Netaji Subhas Chandra Bose

কে সেই মহামানব? ‘গুমনামি সুভাষে’র খোঁজে অশোক ট্যান্ডন

এত বছরেও দেশের মানুষের আবেগে প্রশমন ঘটেনি। নেতাজি ফিরলে দেশের দুঃখ-দুর্দশা দূর হবে, জনগণের তেমনই আশা-ভরসা। দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়ে মানুষ যদি সেই আশায় প্রাণ বাঁধে ক্ষতি কোথায়?

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ২০:৫৬

options
link
কে সেই মহামানব? ‘গুমনামি সুভাষে’র খোঁজে অশোক ট্যান্ডন
'ঈশ্বরে'র অনুসন্ধানে ব্লু-প্রিন্ট রচনা করেন অশোক ট্যান্ডন।

গুমনামি বাবাই  কি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু? এই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে (বর্তমান অযোধ্যা) নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো ‘গুমনামি বাবা’ বা ‘ভগবানজি’কে অনেকে নেতাজিই মনে করেন। তাহলে সত্যিটা আসলে কী? দীর্ঘ গবেষণায় অসংখ্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে, গুমনামি বাবার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বয়ান ঘেঁটে চমকে দেওয়া উত্তর পেয়েছেন দুই লেখক ও গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালে প্রকাশিত হচ্ছে সেই ধারাবিবরণী— ‘মহামানবের চরণতলে’

Advertisement

কে সেই মহামানব?

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে। ‘নয়ে লোগ’ পত্রিকার অফিসে শশব্যস্ততা তুঙ্গে। কিছুদিন আগে, ১৬ সেপ্টেম্বর (১৯৮৫) ফৈজাবাদ শহরের সিভিল লাইনে ‘রামভবন’ প্রাসাদোপম বাড়ির আউট হাউসে এক সন্ন্যাসীর মহাপ্রয়াণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে। তারই মাঝে এক বৃদ্ধা উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে বেড়াচ্ছেন বাড়ির আশেপাশে।

Advertisement

“তোমরা বলো! সরকারকে বলো! আমি সব জানি। এত বছর হয়ে গেল, কেউ খোঁজ নিল না। তিনি কে ছিলেন, আমি সব বলব!”

চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে। দূরে স্তম্ভের মতো স্থির দাঁড়িয়ে বৃদ্ধা সরস্বতী দেবী শুক্লার পুত্র রাজকুমার। পাশে স্ত্রী মাধুরী শুক্লা। বিয়ের পরে যখন সেদিন এসেছিলেন, শাশুড়িমা বলেছিলেন, “বহুরানি, হামারে পরিবার মে এক রাজ হ্যায়। উসে আপনে তক রাখনা।”

খাবারের থালা সাজিয়ে নিয়ে সেদিন প্রথম যান সন্ন্যাসী দর্শনে। অনেক প্রশ্ন ছিল মনে। সত্যিই সে? বাঙালিদের তৃপ্তরসনাই স্বাদে মিষ্ট প্রধান।

মোটা কাপড়ের পর্দার ওপারে খসখস করে লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সন্ন্যাসীর দিনের অধিকাংশ যাপন বইপত্র ও লেখায়। পর্দা সরিয়ে খাবার থালা রাখলেন। পূজার নৈবেদ্যের মতো সাজানো আহার। প্রণতি জানিয়ে ফিরে আসতে গেলে সন্ন্যাসী বললেন, “গুড্ডি! রসোগোল্লা লে আও।” সম্পূর্ণ বাঙালি টানে বাচনভঙ্গিমা। “রসগুল্লো!” সেই দিন আর আজ। পৃথিবীটা উথাল-পাথাল হয়ে গিয়েছে। শাড়ির আঁচল মুখের কাছে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলেন ভগবানজির ‘গুড্ডি’। বারো বছরে সেই রহস্য তিনি অন্তরেই ধারণ করেছেন।

দুই দশক আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে অশোকবাবুর। জমি সংক্রান্ত এক মামলায় জর্জরিত হয়ে উকিল সত্যনারায়ণ সিং- এর শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

“ট্যান্ডনজি, আজ সন্ধ্যায় ‘দিল্লি দরওয়াজা’ সংবাদপত্রের এক সাংবাদিক বেশ কিছু লোক নিয়ে এখানে এসেছিলেন। বলেছিলেন, রামভবনে কোনও এক সন্ন্যাসী থাকতেন। মৃতদেহ তিনদিন ধরে রয়েছে, আজ সৎকারের ব্যবস্থা হবে।”

‘নয়ে লোগ’ পত্রিকার স্টাফ শিবরাম শুক্লা প্রায় এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলেন। ১৮ সেপ্টেম্বর। দিনটা অন্য সাধারণ দিনের মতো নয়। ফৈজাবাদের আকাশে-বাতাসে চাপা গুঞ্জন। এই শহরে অজ্ঞাতবাসী ছিলেন সুভাষচন্দ্র? উদ্বিগ্ন চাহনিতে প্রশ্ন করলেন অশোক ট্যান্ডন। সাংবাদিকতার ধর্মই হল কোনও সম্ভাবনাকে অস্বীকার না করা।

“শোনা কথার ভিত্তিতেই প্রাথমিক তদন্ত সারতে হবে। শুক্লাজি, আপনাকে যতদূর চিনি– খবর পেয়ে আমার অপেক্ষায় নিশ্চয়ই আপনি বসে নেই। আপনার সিক্সথ সেন্স কী বলে?” ব্যাগ থেকে নোটপ্যাড, পেন টেবিলে রাখতে রাখতেই বললেন অশোক ট্যান্ডন।

“খবরে সত্যতা রয়েছে!” ফিসফিস করে বলে উঠলেন শিবরাম। শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত অনুভব করলেন অশোকবাবু। ঠিক আতঙ্ক বা উদ্বেগ নয়, হতাশার!

দুই দশক আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে অশোকবাবুর। জমি সংক্রান্ত এক মামলায় জর্জরিত হয়ে উকিল সত্যনারায়ণ সিংয়ের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। লব্ধপ্রতিষ্ঠ সত্যনারায়ণবাবুর ভাইপো সাংবাল সিং তখন সে তল্লাটের অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জজ। দু’জনেই যেতেন রহস্যময় সেই সন্ন্যাসীর সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে। অযোধ্যার পথে-প্রান্তে সেদিনও গুজব শোনা যেত, সেই সন্ন্যাসীই সুভাষচন্দ্র। সত্যবাবু সেই প্রসঙ্গে এক সময় স্পষ্টভাবে সন্ন্যাসীকে পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। সন্ন্যাসীর পরিচয় কি? যেমনটা শোনা যায়, সত্যিই তিনিই সুভাষচন্দ্র? সেই কারণেই পর্দার অবতারণা? এমন সব প্রশ্ন থেকে মুক্তি পেতেই সুভাষচন্দ্র বেছে নিয়েছিলেন সন্ন্যাস জীবন।

হন্তদন্ত হয়ে সত্যবাবু একদিন ফিরে এলেন চেম্বারে। ক্লায়েন্ট অশোক টন্ডন বসে। ১৯৭৮ সালের কথা। সবকিছু বললেন— “এ কোনও যেমন-তেমন ব্যক্তি নন অশোকজি, সুভাষচন্দ্র! সর্বদা পর্দার আড়ালে থাকেন, আড়াল রেখেই নির্ধারিত সময়ের জন্য অনুগামীদের সঙ্গে কথা বলেন। রাতবিরেতে দিল্লি থেকে মান্যগণ্য ব্যক্তিরা আসেন। ওনার সংস্পর্শীদের কাছে আমি কলকাতার কথা শুনেছি!”

সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রকে অনুগামীরা ঈশ্বর মনে করতেন। দেশ-কাল-ঘটনার পরম্পরা অতিক্রম করে রহস্যময় অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থেকে কখনও-সখনও খসে পড়ত মুক্তাভরণ।

সত্যবাবুর ধারণা ছিল ক্লায়েন্ট অশোকজি হয়তো সেসব কথা অমূলক মনে করে উড়িয়ে দেবেন। কিন্তু তেমনটা হলো না। অশোক ট্যান্ডন তখন ‘সরযূমেল’ পত্রিকার সাংবাদিক। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি পূর্বপরিচিত ডা. বীরেন রাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। “ডাক্তারবাবু, আমি খবর পেয়েছি আপনি অজ্ঞাতবাসী অযোধ্যার সেই সন্ন্যাসীর কাছে নিয়মিত যান। সত্যি কথা বলুন, তিনিই কি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু?”

ডাক্তারবাবু এমন সরাসরি প্রশ্নে বেশ বিব্রত বোধ করলেন। মন্ত্রগুপ্তির শপথ ভঙ্গ করার পাত্র তিনি নন। “তিনি আমার গুরুদেব। এ বিষয়ে আমার কথা বলার অনুমতি নেই।”

‘কারেন্ট’ পত্রিকার সাংবাদিক বীরেন্দ্র মিশ্রা সন্ন্যাসীকে বারংবার বিব্রত করে চলেছিলেন প্রকাশ্যে আসার জন্য। তাকে নিরস্ত করতে ডাক্তারবাবু অশোকজির সাহায্য চাইলে তিনি তাতে অসম্মত হলেন। সাংবাদিকের ধর্মই অনুসন্ধান। সেই ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া সমীচীন নয়। কিন্তু অশোক ট্যান্ডন এই বিষয়ে তখন আর অগ্রসর হননি। কত জায়গাতেই নেতাজি সুভাষচন্দ্রের পুনরাবির্ভাবের কথা শোনা যায়। এত বছরেও দেশের মানুষের আবেগে প্রশমন ঘটেনি। নেতাজি ফিরলে দেশের দুঃখ-দুর্দশা দূর হবে, জনগণের তেমনই আশা-ভরসা। দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়ে মানুষ যদি সেই আশায় প্রাণ বাঁধে ক্ষতি কোথায়? কিন্তু এক্ষেত্রে বিষয়টা এভাবে সত্য প্রতিপন্ন হতে পারে অশোকজি ভাবতেও পারেননি!

“অশোকজি, কাঁহা খো গয়ে?” শিবরাম শুক্লার ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলেন। “কিছু না, তখন যদি একটু গুরুত্ব দিতাম হয়তো তাঁর দেখা পেতাম!” অশোক ট্যান্ডনের আফসোস ক্ষণস্থায়ী। কর্মযোগীর বিলাপ ক্ষণকাল।

“আমি দুই-তিন পাতা লিখেছিলাম খবরটা, কিন্তু আপনার পছন্দ হবে না ভেবে… আপনি যুক্তিবাদী মানুষ, সুভাষচন্দ্রের মতো জাতীয় নেতার এমন পরিণতি আপনি যুক্তিতে…।”

“লিখুন শুক্লাজি! যা সত্যি তা লিখতে ভয় নেই!”

সেই মুহূর্ত থেকেই অশোক ট্যান্ডনের অনুসন্ধান যাত্রার সূত্রপাত। এ যেন অগস্ত্য মুনির চরৈবেতি, যার শুরু আছে, নেই শেষ। সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রকে অনুগামীরা ঈশ্বর মনে করতেন। দেশ-কাল-ঘটনার পরম্পরা অতিক্রম করে রহস্যময় অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থেকে কখনও-সখনও খসে পড়ত মুক্তাভরণ। আন্তর্জাতিক চরিত্ররা রক্তমাংসে জীবন্ত হয়ে উঠতেন ঈশ্বর ভগবানজির অজ্ঞাত জীবন বর্ণনায়। মৃত্যুকে অতিক্রম করে দুর্গমপথে সুভাষচন্দ্রের পদচারণা না-লেখা ইতিহাস!

এমন সাধনা কোনও নিবেদিতপ্রাণ ভক্তই করতে পারেন ইষ্টদেবতার শরণে। এরই মধ্যে সময়ে সময়ে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের অনুগামীদের তালিকা গঠন এবং একেকজন ব্যক্তির সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা চলতে থাকে।

অনুসন্ধানের জন্য তাৎক্ষণিক প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে একটা ব্লু-প্রিন্ট রচনা করলেন অশোক ট্যান্ডন। সহকারী চন্দ্রেশ এবং বিকলকে বললেন, “জীবনে এমন সুযোগ পুনর্বার আসবে না। ভগবানজির অনুগামী শ্রীকৃষ্ণ গোপাল শ্রীবাস্তব, সরস্বতী দেবী শুক্লা— এদের কথা রেকর্ড করা প্রয়োজন।” তারা এমন অজানা ইতিহাসের সন্ধান পেতে চলেছে যা আগামী দিনে সমগ্র ভারত অশ্রুসিক্ত নয়নে শুনতে আসবে!

বাড়িতেই অফিস ঘরে বসে বইপত্র ঘাঁটছিলেন অশোকবাবু। আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে বেশ বুঝতে পারছিলেন, সন্ন্যাসীর ব্যবহৃত দ্রব্যাদির স্তূপে যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের চুপকথারা বন্ধ পড়ে রয়েছে, সেই রহস্যের কুল কিনারা পেতে হলে নিবিষ্ট মনে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ইতিহাস জানা প্রয়োজন। না হলে প্রত্যক্ষ প্রমাণ চোখের সামনে পড়ে থাকবে কিন্তু অনুসন্ধান করা সম্ভব হবে না। অনেকটা ক্রিপ্টোগ্রাফিতে পাবলিক কি-র মতো, সমস্ত কিছু জনসমক্ষে কিন্তু মর্মার্থ উদ্ধারের জন্য অধিগত বিদ্যার প্রয়োজন।

‘ফ্রম মাই বোনস’, ‘নেতাজি অ্যান্ড হিস্ আই.এন.এ.’, ‘আনটু হিম আ উইটনেস’ প্রভৃতি সুভাষচন্দ্রের সমকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সহযোদ্ধাদের গ্রন্থের পাশাপাশি পড়তে থাকলেন ‘সুভাষ ঘরে ফেরে নাই’, ‘আমি সুভাষ বলছি’, ‘অগ্নিযুগ’ প্রভৃতি গ্রন্থ। বাংলা পাঠের অভ্যাস নেই, পরিচিতজনের সাহায্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশের সংক্ষিপ্তসার নিজের মতো হিন্দিতে অনুবাদ করে ফাইলবন্দি করতে থাকেন। সবকিছুই অত্যন্ত দ্রুত। এমন সাধনা কোনও নিবেদিতপ্রাণ ভক্তই করতে পারেন ইষ্টদেবতার শরণে। এরই মধ্যে সময়ে সময়ে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের অনুগামীদের তালিকা গঠন এবং একেকজন ব্যক্তির সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা চলতে থাকে।

ভগ্নীপতি শ্রী বিশ্বম্ভরনাথ আরোড়া ফটোগ্রাফির নৈপুণ্যকে কাজে লাগাতে ভোলেননি।

“তোমরা ঠিক কি করতে চাইছো?” কিছু উদ্বেগ, কিছু চঞ্চলতা ছিল বোন বিনীতা আরোড়ার গলায়। অশোক ট্যান্ডন স্বভাব-তৎপরতায় তা গ্রাহ্যই করলেন না। তাঁর মনন-চিন্তন জুড়ে তখন কেবলই দেশনায়ক। দেশ যাঁকে কেবলমাত্র মনে রেখেছে বইয়ের পাতায়, পাথরের মূর্তিতে আর ২৩ জানুয়ারির শঙ্খনাদে।

যিনি সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপসে সম্মত নন, ভারতের মাটিতে তাঁর অবস্থান জনগণের মনস্তত্ত্বে বিদ্রোহের সঞ্চার করতে পারে।

ফৈজাবাদের রামভবনের বাইরে রাজনীতিজ্ঞদের ভিড়। জনতা আন্দোলনের পর থেকেই উত্তরপ্রদেশ জুড়ে সমাজবাদীদের রমরমা। ইন্দিরা গান্ধীর ‘তানাশাহী’ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এমন পড়ে পাওয়া চৌদ্দআনা সুযোগ তারা ছাড়বে কেমন করে?

“সন্ন্যাসীই সুভাষচন্দ্র? জবাব দাও প্রশাসন!” রীতিমতো মঞ্চ বেঁধে ধরনায় বসে পড়েছিলেন প্রাক্তন বিধায়ক জয়শংকর পাণ্ডে। দলীয় রাজনীতিতে আসন না টলে তাই যুবনেতা রামদুলারে যাদবও আদা-জল খেয়ে লেগে পড়েছিলেন। সাংবাদিক অশোক ট্যান্ডনের নেতৃত্বে অনুসন্ধানকার্য ঘোষণা হতেই ‘নয়ে লোগ’ পত্রিকার প্রথম সংবাদ তিনি পাঠালেন শহরের বাদী-বিবাদী সমস্ত রাজনীতিবিদের কাছেই। ‘মাথার উপর নীল মৃত্যু উজাগর’– অশোকজির তখন তেমনই অবস্থা। নেতাজির সত্য প্রকাশ্যে আনতে জীবনপণ সংগ্রামে তিনি প্রস্তুত। কিন্তু সরকার? ক্ষমতা হস্তান্তরের পরবর্তী ভারতবর্ষের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক আজও অনেক ক্ষেত্রেই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। ভারতের ইন্ট্যালিজেন্স ব্যবস্থার উপর ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণের অভীপ্সা নেশার মতো। আসক্তি কখনওই পিছু ছাড়ে না।

এমন দিনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র, যিনি সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপসে সম্মত নন, ভারতের মাটিতে তাঁর অবস্থান জনগণের মনস্তত্ত্বে বিদ্রোহের সঞ্চার করতে পারে। এই ভয়ে ব্রিটেন আতঙ্কিত। জীবিত নেতা অপেক্ষা ‘মৃত’ নেতাজি, সে অধিক বিধ্বংসী। ১৯৪৫ সালের আজাদ হিন্দ বিপ্লবেই তার আঁচ পেয়েছিলেন মাউন্টব্যাটেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভ করেও ভারতের উপর কর্তৃত্ব ত্যাগ করতে হয়েছিল। পুরনো সেই ক্ষত ব্রিটেন ভোলেনি। এত বছরের ঔপনিবেশিক শাসনকালে কেবলমাত্র সুভাষচন্দ্রই তাদের এশিয়ার মাটি থেকে উৎখাত করতে পেরেছিলেন। স্বাধীনতা এসেছে, হোক সে খণ্ডিত, তবু সে যে আমাদেরই দেশের।

ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। ভগবানজির মধ্যে সেই আতঙ্কের মেঘ দেখেছিলেন তৎকালীন ভারত সরকারও। তাই তাঁর তথাকথিত মৃত্যুসংবাদ প্রসঙ্গে আশ্চর্য্যভাবে থেকেছে মৌন। আজও!

আউটহাউসের পিছনে প্রসারিত মাঠ এবং জঙ্গল। সেই দিক দিয়ে এক গোপন পথ উন্মুক্ত হয় সামরিক ক্যান্টনমেন্টের দিকে।

রামভবনের আউটহাউস। তখন নিঝুম রাত নেমে এসেছে। সিভিল লাইনের সেই তল্লাটে জনবিরলতা। মাঝেমধ্যে দ্রুত ছুটে যায় গাড়ি। অভিজাত অঞ্চল। রামজন্মভূমি অযোধ্যায় নিঃশব্দে অজ্ঞাতবাসে আরেক ‘রামচন্দ্র’। রাজনীতি থেকে শতহস্ত দূরে জীবনের অর্ধেকটাই অতিবাহিত করলেন আধ্যাত্মিক চিন্তায়। সন্ন্যাস কি কেবল বস্ত্র পরিধান, আহার্য এবং জীবনপটেই নির্ধারিত? সন্ন্যাস মনস্তত্ত্বের এক পর্যায়। ঘরে পরিপাটি করে সাজানো গ্রন্থাদি, ছোট ছোট লোহার ট্রাঙ্কে প্রিয়জনদের পাঠানো চিঠি, কুশল বিনিময়ের সঙ্গে রয়েছে প্রত্যাবর্তনের আর্জি। কিন্তু ঈশ্বরের সন্ন্যাস তাতে এতটুকু টলেনি। ছোটবেলা থেকে এমনই জীবন তিনি চেয়েছিলেন। তরুণ বয়সেই স্বামী বিবেকানন্দের বাণীসম্ভার জীবনে এনেছিল গভীর ব্যঞ্জনা। চড়াই-উতরাই জীবনপথে চলতে চলতেই এসেছিল রাজনীতি, কিন্তু হৃদয় জুড়ে ছিল আধ্যাত্মিক চিন্তা।

আউটহাউসের পিছনে প্রসারিত মাঠ এবং জঙ্গল। সেই দিক দিয়ে এক গোপন পথ উন্মুক্ত হয় সামরিক ক্যান্টনমেন্টের দিকে। জঙ্গল থেকে ক্রমে রাত্রিজ্ঞাপক ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আখতারী গান হয়ে বেজে চলেছে। সেই সুরে ঘরের আবহ আরও মায়াবী, মোহময়। পর্দার ওপারে আজ অনুগামীদের ভিড় নেই। সাংকেতিক ভাষায় পাঠানো চিরকুটে কাছের মানুষদের জানিয়েছেন, “এখানে আর কেউ এসো না, প্রয়োজন মতো দেখা হবে অন্য কোনখানে।”

অশ্রুসিক্ত নয়নে কমান্ডারের সেই বার্তা গ্রহণ করেছেন ডাক্তার পবিত্র মোহন রায়, মুকুল, সুনীল দাস, ব্রজ নন্দন, দুলাল নন্দীরা। কলকাতা অপেক্ষায় সেই হৃদয়বিদারক বিদায় লগ্নের।

ঈশ্বরকে স্বদেহে দেখার বড় বিড়ম্বনা, তাঁকে সামান্য মানব রূপে ভ্রম। সন্ন্যাসীর জীবন ত্যাগ করে সুভাষচন্দ্র চলেছেন এক অদৃশ্য লোকের সন্ধানে!

রাত্রি সাড়ে ন’টা। বিদায়ক্ষণ আসন্ন। সাধনার এক এমন স্তরে মহামানব উপনীত হয়েছেন, সেখানে নির্বিকল্প সমাধির ঘোর বাস্তবতা। যোদ্ধা সন্ন্যাসী খোলস ছেড়ে পরমাত্মার সন্ধানী। স্বামী বিবেকানন্দ যে আনুভূমিক ও উল্লম্ব তলের মিলনে লোকান্তরের সীমাকে বিলীন হতে বলেছিলেন, সাধক শ্রীঅরবিন্দের পূর্ণযোগ তা বাস্তবে সম্ভব করে দেখিয়েছিলেন। পণ্ডিচেরীর পুণ্যাত্মারা তার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা রেখে গিয়েছেন ধর্মতত্ত্বের আধারে। আর সুভাষচন্দ্র? তিনি কখনওই নেতা হতে চাননি। গুরু হতেও চাননি। জীবনভর চেয়েছিলেন উপলব্ধি, আধ্যাত্মিকতার উপলব্ধি। পেলেন। অন্তর্হিত হলেন সাধকেরই মনস্তত্ত্বে ভর করে।

“মা জগদম্বে! আলোটা নিভিয়ে দাও, সময় ঘনিয়ে এলো।”

গ্রাম্য জীবনে অভ্যস্ত সরস্বতী দেবী। ধর্মতত্ত্বের গভীরতর স্তর তাঁর অধিগত নয়। তবে এমন কিছু ঘটতে চলেছে যা আগে কখনও ঘটেনি। ঈশ্বরকে স্বদেহে দেখার বড় বিড়ম্বনা, তাঁকে সামান্য মানব রূপে ভ্রম। সন্ন্যাসীর জীবন ত্যাগ করে সুভাষচন্দ্র চলেছেন এক অদৃশ্য লোকের সন্ধানে!

রাত্রি ন’টা পঁয়তাল্লিশ। টিমটিমে লণ্ঠনের আলো ঠিকরে পড়ছে পিঁড়িতে রাখা শ্রীমদ্ভাগবত গীতার উপরে। গোরক্ষপুর প্রেস থেকে প্রকাশিত গ্রন্থের খয়েরি মলাটে কলম ধরলেন দেশনায়ক। সাংকেতিক ভাষায় লিখলেন কিছু নম্বর—’৬… ৮…১৬’। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস। রঙ্গমঞ্চে রচিত হবে এক নতুন নাটক, মহামৃত্যুর সন্ধানে!

(পরবর্তী পর্ব ২০ সেপ্টেম্বর, রবিবার)

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.