Pancreatic Cancer

প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার কেন দেরিতে ধরা পড়ে? কোন লক্ষণগুলো অবহেলা নয়, জানালেন বিশেষজ্ঞ

অকারণে কমে যায় ওজন, হঠাৎ ধরা পড়ে ডায়াবেটিস, পিঠে হালকা ব্যথা বা হজমের অস্বস্তি। ভাবি, এ তো সামান্য সমস্যা। অথচ এই ছোট ছোট সংকেতের আড়ালেই কখনও লুকিয়ে থাকতে পারে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং ক্যান্সার। ব্যাখ্যায় পিয়ারলেস হসপিটালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যান্ড লিড সার্জন।

ডা.‌ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
ডা.‌ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: জুলাই ১৭, ২০২৬, ১৬:৪৭

options
link
প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার কেন দেরিতে ধরা পড়ে? কোন লক্ষণগুলো অবহেলা নয়, জানালেন বিশেষজ্ঞ
কারা বেশি ঝুঁকিতে? ছবি: সংগৃহীত

একসময় এই রোগের নাম উচ্চারণ মানেই ছিল গভীর অনিশ্চয়তা। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগ ধরা পড়ত অনেক দেরিতে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান কখনও স্থির থাকে না। গত এক দশকে আধুনিক কেমোথেরাপি, উন্নত অস্ত্রোপচার, জিনগত পরীক্ষা, প্রিসিশন মেডিসিনের অগ্রগতিতে বদলেছে এই রোগের চিকিৎসার মানচিত্র।

Advertisement

আজ আর পানক্রিয়াটিক ক্যানসার শুধু নিরাশার গল্প নয়; সময়মতো শনাক্ত হলে এবং সঠিক পরিকল্পনায় চিকিৎসা শুরু হলে অনেক রোগী দীর্ঘদিন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

Advertisement

নীরব অথচ অপরিহার্য
প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয় এমন একটি অঙ্গ, যার অস্তিত্ব আমরা প্রায় টেরই পাই না। অথচ প্রতিদিনের প্রতিটি খাবার হজম করা থেকে শুরু করে রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখা, সব ক্ষেত্রেই তার ভূমিকা অপরিহার্য। এই প্যানক্রিয়াসের কোষে যখন ক্যানসারের জন্ম হয়, তখন সেই রোগও অনেক সময় নীরবতাকেই আশ্রয় করে। আর সেখানেই লুকিয়ে থাকে এর সবচেয়ে বড় বিপদ।

Advertisement
pancreatic cancer symptoms early diagnosis treatment
নীরবে বাড়ে ঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত

কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষ করে ৬০ বছরের বেশি বয়সি মানুষ, ধূমপায়ী, দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, স্থূলতা, দীর্ঘস্থায়ী প্যানক্রিয়াটাইটিস বা পরিবারে এই ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে সতর্ক থাকা জরুরি। কিছু ক্ষেত্রে BRCA1, BRCA2 বা PALB2-এর মতো জিনগত পরিবর্তনও ঝুঁকি বাড়ায়।

শরীর যে ভাষায় সতর্ক করে
পানক্রিয়াটিক ক্যানসার খুব কমই উচ্চস্বরে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। বরং ছোট ছোট সংকেত পাঠায়—

  • অকারণে ওজন কমে যাওয়া
  • ক্ষুধামান্দ্য
  • দীর্ঘদিনের পেট বা পিঠব্যথা
  • হঠাৎ নতুন করে ডায়াবেটিস ধরা পড়া
  • জন্ডিস
  • গাঢ় প্রস্রাব
  • ফ্যাকাশে পায়খানা

বিশেষ করে ৫০ বছরের পর হঠাৎ ওজন কমার সঙ্গে নতুন করে ডায়াবেটিস ধরা পড়লে সেটিকে শুধুই কাকতালীয় ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।

pancreatic cancer symptoms early diagnosis treatment
হঠাৎ ডায়াবেটিস অবহেলা নয়। ছবি: সংগৃহীত

কেন এত দেরিতে ধরা পড়ে?
অগ্ন্যাশয় শরীরের গভীরে অবস্থান করে। তাই ছোট টিউমার সহজে ধরা পড়ে না। আবার গ্যাস, বদহজম বা সাধারণ পিঠব্যথার মতো উপসর্গ অনেক সময় রোগটিকে আড়াল করে রাখে। অগ্ন্যাশয়ের মাথার অংশে ক্যানসার হলে জন্ডিস তুলনামূলক দ্রুত ধরা পড়ে। কিন্তু বডি বা টেইল অংশে ক্যানসার উপসর্গ অস্পষ্ট থাকে, ফলে রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়।

রোগ শনাক্তের আধুনিক পথ
বর্তমানে রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, কনট্রাস্ট সিটি স্ক্যান, এমআরআই, এন্ডোস্কোপিক আলট্রাসাউন্ড, বায়োপসি, পেট-সিটি এবং সিএ-১৯-৯-এর মতো টিউমার মার্কার চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করছে। প্রয়োজনে জিনগত পরীক্ষাও করা হয়।

স্ক্রিনিং- সবার জন্য নয়
বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য পানক্রিয়াটিক ক্যানসারের কোনও নিয়মিত স্ক্রিনিং নেই। তবে যাঁদের পরিবারে একাধিক সদস্য আক্রান্ত বা যাঁদের বংশগত ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকা উচিত।

চিকিৎসার নতুন দর্শন: আগে যুদ্ধের প্রস্তুতি, তারপর অস্ত্রোপচার
একসময় মনে করা হতো, ক্যানসার ধরা পড়লেই দ্রুত অস্ত্রোপচারই একমাত্র পথ। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। আজ অনেক বর্ডারলাইন রিসেক্টেবল প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার (বিআরপিসি)‌ রোগীর ক্ষেত্রে প্রথমে আধুনিক কেমোথেরাপি দিয়ে টিউমার ছোট করা হয়। প্রয়োজনে রেডিওথেরাপিও দেওয়া হয়। এরপর জটিল কিন্তু পরিকল্পিত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্যানসার অপসারণ করা হয়। লোকাল অ্যাডভান্সড প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার (এলএপিসি)‌ রোগীর ক্ষেত্রেও, যাঁদের আগে অস্ত্রোপচারের সুযোগ ছিল না, এখন কেমোথেরাপি এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে স্টেরিওট্যাকটিক বডি রেডিওথেরাপি (‌এসবিআরটি)‌ দেওয়ার পর সফল অস্ত্রোপচার সম্ভব হচ্ছে। অগ্ন্যাশয়ের চারপাশের রক্তনালি ও স্নায়ুর সঙ্গে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা থাকায় এসব অস্ত্রোপচার অভিজ্ঞ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ক্যানসার সেন্টারেই করা উচিত।

pancreatic cancer symptoms early diagnosis treatment
উপেক্ষায় বাড়ে বিপদ। ছবি: সংগৃহীত

চিকিৎসা এখন শুধু অস্ত্রোপচার নয়
আজও সম্পূর্ণ নিরাময়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে সফল অস্ত্রোপচারের মধ্যেই। তবে বাস্তবতা হল, রোগ ধরা পড়ার সময় মাত্র ১৫-২০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই সরাসরি অস্ত্রোপচার সম্ভব হয়। তাই সময়মতো রোগ শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আধুনিক চিকিৎসায় কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, জিনগত পরীক্ষা, প্রিসিশন মেডিসিন, রোবটিক সার্জারি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (‌এআই)‌- সবকিছুই একসঙ্গে রোগীর জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। আজ চিকিৎসা মানেই শুধু রোগের বিরুদ্ধে লড়াই নয়; রোগীকে সেই লড়াইয়ের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখন প্রি-হ্যাবিলিটেশন, অর্থাৎ, অস্ত্রোপচারের আগেই পুষ্টি, ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি ও শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

জীবনযাপনের ছোট পরিবর্তন, বড় সুরক্ষা
সব ক্ষেত্রে এই ক্যানসার প্রতিরোধ করা না গেলেও ধূমপান ত্যাগ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

মনে রাখুন
পানক্রিয়াটিক ক্যানসার মানেই শেষ নয়। একসময় যে রোগকে শুধু নীরব আতঙ্কের প্রতীক মনে করা হতো, আজ সেই রোগের চিকিৎসায় এসেছে নতুন দিগন্ত। আধুনিক কেমোথেরাপি, উন্নত সার্জারি, প্রিসিশন মেডিসিন এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক দলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় রোগীরা আজ শুধু দীর্ঘদিন বেঁচে থাকছেন না, ফিরে পাচ্ছেন জীবনের মানও।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.