সৌরভ মাজি, বর্ধমান: প্রকৃতি পরে নিয়েছে শারদীয়া সাজ। বাতাসে বাতাসে যেন পুজোর গন্ধ। ভোরের শিশিরে গা-ধোয়া ধবধবে শিউলিরা জানান দিচ্ছে। কাশের বন মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানাচ্ছে। উমা আসছেন। পুজোয় সাজো সাজো রব গোটা বাংলায়। শুধু শ্মশানের নীরবতা এ বঙ্গেরই এক গ্রামে। মায়ের আবাহন মানেই সেখানে মৃত্যুর কালো ছায়া। আর তাই দুর্গাপুজো নিষিদ্ধ বর্ধমানের গলসির বাবলা গ্রামে।
গলসি-২ ব্লকের প্রায় সব গ্রামেই দুর্গাপুজো হয়ে থাকে। ইতিমধ্যেই মণ্ডপের কাজ প্রায় সারা। আর ক’দিন পরে চলে আসবে প্রতিমাও। আলোর রোশনাইয়ে ভেসে যাবে গ্রামের পর গ্রাম। মালিন্য ভুলে কটাদিন আনন্দে ভেসে যাবেন সকলে। ব্যতিক্রম এই বাবলা গ্রাম। শুকনো মুখে পড়শি গ্রামের সেই আনন্দ আয়োজনের দিকে সকলে তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু কী আর করা যাবে! পুজো হওয়া মানেই তো গ্রামে মৃত্যুর পদচারণা। আর তাই সারা বাংলা আনন্দে মাতলেও, নিজেদেরকে সরিয়ে রাখেন গ্রামবাসীরা। সেখানে নেই কোনও পুজোর আয়োজন।
[ পুজোয় মননের সুলুকসন্ধান টালা পার্ক প্রত্যয়ে ]
পুজো না হওয়ার এ ইতিহাস বেশ করুণ। ভয়ঙ্কর, আতঙ্কেরও। আক্ষেপ করছিলেন গ্রামের এক প্রবীণ নাগরিক। শারদোৎসব করতে গেলেই যে বিপদ ঘনিয়ে আসে। অপমৃত্যু ঘটে আয়োজকদের। তাই আর ঝুঁকি নিয়ে কেউ পুজো করার সাহস দেখান না গ্রামে। হ্যাঁ, একসময় এই গ্রামেও সাড়ম্বরেই দুর্গাপুজো হত। জনশ্রুতি অনুযায়ী, দেড়শো বছরেরও বেশি সময় আগে গ্রামে দুর্গাপুজো চালু হয়েছিল। এই ব্লকের আদড়াহাটি গ্রামের সেন পরিবার সেখানে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেছিলেন। আদড়াহাটি গ্রাম থেকে ওই পরিবার বাবলা গ্রামে উঠে আসেন দেড়শো বছর আগে। পুজোও শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু সেই দুর্গোৎসব মাত্র দুই বছর নাকি স্থায়ী হয়েছিল। লোকমুখে শোনা যায়, এই গ্রামে আসার পর সেন পরিবারের প্রথম বছরের দুর্গাপুজোর অষ্টমীর দিন মৃত্যু হয় এক গৃহকর্তার। পরের বছর সেন পরিবারের এক জামাতা ঘটা করে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেছিলেন। কাকতালীয় হলেও, সেবারও অষ্টমীর দিন অপমৃত্যু ঘটে সেন পরিবারের সেই জামাতার।
[ মহিষাসুরমর্দিনী রেকর্ড করা ঠিক হয়নি: সন্ধ্যা ]
এরপর থেকেই গ্রামে বন্ধ হয়ে যায় দুর্গাপুজো। পরপর দুই বছর দুর্গাষ্টমীর দিন এইভাবে অপমৃত্যুর ঘটনা গ্রামের উৎসবটাকেই যেন চিরতরে বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে পুজো। নবীন প্রজন্মের অনেকেই এ ঘটনাকে কুসংস্কার বা কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেন। বিজ্ঞানসম্মতভাবে তো এ ঘটনার কোনও ব্যাখ্যা মেলে না। ফলে আবার আশায় বুক বাঁধা। বছর সতেরো বাদে ফের আনন্দের বাদ্যি বেজে উঠেছিল গ্রামে। উদ্যোগী কয়েকজন যুবক আয়োজন করেন পুজোর। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে দুর্গাষ্টমীর দিন সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। মহাষ্টমীর দিন পাশের ইরকোনা গ্রামের পুকুর থেকে পদ্মফুল আনতে গিয়েছিলেন আয়োজক যুবকরা। আয়োজকদের অন্যতম ছিলেন সাগর সেন। ইরকোনার পদ্মপুকুরে হাঁটুজলে ডুবে মৃ্ত্যু হয় সাগরের। কোনওক্রমে সেবার পুজোর বাকি দিনগুলি কাটিয়ে দেন বাসিন্দারা।
সেই শেষ। গ্রামে আর হয়নি দুর্গাপুজো। আর হবেও না বলে জানাচ্ছেন গ্রামের বর্তমান প্রজন্মের বাসিন্দারা। কুসংস্কারই হোক, বা অন্ধবিশ্বাস, অপমৃত্যুর ভয় গ্রাস করেছে গ্রামকে। দুর্গাপুজোর আয়োজন করেত গিয়ে নিকটজনকে হারাতে কেই বা চায়! তাই নেই পুজোর গ্রাম হয়েই থেকে গিয়েছে বাবলা।
[ আলপনায় রাস্তা রাঙিয়ে শহরে রঙিন মহালয়া ]
দুর্গাপুজোর আয়োজন না করলেও পাশের গ্রামে গিয়ে অঞ্জলি অবশ্য দেন মহিলারা। অষ্টমীতে লুচি খান বাসিন্দারা। দশমীর জন্য নারকেল নাড়ুও আগে থেকেই করে রাখেন। রীতি মেনে গুরুজনদের প্রণাম, বন্ধুস্থানীয়দের সঙ্গে কোলাকুলি সবই করেন বাসিন্দারা। কিন্তু প্রতিমা এনে দুর্গাপুজোর আয়োজন নৈব নৈব চ।
(ছবি: প্রতীকী )
সর্বশেষ খবর
-
‘ফুটবল মহাকাব্য হলে, আপনি কর্ণ, যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্রোয়েশিয়ার আলো’, লুকা মদ্রিচকে খোলা চিঠি
-
গোল করে নজির, বিশ্বকাপ স্বপ্নে এগোলেন রোনাল্ডো, ‘বন্ধু’র কাছে হেরে বিদায় মদ্রিচের
-
লাইফ বিগিনস অ্যাট ৪০… গোল করে বিশ্বকাপে জোড়া ইতিহাস রোনাল্ডোর
-
টিকিটাকায় ধরাশায়ী অস্ট্রিয়া, দুর্বার গতিতে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় স্পেন
-
মিড ডে মিলের মাংস দিয়ে স্যারের বিবাহ বার্ষিকীর ভোজ! শান্তিপুরের স্কুলে তুমুল শোরগোল