কবি অমিয় চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘মেলাবেন তিনি মেলাবেন’। আদতেও তাই। এমন মিল সত্যিই দেখা মেলা ভার। খেলোয়াড়ি জীবনে ১৬ নম্বর জার্সি ছিল তাঁর সুখ-দুঃখের সাথী। ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ আগলেছেন। তাঁর জন্ম তারিখও ১৬ এপ্রিল। এমনকী যে দেশে তিনি ফুটবল অ্যাকাডেমি খুলেছেন, সেই দেশও ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের (FIFA World Cup 2026) শেষ ষোলোয়। বলা হচ্ছে পাঞ্জাবপুত্তর গুরুবিন্দর সিংয়ের (Gurwinder Singh) কথা। লাল-হলুদের এই প্রাক্তনী জলন্ধর ছেড়ে চলে গিয়েছেন কানাডায়। এখন তাঁর নতুন ঠিকানা কানাডার ক্যালগারিতে। সেখানেই খুলেছেন গ্রাসরুট সকার অ্যাকাডেমি। সেসব নিয়ে নানান কথা বললেন। জানালেন বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ভারতকে খেলতে গেলে কোন ‘রোডম্যাপ’ অনুসরণ করতে হবে।
প্রশ্ন: করোনাকাল কীভাবে আপনার জীবন বদলে দিয়েছিল? জলন্ধর ছেড়েই বা কানাডা গিয়েছিলেন কেন?
আরও পড়ুন:
গুরুবিন্দর: কোভিড-১৯ অতিমারির সময়ই আমাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। সেই সময় ইস্টবেঙ্গলে খেলি। ২০২০ সালের ৫ মার্চ চোট পাই। এর ১৫ দিনের মধ্যেই, ২০ মার্চ দেশজুড়ে লকডাউন শুরু হয়। ফলে চিকিৎসা ব্যাহত হয়। ছ’মাস পর অস্ত্রোপচার করাতে হয়। সেই সময় খুবই কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বহু মানুষ একা হয়ে পড়েছিলেন। যতটা সম্ভব তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছি। সাহায্য করেছি। এরপর দু’মাসের জন্য আমেরিকা যাই। স্ত্রী কানাডায় চাকরি পান। তখনই স্থায়ীভাবে কানাডায় থাকার সিদ্ধান্ত নিই।
প্রশ্ন: কোচিংয়ে আসার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেলেন?
গুরবিন্দর: সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আমার স্ত্রী হরদীপ। খেলোয়াড়ি জীবনে রাজু গায়কোয়াড়, সন্দেশ ঝিঙ্গানের মতো ফুটবলারদের ফিটনেস ও উন্নতিতে সাহায্য করেছিলাম। হরদীপ বলেছিল, এই অভিজ্ঞতা কোচ হিসাবেও কাজে লাগবে। সেই ভাবনা থেকেই প্রথমে জলন্ধরের আদমপুরের দোয়াবা ইউনাইটেডে কোচিং শুরু করি। ওরা পাঞ্জাব লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। এর আগে এখানকার দু’টি ফুটবল অ্যাকাডেমিতেও কোচিং করিয়েছি।
প্রশ্ন: কানাডায় নিজেদের অ্যাকাডেমি গড়ে তোলার ভাবনা কীভাবে এল?
গুরবিন্দর: ২০২২ সালে কানাডায় এসে মেয়েকে একটি সকার অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করাই। কিন্তু প্রশিক্ষণের মানে আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম না। তখন হরদীপই বলেছিল, অন্যের উপর নির্ভর না করে নিজেদেরই অ্যাকাডেমি শুরু করা উচিত। এরপর ক্যালগারির লায়ন্স সকার ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সি লাইসেন্স কোচিং কোর্স সম্পন্ন করি। এরপর ওই ক্লাবের একটি দলের কোচের দায়িত্ব নিই। অল্প সময়েই বেশ উন্নত করে ওরা। এই সাফল্যের পর নিজেদের ফুটবল অ্যাকাডেমি গড়ে তোলার পরামর্শ দেয় হরদীপ।

প্রশ্ন: হরদীপের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
গুরবিন্দর: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওর ফুটবল জ্ঞান খুবই ভালো। কোচিং কোর্সে সেরা ডেমোও দিয়েছিল। ওর বেড়ে ওঠা পাঞ্জাবের মাহিলপুরে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের পরিবেশে বড় হয়েছে। ভাই ও কাকাকে খেলতে দেখে দিনের বেশিরভাগ সময়ই মাঠে কাটাতেন। ওদের গ্রামের অনেক মেয়েই ফুটবল খেলে। তাই ও চেয়েছিল, ভবিষ্যতে তাদের নিয়েও কাজ করতে। ২০২৪ সালে ভারতে ফিরে মোহালিতে ডি লাইসেন্স কোচিং কোর্স করে হরদীপ। সেখানে জসমিত সিংয়ের কাছ থেকে আধুনিক ফুটবল ও কোচিং সম্পর্কে নতুন অনেক কিছু শেখার সুযোগ পায়। ফুটবলকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শেখে। যা নিজেদের অ্যাকাডেমি গড়ে তোলার আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়। অ্যাকাডেমির প্রশাসনিক কাজ থেকে, প্রচার, রেজিস্ট্রেশন থেকে ছোটদের প্রশিক্ষণ– সবকিছুই ও সামলায়।
প্রশ্ন: কানাডায় অ্যাকাডেমির যাত্রা কবে শুরু হয়?
গুরবিন্দর: ২০২৫ সালের মে মাসে। আমি, হরদীপ এবং প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলার অর্শদীপ সিং মিলে অ্যাকাডেমি শুরু করি। এক বছরের মধ্যেই দারুণ সাড়া পেয়েছি।
প্রশ্ন: আপনারা কোন বয়সের শিশুদের নিয়ে কাজ করেন?
গুরবিন্দর: ৩ থেকে ১৬ বছর বয়সি শিশুদের প্রশিক্ষণ দিই। বিশেষ করে ৩ থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ তৈরি করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
প্রশ্ন: কেন এমন ভাবনা?
গুরবিন্দর: কানাডায় ফুটবল প্রশিক্ষণের খরচ অনেক বেশি। অথচ অনেক অভিভাবকের অভিযোগ ছিল, এত টাকা খরচ করেও তাঁদের সন্তানরা তেমন কিছু শিখছে না। আমরা অ্যাকাডেমি শুরু করার পর প্রথম ছ’মাসেই দারুণ সাড়া পাই। শুরুতে গ্রীষ্মকালে তিন মাসের কোর্স চালু করেছিলাম। পরে শীতকালেও প্রশিক্ষণ শুরু করি। শীতের ব্যাচ কানায় কানায় ভর্তি হওয়ায় বুঝতে পারি, দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের চাহিদা রয়েছে। এরপর ছ’মাসের উইন্টার সিজন চালু করি। এখন গ্রীষ্ম ও শীত– দুই মরশুম মিলিয়ে ছ’মাসের কোর্সে প্রায় ২০০ জন ছাত্রছাত্রী প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। কানাডা বহু সংস্কৃতির দেশ। তাই আমাদের অ্যাকাডেমিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের পাশাপাশি আফগানিস্তান, নেটিভ কানাডিয়ান-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরাও শিখতে আসে।

প্রশ্ন: এখন কি কোনও সিজন চলছে?
গুরবিন্দর: হ্যাঁ। সামার সিজন। মে মাসে শুরু হয়েছে। অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। ইতিমধ্যেই ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ। নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি বেশি সংখ্যক শিশুর আগ্রহের কারণে সোমবার থেকে পাঁচ দিনের একটি সামার ক্যাম্পও শুরু করছি। সেখানেও দারুণ সাড়া মিলেছে। আমার স্ত্রীর ভারতের ডি লাইসেন্সের পাশাপাশি কানাডার ‘সকার ফর লাইফ’ লাইসেন্সও রয়েছে। সব বয়সের ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। কানাডায় খুব ছোট বয়স থেকেই খেলাধুলা শেখার সুযোগ রয়েছে। তাই এই বয়সের শিশুদের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ তৈরি করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
View this post on Instagram
প্রশ্ন: ভারত ও কানাডার ফুটবল প্রশিক্ষণের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য কোথায়?
গুরবিন্দর: কানাডায় তিন বছর বয়স থেকেই শিশুদের নিয়মিত ফুটবল শেখানো শুরু হয়। তিন থেকে পাঁচ বছরের বাচ্চারাও ড্রিবলিং, বল নিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক বিষয় শিখে ফেলে। তারা জানে কখন অনুশীলন, কখন ম্যাচ। কিন্তু ভারতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১২-১৩ বছর বয়সে গিয়ে প্রথম কোনও অ্যাকাডেমি বা সঠিক প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়। তত দিনে অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে যায়। কানাডায় শুধু ফুটবল নয়, প্রায় সব খেলাতেই ছোটবেলা থেকেই প্রশিক্ষণ শুরু হয়। পাশাপাশি খুব অল্প বয়স থেকেই প্রতিযোগিতামূলক লিগে খেলার সুযোগ থাকে। আমাদের অনূর্ধ্ব-১২ দল ক্যালগারি মাইনর সকার অ্যাসোসিয়েশনের লিগে খেলছে। এখানে পাঁচ বছর বয়স থেকেই শিশুরা লিগে অংশ নেয়। ফলে ছোটবেলা থেকেই তারা ম্যাচের পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ভারতে প্রশিক্ষণ থাকলেও অনূর্ধ্ব-১৪ স্তরের আগে প্রতিযোগিতার সুযোগ খুবই কম। এই কারণেই দুই দেশের ফুটবলে এত বড় পার্থক্য।
প্রশ্ন: ভারতীয় ফুটবলের উন্নতির জন্য কী প্রয়োজন বলে মনে করেন?
গুরবিন্দর: ভারতের ফুটবলের উন্নতির জন্য তৃণমূল স্তর থেকেই জোর দেওয়ার দরকার। ছোট বয়স থেকেই ফুটবল শেখানো শুরু করতে হবে। কানাডায় ছোটদের জন্য আলাদা পদ্ধতিতে, আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে আনন্দের সঙ্গে ফুটবল শেখানো হয়। পরিকাঠামোও অনেক উন্নত। যদিও এখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বছরের অনেকটা সময় বাইরে অনুশীলন করা যায় না। তবুও ওরা বিশ্বকাপে খেলছে। এটা সত্যিই প্রশংসার। এখানে বাইরে খেলা সম্ভব না হলে ইন্ডোর টার্ফ রয়েছে। ডোম কভার্ড স্টেডিয়াম-সহ উন্নত পরিকাঠামো রয়েছে। তাই সারা বছরই অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া যায়। আর ভারতে সারা বছর খোলা মাঠে অনুশীলনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেই সুবিধাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না। তাই ছোটবেলা থেকে সঠিক প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলে ভারতীয় ফুটবলের উন্নতি সম্ভব।

প্রশ্ন: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
গুরবিন্দর: কলকাতা আমাদের প্রাণের শহর। আর ইস্টবেঙ্গল আমাদের খুব কাছের ক্লাব। তাই ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে কলকাতাতেও ফুটবল অ্যাকাডেমি শুরু করতে চাই। তবে আপাতত কানাডায় নিজেদের অ্যাকাডেমি নিয়েই ব্যস্ত।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপ নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
গুরবিন্দর: ব্যস্ততার কারণে এখনও বিশ্বকাপের ম্যাচ মাঠে গিয়ে দেখা হয়নি। তবে কানাডা যদি সেমিফাইনালে ওঠে, অবশ্যই খেলা দেখতে যাব। আমার মনে হয়, এই দলের সেমিফাইনালে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সামনে মরক্কোর বিরুদ্ধে কঠিন ম্যাচ। সেই পরীক্ষায় উতরে গেলে সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যাবে।
প্রশ্ন: কাকে সমর্থন করছেন?
গুরবিন্দর: ভারত আমাদের প্রথম ভালোবাসা। তবে এখন কানাডাই আমাদের ঘর। আমাদের সন্তানরা এখানেই পড়াশোনা করছে। তাই বিশ্বকাপে আমরা অবশ্যই কানাডাকে সমর্থন করছি। এখানে আরও কয়েকজন ভারতীয় ফুটবলারও রয়েছেন। সুখবিন্দর সিং ও বলজিৎ সাইনি কানাডায় থাকেন। তবে তাঁরা কেউই ফুটবল কোচিং বা অ্যাকাডেমি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত নন। যতদূর জানি, আমরাই প্রথম এই উদ্যোগ নিয়েছি। তবে এখানে ফুটবল অ্যাকাডেমি চালানো সহজ নয়। কোচদের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, মেডিক্যাল পরীক্ষা-সহ একাধিক নিয়ম মানতে হয়। মাঠ ভাড়া নেওয়া থেকে তার রক্ষণাবেক্ষণ– সবকিছুর দায়িত্ব নিতে হয়। এখানে অভিভাবক এবং সরকার শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে খুবই সচেতন। তাই শিশুদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়। শুরুতে এসবই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
View this post on Instagram
প্রশ্ন: কীভাবে ছেলেমেয়েদের উদ্বুদ্ধ করেন?
গুরবিন্দর: বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার সময়ও আমরা ওদের বোঝাই, কীভাবে ভালো পাস দিতে হয়, কীভাবে গোলের সুযোগ তৈরি করতে হয় ইত্যাদি। টেলিভিশনে দেখা সেই কৌশলই অনুশীলনে শেখানোর চেষ্টা করি। তাছাড়াও ভিডিওর মাধ্যমে পাস, মুভমেন্ট ও ম্যাচের বিভিন্ন মুহূর্ত দেখানো হয়। চার বছর আগে কানাডায় এসেছিলাম। এই অল্প সময়ে ফুটবলের সঙ্গে থেকে অনেক কিছু করতে পেরেছি। স্বপ্ন ভারতকে বিশ্বকাপ খেলতে দেখা। মেয়েদের দলও সাফল্যের শিখরে উঠুক। আমাদের অ্যাকাডেমিতে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও শেখে। মেয়েদের আরও বেশি করে ফুটবলে উৎসাহ দিতে তাদের জন্য ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (যেমন ADHD) শিশুদেরও ছাড় দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, নতুন অভিবাসী ও শরণার্থী পরিবারগুলির শিশুদের অনেক সময় বিনা পারিশ্রমিকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফুটবল শেখানোর পাশাপাশি সমাজের জন্যও কিছু করতে চাই। সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
কামিকাজে ড্রোন থেকে গাইডেড মিসাইল, চিন-পাকিস্তানকে নজরে রেখে ৫২ হাজার কোটির সমরাস্ত্র কিনছে ভারত
-
প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ, তারাতলার ধ্বংসস্তূপ থেকে বাঁচানো ‘সাহসী’দের সম্মান মুখ্যমন্ত্রীর
-
ক্লাসরুমেই সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীর সিঁথি রাঙাল একাদশের ছাত্র! বালুরঘাটের স্কুলে হইচই
-
৫ জুলাই শিয়ালদহ-ডানকুনি শাখায় বাতিল একাধিক লোকাল, কোন রুটে ছুটবে এক্সপ্রেস?
-
ইংল্যান্ডের দুশ্চিন্তা ৪০ বছর পুরনো মারাদোনা ‘আতঙ্ক’, কেনদের ‘রাতের ঘুম’ ওড়াতে তৈরি মেক্সিকানরা
