় এই বর্ষায় এখন বেড়ানোর অন্যতম ঠিকানা।
[আরও পড়ুন: Coronavirus: জলের দরে হোটেল ভাড়া! পর্যটক টানতে Digha-য় চালু ‘স্পেশ্যাল অফার’]
রাস্তার দু’পাশে থাকা শাল, শিমুল, পলাশের জঙ্গলের বুক চিরে লং ড্রাইভ। কিংবা খয়রাবেড়া নীল জলরাশিতে মাছ ধরতে ছিপ ফেলা। অথবা পাঞ্চেত জলাধারে নৌকা বিহার। ট্রেকিং-এ এখন নিষেধ থাকলেও পাহাড় জঙ্গলের গ্রামীণ রাস্তায় গাইডকে সঙ্গী করে জঙ্গল ভ্রমণ হতেই পারে। আর তখন যদি পাহাড় থেকে ঝেপে বৃষ্টি নামে? ছাতা মাথায় কোনও মোড়ে এসে চায়ে চুমুক বা শালপাতাযর বাটিতে গরমাগরম তেলেভাজা বা জিলিপি- মেটাবে আপনার রসনাও। তবে সঙ্গে বড় ছাতা নিতে ভুলবেন না। নইলে কিন্তু সবই মাটি। পাহাড়ের উপর ভেসে বেড়ানো কালো মেঘে কখন যে ঝেঁপে বৃষ্টি নামবে, বোঝা বড় মুশকিল।

গত কয়েক বছর ধরেই পুরুলিয়ার ‘মনসুন ট্যুরিজম’-কে তুলে ধরছে পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন। গত বছর কোভিড আবহে দীর্ঘ লকডাউন (Lockdown) থাকায় বর্ষায় এই জেলার পর্যটন কেন্দ্রগুলি ছিল তালা বন্ধ। কিন্তু এবার পুরুলিয়ার ছবিটা একেবারে আলাদা। বিধিনিষেধ থাকলেও কোভিড সংক্রমণের হার একেবারে নিচে। তাতেই পর্যটনে আবার যেন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ” পুরুলিয়া তো ভীষণই বৈচিত্রময়। বর্ষার রূপ আলাদাভাবে চোখ টানে। তাই ভ্রমণপ্রিয় মানুষজন এই জেলায় কয়েক বছর ধরে বর্ষাতেও বেড়াতে আসছেন। তাই আমরাও ঘুরে ঘুরে দেখছি এই বর্ষায় বেড়াতে আসা মানুষজনকে আর কীভাবে ‘অফবিট ট্যুরিজমের’ স্বাদ দিতে পারি। পুরুলিয়ায় এখন সংক্রমণের হার ০.১২ শতাংশ। তাই মানুষজন দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার পর এবার পুরুলিয়া বেড়িয়ে যেতে পারেন। আমরা আপ্যায়ন করতে প্রস্তুত।” তবে সঙ্গে রাখতে হবে জোড়া ভ্যাকসিনের (Corona vaccine) শংসাপত্র কিংবা আরটিপিসিআর বা RAT নেগেটিভ রিপোর্ট।

অযোধ্যা পাহাড় থেকে গড় পঞ্চকোট, বড়ন্তি থেকে দুয়ারসিনি। ‘হীরক রাজার দেশ’ জয়চণ্ডী পাহাড় থেকে কাঁসাই নদী ছুঁয়ে থাকা দোলাডাঙা কিংবা মুরগুমা, খয়রাবেড়া। কোথাও কোনও বাধা নেই। তাই এইসব কেন্দ্রের কটেজের বাইরে মুষলধারে বৃষ্টির ঝাপটা যখন রেস্তোরাঁর কাচে আছাড় মারছে, তখনই পাতে ধোঁয়া ওঠা ভাতে দেশি মুরগির মাংস বা ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’-এর চট্টগ্রাম স্টাইলের ভুনা মাংস! এই সব আপনাকে অনায়াসে লাঞ্চের মেনুতে বানিয়ে দেবে অযোধ্যা হিলটপে সরকারি পর্যটন প্রকল্পকে একেবারে চারতারা হোটেলের রূপ দেওয়া পর্যটক আবাস। ওই প্রকল্পের লিজ পাওয়া অধিকর্তা রাহুল আগরওয়াল বলেন, “অযোধ্যা পাহাড়ে যেমন ষোলআনা বাঙালিয়ানা মাটির গন্ধে আমরা আপ্যায়ণ করতে পারি, তেমনই কর্পোরেট চেহারাতেও আপ্যায়ণের সব ব্যবস্থাই রয়েছে।” সুইমিং পুল, স্পা, জিম সেইসঙ্গে চাইনিজ, কন্টিনেন্টাল ডিশও। আসলে ভিনরাজ্য-সহ বিদেশের পর্যটককে টানতেই এমন আয়োজন।
[আরও পড়ুন: UNESCO ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা পেল হরপ্পা সভ্যতার অংশ ধোলাভিরা, জানুন এর ইতিহাস]
সেইসঙ্গে পুরুলিয়ার সুখ-দুঃখ, জীবন কথা যে গানে শোনা যায় সেই ঝুমুর। ছৌ-এর পদধ্বনি তো রয়েছেই। পাহাড় ছুঁয়ে থাকা কটেজের বারান্দায় বসেই দেখতে পারবেন ছৌ নাচ। লোকসংস্কৃতি, প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে আছে ইতিহাস রাজরাজাদের গল্পও। পঞ্চকোট রাজবংশের স্থাপত্য, জৈনদের পুরাকীর্তি। তাই বৈচিত্রে ভরা পুরুলিয়াতে হারিয়ে যান বর্ষাতেই।
ছবি ও ভিডিও: অমিত সিং দেও।
সর্বশেষ খবর
-
রণবীর-আলিয়ার সিনেমার সেটে মর্মান্তিক মৃত্যু, বনশালির থেকে ৫০ লক্ষ ক্ষতিপূরণ দাবি ফিল্ম সংগঠনের
-
বার্ধক্য ও বিধবা ভাতায় ৫০০ টাকা বৃদ্ধি, কবে থেকে যুবদের ভাতা? বাজেটে ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর
-
দেড় হাজার নয়, মাসে মিলবে ৩ হাজার! বাজেটে বেকারদের জন্য বিরাট ঘোষণা রাজ্যের
-
ভিক্ষার আড়ালে দুষ্টচক্র! ট্রেনের মধ্যে ভিক্ষুক রুখতে মোটা জরিমানার সিদ্ধান্ত সরকারের
-
কী কারণে আচমকা বন্ধ ৩ অ্যাকাউন্ট? প্রশ্ন তুলে কলকাতা হাই কোর্টে ‘কালীঘাট তৃণমূল’