Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ১০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ২৮ আগস্ট ২০২৬
Durgapur

বাল্যবিবাহ রুখে ‘শিল্পী দিদিমণি’র হাফ সেঞ্চুরি পার, বললেন, ‘অসুখ থেকে সেরে উঠুক বাংলা’

এলাকায় 'দিদিমণি' নামেই পরিচিত শিল্পী পাল। বাল্যবিবাহের খবর পেলেই সটান হাজির হন গ্রাম তিনি।

সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: জুলাই ১৩, ২০২৬, ১৫:৩৪

link
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: জুলাই ১৩, ২০২৬, ১৫:৩৪

options
link
বাল্যবিবাহ রুখে ‘শিল্পী দিদিমণি’র হাফ সেঞ্চুরি পার, বললেন, ‘অসুখ থেকে সেরে উঠুক বাংলা’ zoom
বাল্যবিবাহ রোধে শিল্পী। দুর্গাপুরের বিধাননগর ফাঁড়ির সামনে। ছবি: সনাতন গরাই
Advertisement

এক বা দুই নয়, নাবালিকা বিবাহ রুখে হাফ সেঞ্চুরি এক নারীর। বিপথে থেকে ‘পথে’ ফিরে সেই সব নাবালিকারা সাবালিকা হয়েছেন। জীবনে সঙ্গীও এসেছে। তবে কখনই তাঁরা ভোলেন না সেই দিদিমণির কথা। শুধু সেই সব সাবালিকারাই নন, দুর্গাপুর (Durgapur) তল্লাট জুড়ে দিদিমণিকে ‘দশভূজা’রূপে কুর্ণিশ জানান সকলেই।

এলাকায় ‘দিদিমণি’ নামেই পরিচিত শিল্পী পাল। বাল্যবিবাহের খবর পেলেই সটান হাজির হন গ্রাম কী শহর। তারপর পুলিশ-প্রশাসনের কর্তাদের ডেকে সেই বিবাহ রুখে দেন তিনি। অভিভাবকরাও মুচলেকা দেন, আঠারো বছর বয়স ছাড়া মেয়ের বিয়ে দেবেন না। এভাবে বাল্য বিবাহ রুখতে রুখতে শিল্পী ৫১ ছুঁয়ে ফেলেছেন।

Advertisement

দশ বছর আগের সেই দিনটা এখনও বেশ মনে পড়ে শিল্পীর। পরিচিত শিক্ষিকার ফোন পেয়েই পৌঁছে গিয়েছিলেন তাঁর স্কুলে। ক্লাস এইটের ছাত্রীটি বাংলা ক্লাসে গুম হয়ে বসেছিল। ক্লাস টিচার কারণ জানতে চাইতেই মেয়ে কেঁদেকেটে একসা! অসুস্থ দিনমজুর বাবা আর ছ’জনের সংসার চালাতে পারছেন না। তাই চার ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় মৌসুমীকে এখনই বিয়ে দিয়ে পার করতে তৈরি! কিন্তু সে পড়তে চায়। শুনে তো গোটা টিচার্সরুম তাজ্জব! অতঃপর অঘটন ঠেকাতে শিল্পীকে তলব। প্রথমে থানা-পুলিশ। সেই শুরু, তারপর থেকে মুচিপাড়া, জেমুয়া, আড়া, কাঁকসা যেখানেই স্কুলপড়ুয়াদের বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর চেষ্টা হয়েছে, ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন শিল্পী পাল।

সেই মৌসুমী এখন এক বেসরকারি হাসপাতালের নার্স। শুধু মৌসুমীই নয়, বাবা-মাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কিংবা সটান ছাদনাতলায় পৌঁছে শিল্পী গত কয়েক বছরে যাদের বিয়ে আটকেছেন, তারা অনেকেই এখন মূলস্রোতে। কেউ ব্যস্ত উচ্চশিক্ষায়। চাকরি পেয়ে কারও জীবনে রং বদল হয়েছে। মোড় ঘুরে গিয়েছে। সংসারও পেতেছেন কেউ কেউ। তবে স্বেচ্ছায়, পড়াশোনা শেষ করেই। বীরভানপুরের ত্রিশের কোঠার শিল্পী পাল যুদ্ধের মাঠে। রাতই হোক বা দিন। ঠা ঠা রোদই হোক কিংবা ঝড়জল। বাল্যবিবাহের খবর পেলেই ‘অপারেশনে’ তিনি এক পায়ে খাড়া। শিল্পী বলছিলেন, অনেক সময় খবর আসে একেবারে শেষ মুহূর্তে। তখন আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করেন না। সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে সটান হাজির হন বিয়ে বাড়িতে।

এই কাজে বাধাও কম আসেনি। কখনও পরিবারের আপত্তি পাঁচিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনও স্থানীয় মানুষের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় উত্তপ্ত পরিস্থিতিরও মুখোমুখী হতে হয়েছে। বছর তিনেক আগে জেমুয়াতে তো সেবার প্রায় গণধোলাইয়ের মুখোমুখি! বিয়ের দিনই খবর পেয়ে পুলিশ নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন শিল্পী। কিন্তু বাড়িভর্তি লোকের মাঝে বিয়ের পিঁড়ি থেকে মেয়ে তুলে নিয়ে বিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার কথা শুনেই পরিবারের লোকজন তো চটে লাল! ক্ষেপে গিয়ে চড়াও কার্যত গোটা গ্রাম। শিল্পী নিজে তো বটেই, পুলিশও বোঝাতে গিয়ে ফেল মেরে যাওয়ার জোগাড়। ভাগ্যিস মাস্টারমশাই ছিলেন! কনে যে স্কুলে পড়ত তার প্রধানশিক্ষককে খুব মানতেন এলাকার মানুষ। শেষে তিনি এসেও বিয়ে বন্ধের নিদান দেওয়ায় রণে ভঙ্গ দেন কনের বাবা-মা। ঠিক এভাবেই বিপত্তি হয়তো হয়েছে, কিন্তু কোনও বাধাই শেষমেশ টেকেনি। কারণ, আইনই হাতিয়ার শিল্পীর, সঙ্গী প্রশাসন। রেললাইনে উদ্ধার হওয়া একটি মৃতদেহের পরিচয় উদ্ধার করে কোনও একসময় স্বজনদের হাতে তুলে দিতে সাহায্য করেছিলেন। তারপর থেকে এ পর্যন্ত আটজন মৃতের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ায় সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন তিনি। বাল্য বিবাহ ‘অসুখ’ থেকে সেরে উঠুক বাংলা। চাইছেন ‘রণে’ অক্লান্ত শিল্পী। আক্ষরিক অর্থে তিনি শিল্পীই!

Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.