সময় কখন কাকে কোথায় কার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, একমাত্র সময়ই জানে। বেশি দিনের কথা নয়। মাত্র আট বছর আগে কোচিং লাইসেন্সের ক্লাসে তাঁর প্রিয় ছাত্রকে বোর্ডে চক পেনসিল দিয়ে লুই দে লা ফুয়েন্তে শিখিয়েছিলেন কোন ট্যাকটিক্সে গেলে প্রতিপক্ষর ডিফেন্স ভাঙা যাবে। সময়ের কী লিখন দেখুন, সেই প্রিয় ছাত্র আজ ফুয়েন্তেকেই পরাস্ত করার জন্য প্রতিপক্ষ চেয়ারে।
লিওনেল সেবাস্তিয়ান স্কালোনি। আট বছর আগে স্পেনের লাস রোজাসে স্কালোনি যখন উয়েফা প্রো লাইসেন্সের কোচিং কোর্স করছেন, ফুয়েন্তে সেই কোচিং কোর্সের শিক্ষক। স্কালোনিকে আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলের কোচ হতে দেখে স্বয়ং মারাদোনা এতটাই রেগে গিয়েছিলেন, যে প্রবল বিরক্ত হয়ে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, “স্কালোনি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। সে নাকি আবার নিয়ন্ত্রণ করবে আর্জেন্টিনা!” ফুয়েন্তেকে সিনিয়র দলের কোচ নির্বাচন করার পর স্প্যানিশ ফুটবলে আবার শুধু প্রাক্তনরা নন, সে দেশের সংবাদ মাধ্যম পর্যন্ত সমালোচনা করেছিলেন। বলাবলি হচ্ছে, “কে একজন অনামী ফুয়েন্তে। সে আবার কোচিং করবে স্পেনকে?”
আরও পড়ুন:
ফুয়েন্তে নাম নয়, নিজের পরিকল্পনা মতো জুনিয়র ফুটবলারদের দিয়ে দল সাজাতে শুরু করলেন। ফাবিয়ান রুইজ, দানি ওলমো, মিকেল মোরিনো, উনাই সিমোনদের নিয়ে স্প্যানিশ ফুটবলের অল পাসিং ফুটবলের বদলে শুরু করলেন গতিময় কাউন্টার ফুটবল।
২০১৮ বিশ্বকাপের কথা একবার ভাবুন। প্রি-কোয়ার্টারে ফ্রান্সের কাছে হেরে সেই মুহূর্তে বিধ্বস্ত আর্জেন্টিনা। কোচ সাম্পাওলির সঙ্গে সিনিয়র ফুটবলারদের মানসিক দূরত্ব তখন এতটাই যে, স্বয়ং মেসি ঠিক করলেন পরিবেশ ঠিক না হলে আর জাতীয় দলেই ফিরবেন না। কাতার বিশ্বকাপের হারের পর স্পেনের জাতীয় দলেও একই সমস্যা। ফুয়েন্তেকে তবু সব দিক বিবেচনা করে জাতীয় কোচের পদে বসানো হয়েছিল। কিন্তু শুধুমাত্র অর্থের অভাবে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ঠিক করেছিল আপাতত সাম্পাওলির সহকারি স্কালোনির হাতে দায়িত্ব থাকুন। পরে বুঝে শুনে একজন নামী কোচ নিয়ে আসা যাবে। ফুটবল ঈশ্বর বোধহয় স্কালোনি, ফুয়েন্তের সাফল্যের রাস্তার গ্রাফটা অন্যভাবেই তৈরি করেছিল। দু’জনই দায়িত্ব পেয়ে যেটা সবার আগে করলেন, দলের সিনিয়র ফুটবলারদের ছেঁটে ফেললেন।

তবে স্কালোনির ক্ষেত্রে অবশ্য এই সিদ্ধান্তটি ছিল- মেসিকে আলাদা রাখতে হবে। অর্থৎ বাকি সিনিয়রদের থেকে মেসি আলাদা। কিন্তু ফুয়েন্তে কোনও নাম দেখেননি। একদম পরের প্রজন্মে চলে যান। আর স্কালোনি। ভিডিও কল করলেন বার্সেলোনায় থাকা মেসিকে। জানালেন, একঝাঁক নতুন প্রতিভাকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি মেসিকে জাতীয় দলে চান। বললেন, “তাড়াহুড়োর দরকার নেই। তোমার জন্য জাতীয় দলের দরজা সব সময় খোলা।” লটারো মার্টিনেজ, ডি পল, লিসান্দ্রে পারাদেস-সহ একঝাঁক নতুন মুখের সমাগম ঘটল জাতীয় দলে। স্বালোনির কোচিংয়ে জাতীয় দলের সাফল্যর জন্য এক বছর পর ভেনেজুয়েলা ম্যাচে আর্জেন্টিনা জার্সিতে ফিরলেন মেসি। শুরু হল আর্জেন্টিনা ফুটবল ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। কোপা জিতলেন মেসি। কোপা জিতল অর্জেন্টিনা।
উলটোদিকে ফুয়েন্তে নাম নয়, নিজের পরিকল্পনা মতো জুনিয়র ফুটবলারদের দিয়ে দল সাজাতে শুরু করলেন। ফাবিয়ান রুইজ, দানি ওলমো, মিকেল মোরিনো, উনাই সিমোনদের নিয়ে স্প্যানিশ ফুটবলের অল পাসিং ফুটবলের বদলে শুরু করলেন গতিময় কাউন্টার ফুটবল। এক্ষেত্রে তাঁর বড় ভরসা বার্সেলোনার ইয়ামাল আর বিলবাওয়ের নিকো উইলিয়ামসের গতি। মিডফিল্ড জেনারেল করলেন রড্রিকে। উয়েফা নেশনস লিগ জয়ের পর জিতলেন ইউরোতেও।
অন্যান্যবার যা হয় না। এবার সেটাই করল ফিফা। ফাইনালের দু’দিন আগে দু’দলের কোচেদের সাংবাদিক সম্মেলন। স্কালোনি প্রসঙ্গ উঠতে ফুয়েন্তে বলে উঠলেন, “স্কালোনি শুধু একঝাঁক নতুন মুখ তুলে আনেননি। সঙ্গে তাদের মধ্যে জেতার মানসিকতাও ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ওঁর সঙ্গে লড়াই করাটা ভীষণই চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার।” ফুয়েন্তে সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্কালোনি বলেন, “ওঁর কোচিং সিস্টেমের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা করা বেশ কঠিন?” স্কালোনির স্ত্রী এলিসা মনতরো স্পেনের নাগরিক। তাহলে ফাইনালে স্কালোনির স্ত্রীর সমর্থন থাকবে কোনদিকে? স্কালোনি না ফুয়েন্তে। হাসতে হাসতে আর্জেন্টাইন কোচ বলেন, ‘স্ত্রী দেখেছে আমার উঠে আসার কঠিন পথটা। এলিসা ভীষণভাবে চাইবে, বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) আর্জেন্টিনাই জিতুক।” আর ফুয়েন্তে বলছেন, “স্কালোনি ওর দলকে ওর সিস্টেম অনুযায়ী খেলাক। শুধু আমার দল যেন কোনওভাবেই পরিকল্পনা থেকে সরে না যায়। তা হলেই হবে।”
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
উদ্বাস্তু কলোনি থেকে বিশ্বজয়, ইয়ামালের স্বপ্নের জীবনেতিহাস
-
স্পেনের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ মেসির
-
‘ঈশ্বরে’র প্রমাণ করার কিছু নেই! হেরেও চিরবিজয়ীই লিও মেসি
-
ফাইনালের হাফটাইমে জমকালো সমাপ্তি অনুষ্ঠান, শাকিরা-জাস্টিনদের সঙ্গে নজরকাড়া রোনাল্ডিনহোরা
-
লোকসভায় অভিষেকের জায়গা পেলেন সুদীপ! দ্বিতীয় সারিতে কালীঘাট তৃণমূলের দলনেতা
