গুমনামি বাবাই কি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু? এই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে (বর্তমান অযোধ্যা) নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো ‘গুমনামি বাবা’ বা ‘ভগবানজি’কে অনেকে নেতাজিই মনে করেন। তাহলে সত্যিটা আসলে কী? দীর্ঘ গবেষণায় অসংখ্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে, গুমনামি বাবার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বয়ান ঘেঁটে চমকে দেওয়া উত্তর পেয়েছেন দুই লেখক ও গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালে প্রকাশিত হচ্ছে সেই ধারাবিবরণী— ‘মহামানবের চরণতলে’।
ছোটবেলায় অঙ্ককে আমি ভীষণ ভয় পেতাম। সংখ্যাগুলো আমার কাছে কখনও বন্ধুর মতো ছিল না। খাতার পাতায় একের পর এক অঙ্কের হিসাব, অজানা রাশির সন্ধান, জটিল সমীকরণ— সব মিলিয়ে মনে হত, এ যেন এক দুর্ভেদ্য গোলকধাঁধা। যতই শিক্ষক বোঝাতেন, ততই আমার ভেতরে একটা অদৃশ্য আতঙ্ক জমে উঠত। অথচ ইতিহাসের বই খুললেই সেই ভয় কোথায় যেন মিলিয়ে যেত। রাজা-বাদশা, যুদ্ধ, বিপ্লব, বন্দিত্ব, আত্মত্যাগ আর মানুষের অদম্য স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আমাকে টেনে নিয়ে যেত অন্য এক জগতে।
অঙ্কের খাতা থেকে পালিয়ে আমি আশ্রয় নিতাম ইতিহাসের পাতায়। সেই ইতিহাসের বই আঁকড়ে ধরেই ধীরে ধীরে নিজের একটা আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলাম। পাড়ার লোকজন, আত্মীয়স্বজন, পরিচিতদের মুখে তখন প্রায়ই শুনতে হত, ‘বড় হয়ে কী হবি? অঙ্ক না করলে কি জীবনে কিছু করা যায়?’ প্রশ্নটা সহজ ছিল। উত্তরটা আমার কাছে ছিল অন্ধকারে ঢাকা।
বইয়ের পাতায় সুভাষচন্দ্র তখন আমার কাছে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন। তিনি এক রহস্যময় উপস্থিতি।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কী বলব, বুঝতে পারতাম না। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনও সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না, ছিল শুধু বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত নেশা। ক্লাস সিক্স-সেভেনে উঠতেই হাতে আসতে শুরু করল নানা ধরনের সাহিত্যগ্রন্থ। গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, বিপ্লবীদের স্মৃতিকথা— বইয়ের জগৎ ক্রমশ আমার চারপাশের বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠল। কেউ যখন জানতে চাইত, ‘বড় হয়ে কী হবি?’
আমি বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতাম, ‘আমি লেখক হব।’
উত্তরটা শুনে অনেকেই চুপ করে যেতেন। কেউ হয়তো মুচকি হাসতেন, কেউ আবার মাথা নেড়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতেন। কিন্তু আমার কাছে সেই উত্তর নিছক শৈশবের কল্পনা ছিল না। বই পড়তে পড়তেই লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। আর সেই স্বপ্নের ভেতর দিয়েই ইতিহাস ও সাহিত্যের প্রতি আমার ভালোবাসা ক্রমশ গভীর হয়ে উঠেছিল। সেই সময় হাতে এসেছিল শৈলেশ দে-র আমি সুভাষ বলছি। আজও মনে হয়, বইটি আমার কৈশোরের মানসিক জগতে এক বিশেষ দরজা খুলে দিয়েছিল। ইতিহাসের উচ্চাঙ্গ গবেষণায় বইটির স্থান নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, কেউ হয়তো তাকে কঠোর ঐতিহাসিক দলিলের মানদণ্ডে বিচার করবেন। কিন্তু আমার মতো অসংখ্য কিশোরের মনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি যে আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে এই ধরনের বইয়ের ভূমিকা অস্বীকার করা কঠিন।
বইয়ের পাতায় সুভাষচন্দ্র তখন আমার কাছে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন। তিনি এক রহস্যময় উপস্থিতি। এমন একজন মানুষ, যাঁর জীবনকে যতই জানতে চাই, ততই নতুন প্রশ্ন এসে সামনে দাঁড়ায়। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই একদিন আমার নিজের পরিবারের ইতিহাসের দরজা খুলে গেল। আমার জ্যাঠামশাই বিমল সেনগুপ্ত। সম্পর্কের দিক থেকে তিনি আমার বাবার পিসতুতো ভাই। কিন্তু আমাদের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন বলে ছোটবেলা থেকেই তাঁকে জ্যাঠামশাই বলেই জেনেছি। বাবার থেকে বয়সে অনেক বড়। জন্ম ১৯২৭ সালে, ময়মনসিংহে। যৌবনে বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সংসারধর্ম গ্রহণ করেননি। আমাদের পরিবারের সঙ্গেই থেকে গিয়েছিলেন।
একদিন জ্যাঠামশাইয়ের মুখেই প্রথম শুনলাম মহারাজা ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর কথা।
বাড়িতে রাজনৈতিক আলোচনা হলে তিনি ছিলেন এক আলাদা চরিত্র। পরিবারের অন্য অনেকেই পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। বিপ্লবী আন্দোলনের নানা স্মৃতি, মতাদর্শগত বিতর্ক, রাজনৈতিক সংঘাত এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন— এসব আমাদের বাড়ির কথাবার্তার অঙ্গ ছিল। কিন্তু জ্যাঠামশাই ছিলেন একেবারে অন্য ধারার মানুষ। তিনি ছিলেন খাঁটি কংগ্রেসি। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা এবং জীবনের গল্প পরিবারের অন্যদের মতাদর্শের সঙ্গে কখনও মিশেছে, কখনও সংঘর্ষে জড়িয়েছে।
ছোটবেলায় আমরা বুঝতাম না, এই মতাদর্শের পার্থক্যের গভীরতা কতটা। কিন্তু গল্প শুনতে শুনতে, বড়দের কথোপকথন শুনতে শুনতে, পুরনো বইয়ের পাতা উলটাতে উলটাতে বুঝতে শিখেছিলাম— স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস কোনও একরৈখিক গল্প নয়। তার মধ্যে রয়েছে বহু মত, বহু পথ, বহু ত্যাগ এবং অসংখ্য অসমাপ্ত প্রশ্ন। একদিন জ্যাঠামশাইয়ের মুখেই প্রথম শুনলাম মহারাজা ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর কথা। ‘জেঠু কালীচরণ মাঝি! এই ছদ্মনামে একজন বিপ্লবী ছিল ময়মনসিংহে। তুমি জানো?’ আমি যেন চমকে উঠেছিলাম। ‘আরে মহারাজ! আমি তো দাদু বলতাম। মহারাজা ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী! কেন জানব না?’
সেই আলোড়নের গভীরে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল একটি প্রশ্ন। নেতাজি উপেক্ষিত কেন? প্রশ্নটি তখনও পুরোপুরি গুছিয়ে বলতে পারতাম না।
সেই কথোপকথন আজও আমার স্মৃতিতে স্পষ্ট। মনে হয়েছিল, ইতিহাসের যে চরিত্রগুলো এতদিন বইয়ের পাতায় পড়েছি, তারা যেন হঠাৎ আমাদের ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা আর দূরের কোনও কিংবদন্তি নয়। তারা আমাদের পারিবারিক স্মৃতি, আমাদের আত্মীয়দের জানা কথা, আমাদের বাড়ির আলমারিতে জমে থাকা বইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
জ্যাঠামশাইয়ের কাছ থেকেই জানতে পারলাম দুটি বইয়ের কথা। ত্রৈলোক্য চক্রবর্তীর ‘জেলে ত্রিশ বছর’ এবং ভূপেন্দ্র কিশোর রক্ষিত রায়ের ‘সবার অলক্ষ্যে’।
বই দুটি হাতে পেয়ে আমি যেন আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলতে চাইতাম সবকিছু। জেল, বিপ্লবী সংগঠন, আত্মগোপন, পুলিশের নজরদারি, বিশ্বাসঘাতকতা, আদর্শের জন্য আত্মত্যাগ—প্রতিটি অধ্যায় আমার কিশোর মনে এক নতুন আলোড়ন তুলেছিল।
সেই আলোড়নের গভীরে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল একটি প্রশ্ন। নেতাজি উপেক্ষিত কেন? প্রশ্নটি তখনও পুরোপুরি গুছিয়ে বলতে পারতাম না। কিন্তু একটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। যে মানুষটি ভারতের স্বাধীনতার জন্য এত বড় সংগ্রাম করেছিলেন, যাঁর নাম বিপ্লবী, সৈনিক, সাধারণ মানুষ— অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে, তাঁর ইতিহাস কেন এত বিতর্ক, নীরবতা এবং অমীমাংসিত রহস্যে ঘেরা?
আমার কিশোর মন তখন উত্তর খুঁজতে শুরু করেছে। পরিবারের রাজনৈতিক পরিবেশ আমার চিন্তাকে আরও জটিল করে তুলেছিল। একদিকে মার্কসবাদী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত আত্মীয়দের আলোচনা, অন্যদিকে জ্যাঠামশাইয়ের কংগ্রেসি রাজনৈতিক বিশ্বাস। স্বাধীনতা, সমাজতন্ত্র, বিপ্লব, রাষ্ট্র, শ্রেণি এবং মানুষের মুক্তি— এসব নিয়ে নানা মতামত শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। কোনও একটি মতাদর্শকে সহজে গ্রহণ করতে পারিনি। মার্কসবাদকে পুরোপুরি নিজের করে নিতে পারিনি, আবার সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন থেকেও নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারিনি। এই দ্বন্দ্ব আমার মনে দীর্ঘদিন ধরে চলেছে।
আমার অনুসন্ধান ছিল এক অদৃশ্য মানচিত্রের মতো। কোথায় যাব, কোন বই খুঁজব, কোন তথ্য সত্য, কোনটি অতিরঞ্জিত—সবকিছু তখনও স্পষ্ট নয়।
কীভাবে সম্ভব এমন একটি রাজনৈতিক অবস্থান, যেখানে মানুষের সামাজিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থাকবে, কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট মতাদর্শের কঠোর কাঠামো আমাকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করবে না? উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমার সামনে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠলেন সুভাষচন্দ্র বসু। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ, সংগঠন নির্মাণের ক্ষমতা এবং স্বাধীনতার জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে সংগ্রাম—সবকিছু মিলিয়ে তিনি আমার কাছে হয়ে উঠলেন এক অনন্য অনুসন্ধানের বিষয়।
তখন কলকাতার বিভিন্ন লাইব্রেরিতে ছুটে বেড়াতাম। এক লাইব্রেরি থেকে আরেক লাইব্রেরি। পুরনো বইয়ের ক্যাটালগ ঘাঁটতাম। বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে জানতে চাইতাম, ‘নেতাজিকে নিয়ে পুরনো কোনও বই আছে?’ কখনও বই মিলত, কখনও মিলত না। কোনও কোনও বইয়ের নাম শুনে মনে হত, এই বইটিই হয়তো আমার বহুদিনের প্রশ্নের উত্তর দেবে। আবার পড়া শেষ হলে দেখা যেত, নতুন দশটি প্রশ্ন নিয়ে বইটি বন্ধ করেছি।
আমার অনুসন্ধান ছিল এক অদৃশ্য মানচিত্রের মতো। কোথায় যাব, কোন বই খুঁজব, কোন তথ্য সত্য, কোনটি অতিরঞ্জিত—সবকিছু তখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু খোঁজ থামেনি। এমনই এক সময় হাতে এল অনিল রায়ের নেতাজির জীবনবাদ। বইটির মলাট ও পাতাগুলোতে সময়ের ছাপ ছিল। পুরনো কাগজের গন্ধ, লালচে হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা, বহুদিনের ব্যবহারের চিহ্ন— সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, আমি যেন কেবল একটি বই নয়, অতীতের একটি দরজা হাতে তুলে নিয়েছি।
বইয়ের শেষে লেখক পরিচিতি পড়তে গিয়ে থমকে গেলাম। অনিল রায়—বিপ্লবী সংঘ দলের প্রতিষ্ঠাতা। সবার অলক্ষ্যে বইয়ে তাঁর নাম পড়েছিলাম। কিন্তু এবার তাঁর নিজের লেখা বই হাতে নিয়ে সেই পরিচিত নামটি যেন নতুন অর্থ পেল। বইয়ের নিচে প্রকাশকের নাম লেখা— জয়শ্রী প্রকাশন, টেমার লেন। আমি স্থির হয়ে বসে রইলাম। জয়শ্রী প্রকাশন! বিপ্লবীদের লেখা, তাঁদের স্মৃতি, তাঁদের রাজনৈতিক চিন্তা ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রকাশনা সংস্থা। এত বছর পরে কি প্রতিষ্ঠানটি এখনও টিকে আছে? সেই মানুষগুলো কি এখনও বেঁচে আছেন? সেই পুরনো বইয়ের জগৎ কি এখনও কোথাও নিঃশব্দে শ্বাস নিচ্ছে?
মনে একের পর এক প্রশ্ন জন্ম নিতে লাগল। কোনও নিশ্চিত তথ্য হাতে ছিল না। তবু কৌতূহল আমাকে টেনে নিয়ে গেল টেমার লেনের দিকে।
মনে একের পর এক প্রশ্ন জন্ম নিতে লাগল। কোনও নিশ্চিত তথ্য হাতে ছিল না। তবু কৌতূহল আমাকে টেনে নিয়ে গেল টেমার লেনের দিকে। কলকাতার পুরনো গলিপথ পেরিয়ে যখন সেই ছোট্ট ঘরটির সামনে এসে দাঁড়ালাম, তখন আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনও সাধারণ প্রকাশনা অফিসের সামনে নয়, ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছি। উপরে মরচে ধরা বোর্ড। তাতে লেখা—জাতীয় সাহিত্য প্রকাশন। জায়গাটা খুব বড় নয়। কোনও জাঁকজমক নেই। নেই আধুনিক অফিসের সাজসজ্জা। অথচ আমার কাছে সেই ছোট্ট ঘরটির গুরুত্ব তখন কলকাতার যে কোনও বড় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি।
দরজার ভেতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল। ‘কী প্রয়োজন?’সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বৃদ্ধ। বিজয় নাগ। আমার মনে নেই, প্রথম কথোপকথনে আমি ঠিক কী বলেছিলাম। কিন্তু মনে আছে, সেই গম্ভীর স্বরের আড়ালে খুব দ্রুত এক গভীর স্নেহের স্পর্শ অনুভব করেছিলাম। তিনি আমাকে জয়শ্রীর সদস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। শুধু সদস্য করেছিলেন তা নয়, বই পড়ার সুযোগ দিয়েছিলেন।
যে বইগুলো তখন আর ছাপা হত না, সেগুলোর অনেকগুলিই জেরক্স করে দিয়েছেন। এমন বই, যেগুলোর সন্ধানে আমি কলকাতার নানা লাইব্রেরিতে ঘুরেছি, সেগুলোই একদিন টেমার লেনের সেই ছোট্ট ঘরে আমার হাতে এসে পৌঁছতে লাগল। আমি যেন নিজের অজান্তেই এক গুপ্ত ভাণ্ডারের সন্ধান পেয়ে গিয়েছিলাম।
বইয়ের পর বই। বিপ্লবী অনিল রায়, লীলা রায়, সুনীল দাস, অনিল দাস, সমর গুহ এবং আরও বহু জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী নেতৃত্বের লেখা আমার চিন্তার জগতকে নতুন করে গড়ে তুলতে শুরু করল। আমি বুঝতে শিখলাম, ইতিহাস কেবল পরীক্ষার খাতায় লেখার বিষয় নয়। ইতিহাস মানুষের বিশ্বাস, দ্বন্দ্ব, পরাজয়, স্বপ্ন এবং অসমাপ্ত লড়াইয়েরও নাম।
নেতাজির অন্তর্ধান, বিমান দুর্ঘটনার সরকারি বিবরণ, তার বিরোধিতা, বিভিন্ন সাক্ষ্য এবং অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে বিষয়টি যেন এক বিশাল রহস্যের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে।
একদিন যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমি লাইব্রেরি থেকে লাইব্রেরিতে ছুটতাম, তার কিছু সূত্র যেন এসে জমা হতে লাগল টেমার লেনের সেই ছোট্ট ঘরে। কিন্তু সেই সঙ্গে আমার নেতাজি-চিন্তায়ও এল এক গভীর বাঁক। ১৯৪৫ সালের পর নেতাজির সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানটির যোগাযোগ কি সত্যিই অক্ষুণ্ণ ছিল? প্রশ্নটি প্রথম যখন শুনলাম, বিশ্বাস করতে পারিনি। এতদিন ধরে যে ইতিহাস পড়েছি, সেখানে ১৯৪৫ সালের পরের ঘটনাবলি নিয়ে এত অনিশ্চয়তা, এত বিতর্ক। নেতাজির অন্তর্ধান, বিমান দুর্ঘটনার সরকারি বিবরণ, তার বিরোধিতা, বিভিন্ন সাক্ষ্য এবং অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে বিষয়টি যেন এক বিশাল রহস্যের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে।
সেই রহস্যের সঙ্গে যদি জয়শ্রী প্রকাশনের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের প্রশ্ন যুক্ত হয়, তাহলে তা উপেক্ষা করা সহজ নয়। তবে কোনও দাবি শুনলেই তাকে সত্য বলে মেনে নেওয়া যায় না। ইতিহাসের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রমাণের প্রশ্ন। কে বলেছেন? কখন বলেছেন? কোন নথিতে তার উল্লেখ রয়েছে? প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য কতটা নির্ভরযোগ্য? পরবর্তী স্মৃতিচারণে কতটা পরিবর্তন এসেছে?
এই প্রশ্নগুলো তখন আমার অনুসন্ধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসতে লাগল কিছু নথি, কিছু চিঠি, কিছু স্মৃতি এবং কিছু অস্বাভাবিক যোগসূত্র। প্রতিটি তথ্য যেন রহস্যের দরজায় আলতো করে কড়া নাড়ছিল। কিন্তু দরজা তখনও পুরোপুরি খোলেনি। ২০১৮ সালে রাসবিহারী বসুকে নিয়ে আমার লেখা একটি বই প্রকাশিত হয়। সেই সূত্রেই একদিন জয়শ্রী অফিসে দেখা হল সৈকত নিয়োগীর সঙ্গে। তারপর?
(সৌমব্রত দাশগুপ্ত)
(পরবর্তী পর্ব ২৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার)
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
শেয়ার না কিনলেই মামলা! ‘সেবির চিঠি’ দেখিয়ে ফাঁদ, ২৬ লক্ষ খোয়ালেন কলকাতার ব্যবসায়ী
-
‘ভারতে তো ফুটবলের সংস্কৃতিই নেই’, ব্রাজিল ম্যাচের আগে তুলোধোনা আন্সেলোত্তির
-
নাদিয়ালে মেয়েকে খুনের ভয় দেখিয়ে মাকে ধর্ষণ, সকাল পর্যন্ত চলে নির্যাতন! গ্রেপ্তার অভিযুক্ত
-
‘জঙ্গিদের পুষছে’, নিজেদের ‘ব্যর্থতা ঢাকতে’ আফগানিস্তানে ফের হামলা পাকিস্তানের, নিশানায় সুপ্রিম লিডার?
-
উৎসবের মরশুমে নিষিদ্ধ লেজার লাইট, বাজি পড়ানোতেও বিধি নিষেধ বম্বে হাই কোর্টের