মধ্যপ্রদেশের বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী মহোদয় বঙ্গজ ধর্মপ্রাণ হিন্দু বাঙালিদের মহা ধর্মসংকটে ফেলে দিয়েছেন। বিশেষ করে সেই বাঙালিদের, আমিষ ছাড়া যাদের জীবন অচল এবং যারা পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি-রাজ কায়েম করেছে। এ যেন অনেকটা সেই ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা। শাস্ত্রী মহাশয় নিদান দিয়েছেন, পুজো মণ্ডপে প্রতিমা ও আমিষের সহাবস্থান নৈব নৈব চ। তারও আগে একইরকম হুকুম দিয়েছিল ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’।
কী করবে ‘হিন্দুত্ববাদী’ বঙ্গসন্তান? দুর্গাপুজোর মণ্ডপে চিরায়ত আমিষ-যজ্ঞের অবসান ঘটলে অর্ধেক আনন্দ যে মাঠে মারা যায়, আবার নিদান অগ্রাহ্য হলে হিন্দুত্ববাদের অবমাননার তকমা সেঁটে যাওয়ার শঙ্কা। এ এক সসেমিরা হাল। হিন্দু বাঙালি কিংকর্তব্যবিমূঢ় যতটা, তার চেয়ে ঢের বেশি ক্ষুব্ধ।
নবরাত্রি বা রামনবমীতেও দিল্লির বাঙালিটোলায় মাছের বাজার শুধু খোলাই থাকে না, গমগম করে।
রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বও এহেন নিদানে বিব্রত ও বিচলিত। ধর্ম-বর্ণ-জাত নির্বিশেষে বাঙালির সঙ্গে আমিষের সম্পর্ক কতটা গভীর ও আত্মিক, অনেকটা জল ও মাছের মতো, তা তাদের জানা। এমন ধরনের হুকুম বলবত করা, হিন্দু বাঙালির ‘শ্রেষ্ঠ’ উৎসবের সময় মণ্ডপে মণ্ডপে তা কায়েম করা এককথায় যে অসাধ্য, এবং এতে রাজনৈতিক দিক থেকে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই যে প্রবল, বঙ্গভাষী বিজেপি নেতৃত্ব তা বিলক্ষণ জানে। জানে বলেই দিলীপ ঘোষের মতো কেউ কেউ পুজো মণ্ডপ ও খাওয়ার জায়গার পৃথকীকরণের প্রস্তাব দিয়েছেন। ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য আবার বলেছেন, পুজোর সময় বাঙালি যা খায় তাই-ই খাবে। দেখা যাক, বাগেশ্বর বাবার জল কোথায় থামে।
স্বঘোষিত হিন্দুত্ববাদীদের এমন নির্ঘোষ দিল্লির বাঙালিটোলা চিত্তরঞ্জন পার্কেও শোনা গিয়েছিল। কিছু কাল আগে সেখানকার বাজারে ঢুকে একদল ‘হিন্দু’ মাছ-মাংসের দোকান তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। বলেছিল, মাছের বাজারের পাশেই কালী মন্দির। মন্দিরে মায়ের নিত্য আরাধনা হয়।
গা ঘেঁষাঘেষি মাছ বাজার থাকা ঈশ্বর অবমাননারই শামিল। অতএব বাজার বন্ধ করতে হবে। বাঙালিটোলার সম্মিলিত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে স্বঘোষিত সেই হিন্দুত্ববাদী জনতা দ্বিতীয়বার আর ওই তল্লাটে ফিরে আসেনি। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বও তাদের পাশে দঁাড়ানোর ঝুঁকি নেয়নি। নবরাত্রি বা রামনবমীতেও তাই দিল্লির বাঙালিটোলায় মাছের বাজার শুধু খোলাই থাকে না, গমগম করে। দুর্গাপুজোর মণ্ডপে মণ্ডপে বঙ্গ-রসনা তৃপ্তির ঢালাও আমিষ আয়োজন থাকে। বঙ্গ মানসিকতায় ঘা দেওয়ার বিপদটা কোথায়, অবাঙালি হয়েও বিজেপি নেতারা তা বুঝেছে। বঙ্গ বিজেপির বাঙালি নেতৃত্ব কি তা বুঝবে না?
এভাবেই জেনে অথবা না-জেনে, বুঝে অথবা না-বুঝে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা সময় সময় ফরমান জারি করে। সম্প্রতি, মহারাষ্ট্রে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতারা জানিয়েছেন, নবরাত্রিতে গরবা ও ডান্ডিয়া অনুষ্ঠানে অ-হিন্দুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের, ঢুকতে দেওয়া হবে না।
এমন ফতোয়া ক্রমশ রীতি হয়ে যাচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আনাচকানাচে।
নাচানাচিতে অংশ নিতে দেওয়া হবে না। তাঁদের মতে, গরবা ও ডান্ডিয়া নাচ একান্তভাবেই হিন্দুদের উৎসব। সেখানে অ-হিন্দুদের থাকা মানে পবিত্রতা নষ্ট হওয়া। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতারা বলেছেন, নবরাত্রি হিন্দু সংস্কৃতি। তার গাম্ভীর্য ও পবিত্রতা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।
কীভাবে অহিন্দুদের আটকানো হবে, সেই নিদানও পরিষদ নেতারা বাতলে দিয়েছেন। বলেছেন, হিন্দুরা ওই নাচের আসরে ঢুকবেন কপালে তিলক কেটে। গেরুয়া ফোঁটা লাগিয়ে। যঁাদের তা থাকবে না তঁাদের প্রবেশ নিষেধ। সন্দেহভাজনদের আধার কার্ডও দেখাতে হতে পারে।
এইভাবে উত্তরপ্রদেশ-সহ গোবলয়ের অনেক জায়গায় রামলীলার আসর মুসলমানমুক্ত করা হয়েছে। বছর দশেক আগেও ন’-দিন ধরে চলা রামলীলায় বহু অহিন্দু অভিনয়ে অংশ নিতেন। বিজেপির কেন্দ্র দখলের পর উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দাপটে তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী নিজের অভিজ্ঞতার কাহিনি শুনিয়ে বলেছেন, তঁার আশৈশব স্বপ্ন ছিল রামলীলায় অভিনয় করার। ২০১৬ সালে সেই সুযোগ এসেছিল।
সে বছর তঁার গ্রাম, উত্তরপ্রদেশের মুজফ্ফরনগরের বুধনায়, রামলীলার আসরে তঁাকে ‘মারীচ’-এর ভূমিকায় পছন্দ করা হয়েছিল। রাক্ষসী তাড়কার সন্তান ছিলেন মারীচ। সীতাহরণের জন্য রাবণ তঁার সাহায্য চেয়েছিলেন। রামের হাতেই তঁার মৃত্যু হয়েছিল। মারীচের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য উৎসুক নওয়াজউদ্দিনের সাধে বাধা দিয়েছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও শিবসেনা। বলা হয়, মুসলমানদের দিয়ে রামলীলায় অভিনয় করানো যাবে না। ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষা প্রথম ও শেষকথা। ফলে নওয়াজউদ্দিনের স্বপ্নও অধরা থেকে যায়।
এমন ফতোয়া ক্রমশ রীতি হয়ে যাচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আনাচকানাচে।
দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের সময় এগিয়ে এলে উগ্র হিন্দুত্ববাদ মাথাচাড়া দেয়। দেশপ্রেমের জোয়ার বইতে থাকে। মন্দির-মসজিদ বিতর্ক নতুন আঙ্গিকে শুরু হয়। নতুন নতুন ফরমান জারি হয়। নতুন অশান্তি জেগে ওঠে। সমাজে নতুন করে মেরুকরণ সৃষ্টি হয়। আমরা-ওরায় ভাগাভাগি হয়ে যায় সনাতনী ভারত। উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার ভোট আগামী বছরের গোড়ায়। এমন প্রবণতা সেখানেও দেখা যাচ্ছে। অযোধ্যার পর ওই রাজ্যের কাশী, মথুরা, সম্ভল কিংবা মধ্যপ্রদেশের ভোজশালার মতো অনেক জায়গায় মসজিদ প্রাঙ্গনে মন্দিরের নিদর্শন খোঁজা শুরু হয়। সেই প্রচেষ্টা এখনও চলছে। যদিও আদালত এসব জায়গায় এখনও নির্ণায়ক ভূমিকায় রয়েছে।
স্বঘোষিত গোরক্ষক স্বতন্ত্র ভরদ্বাজের মস্তানিও কি সরকারের পক্ষে বিড়ম্বনার নয়?
কিন্তু সম্প্রতি সাহারানপুরে যা ঘটে গেল তা নজিরবিহীন। অভূতপূর্বও বটে। কেননা, উচ্চতর আদালতে মসজিদ কর্তৃপক্ষকে যাওয়ার সুযোগ না দিয়েই সেখানকার প্রশাসন ১৫০ বছরের এক মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদটা ছিল জেলা শাসকের কার্যালয়ের অভ্যন্তরে। সরকারি জমি দখল করে কেন মসজিদ তৈরি, সেই প্রশ্ন তুলে স্থানীয় বজরং দলের নেতা মামলা ঠুকেছিলেন সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে। সেটা ছিল ২০২৫ সাল।
এ বছর ১৬ জুলাই ম্যাজিস্ট্রেটের রায়ে মসজিদ নির্মাণ বেআইনি ঘোষিত হয়। সরকারি জমি দখলের জন্য মসজিদ কর্তৃপক্ষকে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়। মসজিদ কর্তৃপক্ষ জজ কোর্টে আপিল করে। ২ সেপ্টেম্বর সেই আপিল খারিজ হয়ে গেলে তাদের উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সুযোগ না দিয়েই জেলা প্রশাসন বুলডোজার চালিয়ে মসজিদটি গুঁড়িয়ে দেয়। সাহারানপুর এখন থমথম করছে। স্বঘোষিত গোরক্ষক স্বতন্ত্র ভরদ্বাজের মস্তানিও কি সরকারের পক্ষে বিড়ম্বনার নয়? পডকাস্টে তাঁর হম্বিতম্বি, যন্তর মন্তরে পড়ুয়া বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী ছাত্রীর বাবাকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য তাঁর হা-হুতাশ আইন শৃঙ্খলারক্ষীদের অকর্মণ্যতার চূড়ান্ত নিদর্শন। এত খুল্লমখুল্লা অনাসৃষ্টির হুমকি ও দুর্বিনীতদের শিক্ষা দেওয়ার হাঁক সত্ত্বেও সরকার ও পুলিশের নীরবতা রামরাজত্বের বিজ্ঞাপন হতে পারে না।
উত্তরাখণ্ডের ‘শ্রীরাম সেনা ধর্মার্থ সেবা ন্যাস’ হলদোয়ানির রামলীলা ময়দান পবিত্র গঙ্গাজল ঢেলে পূজার্চনার মধ্য দিয়ে শুদ্ধ করেছে।
পশ্চিমি দুনিয়া ভারতীয় গণতন্ত্রের সমালোচনায় মুখর হয়, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এই জাতীয় অনাচারের জন্যই। বারবার যখন এমন ঘটনা ঘটে তখন তা বিচ্ছিন্ন বলে দায় এড়ানো কষ্টদায়ক অজুহাত ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।
উত্তরাখণ্ডের ‘শ্রীরাম সেনা ধর্মার্থ সেবা ন্যাস’ হলদোয়ানির রামলীলা ময়দান পবিত্র গঙ্গাজল ঢেলে পূজার্চনার মধ্য দিয়ে শুদ্ধ করেছে। কারণ, সেখানে কংগ্রেসের ‘দলিত সভাপতি’ মল্লিকার্জুন খাড়গে জনসভা করেছিলেন। এই অসম্মানের কথা খাড়গে সংসদে তুলেছেন। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বিজেপির রাজ্যসভার নেতা জে. পি. নাড্ডাকে চিঠিও লিখেছেন। অথচ এখনও সরকারি পদক্ষেপের কথা শোনা যায়নি। কট্টর হিন্দুত্ববাদী
এই সব সংগঠনের বোঝা উচিত, এভাবে ভোটে হয়তো জেতা যায় কিন্তু দেশ ভিতরে ভিতরে ফোঁপড়া হয়ে যায়। ঝঁাজরা হয়ে যায়। সরকারকেও নড়বড়ে করে তোলে।
‘যস্মিন দেশে যদাচার’– প্রবাদ এমনি এমনি চিরকালীন হয়নি। বঙ্গভূমির পুজো মণ্ডপ
জবরদস্তি আমিষ-বিমুখ করতে গেলে বাগেশ্বর বাবারা বাঙালির রোষাগ্নিতে জ্বলে খাক হয়ে যাবেন। বিজেপিরও তা জানা।
(মতামত নিজস্ব)
[email protected]
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘আইফেল টাওয়ার থেকে মহিলাদের সরাতে হবে’, শর্ত ঘিরে বিতর্ক, ক্ষমা চাইল হিন্দু সংস্থা
-
আইসিএনইউ ২০২৬: আন্তর্জাতিক পুষ্টি সম্মেলন, চিকিৎসায় পুষ্টির নতুন দিশা
-
প্রতীক কার? উপনির্বাচনের আগেই তৃণমূলের ভাগ্য নির্ধারণ, দু’পক্ষকেই তলবের পথে কমিশন
-
‘উচ্চশিক্ষা দপ্তর দেখছে…’, লক্ষ্মীবারে বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে আসছে নয়া বিল, কী জানালেন শুভেন্দু?
-
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নয়া অঙ্ক? প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে তারেকের উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে দীনেশ