Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৬ জুন ২০২৬
Air India

মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিজ্ঞান ছিল এয়ার ইন্ডিয়ার মহারাজা, সেই ভরসার পাট চুকল

মৃত্যুমিছিল, বিমান বিস্ফোরণ এবং এয়ার ইন্ডিয়া।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুন ১৩, ২০২৫, ১৪:১৮

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুন ১৩, ২০২৫, ১৪:১৮

options
link
মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিজ্ঞান ছিল এয়ার ইন্ডিয়ার মহারাজা, সেই ভরসার পাট চুকল zoom

যে কোনও এমার্জেন্সিতে পাইলট এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে বলেন– ‘পানা পানা পানা’। এক্ষেত্রেও সর্বনাশ দেখতে পেয়েছিলেন পাইলট। বলেছিলেন, ‘মেডে’। অর্থাৎ, সময় নেই আর কিছু করার। হল-ও তাই। ধ্বংসের দিকে যাত্রা। লিখছেন অনিন্দ্য চট্টোপাধ‌্যায়।

আকাশে প্লেন গেলে মুখ তুলে তাকাই। বড় হয়েও সে অভ্যেস পালটায়নি। মেঘের আড়ালে লুকিয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো চেটেপুটে দেখে নিই আকাশবিহারীকে। কোনও দিন যে ওই প্লেনে আমিও সওয়ারি হতে পারব, ভাবিনি কখনও! প্রথম প্লেনযাত্রা বড় হয়ে, দিল্লি থেকে কলকাতা। তারপরই উড়ে গিয়েছিলাম, কলকাতা-ব্যাঙ্কক-লস অ‌্যাঞ্জেলেস। অত বড় বিমানযাত্রা, সঙ্গে সুরা ও সুখাদ্য। আন্তর্জাতিক সফর যে অমন আনন্দদায়ক হতে পারে জানতাম না।

Advertisement

এর পরের বছর গিয়েছিলাম ইউরোপ। সস্তার টিকিট বলতে তখন মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস। যাওয়ার সময় ভালোভাবেই পৌঁছলাম। ফেরার যাত্রায় ক্লান্ত ছিলাম, সারা ফ্লাইট অন্ধকার তখন, সবাই অচেতন ঘুমে। ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ মনে হল, কী যেন একটা ঘটছে– কোনও অতলে যেন তলিয়ে যাচ্ছি আমি। প্রথমে ভাবলাম স্বপ্ন, তার পর-পরই শুনলাম গোটা কেবিন-জুড়ে এক প্রবল আর্তচিৎকার– ‘প্লেনটা পড়ে যাচ্ছে’!

আতঙ্কে মুহূর্তকেও এক যুগ মনে হয়, কতক্ষণ ধরে ‘পড়ছিলাম’ বলা শক্ত, হয়তো ১০ সেকেন্ড বা আরও কম, কিন্তু ওই সময়টায় একটা জিনিস বিলক্ষণ বুঝতে পারছিলাম– সব শেষ! বাড়ির লোকেদের মুখ মনে পড়ছিল, আর দেখা না-হওয়ার একটা তীব্র কষ্ট হচ্ছিল বুকজুড়ে। পাশাপাশি মনে হচ্ছিল, তা’ বলে এভাবে! মারা যায় মানুষ– কিন্তু এইভাবে? দলা পাকিয়ে, দুমড়েমুচড়ে? কার সঙ্গে কী কথা বলা হল না, সে হিসেবনিকেশ করতে-করতে শেষযাত্রায় সঙ্গী হচ্ছিলাম অনিশ্চিতের, দূর থেকে ভেসে আসছিল কান্নার মতো মন্ত্রোচ্চারণ, বিমানসেবিকাদের সতর্ক চিৎকার, এই সময় কি উপর থেকে অক্সিজেন মাস্ক নেমে আসে?

এত বড় আকারের একটা আকাশযান, যখন শূন্যে অবিচল, তখন তার আকার বোঝা যায় না, কিন্তু ‘পড়ে যাওয়া’-র সময়ে সে হিঁচড়ে-হিঁচড়ে নীচে নামছে– ওই ঝঁাকুনিটা আতঙ্ক ধরিয়ে দিচ্ছে আরও, ভেঙে যাবে না তো টুকরো-টুকরো হয়ে? কিছু দিন আগে দেখা দুর্ঘটনার একটা ছবি মনের ভেতর দাগড়া হয়ে বসে– প্লেন
দু’-টুকরো হয়ে গিয়েছে, পিছনের টুকরোয় বসে শেষবারের মতো আকাশ দেখছে এক যাত্রী। সম্ভবত ব্রাজিলে ঘটেছিল এমন কাণ্ড।

আমাদের প্লেনটা যদি দু’-ভাগে ভেঙে যায়, বেঁচে না-থাকলে ঠিক আছে– কিন্তু যদি কোনওভাবে বেঁচে থাকি! অত বড় হর্‌র সইতে পারব? চোখ বুজে বাড়ির লোকেদের কাছে ক্ষমা চাইছিলাম, এভাবে চলে যাওয়া হয়তো উচিত ছিল না আমার। বাকি রয়ে যাওয়া সবকিছুর জন্য তীব্র মনখারাপ নিয়ে এক অনন্ত ডুবের দিকে মহাপ্রস্থানের পথে– হঠাৎ করে ব্রেক কষল মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস।

আমি বেঁচে গেলাম সে-যাত্রা। কিন্তু প্লেন চড়া নিয়ে আমার যাবতীয় ফ্যান্টাসি আর রোম‌্যান্সের চ্যাপ্টার ওখানেই খতম। কলকাতা-মুম্বইয়ের নিয়মিত টারবিউল‌্যান্স হঠাৎ-হঠাৎ ফিরিয়ে আনে সেই ফ্লাইটের স্মৃতি। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসে আমাদের ফ্লাইটটা ছিল বোয়িং। এর প্রায় ৮-৯ বছর পর ‘এমএইচ ৩৭০’ ফ্লাইট রহস্যজনকভাবে ভারত মহাসাগরের উপর হারিয়ে যায়। এই নিখোঁজের নানা থিওরি আছে। কিন্তু বিমানটি পাওয়া যায়নি আর। ২৩৯ জন যাত্রী-সমেত একটা প্লেন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল চিরতরে। বোয়িং কোম্পানির উপর রুজু হয় অজস্র মামলা। সে সময়ই বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস।

বৃহস্পতিবার, এতগুলো বছর পরে, ঝটকায় পুরনো আতঙ্ক ফিরে এল আবার। মৃত্যুমিছিল, বিমান বিস্ফোরণ এবং ‘এয়ার ইন্ডিয়া’। ২৪০ জন যাত্রীর মধ্যে দু’টি শিশুও ছিল ওই ফ্লাইটে। টেক অফের সময় মাত্র ৬২৫ ফুট উঠেই পাইলট বুঝতে পারেন– জরুরি অবতরণ করতেই হবে। যে কোনও এমার্জেন্সিতে পাইলট এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে বলেন– ‘প্যান প্যান প্যান’।

এক্ষেত্রে সর্বনাশ দেখতে পেয়েছিলেন পাইলট। বলেছিলেন, ‘মেডে’। অর্থাৎ, সময় নেই আর কিছু করার। যদি কেউ বেঁচেও যান (এ লেখা ছাপতে যাওয়ার সময় পর্যন্ত সৌভাগ্যক্রমে একজন বেঁচেছেন বলে খবর, তঁার নাম বিশ্বাস কুমার রমেশ) এ আগুনকুণ্ডলী ঠেলে, সারা জীবন ওই আতঙ্ক-আর্তনাদের স্বপ্ন ফিরে-ফিরে আসবে। শেষ হয়ে যাওয়া অভিশপ্ত পরিবারগুলি ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের রুটিন সতর্কবাণী শুনে ভয়ে কঁাপবে, গুটিয়ে যাবে গোপনে। ‘এয়ার ইন্ডিয়া’-র মহারাজা মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিজ্ঞান ছিল এক সময়। সেই ভরসার পাট এবার চুকল।

আকাশে প্লেন গেলে মুখ তুলে তাকাই। মেঘের আড়ালে ঘনায় সিঁদুরে মেঘ। কী অনিত্য এ উড়ে যাওয়া, কী অনিশ্চিত এ ভেসে চলা। শিউরে উঠে বিড়বিড় করি, যেন সঠিক গন্তব্যে সাবধানে পৌঁছে যায় সব মূল্যবান জীবন।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.