ন্যূনতম আয়ের শর্টকাটে কি দারিদ্র দূরীকরণ সম্ভব?

নিয়োগের সমস্যাটাই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জানুয়ারি ৩০, ২০১৯, ১৪:০৬

options
link
ন্যূনতম আয়ের শর্টকাটে কি দারিদ্র দূরীকরণ সম্ভব?

সুতীর্থ চক্রবর্তী: ক্ষমতায় এলে গরিবদের জন্য ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। ইতিমধ্যে এই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কয়েক দিনের মধ্যে সংসদে অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ হবে। বাজেটে গরিবদের জন্য ন্যূনতম আয়ের বিষয়টি থাকতে পারে বলে ওয়াকিবহাল মহলের কোনও কোনও অংশের ধারণা। এই প্রকল্পে গরিবদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা ফেলার কথা ভাবা হচ্ছে।

Advertisement

গরিবদের সরাসরি কিছু টাকা পৌঁছে দিয়ে ভারতীয় অর্থনীতির কর্মহীনতার সমস্যাটির মোকাবিলার রাস্তায় হাঁটা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নটি বিভিন্ন মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। ভারতে আর্থিক বৈষম্যের তীব্রতা যে প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। সমাজের নীচের তলার ৫০ শতাংশ মানুষ যা আয় করেন, তা একেবারে উপরতলার মাত্র এক শতাংশ মানুষের আয়ের সমান। অর্থাৎ উপরতলায় চোখ ধাঁধানো ধনের প্রাচুর্য প্রতিষ্ঠিত সত্য। উপরতলার এই অংশে আয়কর সামান্য একটু বাড়ালেই সরকারের হাতে বিপুল টাকা আসতে পারে। সেই টাকার একটি অংশ সরকার গরিবদের মধ্যে ধরে ধরে বণ্টন করে দিলেই সমস্যার সমাধান হতে পারে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

[শোভাযাত্রার বাইরের সেই প্রজা দিবস]

Advertisement

এত সহজ সরল শর্টকাট পথে সরকার হাঁটবে কি না, সেটা সময় বলবে। তবে মনে হয় না লোকসভা ভোটের আগে সরকার কোনও অংশের উপরেই প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধি করবে। গরিবের ভরতুকি ছাঁটাই করে গরিবকে সরাসরি টাকা দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। অনেকটা মাছের তেলে মাছ ভাজার মডেল। যে টাকা নানা ধরনের ভরতুকির হাত ধরে পরোক্ষে পৌঁছচ্ছিল গরিব মানুষের কাছে, বলা হচ্ছে সেটাই সোজা চলে যাবে গরিব মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।

ভরতুকির টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে আসার আর্থিক ফলশ্রুতি যাই হোক, এর যে রাজনৈতিক অভিঘাত যথেষ্ট জোরদার, তা নিয়ে বিতর্ক করার কোনও মানে হয় না। যদি কোনও সরকার প্রতিমাসে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ফেলে দেয়, তাহলে তার চেয়ে ভাল কাজ আর কী-ই বা হতে পারে! উপকৃতরা ভোটে সেই সরকারের উপর রাজনৈতিক আনুগত্য দেখালে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। কিন্তু উৎপাদনবহির্ভূত এই আয় অর্থনীতিকে কোনওভাবে উপকৃত করে কি না দেখা প্রয়োজন। মাথায় রাখতে হবে যে, নিয়োগের সমস্যাটাই কিন্তু অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা। রাজনীতির স্তরেও বেকারত্বই সবচেয়ে বড় ইসু্য। কিছু মানুষের ঘরে সরাসরি টাকা পাঠিয়েও বেশিদিন মূল ইস্যুটিকে চাপা দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ কোনও সরকারের পক্ষেই দেশের ১৩০ কোটি মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাসে মাসে টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। গরিব মানুষের সূচকে পড়বেন দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারীরা। অর্থাৎ যাঁদের বিপিএল কার্ড রয়েছে। বাকিদের জন্য তো দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি। তাছাড়া জনগণের করের টাকায় কতদিন এই প্রকল্প টেনে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হবে? এখন ভরতুকিবাবদ যে টাকা সরকারের খরচ হয়, সেটাও জনগণের করের টাকা। কয়েক দিন আগে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদ সরকারিভাবে বলেছেন, আধার কার্ড হওয়ায় সরকারের বছরে ৯০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। এই টাকাটা ভরতুকির নামে আগে চুরি হত। আধার কার্ড সেই চুরি ঠেকিয়েছে। এই উদ্বৃত্ত ৯০ হাজার কোটি টাকা ও অন্যান্য ভরতুকি বন্ধ হলে যে টাকা সাশ্রয় হবে, সেই টাকা। সবমিলিয়ে অঙ্কটা যাই হোক, তা দিয়ে নিশ্চয়ই ভারতে ক্ষুধা ও দারিদ্র নির্মূল করা সম্ভব নয়। রাহুল গান্ধী তাঁর প্রতিশ্রুতিতে বলেছেন, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়েই ক্ষুধা ও দারিদ্র দূর করবেন।

গরিবের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা গেলেও ঘুরপথে অবশ্য তা উৎপাদনকে সাহায্য করতে পারে। যে ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা আসবে তিনি তা নিয়ে বাজারেই যাবেন। বাজারে গিয়ে নানা পণ্যের চাহিদা তৈরি করবেন। যদি ধরে নিই সরকার বছরে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকা গরিবদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করছে, তাহলে তার মানে দাঁড়ায় বাজারে এই পাঁচ লক্ষ কোটি টাকা ঢুকবে। সেই টাকার নানা পণ্যের চাহিদা তৈরি হবে। বাজারে পণ্যের চাহিদা তৈরি হলে তার উৎপাদনও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। সেটা নাহলে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে। এই পথে সরকার টাকা বিলি করলেও তত্ত্বগতভাবে কর্মসংস্থানের মূল সমস্যাটিরও সমাধান হতে পারে।

কিন্তু অর্থনীতি এখন জোগান-নির্ভর। বাজারে চাহিদা তৈরি হলেই জোগান বাড়বে এমনটা নয়। যে গরিবরা বাড়িতে বসে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাবেন তাঁরা বাজারে শ্রমের জোগান কমিয়ে দিয়ে উৎপাদনের সংকট করতে পারেন। যেমনটা ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প চালুর পরে হয়েছিল। গ্রামে গ্রামে দিনমজুর পাওয়া যাচ্ছিল না– যা কৃষিক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে। গ্রামে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যায়। কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে। একই ঘটনা ঘটতে পারে গরিবদের জন্য ন্যূনতম রোজগার পরিকল্পনাতেও। একদিকে শ্রমের জোগান কমতে পারে ও অন্যদিকে বাজারে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। তাছাড়া শুধু চাহিদা বাড়লেই উৎপাদন বাড়ে না, তার সঙ্গে লগ্নির প্রশ্নটিও জড়িয়ে থাকে। লগ্নি বাড়লে তবেই উৎপাদন বাড়বে এবং কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

লগ্নি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সরকারের কিছু ভূমিকা থাকে। তবে সেটা সময়সাপেক্ষ। সবসময় সেটা দৃশ্যমানও হয় না। সরাসরি মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ফেলার মতো জনপ্রিয়তা তো আনেই না। কিন্তু কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে গরিব মানুষের আয় নিশ্চিত করাটা দীর্ঘকালীন উন্নয়নের জন্য অবশ্যপ্রয়োজনীয়। কর্মসংস্থানের সমস্যাটারও দীর্ঘকালীন জবাব প্রয়োজন। ঘরে ঘরে কাজ থাকলে সমাজ ও অর্থনীতিতে একটা স্থিরতা আসে। যা কিন্তু স্থায়িত্ব দেয় সরকারকেও। নিয়োগের সমস্যার সমাধানের রাস্তায় না গেলে আবার কিন্তু বেশিদিন রাজনৈতিক স্থায়িত্ব ধরে রাখাও যায় না। এটা যে কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্ররই অভিজ্ঞতা।

[‘বিশ্বাসঘাতক’ মৌসমকে হারাতে গনি আবেগই ভরসা কংগ্রেসের, প্রার্থী হচ্ছেন ডালুর ছেলে]

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.