প্রতিপক্ষ হেভিওয়েট তৃণমূল প্রার্থী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। ছাত্র আন্দোলন থেকে বিধানসভার লড়াই, ‘ঘরের মেয়ে’ থেকে সোশাল মিডিয়া ট্রোল— সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে উত্তর দমদমের সিপিআই(এম) প্রার্থী দীপ্সিতা ধর (Dipsita Dhar)।
প্রশ্ন: আপনার সঙ্গে আলাপ ২০১৯-এর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে, জেএনইউ ক্যাম্পাসে ঐশী ঘোষ ইলেকশনে জেতার সময়। মাঝে প সাতটা বছর। ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে বর্তমানের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা— কেমন ছিল যাত্রাপথ?
উত্তর: এর আগে কেবলমাত্র ছাত্রদের নিয়ে কাজ করেছি। নির্দিষ্ট নির্বাচনী কেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছি। কিন্তু, এখন আমাদের কাজের পরিধি বেড়েছে। চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হয়েছে। কিন্তু আমরা প্রতিদিন শিখেছি , অভিজ্ঞতায় প্রবীণ হয়েছি।
আরও পড়ুন:
প্রশ্ন: নির্বাচনী লড়াইয়ে আপনি নতুন নন। ২০২১ ও ’২৪-এ বালি ও শ্রীরামপুর থেকে লড়েছেন। আগের দুবার নিজের এলাকায়, কিন্তু এবার কেন্দ্র দূরে। লড়াই কতখানি কঠিন?
উত্তর: নিজের এলাকায় বাড়তি সুবিধা থাকেই। চেনা ময়দান, চেনা মানুষ। এবারে তা নেই। তবে উত্তর দমদমে পার্টি বরাবর ভালো আসন পেয়েছে। এখানে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে মানুষের লড়াই-আন্দোলন-আত্মত্যাগের। আমাদের লক্ষ্য, এই এলাকার মৃত গৌরব পুনরুদ্ধার। উত্তর দমদমের মানুষ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, উদবাস্তু আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে, আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ে মাটি দখল করেছিলেন। সেই মাটিই আমরা ফের ফিরে পাবো।
দমদম উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে নিকাশী, জমা জল, রাস্তাঘাটের অবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করছে আমাদের। কিন্তু একজন মন্ত্রীর কেন্দ্রে তো আরও অ্যাডভান্সড কিছু দাবি করার কথা তাদের! কারণ আমরা ধরে নিতে পারি যে তাদের বেসিক দাবিগুলো মিটে গেছে। সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, কানেক্টিং ফ্লাইওভার, বা কলেজ-ইউনিভার্সিটির দাবি করতে পারেন সাধারণ মানুষ! কিন্তু তা তো হচ্ছে না! এখনও তাঁরা বলছেন, এখানে নর্দমা পরিষ্কার হয় না!
প্রশ্ন: এলাকাবাসীর ঘরে ঢুকে প্রচার করছেন। সৃজন-কলতানের মতোই স্মিত হাসি আপনার মুখেও। এই বিশেষ হাসি কি জনসাধারণের সঙ্গে ‘কানেক্ট’ করতে সাহায্য করছে?
উত্তর: আমরা বাস্তবে যেরকম, সাধারণ মানুষ সেভাবে দেখতেই ভালোবাসেন। আমাকে দেখে তাদের বাইরের মানুষ কিংবা সেলিব্রিটি বলে মনে হয় না। বাড়ির মেয়ে মনে হয়। আলাদা করে ‘ইউএসপি’ বল না, এমনটাই স্বাভাববিক।
প্রশ্ন: দু’বছর আগে কল্যাণ বন্দোপাধ্যায়, এই বছর চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য— পরপর দু’বার হেভিওয়েট প্রার্থীদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কেমনভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন?
উত্তর: আমাদের লড়াই তো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে নয়। আমরা ‘আইডিওলজিক্যাল ব্যাটল’ লড়ছি। একটা নির্দিষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে। এই মুহূর্তে দমদম উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে নিকাশী, জমা জল, রাস্তাঘাটের অবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করছে আমাদের। কিন্তু একজন মন্ত্রীর কেন্দ্রে তো আরও অ্যাডভান্সড কিছু দাবি করার কথা তাদের! সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, কানেক্টিং ফ্লাইওভার, বা কলেজ-ইউনিভার্সিটির দাবি করতে পারেন সাধারণ মানুষ! কিন্তু তা তো হচ্ছে না! এখনও তাঁরা বলছেন, এখানে নর্দমা পরিষ্কার হয় না! অথচ সেই খালের জন্য প্রায় ১ কোটি ৭৯ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছিল।
প্রশ্ন: ধরা যাক, এই কেন্দ্রের বিধায়ক নির্বাচিত হলেন। স্থানীয়দের কী কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন?
উত্তর: এখনই কোনও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না। আপাতত মানুষের কথা শুনছি। এর আগে একাধিক পাড়া বৈঠক হয়েছে, এখন আরও বড় আকারে বৈঠক করছি। এই এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা নিকাশী ব্যবস্থার। দমদম উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের দুটো পৌরসভা জুড়ে যে নোয়াইখাল, সংস্কারের অভাবে তা হাইড্রেনে পরিণত হয়েছে! ওটা তো খাল ছিল না বরাবর। ছিল লাবণ্যবতী নদী, যে নদীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বজরা চলেছে। ওর আশেপাশের এলাকা মশা-মাছি-দুর্গন্ধ-আবর্জনার কারণে বসবাসের অযোগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের প্রাথমিক ভাবনা, এই নোয়াইখাল কেন্দ্র করে একটা মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা। যাতে তার ড্রেজিং করে, সংশ্লিষ্ট নিকাশী ব্যবস্থাটিকেও ঢেলে সাজানো যায়।
দ্বিতীয়ত, এখানকার অনেকগুলো স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো করতে চাইছে না, স্কুলছুট হচ্ছে। মেয়েরা বিয়ে করে নিচ্ছে, ছেলেরা পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে যাচ্ছে। আমি বিধায়ক নির্বাচিত হলে, নাগরিক কমিটি তৈরির জন্য জোর দেব। যে কমিটি আদতেই নাগরিকদের, কোনও রাজনৈতিক দলের মুঠোবন্দি নয়। যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মানুষই একত্র হয়ে স্কুলছুট হওয়ার মতো সামাজিক ব্যধি রুখতে লড়াই করবেন। আমাদের ম্যানিফেস্টোতে লেখা হবে, আমাদের বিধায়কেরা নির্বাচিত হওয়ার পরের পাঁচ বছর, প্রতিবছর কী কী কাজ করলেন, তা জনতার দরবারে রিপোর্ট হিসেবে রাখবেন। মানুষই বিচার করবেন, আমরা কী পেরেছি, পারিনি।

প্রশ্ন: নদী থেকে খালে রূপান্তর হওয়ার কথা বললেন। এর দায় কিছুটা হলেও কি আপনাদের নয়? ৩৪ বছর দায়িত্বে ছিলেন আপনারা, এমন চিন্তাভাবনা তখন কেন করা হয়নি?
উত্তর: আপনি এই এলাকায় যতগুলো নতুন নর্দমা, পাকা রাস্তা দেখতে পাবেন, তার সমস্তটাই আমাদের সময় হওয়া। যখন এখানকার পৌরসভায় আমাদের জনপ্রতিনিধিরা ছিলেন, তখন তাঁরা নিজের টাকা দিয়ে, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে, হাসপাতাল তৈরি করেন। আপনি যা-কিছু পরিকাঠামো চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন, তা সে স্বাস্থ্য-রাস্তা-নিকাশী যাই হোক, সবটা আমাদের সময় তৈরি হওয়া। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে পৌরসভা যেভাবে দুর্নীতি করেছে, তাতে কোনও ‘মাইক্রো’ সমাধান যথেষ্ট নয়। ‘ম্যাক্রো’ সমাধান দরকার।
প্রশ্ন: রাজনীতির বাইরে গিয়ে প্রশ্ন করব, অতীতেও বিভিন্ন সময় দেখা গিয়েছে, যখনই আপনারা প্রচারে বেরিয়েছেন, বিশেষত মহিলারা, বিভিন্ন রকমের কুকথার মুখোমুখি হয়েছেন। এই সামাজিক অবক্ষয়কে কীভাবে মোকাবিলা করেন?
উত্তর: এই পিতৃতন্ত্র বহুদিন ধরেই মানুষের মধ্যে ছিল। একজন মহিলাকে দেখতে কেমন, তার পোশাক, কথা বলার ধরন, তার চরিত্র— ক্রমাগত জাজ করা হয়। মনে করা হয়, রাজনীতি আসলে মেয়েদের কাজ নয়। মেয়েদের কাজ ঘরের মধ্যে থাকা, রান্নাবান্না করা, সংসারের দেখভাল করা। ফলে পিতৃতান্ত্রিক পুরুষ বা মহিলারা যখন অন্য কোনও মহিলাকে এই সামাজিক ট্যাবু ভেঙে বেরোতে দেখে, তাদের অস্বস্তি হয়। ২০১১ সালের পরেও হয়েছে। আমরা যখন সরকারে ছিলাম, তখনও আমাদের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মিসোজেনিস্ট-নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন। যদিও যারা এমন বলেছেন, পার্টি তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেছে।
’১১ সালের পর থেকে কিন্তু এই বাজে কথা বলাটাই নরমালাইজ হয়ে গেছে। যে যত বাজে কথা বলতে পারবে, সে তত বড় নেতা। শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আমার বিষয়ে যা বলেছেন, তা যদি ছেড়েও দিই, নিজের দলের সাংসদ সম্পর্কেও তিনি আপত্তিজনক মন্তব্য করেছেন। এবং তারপরেও তিনি তৃণমূলের সদস্য। বিজেপি সরকারের কাছ থেকে তো কোনও প্রত্যাশাই নেই, তারা তো মনুস্মৃতিতে বিশ্বাসী। তারা মনে করে, মেয়েদের কাজ বাচ্চা প্রদান ও প্রতিপালন। নারীবিদ্বেষ বা নারী-নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের যা দাবি, তার দর্শনগত মূলে পরিবর্তন প্রয়োজন। সেটা একদিনে হবে না। এই দুই সরকারই আনফিট, প্রবলেম্যাটিক মনে করে এমন মেয়েদের ডিসিশন-মেকিং বডিতে পৌঁছে দেওয়া এই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
প্রশ্ন: দীর্ঘ ৩৪ বছর আপনার দল শাসন করেছে। কিন্তু কালের নিয়মে এখন ‘শূন্য’। মানুষ কেন ‘শূন্য’-কে ভোট দেবে?
উত্তর: যদি সত্যিই শূন্য হতাম, তাহলে আমাদের নিয়ে তৃণমূল বা বিজেপির এত মাথাব্যথা থাকত না। বিগত কয়েক মাস ধরে বিজেপির নেতারা নিজেদের কর্মীদের সঙ্গে কম কথা বলছেন। বরং বামপন্থী সমর্থকদের বলছেন, ‘আপনারা এদিকে চলে আসুন’। পঞ্চায়েত নির্বাচনে, বিভিন্ন জায়গায় ভোটের নামে প্রহসন হয়েছে। আমাদের ভোট করতে দেওয়া হয়নি। সন্ধে আটটার পর কেউ নিজের ভোট দিতে পারেননি। পাড়ায় পাড়ায় দুষ্কৃতিরা বাইক নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। যদি আমরা এতটাই অপ্রাসঙ্গিক হই, তাহলে তো আমাদের দমানোর জন্য এত কিছু করতে হবে না! গতকাল আমরা ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে কয়েক জায়গায় পোস্টার লাগিয়েছিলাম। দু’তিনটে জায়গায় পোস্টার ছিড়ে ফেলা হয়েছে। কেন? এমনও জায়গা রয়েছে যেখানে আমাদের রং করা দেওয়াল, লেখা আছে ‘সিপিআইএম ২০২৬’। সেখানে তাঁরা হোয়াইটওয়াশ করে নিজেদের নাম লিখে দিয়েছেন। আসলে ওঁরাও জানেন, সত্যি করে যদি মানুষ ভোট দিতে পারেন, তাহলে বামপন্থীরা এমন শক্তি হয়ে দাঁড়াবে, যা পশ্চিমবঙ্গকে আগামীদিনে পরিচালনা করবে।
আমি যে টাকা পাবো, তা থেকে কাটমানি আমার পুরপ্রধানকে দিতে হবে— এমনটা আমরা ক্ষমতায় এলে হবে না। কোনও কিছুই পাইয়ে দেওয়ার জন্য কারওর পকেটে টাকা গুঁজে দিতে হবে না! মায়েদের কেবল লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করে থাকতে হবে না। তার বাড়ির ছেলে চাকরিও পাবে! বেকারভাতার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হবে না।
প্রশ্ন: দমদম, উত্তর দমদম কেন্দ্রগুলোকে একসময় ‘বামেদের দুর্জয় ঘাঁটি’ বলা হত। ২০১৬ সালেও উত্তর দমদম থেকে সিপিআইএম প্রার্থী বিধানসভায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এই লালগড়ের ‘শূন্যের গেরো’ কাটবে, সে নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
উত্তর: বামপন্থীদের ‘হে ডেজ’-এও উত্তর দমদমের মানুষ বামপন্থী নন, এমন প্রার্থী নির্বাচন করেছেন। আমি মনে করি, দমদমের মাটির এটাই গুণ যে তাঁরা প্রশ্ন করতে পারেন এবং পরিস্থিতি পছন্দ না-হলে, তা বদলে দিতে পারেন। আমি আশা করব, এই স্পিরিট রেখেই তাঁরা ভোট দেবেন।
প্রশ্ন: লক্ষ্মীর ভাণ্ডার-যুবসাথী-স্বাস্থ্যসাথীর মতো সামাজিক প্রকল্পগুলো আপনাদের কাছে কতখানি চ্যালেঞ্জিং?
উত্তর: আমরা তো এগুলোকে চ্যালেঞ্জ করছি না! ভাতা বা ওয়েলফেয়ার স্কিমগুলোর বিরোধিতা করার তো কোনও কারণ নেই। বার্ধক্যভাতা, বিধবাভাতা, মেয়েদের সাইকেল দেওয়া, পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েদের স্কলারশিপ প্রদান, আমাদের সময়ই চালু হয়েছিল। কিন্তু এখন এই ভাতা নিয়েও দুর্নীতি হচ্ছে। আমি যে টাকা পাবো, তা থেকে কাটমানি আমার পুরপ্রধানকে দিতে হবে— এমনটা আমরা ক্ষমতায় এলে হবে না। কোনও কিছুই পাইয়ে দেওয়ার জন্য কারওর পকেটে টাকা গুঁজে দিতে হবে না! মায়েদের কেবল লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করে থাকতে হবে না। তার বাড়ির ছেলে চাকরিও পাবে! বেকারভাতার জন্য লাইনে দাঁড়াতে হবে না। সেই চাকরি থেকে সে আমার রাজ্যের ট্যাক্সে, অর্থনীতিতে কন্ট্রিবিউট করবে।
প্রশ্ন: প্রতিপক্ষ চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের সম্পর্কে কী মূল্যায়ন?
উত্তর: আমি তো ওঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। চিনছি এই বিধানসভার কেন্দ্রের রাস্তাঘাট-জল-হাসপাতালের মধ্যে দিয়ে। তাতে আমার মনে হয় না যে, উনি এই অঞ্চলের মানুষের জন্য খুব একটা কাজ করেছেন। একজন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর নিজের এলাকার যে পূর-হাসপাতাল, সেখানে গেলেই অন্য কোথাও রেফার করে দেওয়া হয়। বেড নেই, ডাক্তার-নার্স নেই। জনপ্রতিনিধি চন্দ্রিমা আমার কাছে খুব বেশি নম্বর পাচ্ছেন না।
প্রশ্ন: এবারের নির্বাচনী প্রচারে চোখে পড়েছে এক ভিন্ন ছবিও। কলতান হোক বা আপনি, দেখা গিয়েছে মন্দির-মসজিদে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ করছেন। ধর্মীয় বিষয়ের প্রতি কি বাম দলগুলির দৃষ্টিভঙ্গি তবে কিছুটা নমনীয় হয়েছে?
উত্তর: একেবারেই নয়। আমরা ঈদের অনুষ্ঠানে গিয়েছি। কোনও মসজিদের ভিতর গিয়ে টুপি পরে নামাজ আদা করতে যাইনি। কারণ আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে সেই ধর্মে বা অন্য কোনও ধর্মে বিশ্বাস করি না। পুজোয় যেমন বহু মানুষ রাস্তায় নামেন, ঈদেও তেমনই। সে সময়ে আমরা রাস্তায় নেমে জনসংযোগ করেছি। তৃণমূল নেতাদের দেখবেন, তাদের সাজ-আড়ম্বর অন্যরকম। কেউ মাথায় সাদা কাপড় দিয়েছেন, কেউ টুপি— ভাবখানা এমন, যেন মুসলমান মানুষদের চাইতেও তারা বেশি মুসলমান! আমরা এমন ভেক ধরিনি কখনও। গতকাল যে পোশাক পরে রাস্তায় নেমেছিলাম, আজও তাই। সাজপোশাকের মধ্যে দিয়ে ‘আমি তোমাদেরই লোক’ প্রমাণ করার চেষ্টা করিনি। আমি বিশ্বাস করি, আলাদা ধর্ম-পোশাক-সংস্কৃতি থাকা সত্ত্বেও আমার দেশের মানুষ একসঙ্গে থাকতে পারে। এই সহাবস্থানের জন্য ধর্মীয় পোশাক অবলম্বন করতে লাগে না। তাকে আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা জানানোই যথেষ্ট।
পুজোয় যেমন বহু মানুষ রাস্তায় নামেন, ঈদেও তেমনই। সে সময়ে আমরা রাস্তায় নেমে জনসংযোগ করেছি। তৃণমূল নেতাদের দেখবেন, তাদের সাজ-আড়ম্বর অন্যরকম। কেউ মাথায় সাদা কাপড় দিয়েছেন, কেউ টুপি— ভাবখানা এমন, যেন মুসলমান মানুষদের চাইতেও তারা বেশি মুসলমান! আমরা এমন ভেক ধরিনি কখনও।
প্রশ্ন: বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের প্রতিফলন বর্তমান বাম রাজনীতিতে স্পষ্ট। দীর্ঘদিন অভিযোগ ছিল, আপনাদের দল ‘পাকা চুলের দল’। সেই দলে এখন একঝাঁক তরুণ মুখ। উল্টোদিকে আপনাদের প্রাক্তন নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা সাম্প্রতিককালে প্রতীকউর রহমান দল বদলে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। সেই দল, যারা আপনাদের ঘোষিত শত্রু। বারবার প্রশ্ন আসছে, তবে কি তরুণদের এত তাড়াতাড়ি জায়গা না দেওয়াই সঠিক ছিল? তাদেরকে কি প্রভাবিত করা সহজ?
উত্তর: প্রতীক উর-ঋতব্রতর কথা বলছেন, কিন্তু রেজ্জাক মোল্লাকে ভুলে গেলেন। উত্তরবঙ্গেও এমন কিছু সাংসদ-বিধায়ক ছিলেন, যারা বিপক্ষ দলে গিয়েছেন। আমি মনে করি না, এটা প্রজন্মের সমস্যা। কিছু মানুষ থাকেন, যারা মনে করেন সময়ের সঙ্গে, সরকারের সঙ্গে বদলানো উচিত। তাঁরা বদল করেছেন। কিন্তু বহু মানুষ তো স্রোতের বিপরীতে থেকে গেলেন। যে-প্রজন্মেরই উদাহরণ দিন না কেন, যারা চলে গিয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি মানুষ কষ্ট-যন্ত্রণা সহ্য করেও লাল ঝাণ্ডার সঙ্গে রয়ে গিয়েছেন। আমার কাছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। এগোনোর মূল উপাদান।
প্রশ্ন: আপনার প্রচারে লাল ঝাণ্ডার শরীকদের দেখলাম। বাচ্চাদের আদর করলেন, লজেন্স খাইয়ে দিলেন, বড়দের আশীর্বাদ নিলেন। আপনাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে আপনার বাড়ি এই এলাকায় নয়। ‘ঘরের মেয়ে’ হয়ে ওঠার এই ম্যাজিক আসলে কী?
উত্তর: আমি বালির মেয়ে, গঙ্গা পেরোলেই এই কেন্দ্র। আমার রাজনৈতিক শিক্ষা, বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে সংগঠন গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা, কোনও জায়গাই আমার আপন নয়, এমন মনে হতে দেয়নি। এলাকার মানুষেরা আমাকে ভালোবেসেছেন। আমার ধারণা, কেবল ব্যক্তি দীপ্সিতাকে দেখতে আসেননি তাঁরা। দীপ্সিতার বলা রাজনৈতিক কথাগুলো তাঁদেরও বক্তব্য। যখন বলছি যে ক্ষমতায় এলে আমরা কর্মসংস্থানের দাবি জানাব, তখন যে-মা আমায় আদর করছেন তিনিও তাঁর সন্তানের কর্মসংস্থানের কথা ভাবছেন। গতকাল এক মহিলার সঙ্গে আলাপ হয়। তাঁর মেয়ে এমএসসি করে বাড়িতে বসে রয়েছে, কাজ পায়নি কারণ কাজ নেই। একটি ছেলের সঙ্গে আলাপ হল যে গ্র্যাজুয়েশন পাশ করে রিকশা চালায়। যখন আমরা সবার হাতে কাজ দেওয়ার কথা বলছি, তখন ওই মা, ওই বাড়ির ছেলেমেয়ে, তাঁরা আমাদের কথার সঙ্গে একাত্ম হতে পারছেন বলেই দীপ্সিতা তাঁদের ঘরের মেয়ে হতে পেরেছে।
প্রশ্ন: এবার পালা র্যাপিড ফায়ারের। বালি, শ্রীরামপুর না উত্তর দমদম?
উত্তর: বালি আমার বাড়ি, শ্রীরামপুর আমার লোকসভা কেন্দ্র ছিল, কর্মক্ষেত্র ছিল সে সময়। উত্তর দমদম আমার বিধানসভা কেন্দ্র। উত্তর দমদমের মানুষকে সার্ভ করার জন্য অন্তত আগামী পাঁচ বছর আমি এখানে থাকতে চাই।
প্রশ্ন: ছাত্র আন্দোলন নাকি মেঠো রাজনীতি?
উত্তর: দুটোই। ছাত্র থাকাকালীন ছাত্র আন্দোলন করেছি, আজীবন তো তা করে যাওয়া সম্ভব নয়। তৃণমূলের মতো হয় না, যেমন বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়— ওঁর নাতির ছাত্র আন্দোলন করার বয়স হয়ে গিয়েছে। এখনও উনি ছাত্রনেতা।
প্রশ্ন: আজকের প্রজন্ম ‘নেট’-এ বেশি স্বচ্ছন্দ। আপনি নেট-এ না মাঠে?
উত্তর: আমি নেটে, পায়ে হেঁটে, সাইকেলে, ট্রেনে, বাইকে, রিকশায়— সবেতেই স্বচ্ছন্দ।
প্রশ্ন: ‘শূন্যের গেরো’ কাটছে?
উত্তর: অবশ্যই!
প্রশ্ন: ৪ঠা মে কাদের সরকার আসছে?
উত্তর: এমন সরকার নির্বাচিত হবে, যারা সাধারণ মানুষের কথা বলবে। আর যারা অপোজিশনে বসবেন, তাঁরাও সেই দায়িত্ব নিয়েই বসবেন। যে সরকারই হোক না কেন, বামপন্থীরা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলতে বিধানসভার ভিতরে থাকবে। দরকার পড়লে ক্যাবিনেটেও।
প্রশ্ন: কতগুলো আসন পাবেন বলে মনে হয়?
উত্তর: আমি গণক ঠাকুর নই, ভবিষ্যৎবাণী করতে পারি না!
প্রশ্ন: কেউ কি এ-কথা শিখিয়ে দিয়েছে আপনাদের? কলতানও একই কথা বললেন।
উত্তর: শেখানোর প্রশ্ন নেই। আমি বহুদিন ধরেই এ কথা বলে আসছি। আমি আশা করি, মানুষ ভোট দেবেন। সেখানে জয়যুক্ত হয়ে মানুষের সরকার গঠন হবে।
প্রশ্ন: এবার রাজ্যে অষ্টম বামফ্রন্ট সরকার গঠন হবেই, এমন স্বপ্ন দেখেন?
উত্তর: আমি আরও অনেক স্বপ্ন দেখি, সে কথা এখন থাক। আপাতত স্বপ্ন একটাই। এই যে দুই সরকারের জাঁতাকলে মানুষ পিষছে, তা থেকে তাঁদের মুক্তি দেওয়া।
প্রশ্ন: কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য?
উত্তর: ব্যক্তিগতভাবে দুজনের কারও প্রতিই ভালোবাসা বা বৈরিতা নেই। তৃণমূলের যে-কেউ, আমি মনে করি মানুষের জন্য কাজ করেন না। সে-নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য যা-কিছু হতে পারে। আমার কাছে কেবল তাঁদের রাজনীতিটা বিচার্য। আর আমার ধারণা, তা সঠিক রাজনীতি নয়।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
কোথায় শওকত? ছেলেকে আটক করে হন্যে হয়ে খুঁজছে এনআইএ! তল্লাশি ভাইয়ের বাড়িতেও
-
‘শত্রু দেশ’কে হারিয়ে এশিয়ার সেরা! কিমের সঙ্গে নাচলেন ফুটবলাররা, ভাইরাল ভিডিও
-
জন্ম থেকে দলের ‘মালিকানা’ বদল, মমতার তৃণমূলের ২৮ বছরের ইতিবৃত্ত
-
জিনিয়াস স্পোর্টস নয়, আইএসএল আয়োজনের অধিকার খুব সম্ভবত পেতে চলেছে ক্লাবগুলি
-
ফেডারেশনের বৈঠকে রণক্ষেত্র টলিপাড়া, ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর বিরুদ্ধে ‘চোর চোর’ স্লোগানে ছোঁড়া হল ডিম
নিবেদিত


