Guskara Chongdar family puja

দুর্গাপুজোর শেষে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান! গুসকরার এই জমিদার বাড়িতে কেন দশমীতে হয় না ঘট বিসর্জন?

কেন এমন রীতি চোংদার জমিদার বাড়িতে? সে এক বেদনার কাহিনি, জানালেন পরিবারের সদস্যরা।

ধীমান রায়
ধীমান রায়

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ১৪:২২

options
link
দুর্গাপুজোর শেষে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান! গুসকরার এই জমিদার বাড়িতে কেন দশমীতে হয় না ঘট বিসর্জন?
গুসকরার চোংদার জমিদার বাড়ির ব্যতিক্রমী নিয়ম, দুর্গাপুজো শেষে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান, নিজস্ব ছবি

বঙ্গে দুর্গাপুজোর ইতিহাস বহু প্রাচীন। সেই ইতিহাসের হাত ধরে বহু চমকপ্রদ কাহিনির ছোঁয়া থেকে যায় আজকের দিনেও। পাঁচদিনের দুর্গাপুজোর শেষদিন অর্থাৎ দশমীতে দেবী বিসর্জনই সাধারণ প্রথা। কিন্তু নিজস্ব ঐতিহ্য আর পরম্পরা মেনে এর ব্যতিক্রমও আছে। যেমন পূর্ব বর্ধমানের গুসকরার চোংদার জমিদার বাড়ি। এখানে দশমীতে ভাসানের আগে অন্য এক আচার হয়ে থাকে। দুর্গামন্দিরের সামনে বসে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান! স্মরণ করা হয় পরিবারের দুই পূর্বপুরুষ – চতুর্ভুজ চোংদার এবং তাঁর স্ত্রী বিদ্যাসুন্দরী দেবীকে। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের বেশিদিনের পুরনো পুজোয় আজও অমলিন সেই প্রথা।

Advertisement

পরিবারের সদস্যরা জানান, এক দশমীতে পুজো চলাকালীন মারা যান পরিবারের পূর্বপুরুষ চতুর্ভুজ চোংদার। তার পর তাঁর স্ত্রী বিদ্যাসুন্দরী দেবী দুর্গামন্দিরে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করেন। সেই ঘটনার স্মৃতিতেই দশমীর দিনে দুর্গামন্দিরে তাঁদের দু’জনের শ্রাদ্ধ দেওয়ার রীতি চালু হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে আজও সেই রীতি অটুট।

জমিদারি নেই, জৌলুসও ফিকে। কিন্তু গুসকরার চোংদার বাড়িতে দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য আর পরম্পরায় এখনও পড়েনি ভাটা।বারান্দার পলেস্তারা খসে পড়েছে। বয়সের ছাপ স্পষ্ট বাড়ির দেওয়ালে, কারুকার্যময় থামে। একসময় যে বাড়ির পুজো দেখতে সাত গ্রামের মানুষ ভিড় করতেন, সেই জমিদারি আজ ইতিহাস। তবু পুজোর চারদিন এলেই পুরনো বাড়িটি যেন ফের ফিরে পায় তার হারানো দিনের কিছুটা ঔজ্জ্বল্য। দুর্গাদালানে জ্বলে প্রদীপ, হয় হোম-যজ্ঞ, নবমীতে কুমারী পুজো। মহাষ্টমীর অঞ্জলিতে ভিড় উপচে পড়ে।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement
গুসকরার চোংদার বাড়ির পুজো ৩৫০ বছরের প্রাচীন, নিজস্ব ছবি

গুসকরার চোংদার বাড়ির পুজোর শুরু ঠিক কবে, তা নিয়ে পরিবারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে পরিবারের সদস্যদের দাবি, প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে এই পুজো। কে প্রথম পুজোর সূচনা করেছিলেন, তা আজ আর জানা যায় না। একাংশের মতে পুজোর সূচনা হয়েছিল চতুর্ভুজ চোংদারের হাত ধরেই। তবে সময়ের সঙ্গে জমিদারি বিলুপ্ত হলেও পুজোর রীতিতে তার ছাপ রয়ে গিয়েছে।

Advertisement

এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব দশমীর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। পরিবারের সদস্যরা জানান, এক দশমীতে পুজো চলাকালীন মারা যান পরিবারের পূর্বপুরুষ চতুর্ভুজ চোংদার। তার পর তাঁর স্ত্রী বিদ্যাসুন্দরী দেবী দুর্গামন্দিরে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করেন। সেই ঘটনার স্মৃতিতেই দশমীর দিনে দুর্গামন্দিরে তাঁদের দু’জনের শ্রাদ্ধ দেওয়ার রীতি চালু হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে আজও সেই রীতি অটুট। চোংদারদের পূর্বপুরুষদের পদবি ছিল চট্টোপাধ্যায়। পরে তাঁরা চোংদার উপাধি পান। একসময় তাঁদের জমিদারি বিস্তৃত ছিল সাতটি গ্রাম জুড়ে। পুজোর দিনগুলিতে সেই সাত গ্রামের বাসিন্দাদের আনাগোনায় জমজমাট হয়ে উঠত জমিদারবাড়ি। ভোগ খাওয়ার পরে পালাগান, যাত্রা – সবমিলিয়ে উৎসব চলত রাত পর্যন্ত।

জমিদারির জৌলুস হারালেও পুজোর রীতিনীতি এখনও অটুট চোংদার পরিবারে, নিজস্ব ছবি

সেই অতীতের সাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল দুর্গাদালান। তার পাশে ভোগঘর। এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে শতাধিক উনুনের ভগ্নাংশ। জমিদারি আমলে সেই উনুনেই তৈরি হত অন্নভোগ। এখন অবশ্য পরিকাঠামো অনেকটা জীর্ণ। কিন্তু পুজোর চার দিন পরিবারের সদস্যদের বড় একটা সময় কাটে ওই দুর্গাদালানে। হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। চোংদার বাড়ির পুজোয় আরও রয়েছে একাধিক বিশেষত্ব। পুজোর ঘট পরিবর্তন করা হয় না। সপ্তমী থেকে দশমী – চারদিনই জ্বলে প্রদীপ। চলে হোম-যজ্ঞ। নবমীতে হয় কুমারী পুজো। এলাকার বাইর থেকেও বহু মানুষ এই বনেদি বাড়ির পুজো দেখতে আসেন। মহাষ্টমীর অঞ্জলিতে ভিড় হয় সবচেয়ে বেশি। খড়খড়ির জানালা দিয়ে ঘেরা দুর্গাদালান, বড় বড় কারুকাজ করা থামের আড়ালে একচালার সাবেকি প্রতিমা – সবমিলিয়ে পুরনো দিনের আবহ এখনও টিকে রয়েছে।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.