Advertisement
Advertisement
West Bengal Assembly Election

চ্যালেঞ্জ দুষ্কৃতী দমন, ‘হিন্দিভাষী’ হাওড়া উত্তরের ভোটযুদ্ধে কী স্ট্র্যাটেজি তৃণমূল-বিজেপির?

প্রোমোটাররাজ থেকে গণ পরিবহণের সমস্যা, অনেক কিছুই ইস্যু এখানকার ভোটে। তার সমাধানে কাকে বেছে নেবেন জনতা?

Advertisement
অরিজিৎ গুপ্ত
অরিজিৎ গুপ্ত

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২২, ২০২৬, ২১:৫১

link
অরিজিৎ গুপ্ত
অরিজিৎ গুপ্ত

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২২, ২০২৬, ২১:৫১

options
link
চ্যালেঞ্জ দুষ্কৃতী দমন, ‘হিন্দিভাষী’ হাওড়া উত্তরের ভোটযুদ্ধে কী স্ট্র্যাটেজি তৃণমূল-বিজেপির? zoom
হাওড়া উত্তরের নির্বাচনী যুদ্ধ।

কলকাতার অদূরে যমজ শহর হাওড়া। তার শহরতলি এলাকা উত্তর হাওড়ায় বেশি হিন্দিভাষীদের বসবাস। মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীর সংখ্যা বহু। হাজার সমস্যা এখানকার নিত্যসঙ্গী। দুষ্কৃতী দাপট থেকে শুরু করে পরিবহণ, নিকাশি এখানকার মূল নাগরিক সমস্যা। সেসব সামলে জনতার ভোট পাওয়া নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ। ছাব্বিশের নির্বাচনে তাই অন্যতম হটস্পট হাওড়া উত্তর। এই বিধানসভা কেন্দ্র কার দখলে থাকবে, তার নির্ধারক কিন্তু হিন্দিভাষী ভোটাররা। এবার অবশ্য আরেকটি ফ্যাক্টর যোগ হয়েছে – এসআইআর। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন পর্বে এখানে প্রচুর মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এবারের ভোটযুদ্ধ কেমন হতে চলেছে হাওড়া উত্তরে। আসুন দেখে নেওয়া যাক।

ভোট সংক্রান্ত পরিসংখ্যানের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, হাওড়া উত্তরের প্রায় ৬০ শতাংশ হিন্দিভাষী বা মারোয়াড়ি ভোটার। তাঁদের জনসমর্থন যেদিকে, সহজ পাটিগণিতের অঙ্ক বলে, সেই দলেরই জয়ের পথ সুগম হবে। তবে এবারের বড় ফ্যাক্টর হল এসআইআর। তাতে প্রায় ৬০ হাজার নাম বাদ গিয়েছে।

হাওড়া উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ভোটার ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৯৪৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ৭৮ হাজার ৯১১ জন ও মহিলা ৭১ হাজার ০২৯ জন। এখানে প্রায় ১০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন। তফসিলি জাতি ও উপজাতি ৫ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, হাওড়া উত্তরের প্রায় ৬০ শতাংশ হিন্দিভাষী বা মারোয়াড়ি ভোটার। তাঁদের জনসমর্থন যেদিকে, সহজ পাটিগণিতের অঙ্ক বলে, সেই দলেরই জয়ের পথ সুগম হবে। তবে এবারের বড় ফ্যাক্টর হল এসআইআর। তাতে প্রায় ৬০ হাজার নাম বাদ গিয়েছে।

Advertisement

এখানে নির্বাচনের মূল ইস্যু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নাগরিক পরিষেবা। বেহাল নিকাশি ব্যবস্থা, দুষ্কৃতীরাজ বা আইনশৃঙ্খলার অভাব, হাওড়া থেকে কলকাতা কিংবা সল্টলেক যেতে গণপরিবহণের অভাব, জলা জমি বুজিয়ে বেআইনি বহুতলের রমরমা ও সরকারি স্কুল-কলেজের অভাব। এই বিধানসভা কেন্দ্রে হাওড়া পুরসভার অনেক ওয়ার্ডে নিকাশির সমস্যা রয়েছে। নালা বুজে গিয়ে ঠিকমতো জল বের হয় না। বেহাল নিকাশি ব্যবস্থার ঠিকমতো সংস্কার হচ্ছে না বলেই প্রতি বর্ষায় ভেসে যায় হাওড়া উত্তরের বিস্তীর্ণ অংশ। হাওড়া পুরসভার ২, ৩, ৬, ৭, ১০ ও ১৫ নম্বর ওয়ার্ড অল্প বৃষ্টিতেই জলমগ্ন হয়ে পড়ে। নর্দমা বুজে গিয়ে উত্তর হাওড়ার কিছু কিছু এলাকায় সারা বছর জল জমে থাকে। ফলে মানুষ ভোগান্তির শিকার হন।

এই মুহূর্তে উত্তর হাওড়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা দুষ্কৃতী দাপট। কিছুদিন আগে এই উত্তর হাওড়ার গোলাবাড়িতে ভোরবেলায় প্রকাশ্যে প্রোমোটারকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা রাজ্যকে। এই ঘটনা ঘিরে সামনে এসেছিল হাওড়া শহরের দুষ্কৃতীরাজের নগ্ন ছবি। পুলিশ দ্রুত দুষ্কৃতীদের গ্রেপ্তার করলেও আতঙ্ক কমেনি। কান পাতলেই চাপা স্বরে ফিসফিসে আলোচনা শোনা যায় এনিয়ে। প্রকাশ্যে তেমন কিছু কেউ বলতে চান না। কারণ এলাকার মানুষের মনে ভয় দিনের পর দিন ধরে জাঁকিয়ে বসেছে আতঙ্ক।

তবে এই মুহূর্তে উত্তর হাওড়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা দুষ্কৃতী দাপট। কিছুদিন আগে এই উত্তর হাওড়ার গোলাবাড়িতে ভোরবেলায় প্রকাশ্যে প্রোমোটারকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা রাজ্যকে। এই ঘটনা ঘিরে সামনে এসেছিল হাওড়া শহরের দুষ্কৃতীরাজের নগ্ন ছবি। পুলিশ দ্রুত দুষ্কৃতীদের গ্রেপ্তার করলেও আতঙ্ক কমেনি। কান পাতলেই চাপা স্বরে ফিসফিসে আলোচনা শোনা যায় এনিয়ে। প্রকাশ্যে তেমন কিছু কেউ বলতে চান না। কারণ এলাকার মানুষের মনে ভয় দিনের পর দিন ধরে জাঁকিয়ে বসেছে আতঙ্ক। উত্তর হাওড়ার বেশ কয়েক বছরের জ্বলন্ত সমস্যা প্রোমোটার রাজ। আর তাকে ইস্যু করে বিজেপি প্রচারে শান দিচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাধারণ মানুষ জানিয়েছেন, “প্রোমোটারি রাজ দীর্ঘদিন ধরে চলছে। সাধারণ মানুষজন যথেষ্ট ভয়ে থাকে।” এর বেশি তিনি কিছুই বলতে চাননি। এই ভয়ের বাতাবরণকে যেমন অস্ত্র করেছে বিরোধীরা, তেমনই উন্নয়নের পাঁচালি পড়ে শক্ত মাটি নিজেদের কাছে ধরে রাখতে চাইছে শাসকদল।

পরিবহণ সমস্যা রয়েছে হাওড়া উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এলাকাগুলিতে। কয়েকটি বাস রুটে আর পর্যাপ্ত বাস চলে না। ফলে দক্ষিণ কলকাতা ও সল্টলেকে যাঁরা চাকরি করতে যান, তাঁরা রোজই যাতায়াতের জন্য সমস্যায় পড়েন। এছাড়া জলাজমি বুজিয়ে বেআইনি বহুতল তৈরির অভিযোগও রয়েছে। সরকারি স্কুল উঠে গিয়ে পরিকাঠামো ছাড়াই প্রচুর বেসরকারি স্কুলও গজিয়ে উঠেছে। অবশ্য নিকাশি সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়েছে বলে দাবি পুর কর্তৃপক্ষের।

Howrah North Becomes Hotspot in West Bengal Assembly Election 2026
হাওড়া উত্তরের তৃণমূল প্রার্থী বিদায়ী বিধায়ক গৌতম চৌধুরী। নিজস্ব ছবি

এই কেন্দ্রে এবারের তৃণমূল প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক গৌতম চৌধুরী। তিনি প্রচারে বেরিয়ে বলছেন, ‘‘জিতে এলে উত্তর হাওড়ার নিকাশি সংস্কারের জন্য কিংস রোডে ২৮ কোটি টাকা প্রকল্পের কাজ করব। এর ডিপিআর হয়ে গিয়েছে। আমি অনেকদিন থেকেই উত্তর হাওড়ার জল নিকাশির সমস্যার সমাধানের জন্য কাজ করছি। এখনও কিছুটা কাজ বাকি আছে। সেই কাজটা সম্পূর্ণ হলেই নিকাশির সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে মনে করছি। এছাড়াও মৈনাথ পাড়ায় একটি বুস্টিং পাম্পিং স্টেশন করা হয়েছে। এর ফলেও উত্তর হাওড়ার একটি বড় অংশে নিকাশির সমস্যার সমাধান হয়েছে।’’ হাওড়া পুরসভায় বোর্ড না থাকায় শিবপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ওয়ার্ডগুলিতে বর্তমানে কোনও কাউন্সিলর নেই। পুর কমিশনার প্রশাসক হিসেবে রয়েছেন। ফলে হাওড়া পুরসভার আধিকারিকরাই নাগরিক পরিষেবা দেওয়ার দায়িত্বে।

West Bengal Assembly Election: Key Issues and Voter Trends in Howrah North
বিজেপির তরফে হাওড়া উত্তরে লড়ছেন উমেশ রাই। নিজস্ব ছবি

বিজেপি প্রার্থী উমেশ রাইয়ের প্রতিশ্রুতি, ‘‘রাজ্য সরকার উত্তর হাওড়ার নিকাশি সংস্কারের জন্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করলেও উত্তর হাওড়ায় নিকাশি সংস্কারের কোনও কাজ হয়নি। আমি বিধায়ক হলে ও রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার হলে কেন্দ্রীয় সরকারের নগরোন্নয়নের জন্য বরাদ্দ টাকায় উত্তর হাওড়ায় ঢেলে নিকাশি ব্যবস্থার সংস্কার করা হবে। উত্তর হাওড়ায় দুষ্কৃতীরাজ খতম করা হবে। বিশেষত নারীঘটিত কোনও অপরাধে অভিযুক্তকে প্রয়োজনে এনকাউন্টার করে মারা হবে। একইসঙ্গে উত্তর হাওড়ায় গত ৭০ বছরেও একটা কলেজ তৈরি হয়নি। আমি বিধায়ক হলে একটা টেকনিক্যাল কলেজ করব। আর কথা দিচ্ছি উত্তর হাওড়ায় একটি সরকারি হাসপাতালও করব।’’

Howrah North Election Strategy: TMC vs BJP in West Bengal Assembly Election
প্রচার মিছিলে সিপিএম প্রার্থী, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক গৌতম রায়। নিজস্ব ছবি

উত্তর হাওড়ার সিপিএম প্রার্থী তথা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক গৌতম রায়ের বক্তব্য, ‘‘আমি বিধায়ক হলে উত্তর হাওড়ার নিকাশি সংস্কার ও জঞ্জাল অপসারণের জন্য ম্যাপ ও পরিকল্পনা করে এই মূল দু’টি সমস্যার সমাধান করব। এছাড়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে উত্তর হাওড়ায় কীভাবে জলাজমি সংরক্ষণ করা যায় তা দেখব। কারণ এখানে বেআইনিভাবে প্রচুর জলাজমি ভরাট করা হচ্ছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা যাতে ঠিক থাকে তা দেখব। নতুন বাস রুট চালু হবে এখানে যাতে উত্তর হাওড়ার মানুষ সহজেই দক্ষিণ কলকাতা ও সল্টলেকে চাকরি করতে যেতে পারে। পাশাপাশি বেআইনি বহুতল নির্মাণ বন্ধ করব ও এলাকায় সরকারি স্কুল যাতে চালু করা যায় তা দেখব।’’

West Bengal Assembly Election: Howrah North Battle Hinges on Hindi-Speaking Voters
হাওড়া উত্তরের কংগ্রেস প্রার্থী ওমপ্রকাশ জয়সওয়াল। নিজস্ব ছবি

কংগ্রেস প্রার্থী ওমপ্রকাশ জয়সওয়াল বললেন, ‘‘আমি বিধায়ক হলে নালি পরিষ্কার করব। গুন্ডামি-তোলাবাজি এসব বন্ধ হয়ে যাবে। আর আমাদের নেতা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল, এখানে একটি কলেজ করবেন। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির সেই ইচ্ছাপূরণ করব। একইসঙ্গে উত্তর হাওড়ায় ভালো হাসপাতাল নেই। তাই একটি ভালো হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনাও আছে।’’ তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও এবার পাল্লা ভারী বিজেপির। লড়াইয়ে থাকবে সিপিএমও। তবে কাকে বেছে নেবেন জনতা? তা বোঝা যাবে ৪ মে।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.