Joy Goswami

তৃণমূল জমানায় সাহিত্য ক্ষেত্রেও ‘থ্রেট কালচার’! বিস্ফোরক জয় গোস্বামী, কী মত শীর্ষেন্দু-বিনায়ক-অংশুমানদের?

জয়ের বক্তব্য, স্বাস্থ্য, চলচ্চিত্র-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের মতো সাহিত্য জগতেও তৃণমূল জমানায় রমরমিয়ে চলত ‘থ্রেট কালচার’। যোগ করেন, “প্রতিবাদ করে আয়ুক্ষয় করতে পারব না। অল্প বয়সিদেরও বাঁচাতে পারব না।” সময় মতো এই বিষয়ে বিস্তারে মুখ খুলবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ২, ২০২৬, ২০:২৭

options
link
তৃণমূল জমানায় সাহিত্য ক্ষেত্রেও ‘থ্রেট কালচার’! বিস্ফোরক জয় গোস্বামী, কী মত শীর্ষেন্দু-বিনায়ক-অংশুমানদের?
হুমকি সংস্কৃতি নিয়ে মতামত দিলেন সমকালীন কবি ও সাহিত্যিকরা।

শনিবার রবীন্দ্রসদনে তসলিমা নাসরিনের অনুষ্ঠানে অনভিপ্রেত পরিস্থিতিতে মঞ্চে উঠতে পারেননি সমকালীন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি ও সাহিত্যিক জয় গোস্বামী। রবিবার সেই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে অন্য এক প্রসঙ্গে কার্যত বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন তিনি। জয়ের বক্তব্য, স্বাস্থ্য, চলচ্চিত্র-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের মতো সাহিত্য জগতেও তৃণমূল জমানায় রমরমিয়ে চলত ‘থ্রেট কালচার’। যোগ করেন, “প্রতিবাদ করে আয়ুক্ষয় করতে পারব না। অল্প বয়সিদেরও বাঁচাতে পারব না।” সময় মতো এই বিষয়ে বিস্তারে মুখ খুলবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। এখন প্রশ্ন হল, জয় গোস্বামীকে যেভাবে মঞ্চ উঠতে বাঁধা দেওয়া হয়েছে, সেই ঘটনাকে কীভাবে দেখছেন বঙ্গীয় সাহিত্য জগৎ? দ্বিতীয়ত, সাহিত্য ক্ষেত্রে হুমকি সংস্কৃতি নিয়ে কী বলছেন সমকালীন কবি ও সাহিত্যিকরা?

Advertisement

বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, শনিবার তসলিমার অনুষ্ঠানে জয় গোস্বামীর সঙ্গে যা ঘটেছে তা অনভিপ্রেত। ঘুণপোকার স্রষ্টা বলেন, “এমনটা হওয়া উচিত নয়। সবচেয়ে বড় কথা, জয়ের মতো একজন ভারত বিখ্যাত শক্তিশালী কবি, তাঁকে স্টেজে উঠতে না দেওয়াটা একেবারে মানতে পারছি না।” সর্বক্ষেত্রে রাজনীতির রং লাগা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শীর্ষেন্দু। তিনি বলেন, “এখন সবকিছুতেই রাজনীতির রং লেগে যাচ্ছে। রাজনীতি আমাদের হেঁশেলে ঢুকে পড়েছে! এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। কাম্য নয়।” ‘ত্রেট কালচার’ নিয়ে মন্তব্য না করেও তিনি বলেন, “আমাদের তো রাজনীতি বিচ্ছিন্ন একটা সত্ত্বাও রয়েছে। সবকিছুর ভিতর রাজনীতি এনে ফেললে খুবই মুশকিল। বিশেষ করে সাহিত্য ক্ষেত্রেও!”

Advertisement
কবি ও সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়।

শনিবার রবীন্দ্রসদনে তসলিমা নাসরিনকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। জয় গোস্বামীর সঙ্গে ঘটা কাণ্ডের সাক্ষী তিনি। বিনায়ক বলেন, “কাকে যে কবিতা বলে আমরা কি জানি, সমস্ত চলুক, একথা প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত বলেছিলেন। তিরিশ বছরের অধিক বাংলা সাহিত্য জগতে বিচরণ করে আমি যেটুকু চেয়েছি— সকলে সকলের কথা বলুক। কারও যেন কণ্ঠরোধ না করা হয়। আমি আরও বেশি করে চাই, কারণ আমার কণ্ঠ বারবার রুদ্ধ করা হয়েছে।”

Advertisement

থ্রেট কালচার প্রসঙ্গে বিনায়কের বক্তব্য— “গত কুড়ি-তিরিশ বছরে কারা থ্রেট কালচার চালিয়েছেন, সেটা দেখতে হবে!”

উদাহরণ দিয়ে বলেন, “একই মঞ্চে পাঁচজন বক্তৃতা দিয়েছেন কিন্তু আমার নামটি উল্লেখ করা হয়নি। এটাও তো ব্ল্যাক লিস্ট করাই। এগুলো ঘটছে, ঘটে চলেছে। আমি কারও ছাত্র, সেই কারণে কোনও পত্রিকায় লেখা প্রকাশ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বিগত পনেরো বছরে লিটল ম্যাগাজিন মেলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি উৎসবে প্রবেশাধিকার ছিল না আমার। এই কারণেই চাই— কোথাও, কারও যেন কণ্ঠরোধ না করা হয়, প্রত্যেকেই যেন তাঁর কথাটা বলতে পারেন। ফলে এমন ঘটনায় ব্যক্তিগত ভাবে দুঃখিত হই। কোনও অনভিপ্রেত ঘটনাই কাম্য নয়।”

থ্রেট কালচার প্রসঙ্গে বিনায়কের বক্তব্য— “গত কুড়ি-তিরিশ বছরে কারা থ্রেট কালচার চালিয়েছেন, সেটা দেখতে হবে! তা যাতে আগামীতে এই কালচার না থাকে, সেটাও দেখতে হবে। এটাই তো কাম্য। আমি নিজে যে পরিবেশ পরিস্থিতি পাইনি দীর্ঘদিন। সেই কারণেই আমি চাই অন্যরা যেন মুক্ত পরিবেশ পায়। সকলেই যেন নিজের কথাটা বলতে পারেন। গতকাল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও বলেছেন, প্রত্যেকে যেন প্রত্যেকের কথাটা বলতে পারেন। তা যেন বাস্তব ক্ষেত্রেই ঘটে।”

কবি ও সাহিত্যিক অংশুমান কর।

জয় গোস্বামীর সঙ্গে ‘অত্যন্ত অন্যায়’ হয়েছে, মনে করেন বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক অংশুমান কর। পাশাপাশি তৃণমূল জমানার থ্রেট কালচার নিয়েও দ্বিধাহীন ভাষায় সরব হয়েছেন তিনি। অংশুমান বলেন, “গতকাল জয় গোস্বামীর সঙ্গে যা হয়েছে, তা অত্যন্ত অন্যায়। কারণ তিনি ছিলেন ওই অনুষ্ঠানের একজন আমন্ত্রিত অতিথি। তসলিমা নাসরিন আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, উদ্যোক্তারাও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। একজন আমন্ত্রিত অতিথিকে এভাবে হেনস্তা করা যায় না। এটা ঠিক যে জয় গোস্বামী বিগত তৃণমূল সরকারের সমর্থকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু যাঁরা জয়কে অপমান করলেন তাঁরা একবারও ভাবলেন না, শনিবার মঞ্চ থেকে তসলিমা যে কথা বললেন— বিরোধী মতকে আমাদের সম্মান জানাতে হবে, সেই বক্তব্যকেই কার্যত খণ্ডন করা হল!”

সত্যিই কি জয় গোস্বামী সাহিত্য ক্ষেত্রের হুমকি সংস্কৃতি, কাটমানির কথা জানতেন।? রবিবার তিনি ইঙ্গিতবাহী মন্তব্য করেন।

বাংলা সাহিত্য ও কবিতা জগতে হুমকি সংস্কৃতি প্রসঙ্গে ঠোঁটকাটা ভাষায় জবাব দিয়েছেন অংশুমান। তিনি বলেন, “আমার শুনে ভালো লাগল যে জয় গোস্বামী বলেছেন, বাংলা সাহিত্য তথা কবিতার জগতে থ্রেট কালচার ছিল বা আছে। আমি তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। ‘গদ্যপদ্যপ্রবন্ধ’ নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনা করি আমি। দীর্ঘদিন ধরে এই পত্রিকার অনুষ্ঠানে যে তরুণ কবিরা এসেছেন বা আসতে চেয়েছেন, তাঁদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমাদের অনুষ্ঠানে এলে তাঁদের কী ক্ষতি হতে পারে, সে কথা বলা হয়েছে। আমাদের সহ-আয়োজককেও হুমকি দেওয়া হয়েছে।”

যোগ করেন, “রাজনৈতিক ক্ষমতার বলে ক্ষমতাবান কয়েক জন কবি এই কাজ করছিলেন। আমি বারবার এই থ্রেট কালচারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছি।” অংশুমানের বিস্ফোরক দাবি, “তৃণমূল জমানায় কবিতার জগতে কাটমানি সংস্কৃতিও প্রবেশ করেছিল। এই বিষয়ে অভিযোগ জানিয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খোলা চিঠিও দিয়েছিলাম আমরা অনেকে মিলে। আমার ভালো লাগছে, আমরা যা বলছিলাম, এতদিন পর জয় গোস্বামী সেই কথায় মান্যতা দিচ্ছেন। তিনি তো এই জগতেরই লোক, সবকিছুই ওঁর জানা ছিল।”

সত্যিই কি সাহিত্য ক্ষেত্রের হুমকি সংস্কৃতি, কাটমানির কথা জানতেন জয় গোস্বামী? যদি জানাই ছিল সব, তবে এতদিন পর বোধোদয় কেন? রবিবার ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল’র কবি ইঙ্গিতবাহী মন্তব্য করেছেন। জয়ের কথায়, “তিন বছর আগে আমি মুদ্রণ জগৎ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছি। কেন আমাকে প্রত্যাহার করতে হল, সেটা কেউ ভেবে দেখেছেন? একদিনে আমি সব ঘটনা বলব না। সময় যত এগোবে তত একটু একটু করে বোঝা যাবে কেন আমি অতদিন আগেই সরে এসেছিলাম। সব কথা বলার একটা সময় আছে। কারণ টাইমিংটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।” 

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.