বাজারের চরিত্র বদলাবেই, লগ্নিকারীরা সে কথা মাথায় রেখেই এগোন। কিন্তু লগ্নিকারীদের এর পাশাপাশি নিজেদের আচরণেও কিছু বদল অবশ্যই আনা প্রয়োজন। কিছু প্রবণতা এখনই না শুধরোলে অচিরে সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে। সাবধান করলেন ইউটিআই এএমসি-র ফান্ড ম্যানেজার পঙ্কজ পাঠক।
ইনভেস্টরদের আচরণ নিয়ে সারা দুনিয়ায় চর্চা চলে। বাজারের কোথায় বা কখন কে কেমন আচরণ করছেন, তার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। আমার আজকের লেখা ‘বিনিয়োগে সাফল্য’ নিয়ে। যে সাফল্য পেতে সব সময়ই ইনভেস্টররা উদগ্রীব থাকেন, সেই সাফল্যের মূলে আছে কিছু আচরণ। আমার মতে পাঁচটা আচরণ বদলাতেই হবে, নাহলে মনের মতো ফলাফল পাবেন না।
আরও পড়ুন:
পার্সোনাল ফিনান্সের জগতে আমরা প্রায়ই বুদ্ধিমত্তা, বাজার সম্পর্কে তীক্ষ্ণ অনুমান ক্ষমতা অথবা সঠিক অ্যাসেট ক্লাসেস বা সিকিউরিটিজ বেছে নেওয়ার ক্ষমতার প্রশংসা করি। তবু দীর্ঘমেয়াদি লগ্নি সাফল্যের আসল চালিকাশক্তি এসবের চেয়ে অনেক সরল। আবার একই সঙ্গে খুব কঠিন। আজকের দিনে, যখন অনিশ্চয়তা খুব বেশি এবং বাজারের অবস্থা প্রতি ঘন্টায় বদলাচ্ছে, তখন কিছু মানসিক ফাঁদ – যাকে ‘trap’ বলা চলে –চিনে নেওয়া জরুরি। একই রকম জরুরি হল এমন সব ব্যবস্থা তৈরি করা, যেগুলো আমাদের নিয়মনিষ্ঠ থাকতে (এবং শেষ লক্ষ্য স্থির থাকতে) সাহায্য করে।
যেসব ‘behavioural bias’, সোজা কথায় আচরণগত পক্ষপাত, প্রায়ই দেখা যায়, তার কয়েকটা এই রকম :
প্রথমত, মানুষের ভবিষ্যতের মুনাফার চেয়ে তাৎক্ষণিক লাভকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। বিহেভিয়ারাল সায়েন্সে একে বলা হয় ‘প্রেজেন্ট বায়াস’। এর কারণেই অনেক তরুণ/তরুণী বা অল্পবয়সি রোজগেরে লগ্নি শুরু করার কাজটা কেবলই পিছিয়ে দেন। ভবিষ্যতের বহু লক্ষ্যপূরণের জন্য বা আর্থিক স্বনির্ভরতা গড়ে তোলার জন্য টাকা সরিয়ে রাখাটা অ-দরকারি বা গৌণ হয়ে যায়। তার চেয়ে একটি নতুন আইফোন বা সপ্তাহান্তে কাছে পিঠে কোথাও বেড়াতে যাওয়া অনেক বেশি লাভজনক মনে হয়। অথচ লগ্নির পথে পা রাখতে দেরি করাটা কোনও কাজের কথা নয়। প্লেন টেক-অফের উপমা যদি দিতে হয়, প্রত্যেক বছরের বিলম্ব টাকা বাড়ার রানওয়ে ছোট করে আনে।
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আরও একটি মোচড় দেয়, বিশেষ কোনও সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, বা কোথাও পদক্ষেপ নিতে কার্যত বাধ্য করে।
তারপর আছে দলে ভিড়তে চাওয়ার মনোভাব বা হার্ড মেন্টালিটি। এ এমন এক স্বভাব যা চিরকাল বাজারের আচরণ নির্ধারণ করেছে। এমন বার বার দেখেছি আমরা। যখন আপনার আত্মীয়রা কোনও দারুণ গরমাগরম স্টকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন অথবা সোশাল মিডিয়ায় একটি সেক্টর বা অ্যাসেট ক্লাস “বুমিং” বলে হইচই হয়, সেটা কিনতে লোভ হয়। এটা অস্বীকার করে লাভ নেই। কিন্ত দুর্ভাগ্য হল, যতদিনে সকলে গিয়ে ওই অ্যাসেটে বা স্টকে যোগ দেয় ততদিনে তার দাম অনাবশ্যক বৃদ্ধি পায়। আর ভবিষ্যতের রিটার্নও অনিশ্চিত হয়ে যায়।
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আরও একটি মোচড় দেয়, বিশেষ কোনও সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, বা কোথাও পদক্ষেপ নিতে কার্যত বাধ্য করে। গোটা কয়েক ভালো কেনা বেচা হলেই লগ্নিকারীরা ভেবে ফেলতে পারেন যে তাঁরা বেশ বাজারটিকে ‘বুঝে’ ফেলেছেন। তার ফলে যা হওয়ার তাই হতে পারে। আরও রিস্ক নিতে রাজি হয়ে যান তাঁরা। বড়সড় ঝুঁকিপূর্ণ বাজি ধরতে যান। অথবা অত্যধিক কেনাবেচা করতে শুরু করেন। আমি এখানে F&O সেগমেন্টের লাফিয়ে বেড়ে যাওয়া উল্লেখ করতে পারি। অথবা নতুন লগ্নিকারীদের স্মল ক্যাপ কিংবা এসএমই স্টকের উপর বাজি ধরার কথা মনে করাতে পারি। কিন্তু এ-ও দেখেছি যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে যেতে পারে খুব সহজে। বাজারের সেই স্বভাব যথেষ্ট আছে।
অন্যদিকে আছে আর একটি নজর-কাড়া আচরণ। ক্ষতি এড়ানোর প্রবণতার কথা বলছি। কারণ আমরা জানি বাজারে ক্ষতি বা লস আমাদের মানসিকভাবে ভীষণ দুর্বল করে দেয়। মনে করুন একটা স্বল্পমেয়াদি পতন হয়েছে, ভ্যালুয়েশন পড়ে গেছে। হয়ত ১০% নেমে এসেছে। কিন্ত তা অসহ্য হয়ে দাঁড়াতে পারে অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য। সেটি বাজারের সাধারণ ওঠাপড়া হলেও হওয়া সম্ভব। লগ্নিকারীদের একাংশ হয়তো আতঙ্কিত হয়ে স্টক বেচতে শুরু করে দেন। ফলে যখন ওই স্টকের দাম আবার উপরে চড়ে, তা থেকে আর মুনাফা করতে পান না। এই ধরনের প্রবণতা খুব ‘কমন’।
শেষে একটু অন্য পথে নিয়ে যাই। সাম্প্রতিক নানা ঘটনা দেখে ইনভেস্টমেন্টের দুনিয়ায় অনেকে ভাবছেন যে এখন যা ঘটছে (সে দাম বাড়তে থাকাই হোক অথবা কোনও কারেকশন) অনন্তকাল ধরে চলবে। এই চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে হবে। লগ্নিকারীরা বাজার যখন তুঙ্গে তখন বেশি দাম দিয়ে স্টক কিনে ফেলেন, তারপর যখন বাজার নিরাশ করে তখন খুব কম দামে বিক্রি করে দেন। এটা ঠিক নয়।
তিনটি বিষয় মনে রাখবেন :
- অনিয়মিত লগ্নি না করে ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন।
- বেশি ঘনঘন এক ফান্ড থেকে আরেক ফান্ডে যাওয়া থামান।
- যে সব স্টক সাম্প্রতিককালে ভাল পারফরম্যান্স দিয়েছে কেবল তার পিছনেই ছোটা বন্ধ করুন।
বছরের পর বছর এই আচরণগুলোর ফলে নিঃশব্দে অনেক সম্পদ আপনি ধীরে ধীরে হারাতে পারেন। আমাদের সঞ্চয়কে আমাদেরই হাত থেকে বাঁচানো দরকার।
আর একটি কথা বলে শেষ করব। লক্ষ্য-ভিত্তিক লগ্নি করা উচিত। এতে প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত একেকটি প্রয়োজনের সঙ্গে বাঁধা থাকবে। তাতে স্বল্পমেয়াদি কোলাহলের প্রভাব পড়বে না। সিস্টেম্যাটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (SIP) নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। এটা ডিসিপ্লিন বা নিয়মনিষ্ঠতার প্রমাণ। নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের লগ্নি করার মাধ্যমে আপনি বাজারের টাইমিংয়ের ফাঁদ এড়াতে পারেন। ইক্যুইটি, ডেট আর কমোডিটির মধ্যে ছড়িয়ে লগ্নি করবেন। তাতে মানসিক প্রতিক্রিয়াও সামলাতে পারবেন। কেবল আবেগের বশে অদলবদল করার তাগিদ কমবে তারই সঙ্গে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
কোচ আন্সেলোত্তি একাই ফ্যাক্টর নন, মনোবিদের মন্ত্র বদলে দিয়েছে ভিনির খেলা
-
প্রবল বৃষ্টিতে হুড়মুড়িয়ে ভাঙল গাছ, চাপা পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু বৃদ্ধের, মুম্বইয়ের ভিডিও ভাইরাল
-
৫০০ সংস্থায় আবেদন, তবুও মেলেনি চাকরি! পেটের দায়ে কী করছেন ইঞ্জিনিয়ার?
-
বরুণ বিশ্বাসের স্মৃতি আজও টাটকা, সরকার বদলে ‘খুনের’ সুবিচার হবে, আশায় সুটিয়া প্রতিবাদী মঞ্চ
-
স্বামীকে খুনের পর বাথরুমে দেহ পুঁতে টাইলস বসায় স্ত্রী! আগ্রা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে স্তম্ভিত পুলিশও