দুলাল দে: ইস্টবেঙ্গলের কোচ হওয়া ইস্তক কোনও সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার দেননি এতদিন। টানা দুটো ডার্বি জেতার পর এত ফুরফুরে রয়েছেন, সংবাদ প্রতিদিন-কে প্রথম একান্ত সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়ে গেলেন আলেজান্দ্রো মেনেন্দেস গার্সিয়া। আর অনর্গল বললেন তাঁর জমানো সব কথা।
প্রশ্ন: আগের রবিবার ডার্বি জেতার সঙ্গে সঙ্গে আপনি ইতিহাসে ঢুকে গিয়েছেন। জানেন?
আলেজান্দ্রো: হু। সেদিন ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে শুনেছিলাম পনেরো বছর পর নাকি ইস্টবেঙ্গল টানা দু’টো ম্যাচে মোহনবাগানকে হারাল।
প্রশ্ন: একটা সত্যি কথা বলুন তো। এই ডার্বিটার আগের রাতে বা জেতার রাতে ঠিকঠাক ঘুমোতে পেরেছিলেন?
আলেজান্দ্রো : বিশ্বাস করুন, দুটো রাতেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। জানতাম, মোহনবাগানকে হারাবই। কারণ এবার ডার্বির আগে টিমের সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছিল। আর জেতার রাতে আমার শান্তির ঘুমের কারণ, পরীক্ষা-হলে প্রশ্নপত্র কমন আসায় ছেলেরা ভাল রেজাল্ট করেই।
[সুনীলদের কোচ সের্জিও লোবেরো? তুঙ্গে জল্পনা]
প্রশ্ন: মানে? আপনিই প্রথম ডার্বি কোচ যিনি বললেন, এই ম্যাচ নিয়ে কোনও টেনশনে ছিলেন না!
আলেজান্দ্রো: সত্যিই। ম্যাচটা জিতব নিশ্চিত ছিলাম। তাই কোনও চাপে ছিলাম না। যেটুকু চাপ ছিল সেটা অন্য জায়গায়। যেভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, সেটা মাঠে নেমে ছেলেরা ঠিকমতো করে দেখাতে পারবে কি না? তবে ওটুকুর জন্য রাতের ঘুম নষ্ট করার মানে হয় না।
প্রশ্ন: তাও জানতে চাইছি কোন ডার্বিটা আপনার কাছে বেশি কঠিন ছিল?
আলেজান্দ্রো: প্রথম ডার্বি আমার জন্য টাফ ছিল। প্রথমত ইস্টবেঙ্গলের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ডার্বি। তা ছাড়া তখনও ঠিক ভাবে টিমটা গুছিয়ে তুলতে পারিনি। এখন যেমন আমাদের দল তৈরি হয়ে গিয়েছে। প্রতিপক্ষ সব দল সম্পর্কে ভাল জানি, সেই সব প্রথম ডার্বির সময় ছিল না।
প্রশ্ন: এই মুহূর্তে চেন্নাই, কাশ্মীর, চার্চিল আর ইস্টবঙ্গেল। চার দলই আই লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ দৌড়ে আছে…।
আলেজান্দ্রো: কী বলতে চাইছেন বুঝতে পেরেছি। ইস্টবেঙ্গলের ট্রফি জেতার চান্স কতটা- তাই তো? দেখুন, চেন্নাই-চার্চিল ভাল দল। আর কাশ্মীরের বিরুদ্ধে আমাদের অ্যাওয়ে ম্যাচটা মনে হয় সবচেয়ে কঠিন হতে চলেছে। তাও যদি চারটে দলের মধ্যে বলেন, তাহলে বলব ইস্টবেঙ্গলের আই লিগ জেতার সুযোগ সবচেয়ে বেশি।
প্রশ্ন: প্রাক্তন মোহনবাগান কোচ শংকরলাল চক্রবর্তী আমাদের কাগজেই লিখেছেন, আপনার কোচিংয়ে ইস্টবেঙ্গল এবার আই লিগ জিতবে।
আলেজান্দ্রো: উনি ঠিকই বিশ্লেষণ করেছেন। আমার কোচিংয়েই ইস্টবেঙ্গল আই লিগ জিতবে।
প্রশ্ন: সমর্থকরাও তাই আশা করছেন। এবারই ইস্টবেঙ্গলের ১৬ বছরের আই লিগ শাপমুক্তি ঘটবে।
আলেজান্দ্রো: ওঁদের বলব, যেভাবে সমর্থন জানিয়ে চলেছেন, শেষ ম্যাচ পর্যন্ত সেভাবেই আমাদের পাশে থাকুন। আর সব সময় পজিটিভ থাকুন।
[জাতীয় দলে কাকে কোচ হিসেবে চান? নিজের পছন্দ জানালেন সুনীল]
প্রশ্ন: হোম ম্যাচে একদিন আগে ইস্টবেঙ্গল দল পাঁচতারা হোটেলে উঠছে-এই দৃশ্য আগে কখনও দেখা যায়নি!
আলেজান্দ্রো: আমি টিমের দায়িত্ব নিয়েই কোয়েস ইস্টবেঙ্গল এফসি কর্তাদের ব্যাপারটা বলেছিলাম। বুঝিয়েছিলাম এর পজিটিভ দিক। শুধু এটা কেন, দলের প্রয়োজনে কোয়েস ইস্টবেঙ্গল এফসি-র কাছে যা যা চেয়েছি, সব কিছু দিয়ে ওঁরা সাহায্য করেছেন।
প্রশ্ন: কিছুদিন আগেও দেখা যেত, ইস্টবেঙ্গলের বিদেশি কোচ এলেই তিনি স্ট্রাইকারে ভারতীয়র থেকে বিদেশির উপর বেশি ভরসা করছেন। সেখানে আপনি হঠাৎ কী দেখলেন যে, জবি জাস্টিনের উপর এত ভরসা রাখছেন?
আলেজান্দ্রো: জবিকে প্রথম দেখি এই ক্লাবের আগের কোচের (সুভাষ ভৌমিক)) ট্রেনিংয়ে। দেখলাম, ছেলেটার দুর্দান্ত স্কিল। বলের জন্য ঠিক জায়গায় চলে যাচ্ছে। তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম, একে নিয়ে পড়তে হবে। জবির উপর আস্থা রেখে আমি যে ভুল করিনি সেটা প্রমাণিত।
প্রশ্ন: স্পেন ছেড়ে আপনার কলকাতায় কোচিং করতে আসা অনেকটা কোনও শিক্ষকের দারুণ একটা স্কুলে পড়াতে পড়াতে সাধারণ স্কুলে শিক্ষকতা করতে আসা।
আলেজান্দ্রো: এর আগে থাইল্যান্ডে কোচিং করেছি, তাই ভারতীয় ফুটবল থেকে যখন ডাক পেলাম এখানকার পরিকাঠামো নিয়ে মনের মধ্যে একটা ধারণা করে নিয়েছিলাম। তারপরে ইস্টবেঙ্গল সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গিয়ে দেখলাম, ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস ইস্টবেঙ্গলকে ছাড়া সম্ভব নয়। তখন মনে হল, আমি যদি ভারতীয় ক্লাব ফুটবলের সামান্য উন্নতিতেও কাজে লাগতে পারি, খারাপ হবে না। তখন ইস্টবেঙ্গল কোচ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
প্রশ্ন: ঠিক কী ধারণা ছিল ভারতীয় ফুটবল সম্পর্কে?
আলেজান্দ্রো : শুধু জানতাম, ভারতীয় ফুটবল উন্নতি করার চেষ্টা করছে। ব্যাস।
প্রশ্ন: আই লিগ-আইএসএলে মোটামুটি সব ফুটবলার দেখে ফেলেছেন। কোনও ভারতীয় প্লেয়ার দেখে মনে হয়েছে, এই ছেলেটা বিদেশের কোনও লিগে খেলতে পারে?
আলেজান্দ্রো: সত্যি বলতে এরকম কোনও ভারতীয় ফুটবলারের নাম আমি এখনও বলতে পারছি না। তবে অনেকের মধ্যে ভবিষ্যতে সেই সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তার জন্য আরও অনেক উন্নতি দরকার।
প্রশ্ন: আপনার প্রিয় কোচ কে?
আলেজান্দ্রো: জোসে মোরিনহো। ওঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি বলেই নয়। জোসে ওঁর দক্ষতার জন্য আমার প্রিয় কোচ।
প্রশ্ন: আপনি এখন ইস্টবেঙ্গল কোচ, জানিয়েছেন মোরিনহোকে?
আলেজান্দ্রো: না, জানাইনি। উনিও বোধহয় জানেন না।
প্রশ্ন: আপনি ঠিক কোন মানসিকতার কোচ? আক্রমণাত্মক, ডিফেন্সিভ? নাকি দুটোর ব্যালান্স করেন?
আলেজান্দ্রো: আমি অ্যাটাকিং মানসিকতার কোচ। প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অ্যাটাকিং লাইন যদি শক্তিশালীও হয়, তবু আমি আক্রমণাত্মক খেলে জেতার চেষ্টা করব। শেষ ডার্বিতে যেমন। আমার দর্শন হল, মাঠে যাও। খারাপ দিনেও তিন পয়েন্ট নিয়ে ড্রেসিংরুমে ফেরো।
প্রশ্ন: শোনা যায়, কোচিং স্টাফ থেকে ফুটবলার। সবাই আপনাকে ভয় পায়। আপনি দলের কাছে বাবার মতো, নাকি বন্ধুর মতো?
আলেজান্দ্রো: কখনও বাবার মতো কড়া। কখনও বন্ধুর মতো মিশুকে। তবে ফুটবলারদের থেকে সব সময় একটা সম্মানের দূরত্ব রাখতে পছন্দ করি আমি। একইসঙ্গে দরকারে বন্ধুর মতো পাশে থাকতেও চাই। আসলে পরিস্থিতি বুঝে ফুটবলারদের সামনে নিজেকে দাঁড় করাই।
প্রশ্ন: এবারের ইস্টবেঙ্গল দলে যেন একজনই বস। তিনি আলেজান্দ্রো। কোথাও কোনও বিক্ষুব্ধর গল্প নেই?
আলেজান্দ্রো: চোখের সামনে রোনাল্ডো, র্যামোস, পেপেদের দিনের পর দিন কোচিং করতে দেখেছি। তারপর মনে হয়, কোনও ভারতীয় ক্লাবে ফুটবলারদের নিয়ন্ত্রণ করতে অসুবিধা হওয়া উচিত নয় আমার! ইস্টবেঙ্গলে কোচিং করা আমার জন্য সহজ কাজ।
প্রশ্ন: তাও আই লিগে প্রথম দুটো ম্যাচ জেতার পরে পুরো দলটা কেমন যেন কেঁপে গিয়েছিল। পরপর হারছিল!
আলেজান্দ্রো: দেখুন, ওই সময়টা আমার কাছে এখানকার সব কিছু নতুন ছিল। তা ছাড়া একটা আমার সিস্টেমে ফুটবলারদেরও মানানোর ব্যাপার ছিল। আমি বলব, ওই হারগুলো আমাদের জন্য অ্যাক্সিডেন্ট ছিল। এখন আর আমরা ওই ভাবে পয়েন্ট হারাব না। সবাই তৈরি হয়ে গিয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার প্রতিবেশী মোহনবাগানের সেরা ফুটবলার!
আলেজান্দ্রো: সোনি নর্ডির কথা বলছেন কি? ওর সঙ্গে কমপ্লেক্সে মাঝেমধ্যে দেখা হয়। আমার মনে হয়, ম্যাচের বাইরে সব ক্লাবের ফুটবলার-কোচদের মধ্যে ভাল সম্পর্ক থাকা উচিত। ভারতীয় ফুটবলেরই উন্নতিতে সেটা কাজে আসবে।
সর্বশেষ খবর
-
নিউ আলিপুর থানার সামনে উত্তেজনা, স্বরূপ অনুগামীদের মার ক্রুদ্ধ জনতার, নামল বাহিনী
-
বৈভবকে নিয়ে আলোচনা বিলেতেও, অন্য দুই দেশের টেস্টেও উঠল ভারতীয় দলে নেওয়ার দাবি
-
‘ববিদাকে ফোন করব’, ফিরহাদের পদত্যাগের পরই জল্পনা বাড়ালেন ‘আসল তৃণমূল’ ঋতব্রত
-
‘ইন্ডাস্ট্রিতে কেউ কচি নয়’, স্বরূপের শ্লীলতাহানি মামলায় রূপার নিশানায় কারা? কী বলছেন স্বপন দাশগুপ্ত?
-
দিল্লি দরবারে বৈঠক শেষে ‘খুশি’ মনে রাজ্যে ফিরছেন মুখ্যমন্ত্রী, আজ রাতেই দপ্তর বণ্টন!