BREAKING NEWS

১৫ অগ্রহায়ণ  ১৪২৭  শনিবার ৫ ডিসেম্বর ২০২০ 

Advertisement

জৌলুস কমলেও নীতীশ অস্ত যাননি

Published by: Monishankar Choudhury |    Posted: November 11, 2020 8:15 am|    Updated: November 11, 2020 8:15 am

An Images

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: আসন যে কিছুটা টলমল, তা বুঝে নীতীশ কুমার প্রচারের শেষ লগ্নে বলেছিলেন, এটাই তাঁর শেষ ভোট। সেই সঙ্গে তাঁর আকুল আর্তিও শোনা গিয়েছিল। জনতা-জনার্দনের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, শেষ ভোটে অপদস্থ হয়ে তাঁকে যেন বানপ্রস্থে যেতে না হয়!

[আরও পড়ুন: প্রি-ওয়েডিং ফটো শুটে নৌকায় ‘টাইটানিক’ পোজ! আচমকাই তলিয়ে গেলেন হবু দম্পতি]

হেলে যাওয়া গাছ ঠেকা দিয়ে সোজা রাখার মতো সচেষ্ট ছিল বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। মনোবল না হারানোর দাওয়াই হিসাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘ফল যেমনই হোক, প্রয়োজনীয় সংখ্যা এলে নীতীশই হবেন জোট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী।’ গণনার মাঝপথে স্পষ্ট, পনেরো বছরের শাসনে জনপ্রিয়তায় টাল খেলেও বিহারি জনতা নীতীশকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়নি।

চমক এখন একাধিক। শেষ পর্যন্ত যারাই হাসুক, সেই হাসি খুব সম্ভবত আকর্ণবিস্তৃত হচ্ছে না। সরকার গড়ার মতো পর্যাপ্ত সমর্থন এনডিএ ধরে রাখতে পারলে প্রচারের মধ্যগগনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি পালিত হবে কি? কম আসন পাওয়া সত্ত্বেও বিহারের মসনদ বিজেপি কি নীতীশকে ছেড়ে দেবে? প্রশ্নটা বড় হয়ে উঠছে। আবার, আরও একবার মুখ্যমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালনে সত্তর ছুঁই-ছুঁই নীতীশ কুমার রাজি হবেন কিনা, সেই প্রশ্ন জাগছে। মহারাষ্ট্রের মতো অবিশ্বাস্য কিছু নতুন সমীকরণ আচমকা হানা দিতে পারে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ জাগছে, বিশেষত, এলজেপি-র কারণে নীতীশকে যে ধরনের অপমান সহ্য করতে হয়েছে, তারপরে এই সন্দেহ জাগতেই পারে। করোনার কারণে অত্যন্ত ঢিমেতালে চলা ভোটগণনা নিয়ে এই সব আগ্রহ দানা বাঁধার নেপথ্যে রয়েছে অনেক রাজনৈতিক ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’।

অথচ গোটা প্রচারপর্বের চমক ছিল নেতা হিসাবে লালুপুত্র তেজস্বী-র উদয়। তাঁর নির্বাচনী সভাগুলোয় যুবকদের বিপুল সমাবেশ এক ধরনের বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল। নির্বাচনী পণ্ডিতদের নজরে তা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। একের পর এক বুথ ফেরত সমীক্ষায় তাই চিত্রিত হয়েছিল তেজস্বীর সম্ভাব্য জয়। তার কারণও ছিল। কারও বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার না করে তেজস্বী জোর দিয়েছিলেন কর্মসংস্থানের উপর। প্রচারের অভিমুখে ছিল নীতীশ জমানার ‘অনুন্নয়ন ও সার্বিক হতাশা’। একের পর এক জনসভায় তেজস্বী তাই জানতে চেয়েছেন, পনেরো বছর রাজত্ব করা সত্ত্বেও নীতীশ কুমারের রাজ্যের যুবাদের পেট চালাতে কেন রাজ্যের বাইরে যেতে হবে, বিহারি শিক্ষকদের ট্রেনিং নিতে কেন রাজস্থানের কোটায় যেতে হয়, কেন হাজার মাইল হেঁটে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফিরতে হয়? ক্ষমতা দখলে এই প্রশ্নাবলি তেজস্বীর হাতিয়ার হয়েছিল। নীতীশের বিরোধিতা তিনি করেছিলেন অবশ্যই। রাজনীতিতে তা অনিবার্য। কিন্তু একবারের জন্যও প্রতিপক্ষকে অন্যায় আঘাত করেননি। মাত্র ৩১ বছর বয়সে তঁার এই ‘পরিপক্বতা’, করোনা-মোকাবিলার প্রাথমিক দিনগুলোয় রাজ্য সরকারের ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা’ এবং তেজস্বীর ১০ লাখ চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যে-মায়াজাল সৃষ্টি করেছিল, পণ্ডিত সমীক্ষকরা তাতে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন। এতটাই শক্তিশালী সেই মায়াজাল যে, ১০ লাখ চাকরির মোকাবিলায় এনডিএ-ও ১৯ লাখ চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়।

কিন্তু গণনার অন্তিম পর্বে আরও একবার প্রমাণ হয়, এদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি এখনও গালিভার। এনডিএ ক্ষমতা ধরে রাখলে বলতেই হবে, বিহারি জনতা মোদির ‘ডাবল ইঞ্জিন’ তত্ত্বে ভরসা রাখতে ভালবেসেছে। নির্বাচনী ময়দানে একজন মানুষের দক্ষতা কী পরিবর্তন ঘটাতে পারে, সাম্প্রতিক কালের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি বারবার তার প্রমাণ রাখছেন।

মঙ্গলবার বিকেলে এই লেখা লিখছি যখন, ফল ঘোষণার তখনও ঢের দেরি। তবু, গণনার গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী দলগত পর্যালোচনায় প্রথমেই উঠে আসছে বিজেপির সাফল্যের পাশাপাশি নীতীশের সংযুক্ত জনতা দলের তুলনামূলক ব্যর্থতা। পঁাচ বছর আগে বিজেপি ১৫৭ আসনে প্রার্থী দিয়ে ৫৩টি জিতেছিল। লালুপ্রসাদের আরজেডি ও নীতীশের জেডিইউ ১০১ আসনে দঁাড়িয়ে পেয়েছিল যথাক্রমে ৮০ ও ৭১টি আসন। লালুর সঙ্গে জোট বেঁধে কংগ্রেস লড়েছিল ৪১ আসনে। জিতেছিল ২৭টি। লোক জনশক্তি পার্টির রামবিলাস পাসোয়ান তখনও চনমনে লড়াকু নেতা। ৪২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জিতেছিলেন মাত্র ২টি আসনে। এবার বিজেপি ও জেডিইউ দুই দলই লড়েছে প্রায় সমান আসনে। বিজেপি ১২১, জেডিইউ ১২২ কেন্দ্রে। বিজেপি তার আসন থেকে ভাগ দিয়েছে বিকাশশীল ইনসান পার্টিকে, জেডিইউ ছেড়েছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জিতনরাম মান্‌ঝির দল ‘হিন্দুস্তানি আওয়ামি মোর্চা’ বা ‘হাম’-কে। গণনার মাঝপথের ছবি অনুযায়ী বড় দলের মধ্যে একমাত্র বিজেপিই নিশ্চিতভাবে তার আসন বাড়াতে পারছে। তারা ছাড়া নজর কেড়েছে বামপন্থীরা, বিহারের রাজনীতিতে ক্ষেত্রবিশেষে যাদের প্রভাব অনস্বীকার্য। বিশেষ করে সিপিআইএম(এল)। এই প্রথম এতটা সমীহ অর্জনে তারা সফল। সৌজন্যে, তেজস্বীর বিচক্ষণতা।

অঙ্কের হিসাবে লোক জনশক্তি পার্টির আসন তেমন একটা বাড়ছে না। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তারা জেডিইউ-র বাড়া ভাতে ছাই দিতে পেরেছে। জেডিইউ-র আসন কমার ক্ষেত্রে এলজেপি-র সূক্ষ্ম অথচ ক্রূর রাজনীতি প্রধানত দায়ী। এবারের ভোটে চিরাগ পাসোয়ানের সেই রাজনীতি এক প্রবল বিস্ময়! নীতীশ তঁার নির্বাচনী খেরোর খাতায় কালের নিয়মে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ভাবমূর্তিকে অনেকটা জায়গা নিশ্চয় দেবেন। পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকার খেসারত সবাইকেই দিতে হয়। কিন্তু খানিকটা জায়গা তিনি অবশ্যই ছেড়ে রাখবেন জোটের কুটিল রাজনীতির জন্যও। সেই রাজনীতি, যা ভোটযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার পর জোট-ধর্মকে জলাঞ্জলি দিয়ে চিরাগ পাসোয়ানকে খুল্লমখুল্লা নীতীশ-বিরোধিতায় উৎসাহিত করেছে। প্রশ্ন একাধিক। জোটে থেকেও কেন চিরাগ এভাবে নীতীশের বিরোধিতায় কোমর কষে নামলেন? বেছে বেছে শুধুমাত্র জেডিইউ-র বিরুদ্ধেই কেন প্রার্থী দিলেন? কেন বেছে নিলেন বিজেপির টিকিট না-পাওয়া ক্ষুব্ধদের? বিজেপিই বা কেন তা হতে দিল? প্রধানমন্ত্রী একবারও কেন প্রকাশ্যে চিরাগের সেই আচরণ নিয়ে কিছু বললেন না? তা হলে কি এই ধারণাই সত্য যে, নীতীশকে পিছিয়ে দিয়ে নিজেদের এক নম্বর দল করে তোলাই ছিল বিজেপির রাজনৈতিক লক্ষ্য? গণনার মাঝপথে দেখা গেল, যত ভোট এলজেপি টেনেছে, তা জেডিইউ-র পক্ষে গেলে নীতীশের দল ৮৩ আসনে এগিয়ে থাকত! এই ‘অপমান’ পোড় খাওয়া নীতীশ কীভাবে নেবেন, গণনা-পরবর্তী মুখ্য আকর্ষণ হিসাবে তা চর্চায় থাকবেই। অন্তত বেশ কিছুকাল। রাজনীতিতে সম্ভাবনার দুয়ার যে কোনওদিনই বন্ধ হয় না।

তেজস্বী শেষ পর্যন্ত হতোদ্যম হলে রাহুল গান্ধী তার জন্য কতটা নিজেকে অপরাধী ভাববেন– সে-ও এক প্রশ্ন। তেজস্বীকে চাপে রেখে রাহুলের দল এবার ৭০ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। গতবারের চেয়ে ২৯ আসন বেশি। এত আসনে লড়েও গতবারের চেয়ে কম আসন পাওয়া রাহুলের পক্ষে মোটেই সম্মানজনক নয়।

ঢিমেতালে গণনা শেষে বিহারের শাসনভার শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে, মসনদে কে বসবে– সেই জল্পনায় না গিয়ে বলা যায়, এই মুহূর্তের সত্য, জৌলুস কমলেও নীতীশ কুমার অস্ত যাননি। দ্বিতীয় সত্য, বাবার ছায়াবৃত্ত থেকে বেরিয়ে নেতা হিসাবে তেজস্বীর উদয়। তৃতীয় সত্য, হিন্দি হৃদয়ে কংগ্রেসের মাটি এখনও ঝুরঝুরে। জনমানসে রাহুল এখনও তঁার স্থান পোক্ত করতে পারেননি। কিন্তু সব সত্যের বড় সত্য, মধ্যগগনের সূর্যের মতোই এখনও উজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি। প্রবল ভাবমূর্তি দিয়ে তিনি ঢেকে দিতে চেয়েছেন পনেরো বছরের শাসকের যাবতীয় দুর্বলতা। ভবিষ্যৎ বিহারে রাজনীতি কীভাবে ও কতটা স্থিতিশীল হতে পারবে, সে এক ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বলা যায়, ঘরের পাশে বিজেপির রমরমার খবর পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে কিছুতেই শ্রুতিমধুর হতে পারে না।

[আরও পড়ুন: বাংলার নির্বাচনের আগে বাড়তি অক্সিজেন? বিহারে দুর্দান্ত লড়াই বামেদের]

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement