বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠান নয়; বদলে যাওয়া কাঠামোর লক্ষণ। এটি মনে করিয়ে দেয় পরিবার, সময়, সম্পর্ক এবং দায়িত্বের পুরনো সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের দায় যেমন সন্তানের একার নয়, তেমনই মা-বাবারও নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। লিখছেন অনিমেষ বৈদ্য।
‘বৃদ্ধাশ্রম’ নিয়ে আমাদের সমাজে আবেগ অনেক, অভিযোগও কম নয়। জনপ্রিয় সংস্কৃতি থেকে সামাজিক আলোচনায় বারবার একটি কথাই ফিরে আসে– ‘ভালো সন্তান’ কখনও মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে পারে না। যেন বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছে যাওয়া মানেই সন্তানের ব্যর্থতা, সম্পর্কের অবক্ষয়, কিংবা মূল্যবোধের মৃত্যু। বেশ কয়েক বছর আগের একটি জনপ্রিয় গান এই ধারণাকে আরও বেশি করে প্রতিষ্ঠা করেছিল বলেই মনে হয়। সেই গানে বৃদ্ধাশ্রমে বসে এক বাবা ছেলেকে মানুষ করার স্মৃতি মনে করছেন, আর আক্ষেপ করছেন যে, সেই ছেলেই এখন তাঁকে সেখানে রেখে গিয়েছে। গানের গল্প যেমনই হোক, তার মধ্য দিয়ে একটি প্রচলিত সামাজিক রাগ ও ক্ষোভই প্রকাশ পেয়েছিল। যেন একমাত্র সন্তানেরই দায়– সে ‘ভাল সন্তান’ হলে এমন পরিস্থিতি কখনও তৈরি হত না।
কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই এত সরল? এখনকার সমাজে পরিবার, সম্পর্ক এবং দায়িত্ব– সবকিছুর সংজ্ঞাই বদলে যাচ্ছে। এক সময় যৌথ পরিবার ছিল আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি। একই বাড়িতে একাধিক প্রজন্মের বসবাস, ভাগ করে নেওয়া দায়িত্ব, পারস্পরিক নির্ভরতা– সব ছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ। এখন সেই জায়গায় এসেছে একক পরিবার। ছোট ফ্ল্যাট, কর্মব্যস্ত জীবন, সময়ের অভাব এবং ক্রমাগত প্রতিযোগিতা মানুষকে
এমন এক বাস্তবতার মধ্যে নিয়ে এসেছে, যেখানে সম্পর্কের চেয়ে জীবিকার লড়াই অনেক সময় বেশি জরুরি, অনিবার্য, এর প্রভাবও অলঙ্ঘনীয়। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড়
প্রভাব পড়েছে পরিবারে বড় হয়ে ওঠা শিশুদের উপর।
এখনকার শিশু এমন এক পরিবেশে বড় হচ্ছে যেখানে মা-বাবার সঙ্গে নির্ভার সময় কাটানোর সুযোগ কমছে। বাড়িতে কথোপকথনের জায়গা সংকুচিত।
কয়েক দশক আগেও ভাবা যেত না যে, একটি শিশুর শৈশবের বড় অংশ কাটবে ক্রেশে। অথচ এখনকার শহুরে জীবনে সেটাই বাস্তব। কর্মজীবী মা-বাবার কাছে ক্রেশ বিলাসিতা নয়, বরং কেঠো প্রয়োজন। সন্তানকে সেখানে রেখে অফিসে যাওয়া, নির্দিষ্ট সময়ে তাকে নিয়ে আসা– এসব এখন মধ্যবিত্ত জীবনের স্বাভাবিক অঙ্গ। আমরা এটিকে আধুনিক জীবনের অমোঘ বাস্তবতা বলেই মেনে নিয়েছি। কারণ, আমরা জানি, কাজ না-করলে অর্থোর্পাজন না-করলে সংসার চলবে না। অফিসে সময় না-দিলে পেশাগত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও কঠিন।
অর্থাৎ শিশুর পরিচর্যার একটি অংশ গোড়াতেই পরিবার থেকে সরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাচ্ছে। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। যে-শিশু ছোটবেলা থেকেই শিখছে– যত্ন, সঙ্গ ও পরিচর্যার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সামাজিক জীবনে স্বাভাবিক, সে বড় হয়ে যদি একইভাবে বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য ‘বৃদ্ধাশ্রম’-কে একটি সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠান ও আপন ব্যস্ততার প্রতিষেধক রূপে দেখে, তাহলে তাকেই কি একমাত্র স্বার্থপর বলা যায়?
এই প্রশ্নের মধ্যে বৃদ্ধাশ্রমকে সমর্থন করার চেষ্টা নেই। বরং প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের দিকেই ফিরে আসে। কারণ, শিশুকে ক্রেশে পাঠানোকে আমরা বাস্তবতার দাবি বলে মেনে নিই, কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য বৃদ্ধাশ্রম বেছে নেওয়ার ঘটনাকে দেখি নৈতিক অবক্ষয় হিসাবে। অথচ দু’টি ক্ষেত্রেই পরিবার তার ঐতিহ্যগত দায়িত্বের একটি অংশ প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিচ্ছে। প্রথম ক্ষেত্রে আমরা বলি ‘সময়ের প্রয়োজন’, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বলি ‘মূল্যবোধের সংকট’। এই দ্বৈততার কারণ নিয়েও ভাবা প্রয়োজন।
সমস্যা আরও গভীরে। এখনকার শিশু এমন এক পরিবেশে বড় হচ্ছে যেখানে মা-বাবার সঙ্গে নির্ভার সময় কাটানোর সুযোগ কমছে। বাড়িতে কথোপকথনের জায়গা সংকুচিত। অনেক পরিবারে প্রকাশ্য অশান্তি নেই, কিন্তু রয়েছে নীরব দূরত্ব। আবার কোথাও প্রতিদিনের ক্লান্তি, মানসিক চাপ এবং অনিশ্চয়তা সম্পর্ককে যান্ত্রিক করে তুলছে।
পাশাপাশি, আমরা সন্তানের শিক্ষাগত সাফল্য নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, মানুষ রূপে তার মানসিক বিকাশ নিয়ে ততটা নই। কোন স্কুলে পড়ছে, কতগুলি টিউশন নিচ্ছে, কোন প্রতিযোগিতায় সফল হচ্ছে– এসবে আমাদের আগ্রহ অসীম। অথচ সহানুভূতি, সম্পর্কের মূল্য, পারিবারিক উষ্ণতা, অপেক্ষার অর্থ, কিংবা যত্নের গুরুত্ব– এসব শেখানোর সময় ও পরিবেশ ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
‘বৃদ্ধাশ্রম’ কোনও আদর্শ পারিবারিক ব্যবস্থার বিকল্প নয়। বাস্তবে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের পক্ষে তার খরচ বহন করাও সম্ভব নয়।
ফলে বড় হয়ে সম্পর্ককে সে আবেগের জায়গা থেকে নয়, বরং দায়িত্ব ও চাপের জায়গা থেকে দেখতে শেখে। মা-বাবার বার্ধক্য তখন তার কাছে ভালোবাসার প্রশ্নের পাশাপাশি দেখভালের ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়। সেই জায়গা থেকেই কিছু পরিবার বৃদ্ধাশ্রমের মতো ব্যবস্থার দিকে ঝোঁকে। কিন্তু এ প্রবণতা আমাদের সমাজে সম্পর্কের সংকটকেই সামনে আনে, তার সমাধান নয়।
এখানে শুধু সন্তানকে দোষ দিলে সমস্যার আসল চেহারা আড়াল হয়ে যায়। কারণ, কোনও সন্তান জন্মগতভাবে দায়িত্ববোধ নিয়ে বড় হয় না। সম্পর্কের মূল্য, একসঙ্গে থাকার গুরুত্ব, অপেক্ষা ও যত্নের অর্থ– শেখানো হয় পরিবারেই। কিন্তু পরিবার যদি সময়ের অভাব, ক্লান্তি ও বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত হয়, তাহলে সেই শিক্ষা আসবে কোথা থেকে?
এখানে আর-একটি বাস্তবতাও মনে রাখা প্রয়োজন। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ কোনও আদর্শ পারিবারিক ব্যবস্থার বিকল্প নয়। বাস্তবে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের পক্ষে তার খরচ বহন করাও সম্ভব নয়। অধিকাংশ প্রবীণ এখনও পরিবারের মধ্যেই জীবন কাটান এবং কাটাতে চান। তাই এই আলোচনার উদ্দেশ্য বৃদ্ধাশ্রমকে সমর্থন করা নয়। উদ্দেশ্য হল, বৃদ্ধাশ্রমকে ঘিরে আমাদের কিছু পূর্বনির্ধারিত ধারণাকে নতুন করে বিচার করা।
বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠান নয়; এটি আমাদের সমাজের বদলে যাওয়া কাঠামোর একটি লক্ষণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পরিবার, সময়, সম্পর্ক এবং দায়িত্বের পুরনো সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের দায় যেমন সন্তানের একার নয়, তেমনই মা-বাবারও নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। তাই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
যে-সমাজে আমরা শিশুদের যত্নের দায়িত্বের একটি অংশ ক্রমশ প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়াকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছি– সেই সমাজে প্রবীণদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা দিলে, তাকে কি শুধুই স্বার্থপরতার ফল বলে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট? না কি আমাদের বদলে যাওয়া সমাজ-বাস্তবতার দিকেও সমানভাবে তাকানো প্রয়োজন?
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
[email protected]
সর্বশেষ খবর
-
‘লক আপ সিজন ২’-এ কঙ্গনার মুখে শাহরুখ স্তুতি, কেন ‘কিং’-এর প্রশংসায় ‘ক্যুইন’?
-
বারুইপুর কাণ্ডে দ্রুত অ্যাকশনে পুলিশ, নাবালিকা ধর্ষণ-খুন মামলায় ৬ সদস্যের সিট গঠন
-
বৈভবদের ম্যাচে কন্ডোমের বিজ্ঞাপন! বন্ধ না হলে সংসদে সোচ্চার হবেন তৃণমূল সাংসদ কীর্তি
-
মেলেনি শববাহী গাড়ি, স্ত্রীর দেহ বাইকে বেঁধে শ্মশানের পথে স্বামী, অমানবিক ছবি ওড়িশায়
-
বাউলদের উপর হামলায় তদন্তের নির্দেশ, ‘হিন্দু বিদ্বেষ’ বদনাম ঘোচাতে তৎপর তারেকের বাংলাদেশ