Auto Fare Spike

ইরান যুদ্ধ জিততে না চাইলে কলকাতায় অটো ভাড়া বাড়ে!

গোটা ঘটনাচক্রের নির্যাস, ইরান যুদ্ধ জিততে না চাইলে কলকাতায় অটো ভাড়া বাড়ে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, লড়াইয়ে তো সবাই জিততেই চায়, তেহরানের কি মতিভ্রম হয়েছে? নাকি এর অর্থ গভীর। সাধারণ যুক্তি বা 'ওবসলিট' সমরনীতিতে যা বোধগম্য হয় না।

Advertisement
মণিশংকর চৌধুরী
মণিশংকর চৌধুরী

শেষ আপডেট: মার্চ ১২, ২০২৬, ১৪:৪৭

options
link
ইরান যুদ্ধ জিততে না চাইলে কলকাতায় অটো ভাড়া বাড়ে!
বন্ধ হরমুজ প্রণালী, বাড়ছে কলকাতার অটো ভাড়া।

‘কত দিলা?’, অটো থেকে নামতে না নামতেই প্রশ্নবোমা বয়স্ক বন্ধুর (প্রবীণ বন্ধুবর)। রাত তখন ওই প্রায় ৯টা। রানিকুঠি থেকে অটো ধরে সবে শ্রীকলোনি বাজারে নেমেছি। দেখি মোড়ের মাথায় রিভুদা দাঁড়িয়ে। ফোকলা মুখে দিব্বি ফুকফুক করে সিগারেটে টান দিচ্ছে। পাশের ‘আবার খাবো’ রেস্তরাঁ কাবাব-রোল-মোগলাইয়ের দেদার খুশবু ছাড়ছে। খদ্দেরও জমেছে মন্দ নয়। গামছা কাঁধে একমনে সোমনাথ উলটো কড়াইয়ে রুমালি রুটি সেঁকে যাচ্ছে। আর এত সুখাদ্য থাকতে জনা দুই সুন্দরী (আধুনিকা) হা করে মোবাইল ‘গিলছে’। তাঁদের ‘গিলছে’ পাশে দাঁড়ানো ছোকরার দল। এহেন সদ্য যুবতী রাতে আমি ভাবছি, কী খাব, কী খাব…। এমন সময় চটকা ভাঙল রিভুদার প্রশ্নে। অটোর দিকে ইশারা করে বলল, ‘কত দিলা?’। বুঝলাম অটো ভাড়ার কথা বলছে। বললাম, ‘যা দিই তাই দিলাম। কেন?’ বলল, ‘অটো ভাড়া বাড়ছে (Auto Fare Spike)। উলটোডাঙায় দেখি ৫ টাকা বেশি নিল। ওই যুদ্ধ লাগছে গ্যাস নাই। এইডা কেমন হইল? হালার পো ইরানে যুদ্ধ লাগলে কলকাতায় অটো ভাড়া বাড়ব ক্যান?’

Advertisement

সঙ্গত প্রশ্ন। রাতে বিছানায় শুয়ে এসবই ভাবছিলাম। খানিক ভাবার পর মনে হল, গোটা ঘটনাচক্রের নির্যাস, ইরান যুদ্ধ জিততে না চাইলে কলকাতায় অটো ভাড়া বাড়ে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, লড়াইয়ে তো সবাই জিততেই চায়, তেহরানের কি মতিভ্রম হয়েছে? নাকি এর অর্থ গভীর। সাধারণ যুক্তি বা ‘ওবসলিট’ সমরনীতিতে যা বোধগম্য হয় না।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ নতুন কিছু নয়। ছোটবেলায় উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা তেলের কুয়োর ছবি। নয়ের দশকে কুয়েতে ইরাকের আক্রমণ। আমেরিকার অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম। সবমিলিয়ে টানটান নাটকের উপাদান চিরকালই সেখানে ছিল। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় ২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনাচক্র। আমেরিকা ও ইজরায়েলের বোমায় (অপারেশন এপিক ফিউরি এবং দ্য রোরিং লায়ন) প্রাণ হারান ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তেহারানের মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ হয়। মিসাইল সাইট, বিমানঘাঁটি পুড়তে থাকে। বন্দর আব্বাসে ইরানের পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয় আমেরিকা। ভারত মহাসাগরে মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় সলিলসমাধি ঘটে তেহরানের রণতরী ‘ডেনা’র।

Advertisement

মোটের উপর মনে হয়েছিল ইরান শেষ। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েতের মতো আরব দেশগুলির মার্কিন ঘাঁটিতে কয়েকটি মিসাইল ছুড়েই বুঝি ফুরিয়ে গিয়েছে তারা! কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তৈরি হচ্ছে এক অভিনব পরিস্থিতি। সমরশাস্ত্রের সোজা সমীকরণই বলে দেয় সরাসরি যুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামনে খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে ইরান। জয়ের কথা ভাবাও বাতুলতা। ইরান তা জানে। ফলে যুদ্ধে জিততেও চায় না। তাই তেহরানের নীতি সহজ। যুদ্ধের মাশুল এতটা বাড়িয়ে দাও যাতে জয়ও পরাজয়ের মতো মনে হয়। দশক ধরে খামেনেইয়ের নির্দেশ মোতাবেক এহেন পরিস্থিতির জন্যই তারা তৈরি। আর প্রকৃতির এক অমোঘ হাতিয়ার তাদের হাতে। নাম হরমুজ। বিশ্বের ‘তৈল ধমনী’। তেল পিপাসু বিশ্বের ২০ শতাংশ রসদ আসে এই পথেই। হরমুজ বন্ধ হলে হেঁশেলেও প্রভাব পড়বে। বা ইতিমধ্যেই পড়ছে। রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে। গ্যাস বুক করা যাচ্ছে না। অভিযোগ, ফোন করলেও কেটে দিচ্ছেন ডিলাররা। এদিকে পরের সিলিন্ডার বুক করার মেয়াদ ২৫ দিন করে দিয়েছে কেন্দ্র। পেট্রোল পাম্পে অটোর লাইন। সিএনজিতে নাকি টান পড়েছে। দমদম-সিঁথি, উলটোডাঙ্গা-করুণাময়ী, চিংড়িহাটা-এসডিএফ, গড়িয়া-বারুইপুর, সোনারপুর-গড়িয়ার মতো রুটে ভাড়া বেড়ে গিয়েছে। গতকাল গ্যাস ও জ্বালানি তেল সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে সংস্থাগুলির সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এখানেই ইরানের স্ট্র্যাটেজি সফল।

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ নতুন কিছু নয়। উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং দাউদাউ জ্বলতে থাকা তেলের কুয়োর ছবি। নয়ের দশকে কুয়েতে ইরাকের আক্রমণ। আমেরিকার অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম। সবমিলিয়ে টানটান নাটকের উপাদান চিরকালই সেখানে ছিল।

যুদ্ধ শুধু কয়েকটি সেনাঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া বা মানুষ মারা নয়। প্রতিপক্ষের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাকে নষ্ট করাই এর উদ্দেশ্য। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মেয়াদ খুবই কম হবে বলে ধরেই নিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। খামেনেই খতম হলেই খোলা হাওয়ার জন্য ‘আমেরিকান লিবারেটর’দের ‘বুকে আয় বাবা’ বলবে ইরানিরা। তা হয়নি। বরং উলটোটাই হয়েছে। এমনকী, ইরানি শাসন দ্রুত ভেঙে পড়লেও, বাইরের সমর্থনে গঠিত কোনও অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের কাছে বৈধতা পাবে না। ইরান এই সংঘাতকে অস্তিত্বরক্ষার লড়াই হিসাবে দেখছে। সেই লড়াইয়ের সাক্ষী হরমুজ।

কী হচ্ছে হরমুজে?

খামেনেই অনুগত ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের (IRGC) স্পিডবোটগুলো হরমুজ প্রণালীতে বিদেশি যুদ্ধজাহাজ ও বাণিজ্যিক তেল ট্যাঙ্কারগুলোতে ড্রোন বা মিসাইল ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে। ইরানের রণতরীগুলো মাইন বসাচ্ছে। তেহরানের সাফ কথা, হরমুজ প্রণালী কেউ পার করার চেষ্টা করলে তাকে খতম করা হবে। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণের এই রুটটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এবং সুনির্দিষ্টভাবেই ইরান তা করে চলেছে। ফলে ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হামলার প্রথম দিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারির সঙ্গে তুলনা করলে ওই দাম প্রায় দশ শতাংশ বেড়েছে। তথ্য বলছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চিন ও ভারতে তেল রপ্তানির জন্য জাহাজ ভাড়া গত সপ্তাহের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা দৈনিক চার লক্ষ ডলারেরও বেশি। তারমধ্যে বিমা কোম্পানিগুলো হাত গুটিয়ে নিচ্ছে।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬-এর প্রাক্তন প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়ঙ্গার বিবিসিকে বলেছেন, “তেলের দামের উপর প্রভাবের কথা বিবেচনা করলে বলা যায়, হরমুজ বন্ধ রাখলে স্পষ্টতই একটি অবিশ্বাস্য অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি হবে।” ফ্রেট অ্যানালিটিক্স সংস্থা ‘ভর্টেক্সা’র তথ্য অনুযায়ী, গতবছর দৈনিক গড়ে ২০ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি অশোধিত তেল, কনডেনসেট (প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপাদিত কম ঘনত্বের তরল) এবং জ্বালানি হরমুজ হয়ে বিভিন্ন দেশে গিয়েছে। যার আনুমানিক মুল্য ৬০০ বিলিয়ন ডলার। ইরান-সহ ‘অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিস’ (ওপেক)-এর অন্যান্য সদস্য দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, কুয়েত এবং ইরাক কিন্তু এশিয়ায় তাদের বেশিরভাগ অশোধিত তেল এই পথেই রপ্তানি করে।

ফলে, হরমুজ বন্ধ থাকলে দিনে ৫০টি ফোন আসবে ট্রাম্পের কাছে। হয়তো বা আসছেও। সৌদি, আমিরশাহী, কাতার, কুয়েতের মতো দীর্ঘদিনের আমেরিকা বন্ধু দেশগুলো প্রবল চাপ তৈরি করবে। ভারত আবারও রুশ তেল কেনা বৃদ্ধি করবে। তাছাড়া, বিশ্ব বাজারে বিরাট সংকট তৈরি হবে। অন্যদিকে, ইজরায়েলের একার পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে লড়াই করা সম্ভব নয়। এক একটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম লক্ষ লক্ষ ডলার। বিপুলায়তন ইরানে সরাসরি ফৌজ পাঠানোও বোকামো। ইরাক, আফগানিস্তান থেকে সেই পাঠ পেয়েছে আমেরিকা। ফলে ইরানকে যুদ্ধ জয় করতে হবে না, শুধু টিকে থাকতে হবে। তা করলেই অর্থনীতিই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে দেবে।

শেষ পাওয়া খবর মোতাবেক, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ এবং ইজরায়েলে প্রত্যাঘাত করছে ইরান। ইরাকের বাণিজ্যবন্দর আল-ফ-তে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে তেহরান। এছাড়াও কুয়েত, কাতার, আরব আমিরশাহী এবং সৌদি আরব জানিয়েছে, দেশগুলিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলেও তা রুখে দিয়েছে তারা। সংঘাতের মধ্যেই শান্তি ফেরাতে তিন শর্ত দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সেগুলি হল ১) সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে তেহরানের অধিকারের স্বীকৃতি, ২) যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ৩) ভবিষ্যতে আগ্রাসন হবে না, এই আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি। তাই হরমুজকে কেন্দ্র করেই ইরানের কৌশল। ইরান জিততে চায় না, শুধু সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে চায়। তেমন হলে ভারতের মতো তেল পিপাসু দেশগুলোর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবে। আর রিভুদার প্রশ্নের উত্তরে আমাকে বলতেই হবে, ‘ইরান যুদ্ধ জিততে না চাইলে কলকাতায় অটো ভাড়া বাড়ে।’

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.