Mahatma Gandhi Death Anniversary

শেষের সেদিন… মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডে গুপ্তঘাতকরাই একমাত্র দায়ী ছিল না!

কোনও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডই আদতে একজন ব্যক্তির ‘কাজ’ হতে পারে না। গান্ধী-মৃত্যুদিনে বিশেষ প্রবন্ধ।

Advertisement
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: জানুয়ারি ৩০, ২০২৬, ১৬:১৩

options
link
শেষের সেদিন… মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডে গুপ্তঘাতকরাই একমাত্র দায়ী ছিল না!
মহাত্মা গান্ধী তঁার শেষদিনের পূর্বাভাস দিয়ে গিয়েছিলেন!

মহাত্মা গান্ধীর  হত্যাকাণ্ডে গুপ্তঘাতকরাই একমাত্র দায়ী, না কি তঁার রক্ষাকর্তা ভারতীয় পুলিশ, আমলাতন্ত্র এবং অতিবিশ্বস্ত নেতৃবৃন্দ যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি বলেই এটা ঘটেছিল? দেশভাগের ট্র্যাজেডির জন্য নাথুরাম গডসে তো বটেই, গান্ধীজি স্বয়ং দায়ী করেছেন নিজেকে– যদিও একজন প্রতিশোধকামী, অন্যজন প্রায়শ্চিত্তকারী হিসাবে। ৩০ জানুয়ারি, গান্ধী-মৃত্যুদিনে (Mahatma Gandhi Death Anniversary) বিশেষ প্রবন্ধ। 

Advertisement

অনেকের চোখে, মহাত্মা গান্ধী হিন্দুদের অস্তিত্বের পক্ষে বিপজ্জনক, মুসলমানদের কট্টর সমর্থক। সেই মানসিকতা থেকে, তাদের আদিম সত্তা যেন গান্ধীর রক্তদর্শন করতে চাইছিল। নাথুরাম গডসের কার্যকলাপ সেই ইচ্ছারই প্রতিফলন। গডসের মনে হয়েছিল, লক্ষ লক্ষ ভারতীয় তার পক্ষে। অবশ্য বর্তমান ভারতের দিকে তাকালে মনে হতেই পারে, এ-দেশের জনসাধারণ সম্পর্কে এমন মূল্যায়ন ভুল ছিল তা নয়। তবে কোনও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডই আদতে একজন ব্যক্তির ‘কাজ’ হতে পারে না। বরং সব রাজনৈতিক হত্যাই বলা চলে যৌথ কর্মসূচি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, হত্যাকারী মানসিকভাবে অসুস্থ অবস্থায় একা সব কাজ করেছে এবং তা হয়েছে একেবারে তাৎক্ষণিক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে। কিন্তু আরও গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা করা যায়– বৃহত্তর কোনও শক্তির প্রতিনিধি হয়ে পরিকল্পনামাফিক সংশ্লিষ্ট ব‌্যক্তিটি সেই কাজ করেছে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডে গুপ্তঘাতকরাই একমাত্র দায়ী, না কি তারা ছাড়াও গান্ধীর রক্ষাকর্তা ভারতীয় পুলিশ ও তার গুপ্তচর শাখা, আমলাতন্ত্র এবং গান্ধীর অতিবিশ্বস্ত নেতৃবৃন্দ যথাযথ ভূমিকা পালন করেননি বলেই এটা ঘটেছিল– এ প্রশ্নও ঘুরেফিরে আসে। সেক্ষেত্রে অবশ্য পাশাপাশি প্রশ্ন ওঠে– গান্ধী ও ভারত সরকারে নিযুক্ত তঁার উত্তরসূরিরা হত্যাকারীর সঙ্গে কতটা যুক্ত ছিল? কারও অজানা নয়, দিল্লিতে জীবনের শেষ ক’টি দিন খুব বিমর্ষভাবে কাটাচ্ছিলেন বাপু। তঁার বঁাচার স্পৃহাও যেন কমে যাচ্ছিল। আসন্ন দেশভাগের ধারণা ছিল তঁার কাছে হৃদয়বিদারক। জানিয়েছিলেন, দেশভাগ তঁার পক্ষে সমর্থন করা সম্ভব নয়। বিভাজন-পূর্ব ও পরবর্তী হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় মানুষের হিংসার যে-রূপ তিনি প্রত‌্যক্ষ করেছিলেন, তা তো তঁার বঁাচার ইচ্ছাকে অন্তর্হিত করেইছিল– সেই অনিচ্ছাকে আরও ইন্ধন জোগায় দিল্লিতে কাটানো জীবনের শেষ ক’টি দিন। এই দিনগুলিতে চারপাশ থেকে কানে ভেসে আসত ‘গান্ধী মুর্দাবাদ’ স্লোগান।

Advertisement

President Kovind, PM Modi pay tributes to Mahatma Gandhi on his death anniversary

গডসের মনে হয়েছিল, লক্ষ লক্ষ ভারতীয় তার পক্ষে। অবশ্য বর্তমান ভারতের দিকে তাকালে মনে হতেই পারে, এ-দেশের জনসাধারণ সম্পর্কে এমন মূল্যায়ন ভুল ছিল তা নয়। তবে কোনও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডই আদতে একজন ব্যক্তির ‘কাজ’ হতে পারে না।

সংশ্লিষ্ট সময়পর্বে গান্ধীজি লক্ষ করেন, তঁার প্রার্থনাসভায় লোকজনের উপস্থিতি ও উৎসাহ কমে আসছে। অনুভব করেন, এমনকী, যারা আসছে, তাদের অনেকেই শুধুমাত্র নিয়মরক্ষার খাতিরে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ‘অহিংসা’-র প্রবক্তাও কেমন যেন হিংসাত্মক মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠেন। নইলে মনুবেনকে কেন জানাবেন– অসুস্থতার জন্যই যদি মারা যান, তবে বুঝতে হবে তিনি মেকি ‘মহাত্মা’; আর যদি কেউ যদি আমাকে হত‌্যা করতে আসে আর মৃতু‌্যর সময় যদি তঁার মুখে ‘রামনাম’ থাকে, তবেই তিনি প্রকৃত ‘মহাত্মা’ বলে পরিগণিত হবেন। সব জেনেঝুঝেই যেন তিনি তঁার শেষদিনের পূর্বাভাস দিয়ে গিয়েছিলেন।

সারা জীবন নিজের নিরাপত্তা নিয়ে তোয়াক্কা করেননি ঠিকই, কিন্তু ওই সময় যেন তিনি নিজের শারীরিক নিরাপত্তার ব্যাপারে ভীষণ লাগামছাড়া হয়ে ওঠেন। স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়ছিল। মৃত্যুর কিছু দিন আগে প্রার্থনাসভায় বোমা নিক্ষেপকারীর দলই পরে তঁাকে হত্যা করে। কিন্তু তিনি নিরাপত্তার জন্য পুলিশের সাহায্য নিতে একেবারেই ইচ্ছুক ছিলেন না। জি. ডি. বিড়লাকে বলছিলেন– তঁার নিরাপত্তার জন‌্য পুলিশ মোতায়েন করা হোক বা না-হোক, দুই-ই সমান; কারণ দিনান্তে তঁাকে রক্ষা করবেন শ্রীরামচন্দ্র। এটা কি নিছকই আত্মবিশ্বাস? না কি মহাত্মা স্বয়ং ঘাতকদের কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ করে দিতে চাইছিলেন?

President Kovind, PM Modi pay tribute to Mahatma Gandhi on Twitter

গান্ধীজি লক্ষ করেন, তঁার প্রার্থনাসভায় লোকজনের উপস্থিতি ও উৎসাহ কমে আসছে। অনুভব করেন, এমনকী, যারা আসছে, তাদের অনেকেই শুধুমাত্র নিয়মরক্ষার খাতিরে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ‘অহিংসা’-র প্রবক্তাও কেমন যেন হিংসাত্মক মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠেন।

তিনি যেন এক হতাশ, আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। আর অদ্ভুতভাবে ঠিক সেই পর্বেই তঁার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তার অভাব পরিলক্ষিত হতে শুরু করে। গান্ধী-হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন আগে, গডসের সঙ্গে যুক্ত ষড়যন্ত্রকারী মদনলাল পাওয়া বাপুর প্রার্থনাসভায় বোমা নিক্ষেপ করে গ্রেফতার হন। পাওয়াকে গ্রেফতারের পরও দিল্লি, পুনে, বোম্বাই পুলিশের মধ্যে তেমন সমন্বয় বা যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। ইচ্ছা করে হোক বা অনিচ্ছায়, তদন্তের কাজে পুলিশের যেন কেমন যেন গাছাড়া ভাব দৃশ‌্যমান হয়।
২০ বছর পর কানপুর তদন্ত কমিশন ষড়যন্ত্রকারীদের সম্বন্ধে তাদের তথ্যসূত্র সংগ্রহে পুলিশের কুঁড়েমি ও প্রশাসনের অপদার্থতা বিষয়ে রিপোর্ট দেয়। এটাকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অভ্যাস বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। বরং ভারতের আধুনিক সংস্কৃতির সহজাত ও গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি বিচার করা দরকার। তাদের আচরণের কারণেই প্রশ্ন তো উঠবেই– তারা কি তবে ষড়যন্ত্রকারী দলের সহযোগী ছিল? দিল্লির পুলিশ অফিসাররা পরে দলিলপত্র সরিয়ে দিয়েছে অথবা নষ্ট করেছে। বোম্বে ও পুণে পুলিশ ষড়যন্ত্রকারীদের নামধাম পাওয়ার পরও চুপ করে বসেছিল। অর্থাৎ, প্রত্যেকেই যেন তদানীন্তন গান্ধীবিরোধী পরিস্থিতির অংশ হয়ে গিয়েছিল। আসলে, এই মানুষগুলিই তো বহু দিন গান্ধীর বিরুদ্ধে ব্রিটিশরাজের হয়ে কাজ করে এসেছে এবং গান্ধীর ভিন্ন প্রকৃতির সমাজের চিত্র তাদের উপর কোনওভাবেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেনি।

পাশাপাশি, সেই সময় গান্ধীর নিরাপত্তায় নিযুক্ত হিন্দু পুলিশ মুসলমান-বিদ্বেষের বাতাবরণে প্রভাবিত ছিল। এদের বেশির ভাগ ছিল বিভিন্ন ক্ষত্রিয় উপধারা বা ক্ষত্রিয় ঊর্ধ্বগামী সামাজিক গোষ্ঠীর লোক– এরা গান্ধীকে শুধু ‘মুসলমান ঘেঁষা’-ই নয়, ‘অহিন্দু আক্রমণকারীদের প্রতি বশ্যতা দেখানো হিন্দু’ বলেও গণ্য করত। তাছাড়া, তখন ভারতীয় পুলিশ ধর্মনিরপেক্ষ আইন পালনকারীর ভূমিকা ত্যাগ করে ফেলেছে। উপমহাদেশে পুলিশবাহিনী দাঙ্গার সময়ে সাম্প্রদায়িক আবেগে চলেছিল– বেশিরভাগ পুলিশ নিজের সম্প্রদায়ের পক্ষ নিয়ে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ হত্যায় সহযোগী হয়ে ওঠে। গান্ধীজির রাজনৈতিক উত্তরসূরিরা তঁাকে ‘জাতির জনক’ বলে গণ্য করলেও স্বাধীনতার পর নতুন দায়িত্ব ঘাড়ে এসে পড়ায় সংশ্লিষ্ট নেতাদের বেশিরভাগেরই হাতে সময়
যায় কমে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে অরাজকতা, অস্থিরতা ও নৈরাজ্য পরিস্থিতি তাদের ব্যস্ত রাখে। আর বাপু হয়ে ওঠেন, কেমন যেন কেমন যেন, অপাঙ্‌ক্তেয়।

বোম্বে ও পুণে পুলিশ ষড়যন্ত্রকারীদের নামধাম পাওয়ার পরও চুপ করে বসেছিল। অর্থাৎ, প্রত্যেকেই যেন তদানীন্তন গান্ধীবিরোধী পরিস্থিতির অংশ হয়ে গিয়েছিল।

বল্লভভাই প‌্যাটেল চাইছিলেন মহাত্মার প্রভাব কাটিয়ে নিজের মতো কাজ করতে। হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ঘিরে তৎকালীন রাজনীতির বাস্তবতা মেনে প্যাটেলের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গান্ধীজির মতপার্থক্য দেখা যায়। তারই প্রেক্ষিতে প্যাটেলের সতীর্থ ও প্রত্যক্ষদর্শী আবুল কালাম আজাদ ইঙ্গিত দিয়েছেন– গান্ধীকে রক্ষা করতে ব্যর্থতা কি গান্ধীর প্রাসঙ্গিকতা ও তঁার হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্যাটেলের অসচেতন বিদ্রোহের প্রতিফলন? আজাদের মনে হয়েছে, পরবর্তীকালে প্যাটেল এই অপরাধবোধ ও গ্লানি কাটাতে না পেরে অসুস্থ হন ও মারা যান। সেক্ষেত্রে গান্ধীজি যেন তঁার নিজের মৃত্যুর মধ‌্য দিয়ে ভারতীয়দের অন্তরের নৈতিক সংকটের ছবিটি তুলে ধরতে সফল। আসলে, মহাত্মার জীবনই তো তঁার বাণী। বিশেষত, প্যাটেলের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও গভীর হয়েছিল যেহেতু হত্যাকারীদের অনেকেদের প্রতিই তিনি নরম মনোভাব দেখিয়েছিলেন।

দেশভাগ হয়েও দু’-পক্ষের মধ্যে শত্রুতা কমেনি, তাই অবিভক্ত ভারতের সম্পদের অংশ পাকিস্তানকে দিতে অস্বীকার করে প্যাটেল-নেহরু ভারত। যা দেখে মনে হয়েছিল গান্ধীর শেষ অনশন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তো বটেই, প্যাটেল-নেহরুর নীতির বিরুদ্ধেও ছিল। গান্ধী-হত্যাকাণ্ডকে ইন্ধন জুগিয়েছে ভারত-ভাগ। দেশভাগের ট্র্যাজেডির জন্য গডসে তো বটেই, গান্ধীজি স্বয়ং-ও দায়ী করেছেন নিজেকে– যদিও একজন প্রতিশোধকামী, অন্যজন প্রায়শ্চিত্তকারী রূপে। প্রতিপক্ষ এই দুই মানুষের পরোক্ষ শাহাদাত কামনা প্রশ্ন তুলে দেয়– সংঘাতে কে বিজয়ী আর কে বিজিত? না কি এই ম্যাচ এখনও অমীমাংসিত?

(মতামত নিজস্ব)

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.