BREAKING NEWS

১৪ আশ্বিন  ১৪২৭  বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ২০২০ 

Advertisement

শুধু দেখেছ ঘুঘুটি তাই এত ভুরুকুটি

Published by: Sangbad Pratidin Digital |    Posted: May 21, 2016 10:12 am|    Updated: May 21, 2016 10:12 am

An Images

‘মুক্তিযোদ্ধা’৷ শিল্পী .. শাহাবুদ্দিন, ২০১২

কৃষ্ণকুমার দাস: মাত্র ৩০ মাসে আদালতের নির্দেশ মেনে পাঁচ-পাঁচজন ‘জামাত ইসলামি’-র শীর্ষনেতার ফাঁসি হল প্রতিবেশী বাংলাদেশে৷ কাদের মোল্লা, কামরুজ্জামান, সাকা চৌধুরি,  মহম্মদ মুজাহিদ ও মতিউর রহমান নিজামি-র মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর, আরও তিনজনকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরু‌দ্ধে যুদ্ধাপরাধের শাস্তি দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে শেখ হাসিনা সরকার৷ এঁরা হলেন–মির কাশেম আলি, আবদুস সুবাহন ও আজাহারুল ইসলাম৷ এছাড়াও গোলাম আজম নামে আর-এক শীর্ষ জামাত নেতা কারাবাসে থাকাকালীন দু’বছর আগে জেলেই মারা গিয়েছেন৷ এর আগে ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ আদালত রায় দিতেই ওপার বাংলার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসবাদী ‘বাংলাভাই’-এর চটজলদি ফাঁসিও দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার৷

২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রথম ফাঁসি হয় কাদের মোল্লার৷ দ্বিতীয় ফাঁসি ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল মহম্মদ কামরুজ্জামানের৷ তৃতীয় ফাঁসি ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর জামাতের সেক্রেটারি জেনারেল মহম্মদ মুজাহিদ, চতুর্থ ফাঁসি হয় খালেদা জিয়া-র মন্ত্রিসভার অন্যতম প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং চট্টগ্রামের দাপুটে নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরি ওরফে সাকা-র৷ সর্বশেষ ফাঁসি হল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যু‌দ্ধে পাকিস্তানপন্থী আল বদরদের নেতা ‘আমির’ মতিউর রহমান নিজামি-র গত ১০ মে, ভারতীয় সময় রাত ১১.৪০ মিনিটে৷ পদাধিকারবলে তিনি ছিলেন জামাতের প্রধান, পোশাকি পদ ‘আমির’৷

প্রত্যেকটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল তৈরি করে তথ্য-প্রমাণ এবং সাক্ষ্য জোগাড় করে সেখানে বিচারপ্রক্রিয়া চলেছে৷ শেখ হাসিনা সরকার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে সংসদ থেকে পাশ করিয়ে রীতিমতো আইনি আটঘাট বেঁধেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল তৈরি করেছিল যুাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করার জন্য৷ প্রত্যেকটি বিচারই ওই ট্রাইবুনালে এতটাই নিখুঁতভাবে সাক্ষ্যপ্রমাণ-সহ সম্পন্ন্ করা হয়েছে যে, বার-বার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেও রায়ের নড়চড় করতে পারেননি জামাতের বাঘা-বাঘা আইনজীবী৷ এমনকী, বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের উপর চাপ তৈরি করিয়েও যুাপরাধীদের শাস্তি কমাতে পারেনি জামাত শিবির৷ প্রথম-প্রথম নেতাদের ফাঁসি হলে বা আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরই বাংলাদেশ জুড়ে হরতাল-বন্ধ-অশান্তি শুরু করে দিত জামাতের সমর্থকরা৷ মানুষও ভয়ে হরতালকে সমর্থন করে রাস্তায় বের হতেন না৷ কিন্ত্ত কাদের মোল্লার ফাঁসির পর যতটা সাড়া মিলেছিল, সাকা চৌধুরি বা নিজামির ক্ষেত্রে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি৷ এবারে সংবাদ মাধ্যমে প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে জামাতের তরফে দেশব্যাপী বন্ধ ডাকা হয়েছিল৷ কিন্তু দু’-একটি ছোটখাটো পকেটে রাস্তা অবরোধ বা পিকেটিং ছাড়া আর কোথাও কিছু চোখে পড়েনি৷ বিশেষ করে ঢাকা আর চট্টগ্রামের মতো মহানগরের জনজীবনে যে বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি তা স্বীকার করেছেন জামাতের কট্টর সমর্থকরাও৷

আল বদরদের নেতা মতিউর রহমান নিজামির ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় শাহবাগ চত্বরের পাশাপাশি ওপার বাংলার বিভিন্ন এলাকায় স্বতস্ফূর্ত মিছিল ও শোভাযাত্রায় আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে সাধারণ মানুষকে৷ আসলে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের গণ আন্দোলন এবং সেই মঞ্চে ওপার বাংলার নয়া প্রজন্মের ব্যাপক হারে যোগদান জামাতকে কোণঠাসা করে দিয়েছিল৷ ঢাকার অভিনেতা-অভিনেত্রী, শিল্পী-সাহিত্যিক এবং বিদ্বজ্জনদের একটা বড় অংশও শাহবাগের আন্দোলনকে সমর্থন করেন৷ সোশ্যাল মিডিয়াতেও গত তিন বছরের বেশি সময় ধরে জামাত-বিরোধী ঝড় বইছে৷ যুদ্ধাপরাধ বিরোধী ‘তুই রাজাকার, মুই রাজাকার’ গান বিশ্বজুড়ে ব্যাপক হিট করেছে ইউটিউবে৷ স্বভাবতই বিশ্বজুড়ে জামাত অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধ-বিরোধী একটি প্রবল জনমত তৈরি হয়৷ আর, তারপরেই পরপর পাঁচ জামাত নেতার ফাঁসি কার্যকর হল৷

যে-অপরাধে আদালত থেকে নিজামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল তা হল .. মুক্তিযুদ্ধের সময় বাউস গাড়ি ও ডেমরা গ্রামে একসঙ্গে ৪৫০ জনকে নির্বিচারে হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি৷ আদালতের রায়ে নিজামি-কে বলা হয়েছে ’৭১-এর মুক্তিযুর সময়ে বুজিীবীদের হত্যাকাণ্ডের নকশাকার৷ ২০০০ সালে এই নিজামিই হয়েছিলেন জামাতের প্রধান অর্থাত্‍ ‘আমির’৷ খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ২০০১ সালে যখন ক্ষমতায় আসে, তখন এই নিজামিই প্রথমে কৃষি এবং পরে শিল্পমন্ত্রী হন৷ ট্রাইবুনালে সরকারের তরফে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবীরা বলেছিলেন, ‘নিজামিকে দেশের মন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের তিরিশ লাখ শহিদ এবং সম্ভ্রমহারা দু’লক্ষ মা-বোনদের অপমান করা হয়েছে৷ এটা মানবতার লজ্জা৷’

মাত্র আড়াই বছর সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালকে সামনে রেখে যেভাবে যুদ্ধাপরাধীদের একের-পর-এক শাস্তি দিচ্ছে শেখ হাসিনা সরকার–তাতে গোটা জামাত শিবিরের অস্তিত্ব সংকটে৷ কারণ, একদিকে যেমন সংগঠনকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ‘যোগ্য’ নেতার অভাব দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে তহবিল তৈরির ক্ষেত্রেও ‘বিশ্বাসযোগ্য’ লোক পাওয়া যাচ্ছে না৷ এছাড়াও জামাতের কর্মকাণ্ডের খবর পেলেই সরকারের তরফে যে-হারে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তাতে রীতিমতো শঙ্কিত নিচুতলার কর্মী-সমর্থকরা৷ বস্তুত, এই কারণে এখন মোটা টাকা দিলেও নাশকতা ঘটানোর লোক পাওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে জামাতের স্লিপিং সেলের নেতাদের কাছে৷ জেলে বন্দি জামাতের নিচুতলার নেতারা পুলিশি ইণ্টারোগেশনে নেটওয়ার্ক-সংক্রান্ত খবর এবং লোকদের নাম ফাঁস করে দিচ্ছে৷ আর সেই কারণে একের-পর-এক ফাঁসি কার্যকর হলেও নাশকতা ঘটিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে জনমানসে নিজেদের কোনও প্রভাব বা ক্ষমতা জাহির করতে পারছে না জামাত শিবির৷ আর সেদিক থেকে পুরোপুরি লাভবান হচ্ছে তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনা সরকার৷

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ভারত শুধুমাত্র প্রতিবেশী বাংলাদেশের পাশে নয়, দরকারে সমস্তরকম সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে তা ঢাকায় দাঁড়িয়ে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করে এসেছেন৷ নিজামি’র ফাঁসির পরের দিন তুরস্ক ঢাকা থেকে কোনও নোটিস ছাড়াই রাষ্ট্রদূত ‘তুলে’ নিয়েছে, পাকিস্তান ইসলামাবাদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে৷ কিন্তু সেদিনই ঢাকায় পা রেখেছিলেন ভারতের বিদেশসচিব এস. জয়শঙ্কর৷ তিনি একেবারে সরাসরি মোদির বার্তা নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ঢাকার পাশে নয়াদিল্লির থাকার কথা আরও একবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়ে এসেছেন৷ এছাড়াও ‘টুইন টাওয়ার’ ধ্বংসের ঘটনার পর থেকে আল কায়েদা ও জামাতের মতো সংগঠনের বিরুদ্ধে আমেরিকা যে খড়গহস্ত, তা একাধিকবার বাংলাদেশে এসে মার্কিন শীর্ষনেতারা জানিয়েছেন৷ স্বভাবতই একদিকে আমেরিকা, অন্যদিকে ভারতের মতো প্রতিবেশীর একশো শতাংশ সমর্থন পেয়ে–যুদ্ধাপরাধীদের আড়ালে যে-সমস্ত সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ হচেছ তা দমনে শেখ হাসিনা আরও কঠোর হচ্ছেন৷ এমনকী, বাংলাদেশে জামাত ইসলামি দলকে নিষি করার কথাও সরকারের শীর্ষস্তরে আলোচনা হচেছ৷ একাধিক ক্যাবিনেট মন্ত্রীও ঢাকায় নানা সাংবাদিক বৈঠকে জামাতকে নিষিদ্ধ করা এখন শুধু ‘সময়ের অপেক্ষা’ বলে মন্তব্যও করেছেন৷

পরিস্থিতির চাপে পড়ে জামাতের ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’-এর (তৎসহ বিএনপি-ঘনিষ্ঠ একাধিক প্রভাবশালী) নেতারা এখন মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় আশ্রয় নিতে তৎপর৷ সেই তালিকাও সরকারের কাছে পৌঁছেছে৷ কারণ, ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের যেভাবে ‘মানবতাবিরোধী’ ছাপ দিয়ে তথ্যপ্রমাণ-সহ আদালতের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে নতুন প্রজন্মের কাছে জামাত তাৎপর্য হারাচ্ছে এবং সেটা সংগত কারণেই৷

জামাতের প্রধান মাথারা এখন মরণপণ চেষ্টায় রত যাতে সংগঠনে নতুন মুখের সংযুক্তি ঘটিয়ে, নেতৃত্বে অদলবদল এনে প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখা যায়৷ বাস্তবের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে দলীয় গঠনতন্ত্র ও আদর্শের ক্ষেত্রেও একাধিক সংশোধনী আনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে৷ আসলে, জামাত-কে টিকিয়ে রাখার নেপথ্যে বাংলাদেশের একটি অংশের অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে৷ এই মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রচুর সম্পদ, ও বিভিন্ন ব্যাঙ্কে জামাতের সঞ্চিত অর্থের পরিমাণও বিপুল৷ স্বভাবতই সেগুলি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনে এবং নিজেদের স্বার্থের পাশাপাশি ফাঁসির হাত থেকে বাঁচতে জামাত পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চলেছে৷

কিন্তু আইন ও বিচারব্যবস্থা যে প্রকৃতপ্রস্তাবে ‘নিরপেক্ষ’ এবং সাধুর ভেক ধরে বা পাওয়ার প্র্যাকটিস করে অপরাধের সাজা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না, পাঁচজন অভিযুক্তকে চরম শাস্তিপ্রদানের মধ্যে দিয়ে সেই বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছেন শেখ হাসিনা৷

এখানেই ঝলমল করছে মুক্ত মনের বিভা৷

 

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement