রঞ্জন মহাপাত্র: সৈকতে মাছভাজার আড়ালে অফুরান মদ! কেউ আবার সমদ্রতটে গর্ত খুঁড়ে বালির নিচে মদের বোতল রাখে গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য। মাছভাজা আছে অথচ পানীয় নেই, উদয়পুর বিচে এরকম একটি দোকানও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এপারে বাংলা। উঁকি মারলেই ওড়িশা। বিস্তীর্ন সমুদ্র তট। ফুরফুরে হাওয়া। সারি সারি নৌকা প্রহর গুনছে সমুদ্রে পাড়ি দেওয়ার জন্য। “দাদা ঠান্ডা হবে তো?” উন্মুক্ত সমুদ্র তটে মাছ কিংবা কাঁকড়া ভাজা বিক্রির দোকানে ঠাণ্ডা? ভুল শুনলেন না তো? অপেক্ষা করুন। খেলাটা দেখুন।
দোকানের সামনে পাতা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। ফাইবারের লাল—নীল টেবিলে পৌঁছে যাবে কাঁকড়া ভাজা, মাছের ভাজা। টেবিলে মাছ ভাজার প্লেট রাখার সঙ্গে সঙ্গে দোকানে ফাইফরমাশ খাটা বছর বারো—চোদ্দোর ছেলেটিই জিজ্ঞাসা করবে, ঠান্ডা না গরম? যদি বলেন ঠান্ডা, তাহলে বোতলের গায়ে জল ঝরে পড়া বিয়ারের বোতল চলে আসবে। আর গরম বললে রাম বা হুইস্কির দু’পেগ গ্লাসে ঢালা। আবার একটু বাবুয়ানি করতে চাইলে ডাবের জলে ভদকাও নিয়ে হাজির হবে ওই ফাইফরমায়েশ খাটা ছেলেটা।
[দিঘার হোটেলে নেওয়া যাবে না অতিরিক্ত ভাড়া, চরম হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর]
বিচে বসে প্রকাশ্যে মদ? দিঘায় এই ছবিটা এখন দেখা না গেলেও উদয়পুরে এটি পরিচিত ছবি। বাংলা ও ওড়িশার সীমানায় এই সমুদ্রতটের দুই প্রান্তেই মাছের দোকানের আড়ালে চলছে মদের দোকান। দোকানের সামনে বড় থার্মকলের পেটি কিংবা ছোট ছোট ফ্রিজ। বিদুৎ যোগাযোগ নেই। তাই পেটি বা ফ্রিজ বরফ ঠাসা থাকে। ঠাণ্ডা ছাড়া বিয়ার খাবে কে? আর মদের বোতল? দোকানের ভেতর একেবারে সাধারণ ঝোলা ব্যাগে এমনভাবে পড়ে থাকে কারও সন্দেহের কোনও কারণই থাকে না। কেউ আবার সমদ্র তটে গর্ত খুঁড়ে বালির নিচে মদের বোতল রাখে গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য। কিন্তু মাছভাজা আছে, পানীয় নেই, উদয়পুর বিচে এরকম একটি দোকানও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এই এলাকায় মূলত ওড়িশা থেকে কম দামে মদ কিনে চড়া দামে পর্যটকদের বিক্রি করে থাকেন ব্যবসায়ীরা।
ওড়িশার মদ এমনিতে একটু কড়া, তবে দ্রুত নেশা হওয়ার পক্ষে বেশ কার্যকরী। বোতলের লেবেল প্রায় একই রকম। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নকল মদ। একেবারে শাঁখের করাতে কাটার অবস্থা হয় পর্যটকদের। একে মদ, তার উপর আবার নকল। সমুদ্রতটের প্রবল হাওয়া নেশাকে জোরালো করে। সমুদ্র তখন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। সটান সমুদ্রে নেমে পড়া। আবার মন চাইলে স্পিড বোট কিংবা টিউব তো অপেক্ষাতেই আছে। একটু বেপরোয়া হলেই আর কিছু করা থাকছে না। ঘটছে মৃত্যু। তাহলে প্রশাসন কী করছে? উদয়পুর ও দত্তপুর সমুদ্র পাড়ে থাকা দোকানগুলোর বৈধতাই নিয়েই তো প্রশ্ন। অনেকেরই বক্তব্য, দোকানগুলির কোন বৈধতাই নেই। উদয়পুর বেড়াতে আসা এক কলকাতার পর্যটকও প্রশ্নটা তুললেন। বললেন, “দিঘা—শংকরপুর উন্নয়ন পর্ষদের ভাঙন রোধে তৈরি করা গার্ড ওয়ালেও ব্যবসায়ীরা দোকান পেতে ফ্রিজ বসিয়ে মদ বিক্রি করছে।” চাইলেই নাগালে মদ। তার জন্য শুধু একটু বেশি দাম। একেবারে বিচের হাওয়ায় নেশা করার টোপ, সঙ্গে গরম গরম মাছ ভাজা।
[ভুয়ো পোস্ট ছড়ানোর দায়ে আসানসোলে গ্রেপ্তার বিজেপি নেতা]
দিঘা—শংকরপুর উন্নয়ন পর্ষদ থেকে পুলিশ প্রশাসন দিঘা, মন্দারমণি, তাজপুর কিংবা উদয়পুর সমস্ত সমুদ্র সৈকতে মদ্যপানের উপদ্রব বেড়েছে বলে স্বীকারও করেছে। আর তার ফলেই স্নান করতে নেমে তলিয়ে যাওয়ার লিস্টও লম্বা হচ্ছে পুলিশের খাতায়। এক্ষেত্রে পর্যটকদের বেপরোয়া মানসিকতা দায়ি হলেও, বিচে যেভাবে দেদার মদ বিক্রি হয়, সে দায় কার? একথা ঠিক, দিঘার বিচে প্রকাশ্যে মদ খাওয়ার সুযোগ নেই, তবু ‘জলে জল’ (মিনারেল ওয়াটারের বোতলে ভদকা মেশালে বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই) মিশিয়ে দিঘার সমুদ্র পাড়ে বসে মদ খাওয়া চলে। সিসিটিভিতে তা ধরা পড়ার কথাও নয়, পড়েও না। পুরানো দিঘা থেকে নতুন দিঘা পর্যন্ত সৈকত বরাবর উন্নয়ন পর্ষদের সহযোগিতায় পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ প্রশাসন সিসি ক্যামেরা বসালেও সে সবের বালাই নেই অন্য অনেক বিচে। কিন্তু তা বলে বিচের প্রায় প্রতিটি দোকানে ওড়িশার মদ বিক্রি ধরতে সিসিটিভির প্রয়োজন আছে কি? প্রশ্নটা তুলেছেন পর্যটকরাই। প্রশাসন বলছে, ওয়াচ টাওয়ার তৈরি হয়েছে পালা করে সমুদ্র স্নানের উপর নজরদারির জন্যে। মোতায়েন রয়েছে সিভিক ভলেন্টিয়ার ও বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের কর্মী। সমুদ্র স্নানের ঘাটগুলিতে রয়েছে নুলিয়া। সেইসঙ্গে রাজ্য পুলিশের ডিআইবি দফতরের এক এএসআই সহ সাতজন বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কর্মীকে ওয়াকিটকি হাতে সমুদ্র পাড়ে নজরদারির জন্যে মোতায়েন করেছে জেলা পুলিশ। তারপরেও নজর এড়িয়ে পর্যটকরা সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছেন এবং মৃত্যু ঘটছে। তাতে কপালে ভাঁজ পড়েছে জেলা পুলিশ প্রশাসনের।
পর্যটকদের মদ্যপ অবস্থায় সমুদ্র স্নানের উপর নামার উপর সম্পূর্ন নিষেধাজ্ঞা জারি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে। দিঘা সি বিচে প্রকাশ্য মদ্যপান না হলেও তাজপুর, মন্দারমনি কিংবা উদয়পুর বিচের দোকানগুলোতেই প্রকাশ্যে মদ বিক্রি ও খাওয়া দুটোই চলছে। মাঝে মাঝে পুলিশের অভিযানের ফলে তা বন্ধ হয়ে গেলেও কোন এক অজ্ঞাত কারনে তা ফের চালু হয়ে যায়। তাজপুর ও মন্দারমণিতে বাংলার পুলিশ মাঝে মাঝে আইনি ব্যবস্থা নিলেও উদয়পুর বিচে প্রকাশ্য মদ্যপানের জন্যে কোন ব্যবস্থাই নেওয়া হয়না বলে অভিযোগ। উদয়পুর এলাকাটি বাংলার বর্ডার হওয়ায় দত্তপুর ও উদয়পুর মিলেই উদয়পুর সি বিচ হয়েছে। যদিও দত্তপুর বাংলার অংশে পড়লেও উদয়পুর পড়ছে ওড়িশা এলাকায়। ফলে ওড়িশা পুলিশ অভিযান চালালে মাছ ভাজার দোকান চলে আসে বাংলায় দিকে। দুই রাজ্যের সীমানা সমস্যা থাকার কারনে ব্যবসায়ীরা বাড়তি সুবিধা পেয়ে চলেছেন। বাংলার পুলিশ অভিযান চালালে ওড়িশা এলাকায় চলে যায় ব্যবসায়ীরা। এই চোরপুলিশ খেলায় বিরক্ত হয়ে সেভাবে ধড়পাকড়ও হয় না এখন। জেলা পুলিশ সুপার অলোক রাজোরিয়া বলেন, দিঘার নিরাপত্তা নিয়ে নবান্নে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্যে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানতে চাওয়া হয়েছিল আমরা তার উত্তর দিয়েছি।
[বসিরহাট কাণ্ডে উসকানি, বিজেপি নেত্রীর বিরুদ্ধে জোড়া এফআইআর]
সর্বশেষ খবর
-
কাচ ঢাকা কালো গাড়িতে অভিষেক, ঝুলতে ঝুলতে যাতায়াত নিরাপত্তারক্ষীদের! ‘যুবরাজে’র বিরুদ্ধে এফআইআর
-
হেপাইটাইটিস বি পজিটিভ রোগীর ত্বকে সফল অস্ত্রোপচার, দেবেন মাহাত মেডিক্যালে অসাধ্যসাধন
-
জোড়া গোলে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা কেন, শেষ ষোলোয় ইংল্যান্ড, বিশ্বকাপে কঙ্গোর রূপকথায় ইতি
-
অযোধ্যা পাহাড়ের হোটেলে গা ঢাকা দিয়েও হল না শেষরক্ষা, কীভাবে এসটিএফের জালে অদিতির স্বামী দেবরাজ?
-
খাস কলকাতায় নাবালিকাকে ‘গণধর্ষণ’, গ্রেপ্তার ২ অভিযুক্ত