‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ কিংবা সংবিধানের কড়া আইন এখানে খাটে না। এই গ্রামে জন্ম নেওয়া মেয়েদের কাছে অভিশাপের সমান। এখানে মেয়েদের কাছে বিকল্প দুটি, বাল্যবিবাহ নাহলে বেশ্যাবৃত্তি। নারী-পুরুষ সমানাধিকার এখানে গল্পকথা। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে মধ্যযুগীয় রীতি এখনও অপরিবর্তিত গুজরাটের ভাদিয়া গ্রামে যা ‘পতিতাদের গ্রাম’ নামেই বেশি পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে এই গ্রামের মহিলাদের যৌন ব্যবসায় নামতে বাধ্য করা হয়েছে। পরিবারের পুরুষ সদস্যরাই তাঁদের জন্য খুঁজে আনেন খদ্দের।
আরও পড়ুন:
বনসকাঁটা জেলার ভাদিয়া গ্রামে ৭৫০ জন মানুষের বাস। দিনের আলো ফুটলে গ্রামের পুরুষরা পালনপুর-থারাড হাইওয়েতে হাজির হন। সেখান থেকে ট্রাকচালক, পথচারী, আশপাশের গ্রাম, শহরের থেকে খদ্দের ধরে আনেন। অর্থাৎ পুরুষরাই হয়ে ওঠেন বাড়ির মহিলাদের দালাল। ভারতে বাল্যবিবাহ আইনত নিষিদ্ধ। তবে ভাদিয়ায় সে নিয়ম খাটে না। বাল্যবিবাহই এখানে বাড়ির মেয়েদের পতিতাবৃত্তি থেকে সরিয়ে ফেলার রীতি। মেয়েদের পতিতাবৃত্তি থেকে দূরে রাখার একমাত্র রক্ষাকবচ।

পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই গ্রামের ১৯ বছরের এক তরুণী বলেন, বাড়িতে তাঁর মা ও দিদা দুজনেই যৌনকর্মী। ১১ বছর বয়সে তাঁর বাগদান হয়, ১৮ বছরে বিয়ে। বর্তমানে তিনি একটি কলেজে নার্সিং পড়েন। তাঁর কথায়, “আমি বাবা ও কাকাকে দেখতাম মা ও দিদার জন্য খদ্দের ধরে আনত। আমার মা বলেছিলেন, তাঁদের এই কাজে বাধ্য করা হয়নি। দারিদ্রের কারণে গ্রামের বাকিদের মতো এই প্রথা তিনি গ্রহন করেছেন। আমার বাবা আসল বাবা কি না সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত নন। তবে তিনি আমায় এই ব্যবসায় নামতে দেননি। ১১ বছরে আমার বিয়ে দিয়ে দেন।” গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি জানান, পতিতাবৃত্তিতে জড়িত মহিলারা বেশিরভাগ সময় বাড়ির অন্দরে থাকেন, পরিবারের বাকি সদস্যরা তাঁদের জন্য খদ্দের খুঁজে আনেন। গ্রামের ৭৫০ জন বাসিন্দার মধ্যে ৩৫০ জন মহিলা। এদের বেশিরভাগই যৌন পেশায় যুক্ত।
ভারতে বাল্যবিবাহ আইনত নিষিদ্ধ। তবে ভাদিয়ায় সে নিয়ম খাটে না। বাল্যবিবাহই এখানে বাড়ির মেয়েদের পতিতাবৃত্তি থেকে সরিয়ে ফেলার রীতি। মেয়েদের পতিতাবৃত্তি থেকে দূরে রাখার একমাত্র রক্ষাকবচ।
১৫ বছরে যৌনপেশায় লিপ্ত হওয়া চন্দ্রা সারনিয়া বলেন, “বাল্যকালে আমি আমার মেয়ের বিয়ে দিতে চাইনি। কিন্তু আমাকে বলা হয়, এখানে এটাই রীতি অন্যথায় মেয়েকে যৌনপেশায় লিপ্ত হবে। বাধ্য হয়েই মেয়েকে ১২ বছর বয়সে বাগদান করাই এবং ১৮ বছরে বিয়ে দেই। বর্তমানে সারনিয়া একটি ছোট দুধের খামার চালান। ১৯৬৩ সালে সরকার তাঁর পরিবারকে চাষাবাদের জন্য জমি দিয়েছিল, কিন্তু গ্রামে সেচের সুবিধা না থাকায় তাকে যৌনকর্মেই ফিরতে হয়। যৌন ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থে চন্দ্রা তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়েকে বড় করেছেন। ২০১২ সালে এখানে গণবিবাহের আসর বসে এক এনজিওর দৌলতে। সেবার বহু মেয়ে পতিতাবৃত্তির অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এরপর থেকে এখানে প্রতিবছর গণবিবাহের আয়োজন হয়। বহু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এখানকার বাসিন্দাদের জন্য বিকল্প আয়ের রাস্তা তৈরি করছে। ১৬০টি পরিবারের মধ্যে ৯০টি পরিবারকে এই ব্যবসা ছাড়তে রাজি করানো হয়েছে।

বিচার্তা সমাজ সমর্থন মঞ্চ নামক এনজিও-র প্রতিষ্ঠাতা মিত্তাল প্যাটেল বলেন, কিছু সমাজকর্মী এখানে বাল্যবিবাহের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু পতিতাবৃত্তির চেয়ে বাল্যবিবাহ শ্রেয়। এখানকার বাবা-মায়েদের জন্য মেয়েদের শিক্ষা এবং উন্নত জীবনে পা রাখার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার উপায়ও বটে। অবশ্য এটাও ঠিক যে এই গ্রামে মেয়েদের জন্য পাত্র খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়, কারণ গ্রামের সঙ্গে কলঙ্ক জড়িয়ে রয়েছে। উল্লেখ্য, সারনিয়া সম্প্রদায় হল যাযাবর উপজাতি। লোককথা অনুযায়ী, এরা একসময় মেবারের মহারানা প্রতাপের সেনাবাহিনীর সঙ্গী ছিলেন। পুরুষরা যখন ঢাল ও তলোয়ারের মতো অস্ত্র শান দিত, তখন মহিলারা সৈন্যদের মনোরঞ্জন করত। কিংবদন্তি অনুসারে, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলে সারনিয়ারা তাদের কাজ হারায়। অন্য কোনও উপায় না থাকায়, পেটের দায়ে তারা আবার পতিতাবৃত্তিতে ফিরে আসেন। ‘পতিতাদের গ্রাম’ এই কলঙ্ক ঝেড়ে ফেলার লড়াইয়ে ভাদিয়া গ্রামের মানুষ এখন তাদের অতীতের আশ্রয়ে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
গুলতি ছুঁড়ে অভিনব কায়দায় চুরি! মন্ত্রীর পাড়ায় হানা দিতেই জালে বিহারের ৪ দুষ্কৃতী
-
গঙ্গা-পদ্মার গ্রাসে চলে যাবে ৪০ কিলোমিটার! ভাঙন ও ধসে আতঙ্কে ফরাক্কা থেকে লালগোলা
-
‘বিনা পারিশ্রমিকেও অভিনয়ে রাজি,’ হলিউডে পাড়ি ‘মহারাজা’ বিজয় সেতুপতির!
-
বিদেশভূমে সিরিজের মাঝপথে ভারতের নেতৃত্ব ছাড়বেন গিল! ব্যস্ত সূচিতে ভাগ হবে কোচিং দলও
-
‘শিবরাত্রির সলতে’ রেজিনগর, উপনির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপাছেন মমতা, প্রচারে অভিষেক-প্রিয়াঙ্কা-সহ ২০!