উত্তরের তিস্তাপাড়ে দেবী প্রতি বছর আসেন রাজবংশী বধূ সাজে। যদিও থাকে না কোনও জমকালো রাজকীয় সাজ। এখানে দেবী নিতান্তই সাধারণ। পরনে ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘ফোতা’ অথবা ‘পাটানি’। অতি সাধারণ অলংকার। ঠোঁটের কোনায় যেন কবেকার চেনা হাসি! কয়েক দশক আগেও ঠিক যেমনটা দেখা যেত গ্রামের লাজুক চাষি ঘরনিদের মুখে। দেবীও তাঁদেরই মতো, যেন ঘরের মেয়ে! জলপাইগুড়ির (Jalpaiguri) ময়নাগুড়ি ব্লকের আমগুড়ি বাজার সংলগ্ন এলাকায় ২১৬ বছরের ওই দেবী আরাধনা আজও ঐতিহ্যে অমলিন। এই পুজোকে গবেষকরা ডুয়ার্সের আদি পুজো (Durga Puja) হিসেবেই মনে করেন।
রাজবংশী সমাজে দুর্গা ‘দেবী ঠাকুরানি’ নামে পরিচিত। বসুনিয়া পরিবারেও ওই নামে পুজো হয়ে থাকে। এখন চলছে প্রতিমা তৈরির তোড়জোড়। এখানে দেবী আর দশটি প্রতিমার মতো নয়, রক্তিম বর্ণের। চোখ, নাক ও মুখের গড়ন দেখে মনে হবে যেন ঘরের মেয়ে। পুরনো রীতি অনুসারে দেবীর মাথায় শোভা পায় শেয়ারা। কী এই শেয়ারা? আগে রাজবংশী সমাজে বিয়ের সময় কনে যে মুকুট মাথায় পরত, সেটিকে বলা হত শেয়ারা।
আরও পড়ুন:
রাজবংশী সমাজের রীতি মেনেই দেবীর আরাধনায় আগে ‘গ্রাম ঠাকুর’-এর পুজো হয়। এই গ্রাম ঠাকুর আদতে শিব। নবমীর দিন রাজবংশী রীতি মেনে যাত্রাপুজোর আয়োজন হয়। পুজো মণ্ডপে কৃষিজ সামগ্রীর পুজোও। সবুজের গন্ধ মাখা গাঁয়ের সরল আন্তরিকতা এই পুজোর পরম প্রাপ্তি। পুজো মণ্ডপ এখানে ‘থান’ নামে পরিচিত। অতি সাধারণ, গাঁয়ের চাষির বাড়ির পরিবেশ যেমনটা হয়। বসুনীয়া পরিবারের নথি থেকে জানা গিয়েছে, ১৮১০ সালে ধনবর বসুনীয়া ওই পুজোর সূচনা করেন। তিনি কোচবিহার রাজ্য থেকে বিতারিত হয়ে তৎকালীন ২৬টি তালুক নিয়ে গঠিত জঙ্গলাকীর্ণ চাপগড় পরগনার আমগুড়ি গ্রামে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। কালক্রমে নিজেও জোতদার হয়ে ওঠেন। শুরুতে পুজোকে ‘যাত্রা’ পুজো বলা হত। পরবর্তীতে সেটি বদলে হয় দেবী ঠাকুরাণির আরাধনা। যদিও রাজবংশী আধুনিক প্রজন্ম দুর্গাপুজো বলতেই অভ্যস্ত।

তবে শুরুতে পুজোর আয়োজন খুব সহজ ছিল না। চাপগড় অথবা আমগুড়ি এলাকায় ওই সময় মৃৎশিল্পী, পুরোহিত, ঢাকি পাওয়া যেত না। ধনবর পুজো শুরু করার ৫৯ বছর পরে ১৮৬৯ সালের ১ জানুয়ারি জেলা সদরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ওই কারণে প্রথম কয়েক বছর অধুনা বাংলাদেশের রংপুর থেকে ঘোড়ার গাড়িতে প্রতিমা আনা হত। পরবর্তীতে ধনবরের ছেলে তত্কালীন ভুটান রাজার খাজাঞ্চি মুসব্বর বসুনিয়া রংপুর থেকে এক মৃৎশিল্পী পরিবারকে এলাকায় নিয়ে আসেন। নিজের জমিতে তাঁদের থাকতে দিয়েছিলেন। একইভাবে অসম থেকে পুরোহিত এবং ঢাকির পরিবারদেরও এনে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ওই সময় কোচবিহার এমনকী রংপুর থেকেও পুজো দেখতে প্রচুর মানুষ আমগুড়িতে ভিড় করত।

এই মুহূর্তের অন্যতম পুজো উদ্যোক্তা দীপু বসুনীয়া জানান, ধনবর বসুনীয়া কোচবিহার রাজ পরিবারের পুজো দেখেছেন। ওই কারণে সেখান থেকে বিতাড়িত হলেও রাজবাড়ির দেবী প্রতিমার বর্ণ নিজের পুজোতেও ‘আভিজাত্যের’ প্রতীক হিসেবে রাখেন। দেবী প্রতিমার গড়ন নিজেই সমাজের বধূর মতো ঠিক করে দেন। কেন পুজোর আয়োজন করেন ধনবর বসুনীয়া? লোক সংস্কৃতির গবেষক রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য দীপক রায় মনে করেন, কৌলীন্য ধরে রাখতে ধনবর বসুনীয়া পুজোর আয়োজন করে থাকতে পারেন। বসুনীয়া পরিবারের নথি থেকে জানা গিয়েছে, আদিতে ওই পুজো দেখার জন্য অধুনা বাংলাদেশের রংপুর থেকে প্রচুর মানুষ আমগুড়িতে ভিড় জমাতেন। তবে সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু পালটেছে।”
নেই জোতদারি প্রতাপ। পারিবারিক ঐশ্বর্য। তবু পরম্পরা রক্ষার চেষ্টা আজও স্পষ্ট দেবী প্রতিমা ও মণ্ডপ তৈরির কৌশলে। প্রাচীনত্বের সেই ঘ্রাণটুকু পরখের আশায় অথবা শিকড়ের সন্ধানে ষষ্ঠীর দিন থেকে বিভিন্ন গ্রামের মানুষের পাশাপাশি মণ্ডপে ভিড় করেন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক থেকে পর্যটকদের অনেকে। এবার মহাসপ্তমীতে সেখানে বসবে রাজবংশী সাহিত্য বাসর। দীপকবাবু বলেন, “বসুনীয়া বাড়ির পুজোয় ডুয়ার্সের ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। আধুনিক গবেষকদের কাছে এই পুজোর প্রতিটি দিক আকর্ষণীয়।”
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
ভাড়ার অ্যাকাউন্টে দেশজুড়ে সাইবার জালিয়াতি! পার্ক স্ট্রিটের ব্যাঙ্কে ‘মিউল অ্যাকাউন্টের’ সন্ধান পেল পুলিশ
-
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সসম্মানে ফিরলেন বঙ্গবন্ধু, হাদির নাম মুছে ফিরছে শেখ মুজিবুর রহমান হল
-
শ্রীঘরে দুই বেয়াই! দু’বছর আগে নাবালিকার বিয়ে, কোলে ৬ মাসের শিশু, খবর পেতেই ‘অ্যাকশন’ পুলিশের
-
‘হিরো, আপনিই বাঁচিয়েছেন’, ককপিটে সতীর্থের ছুরিতে রক্তাক্ত হয়েও কর্তব্যে অবিচল ভারতীয় পাইলট
-
বার্বিকিউ কাণ্ড থেকে শিক্ষা! দার্জিলিং-কালিম্পংয়ে রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কত হোমস্টে? রিপোর্ট চাইলেন মন্ত্রী