Advertisement
Advertisement
ভোট প্রথমা
West Bengal Assembly Election 2026

খেলা ঘোরালেন পরিযায়ী শ্রমিকরা! উত্তরে ‘নজিরবিহীন শান্তি’র ভোটে স্বস্তি কাদের?

ডোমকল, দিনহাটা, রানিনগর, রতুয়া, চাঁচল, চোপড়া, হরিরামপুর। একটা সময় ভোটের সকালগুলিতে বারুদের গন্ধে ঘুম ভাঙত এই এলাকাগুলির। এ বছর কোনও এক জাদুকাঠিতে সবটা বদলে গেল।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ২৩:০৬

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ২৩:০৬

options
link
খেলা ঘোরালেন পরিযায়ী শ্রমিকরা! উত্তরে ‘নজিরবিহীন শান্তি’র ভোটে স্বস্তি কাদের? zoom
ভোটে বড় প্রভাব পরিযায়ী শ্রমিকদের। ফাইল ছবি।

ডোমকল, দিনহাটা, রানিনগর, রতুয়া, চাঁচল, চোপড়া, হরিরামপুর। একটা সময় ভোটের (West Bengal Assembly Election 2026) সকালগুলিতে বারুদের গন্ধে ঘুম ভাঙত এই এলাকাগুলির। মোটামুটিভাবে উত্তর ও মধ্যবঙ্গ সার্বিকভাবেই ভোটে হিংসা দেখে অভ্যস্ত। এ বছর কোনও এক জাদুকাঠিতে সবটা বদলে গেল। বিধানসভায় শেষ কবে এত অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট দেখেছে বাংলা, সেটা অনেকেই মনে করতে পারেন না।

কোথাও কোথাও দু-একটা বিচ্ছিন্ন হিংসার ঘটনা বাদ দিলে মোটের উপর ভোট নির্বিঘ্ন, শান্তিপূর্ণ। স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষ শামিল হয়েছেন গণতন্ত্রের উৎসবে। যার ফলশ্রুতি ৯২ শতাংশ ভোট। অবশ্য এটার একটা বড় কারণ এসআইআর। প্রথমত, ভোটার তালিকা যত স্বচ্ছ হয়, ভোটের হার তত বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক। এতদিন ভোটার তালিকায় ৮-৯ শতাংশ ছিল অস্তিত্বহীন ভোটার। অর্থাৎ ভোট হচ্ছিলই ৯১-৯২ শতাংশ ভোটারের মধ্যে। ফলে বিপুল হারে ভোট পড়লেও চূড়ান্ত সংখ্যাটা তুলনায় কমই দেখাত। এবার যেহেতু ভোটার তালিকা থেকে ওই বিপুল অস্তিত্বহীন ভোটার কমে গিয়েছে, তাই এমনিতেই ভোটের হার ৮-১০ শতাংশ বেশি দেখাচ্ছে। তাছাড়া এসআইআরের ফলে এবার অনেক ভোটারের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করেছে। ভোটারদের একটা বড় অংশের মনে হয়েছে, এবার ভোট না দিলে পরবর্তীকালে সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকে বহু ভোটার যাঁরা হয়তো এতদিন ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দোনামনা করতেন, তাঁরাও এবার ভোট দিয়েছেন। ভিনরাজ্য থেকে হাজারে হাজারে পরিযায়ী শ্রমিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে এসেছেন স্রেফ ওই আশঙ্কা থেকে।

Advertisement

২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে স্রেফ ডোমকলে ভোটহিংসায় প্রাণ গিয়েছিল তিরিশের বেশি মানুষের। ২০১৮ এমনকী ২০২৩ সালেও বহু মানুষ এই ডোমকলে ভোট দিতে পারেননি বলে অভিযোগ উঠেছিল। সেখানে এবার উৎসবের আবহে ভোট হয়েছে। নিজের ভোট নিজে দিতে পেরে খুশি ভোটাররাও।

শান্তিপূর্ণ ভোটের (West Bengal Assembly Election 2026) এই ম্যাজিক কী করে হল? এটার জন্য কৃতিত্ব দিতেই হয় কমিশনকে। আসলে এবারে ভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করাটাকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছিল কমিশন। ভোটের অনেকদিন আগে থেকেই এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহলদারি, ভোটারদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এলাকায় এলাকায় পেট্রোলিং এবং সচেতনতার প্রচার, এলাকায় যারা অশান্তি বাঁধাতে পারে, তেমন দুষ্কৃতীদের ‘চিহ্নিত’ করা এবং রীতিমতো থানায় ডেকে নিয়ে গিয়ে ধমকানি-চমকামি! এবং ভোটের দিন কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয়তা। অতীতে বহু ভোটে দেখা গিয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকলেও ভোটের দিনে তাঁরা কোথাও বসে জিরোচ্ছেন, কেউ হাজারদুয়ারির প্যালেস দেখছেন। এবার কিন্তু সেই ছবি দেখা যায়নি। উলটে কোথাও সামান্যতম অশান্তির খবর পেলেই পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী ছুটে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছেন।

২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে স্রেফ ডোমকলে ভোটহিংসায় প্রাণ গিয়েছিল তিরিশের বেশি মানুষের। ২০১৮ এমনকী ২০২৩ সালেও বহু মানুষ এই ডোমকলে ভোট দিতে পারেননি বলে অভিযোগ উঠেছিল। সেখানে এবার উৎসবের আবহে ভোট হয়েছে। নিজের ভোট নিজে দিতে পেরে খুশি ভোটাররাও। একটা সময় এই ডোমকল মহকুমার বড় সমস্যা ছিল ড্যামি ভোটার। শক্ত-সমর্থ ভোটাররাও ভোটকেন্দ্রে গিয়ে বলতেন, ‘চোখে ছানি, ভোট দিতে পারব না। আমার ভোট অমুক দেবেন।’ এবার এই ড্যামি ভোটারদের কড়া হাতে দমন করেছে কমিশন। শুধু মালদহ কেন, গোটা মুর্শিদাবাদ জেলাকে কার্যত দুর্গ বানিয়ে ফেলেছিল কমিশন। একমাত্র নওদায় দু-তিনটি বুথে হুমায়ুন কবীরকে ঘিরে অশান্তি ছাড়া, তেমন কিছুই হয়নি। একই ছবি বীরভূমে। ভোট হয়েছে উৎসবের আবহেই। খয়রাশোলে বিকালের দিকে অশান্তির আবহ তৈরি হলেও সেটা কড়া হাতে দমন করেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। মোটের উপর মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের ভোটও অবাধ ও শান্তিপূর্ণ। ভোটের হারের পর কমবেশি সন্তোষপ্রকাশ করেছে সব দলই। যদিও কিছু কিছু এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অতি সক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও তৃণমূল কর্মীদের মারধর, কোথাও বয়স্ক ভোটারদের ভোটদানে বাধার মতো অভিযোগ উঠলেও সেগুলি সার্বিকভাবে নগণ্য।

Bengal Election 2026: chicken and khichuri cooking organized for voters in Jhargram
মাংস-খিচুড়ি রান্না চলছে। নিজস্ব চিত্র

উত্তরবঙ্গের অন্য জেলাগুলির ভোটচরিত্রও একই রকম। তীব্র দাবদাহ উপেক্ষা করে মানুষ ভোটের লাইনে দাঁড়ালেন। কোথাও কোথাও লাইন ৩০০-৪০০ মিটারও ছাড়াল। যে কোচবিহার জেলা একটা সময় নিশীথ-উদয়নের দ্বন্দ্বে নিত্যদিন অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠত, সেখানেও এবার নির্বিঘ্নে ভোট হল। দুই হেভিওয়েটই আটকে রইলেন নিজের কেন্দ্র। উদয়ন বারকয়েক অভিযোগ করলেন স্থানীয় থানার আধিকারিকদের বিরুদ্ধে। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল কর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। আবার নিশীথকে ঘিরে ঘোঘাসডাঙ্গায় বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তৃণমূল কর্মীরা।তাছাড়া মোটের উপর ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল নজরকাড়ার মতো। উত্তরবঙ্গে কিছুটা অশান্তির জায়গা খবর এসেছে শিলিগুড়ি থেকে। জনা তিনেক ভোটার অভিযোগ করেছেন, তাঁদের ভোট অন্য কেউ দিয়েছে। কমিশন বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাসও দেয়।

এখন প্রশ্ন হল, এই বিপুল ভোট কি শুধু এসআইআর এবং কমিশনের সুব্যবস্থার জন্যই? উত্তরের বিভিন্ন জেলায় ভোটচিত্র বলছে, ভোটের হার বাড়ার মূল কারণ যদি SIR হয়, তাহলে অনুঘটক পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রত্যাবর্তন। স্রেফ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে প্রায় ২২ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের সিংহভাগ ভোট দিতে ফিরেছেন। সাধারণত, পঞ্চায়েত ভোটে এই পরিযায়ীদের নিজেদের উদ্যোগে ফেরান পঞ্চায়েতের প্রার্থীরা। বিধানসভা বা লোকসভা ভোটে এই পরিযায়ীদের একটা বড় অংশ ফেরেন না। কিন্তু এবার এসআইআরের ভয়ে অনেকে নিজেরাই এসেছেন ভোট দিতে। অভিযোগ এমনও আছে যে, ওই পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফেরত আনার দায়িত্ব নিচ্ছে বিজেপিই। তাঁদের টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে, খাবার দেওয়া হয়েছে, এমনকী হুমকিও দেওয়া হয়েছে বাংলায় বিজেপি না এলে নিজেদের কর্মস্থলে তাঁরা ফিরতে পারবেন না। এমনিতে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের একটা বড় অংশ মুসলিম, এবং এঁরা তৃণমূলের ভোটার। এদের উপর এই হুমকি প্রভাব ফেলবে কিনা, সেটাই বদলে দিতে পারে উত্তরের ভোটভাগ্য। সব পক্ষই আশাবাদী, মানুষ তাঁদের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তৃণমূল বলছে, এই বিপুল ভোট আসলে এসআইআর হেনস্তার প্রতিবাদ। কমিশন ও বিজেপির যোগসাজশের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছেন মানুষ। কাদের দাবি সত্যি? সেটা অবশ্য জানা যাবে ৪ মে।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.