চন্দ্রশেখর চট্টোপাধ্যায়, আসানসোল: ‘তোমরা যখন সেজেগুজে পুজো প্যান্ডেলে… আমার তখন সেফটি পিন ছেঁড়া স্যান্ডেলে।। পিঠে আমার মস্ত ঢাক, হাতে ঢাকের কাঠি… শারদপ্রাতে গাঁ ছেড়ে শহর পথে হাঁটি।’- এতো শুধু গান নয় যেন বাস্তব। দামোদরের পার লাগোয়া আসানসোলের সাঁকতোড়িয়ার ঢাকিরা শারদপ্রাতে গাঁ ছেড়ে ভিনরাজ্যের শহরের পথেই হাঁটা দেয় প্রতিবছর। পেটের টানে পরিবার ছেড়ে, বাড়ি ছেড়ে অনেক দূরের পুজো মণ্ডপেই কাটাতে হয় তাঁদের। আর পাঁচটা বাঙালির মতো শারদোৎসবের উষ্ণতা ছুঁতে পারে না এ গ্রামের পরিবারগুলিকে।

[আশ্বিনেই বাঙালির তেরো পার্বণের স্বাদ মালদহের মণ্ডপে]
আশ্বিন মাস কড়া নাড়তেই পুরোনো ঢাক নামিয়ে মেরামতির কাজ শুরু করে দেন ঢাকিরা। এই ঢাকের সুরেই প্রাণ পাবে মায়ের মৃন্ময়ী প্রতিমা। পুজো শুরুর মাস-খানেক আগে থেকে সাঁকতোড়িয়ার বাদ্যকর পাড়ায় শরতের ঘুম ভাঙে ঢ্যাং কুড়াকুড় শব্দে। পশ্চিম বর্ধমান জেলার সাঁকতোড়িয়ার বাদ্যকরপাড়া, ময়লাগাদা ও গাঙ্গুটিয়া গ্রামের ঢাকিরা মহড়া সেরে এখন মণ্ডপমুখী। গ্রামের প্রায় ২৫০টি পরিবারের প্রধান জীবিকা ঢাক বাজানো। তাই বংশ পরম্পরায় বাদ্যকরেরা স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছেন পিতৃপুরুষের ব্যাটন। রোহন বাদ্যকর জানান, পুজোর সময় তাঁরা যান পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ডে। কেউ কেউ ঢাক বাজানোর বায়না নিয়ে পাড়ি দেন প্রবাসী বাঙালি বাড়ির পুজোয় কিংবা অবাঙালিদের বারোয়ারি পুজো মণ্ডপে। কয়লার রাজধানী ধানবাদ, ইস্পাত শহর বোকারো, বৈদ্যনাথধাম দেওঘর, এমনকী বিহারের ভাগলপুরেও চারদিনের জন্য ঢাক বাজাতে যান সাঁকতোড়িয়ার ঢাকিরা। নিজের এলাকাতে ঢাক বাজানোর ডাক পেলেও দর-দাম তেমন পোষায় না। তাই নিতান্ত বাধ্য হয়েই ভিনরাজ্যে চলে যান তাঁরা।
[প্রশাসনের উদ্যোগে পুজোর কেনাকাটা, হাসি ফুটল অনাথ বাচ্চাদের মুখে]
এলাকার নামকরা ঢাকি বাদল বাদ্যকর জানান, সময় পরিবর্তনে পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে সাবেকি বোলের বদলে সমকালীন বাংলা অথবা হিন্দি গানের কদর অনেক বেশি। তাই বাড়তি কিছু বখশিসের আশায় তাঁরা পুজোর চার দিন নানারকম বোল তুলে নিয়ে যান সেখানে। ঢাকির স্ত্রী চায়না বাদ্যকরের ক্ষোভের সঙ্গে জানান, সবার জামা-কাপড় হয় পুজোর আগে। কিন্তু আমাদের ছেলে মেয়েদের নতুন পোশাক গায়ে ওঠে পুজোর পর। পুজোর চারটে দিন এই সমস্ত ঢাকিদের গায়ে ওঠে বিজ্ঞাপনের সস্তা গেঞ্জি। সেটাই তাঁদের কাছে পুজোর নতুন জামার গন্ধ। মহিলারা জানান পুরুষরা উৎসবের দিনে বাড়িতে থাকেন না। ছোট বাচ্চারাও কাঁসর নিয়ে বাবা-কাকাদের সঙ্গে চলে যান। অন্যকে বিনোদন দিয়ে গেলেও পুজোর সময় গোটা পাড়া থাকে নিস্তব্ধ, নিশ্চল। ঢাকিদের একাংশের বক্তব্য, জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর থেকে লোকশিল্পীদের বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করে। কিন্তু তাঁরা জানেন না কোথায় যেতে হবে, কী ভাবে আবেদন করতে হবে। তাঁরা শুধু জানেন, মনপ্রাণ দিয়ে ঢাকে সুর তুলতে। যে সুর শোনায় আনন্দময়ীর আগমনবার্তা। যে সুরে চাপা পড়ে যায় অনেক যন্ত্রণা, অপ্রাপ্তির কথা।
সর্বশেষ খবর
-
বিধায়কদের প্রশিক্ষণ শিবিরে বাম-তৃণমূলকে নিশানা, ‘রাজ্যকে দাঁড় করাতেই হবে’, সংকল্প মুখ্যমন্ত্রীর
-
‘এতে হইচই করার কিছু নেই’, রাম মন্দিরে চুরিকে গুরুত্বই দিচ্ছেন না উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী
-
রাস্তা আটকে ২১ জুলাই, আদালত অবমাননায় মমতা-অভিষেকের হলফনামা তলব হাই কোর্টের
-
স্বাধীন তিব্বতের দাবি! রাষ্ট্রসংঘের সদর দপ্তরের সামনে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মঘাতী যুবক
-
গোলও করেন, আবার লেখেনও! নরওয়েকে শেষ ষোলোয় তোলা নুসার লেখা বই এখন বেস্টসেলার