বাংলার বনেদি দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এমন অদ্ভুত এবং শিহরণ জাগানো কাহিনি আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া কঠিন। মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জের গদাইপুরে বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজো আজ লোকমুখে ‘পেটকাটি দুর্গা’ নামেই পরিচিত। প্রায় ৪২০ বছরের প্রাচীন এই পুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, এটি এক জীবন্ত লোকপুরাণ, যেখানে দেবী পূজিতা হন ভক্তির পাশাপাশি ভয়ের সঙ্গেও।
লোকমুখে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, বহু শতাব্দী আগে এই মন্দিরের পুজোর দায়িত্বে ছিলেন এক অত্যন্ত দরিদ্র ব্রাহ্মণ। স্ত্রী ও তাঁর অপরূপ সুন্দরী কিশোরী কন্যাকে নিয়ে তিনি মন্দিরের পাশেই থাকতেন। এক বছর মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোর রাতে সেই মেয়েটি পুজোর জোগাড় করছিল। হঠাৎ করেই সে মন্দির চত্বর থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। চারদিকে খুঁজেও মেয়ের সন্ধান না পেয়ে শোকে বিহ্বল পিতা সারারাত প্রতিমার সামনে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন।
আরও পড়ুন:
গভীর রাতে স্বপ্নে স্বয়ং দেবী দুর্গা তাঁকে দর্শন দেন এবং এক ভয়ংকর সত্য প্রকাশ করেন। দেবী জানান, কিশোরীর অপরূপ রূপে মুগ্ধ হয়ে তিনি লোভ সামলাতে না পেরে তাকে গিলে ফেলেছেন। তবে তিনি মেয়েকে ফিরিয়ে দেওয়ার উপায়ও বলে দেন। তাঁর নির্দেশ ছিল, পরদিন নবমীতে ছাগ বলিদানের পর বলির খাঁড়া দিয়েই দেবীপ্রতিমার মাটির পেট চিরে ফেলতে হবে, তাহলেই মেয়েটিকে জীবিত উদ্ধার করা যাবে।
পরদিন সকালে ব্রাহ্মণ দেবীর আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। প্রতিমার পেট কাটতেই অলৌকিকভাবে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সেই কিশোরী, সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায়। সেই দিন থেকেই এই দেবীর নাম হয়ে যায় ‘পেটকাটি দুর্গা’।
কিন্তু আসল নতুনত্ব বা বিস্ময় লুকিয়ে আছে আজকের রীতিনীতিতে। সেই ঘটনার পর দেবীকে ‘শাস্তি’ দেওয়ার যে প্রথা শুরু হয়েছিল, তা ৪২০ বছর পরেও আজও অটুট। অন্য কোনও মণ্ডপে দেবীকে বরণ করা হয় ফুল-চন্দন-মালায়, আর এখানে দেবীর পায়ে পরিয়ে দেওয়া হয় প্রতীকী ‘লোহার শিকল’। লোকের বিশ্বাস, মা দুর্গা যাতে ভবিষ্যতে আর কোনওদিন কোনও কিশোরীকে গিলে না ফেলতে পারেন, সেজন্যই তাঁকে শিকলে বেঁধে রাখা হয়।
শুধু তাই নয়, কুমোর যখন প্রতিমা গড়েন, তখন প্রথম দিন থেকেই দেবীর পেট কাটা অবস্থায় তৈরি করা হয়। পুজোর ক’দিন দেবীর মুখে গোঁজা থাকে শাড়ির এক টুকরো আঁচল, যা সেই ভক্ষণের নীরব প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
বিসর্জনের রীতিও এখানে সম্পূর্ণ আলাদা। দশমীর দিন দেবীকে নৌকায় চাপিয়ে আখেরি নদীপথে সদর ঘাটে নিয়ে আসা হয়। সেখানে সারারাত রাখার পর একাদশীর দিন জঙ্গিপুরের শ্মশানঘাটে তাঁর নিরঞ্জন হয়। শ্মশানঘাটে দেবীবিসর্জন বাংলার আর কোথাও প্রায় দেখা যায় না। পেটকাটা প্রতিমা, মুখে আঁচল, পায়ে শিকল আর শ্মশানে বিসর্জন — সব মিলিয়ে রঘুনাথগঞ্জের এই পুজো আজও বাংলার লোকসংস্কৃতির এক বিস্ময়কর অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
ধর্মীয় ভাবাবেগ ও পরিবেশ দু’টোই গুরুত্বপূর্ণ! বাজি পোড়ানোয় নিষেধাজ্ঞায় ‘না’ সুপ্রিম কোর্টের
-
অক্টোবরে সরকারি কর্মীদের ছুটিই ছুটি, ক্যালেন্ডার বলছে, পুজোর মাসে ১৭ দিনই ‘অফ ডে’!
-
নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগে রনজিতে নামতে পারেন শুভমান-রাহুল, ভাবনায় বুমরাহও
-
পড়ুয়াদের আই কার্ডের ফিতের নীল রং বদলে গেরুয়া! কী সাফাই নদিয়ার কলেজ কর্তৃপক্ষের?
-
ইজরায়েলগামী বিমান ‘ক্র্যাশ’ করার চেষ্টা! গ্রেপ্তার সহ-পাইলট, ‘সন্ত্রাসবাদী হামলা’, বলল তেল আভিভ