বাবুল হক, মালদহ: পরনে পুরনো জিনসের প্যান্ট আর হাফহাতা চেক জামা। হাতে মাটির তাল। তা দিয়েই হাত পাকানো চলছে বিশুবাবুর কারখানায়। এটাই তার ‘স্কুল’। পুজো এলেই এখানে মূর্তি গড়ার কাজে হাত লাগাতে পারে সে। নিখুঁত মূর্তিও গড়ে নিতে পারছে এখন। দু’বেলা খাবারও জুটে যাচ্ছে। কিন্তু লড়াইটা অন্য জায়গায়। একটানা প্রায় দেড় বছর ধরে স্বপ্ন দেখছে সে, “কবে যে আমি নিজের মা-বাবার মূর্তি গড়তে পারব!”
[মেয়েকে পিঠে নিয়েই মণ্ডপে যাবেন বাগডোগরার ‘উমা’]
দুর্গা ঠাকুর বানাতে বানাতে একদিন নিজের বাবা-মায়ের মূর্তি গড়তে চায় দশ বছরের সুজিত দাস। পুজো এলেই তাঁদের কথা মনে পড়ে যায় তার। বিশুবাবুর কারখানায় কাজের ফাঁকে ওকে চোখের জল মুছতেও দেখা যায়। আসলে মা-বাবার স্মৃতিটা এখনও ওর মনে টাটকা। বছর খানেক আগে অনাথ সুজিতকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিজের কারখানায় আনেন বিশুবাবু। তখন সুজিতের বয়স ছিল মাত্র আট। সেদিন সুজিতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল মাটির তাল। সেই প্রথম দিনই একটা শর্ত দিয়েছিল ছোট্ট ছেলেটি। বলেছিল, “মূর্তি গড়া শিখব। কিন্তু একদিন আমি আমার মা-বাবার মূর্তি গড়ব এখানেই।” এই শর্ত শুনে আর ‘না’ বলতে পারেননি বিশুবাবু। এরপর থেকে সুজিত একমনে প্রতিমা গড়ার কাজ করে চলেছে চাঁচোলের কুমোরটুলিতে। উত্তর মালদহের প্রখ্যাত মৃৎশিল্পী বিশু পালের কারখানায়। এই অল্প সময়েই সরস্বতী, লক্ষী ও দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে ফেলেছে সে।

[‘সবথেকে বড়’র লড়াই উত্তরবঙ্গে, কোচবিহারের বাজি ৮০ ফুটের মূর্তি]
তবে সুজিতের মা-বাবা কখনওই মৃৎশিল্পী ছিলেন না। সুজিতের বাড়ি ছিল চাঁচোলের জেলেপাড়ায়। বাবা বলরাম দাস ছিলেন একজন দিনমজুর। মা কল্পনাদেবী অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতেন। একমাত্র ছেলে সুজিতকে মানুষ করাটাই ছিল বাবা-মায়ের লক্ষ্য। কিন্তু বছর পাঁচেক আগে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে বলরামবাবু মারা যান। অর্থাভাবে স্বামীর চিকিৎসাও করাতে পারেননি কল্পনাদেবী। পরের বছরই রোগাক্রান্ত হয়ে সুজিতকে চিরদিনের মতো ছেড়ে চলে যান কল্পনাদেবীও। সুজিতের কপালে নিয়তি যেন অনাথের তকমা সেঁটে দেয়। সুজিত চাঁচোলের হাটেবাজারে, রাস্তাঘাটে ভবঘুরেদের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল। দু’বেলা খাবার জোটেনি। একদিন রাস্তার ধারে ফুটফুটে ছেলেটাকে ছেঁড়া পোশাকে খেলতে দেখেন বিশু পাল। হাতে মাটি-কাদা নিয়েই সে খেলছিল। বিশুবাবুর মনে হয়েছিল, ছেলেটি মাটির পুতুল বানানোর চেষ্টা করছে। কাছে গিয়ে সুজিতের খোঁজখবর নেন তিনি। জানতে পারেন, ওর কেউ নেই। তারপরই সুজিতকে রাস্তা থেকে কুমোরটুলিতে তুলে নিয়ে আসেন বিশুবাবু। তিনি বলেন, “ওকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খুব চেষ্টা করেছি। কিন্তু ও স্কুলে যেতেই চায়নি। শুধু বারবার বলে, আমি বাবা-মায়ের মূর্তি গড়ব।” সুজিতের স্কুল, বাড়িঘর, সবই এখন এই কারখানা। পুজোয় মূর্তি বানিয়েই আনন্দ পায় সে। দশ বছরের এই খুদে মৃৎশিল্পী সুজিত দাস আজও দেখছে সেই স্বপ্নই।
সর্বশেষ খবর
-
পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়! এবার আদালতে যাচ্ছেন ১০৫ সেতুর নিচের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা
-
ধোনির যোগ্য উত্তরসূরি হার্দিকই! তারকা অলরাউন্ডারের দলবদল নিয়ে মুখ খুলল সিএসকে
-
‘ফুটবল মহাকাব্য হলে, আপনি কর্ণ, যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্রোয়েশিয়ার আলো’, লুকা মদ্রিচকে খোলা চিঠি
-
গোল করে নজির, বিশ্বকাপ স্বপ্নে এগোলেন রোনাল্ডো, ‘বন্ধু’র কাছে হেরে বিদায় মদ্রিচের
-
লাইফ বিগিনস অ্যাট ৪০… গোল করে বিশ্বকাপে জোড়া ইতিহাস রোনাল্ডোর