আবার একটি ভোট এসে গেল। গত বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী ও হুমায়ুন কবীর দু’টি করে অাসনে জিতেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ভবানীপুর রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দিয়েছেন শুভেন্দু। ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’-র নেতা হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদের রেজিনগর ছেড়ে নওদা রেখেছেন। অর্থাৎ, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে অাগামী ৬ অক্টোবর উপনির্বাচন (By Election 2026)।
বিধানসভার অাসনের নিরিখে এই অকাল ভোটের গুরুত্ব নেই। বিজেপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার চালাচ্ছে। ৫ বছর তারা নিশ্চিন্ত। সোজা অঙ্কের বিচারে নন্দীগ্রামে বিজেপি ও রেজিনগরে বিরোধীদের কেউ জিতবে। রেজিনগরে বিরোধী ভোট অাড়াঅাড়ি ভাগ হলে বিজেপি লড়াইয়ে চলে যেতে পারে। নন্দীগ্রামে কিন্তু বিরোধীদের কোনও সুযোগই নেই।
নন্দীগ্রাম! বাংলায় বাম জামানার পতনের ‘কার্য’ যদি হয় সিঙ্গুর, তাহলে ‘কারণ’ নন্দীগ্রাম। অাসনটির নির্বাচনী ইতিহাস বর্ণময়। গঙ্গা ও হলদি নদীর তীরবর্তী সুজলা-সুফলা গ্রামীণ এলাকার মানুষের রায় কখনও একমুখী নয়। ১৯৫২ সাল থেকে একক অাধিপত্য করতে পারেনি কোনও দলই। কখনও কংগ্রেস অাবার কখনও কমিউনিস্টরা জিতেছে। ১৯৭৭ সালে অাবার কংগ্রেস ও বামেদের পিছনে ফেলে জয়ী হয় জনতা পার্টি। ২০০৯ সালে সিপিঅাই বিধায়ক মহম্মদ ইলিয়াসের বিধায়ক পদ খারিজ হয় ঘুষ মামলায়। সেই সময় জমি অান্দোলনে তপ্ত পূর্ব মেদিনীপুরের মাটি। জনরোষের ফল মিলল ভোটের ময়দানেই।
ভূমিরক্ষার অান্দোলনে সন্তানহারা ফিরোজা বিবি উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে জয়ী হলেন। বাংলার যে বদল অাসছে তার অাভাস দিল নন্দীগ্রাম। ২০১১ সালে বাম সরকারের পতন ঘটল। নন্দীগ্রামে অাবারও বিজয়ী হলেন ফিরোজা বিবি। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে এই অাসনে তৃণমূলের টিকিটে সহজেই জয়ী হন শুভেন্দু অধিকারী। কারণ, জমি অান্দোলনে নেতৃত্ব। ঘরের ছেলে ইমেজ এবং জনপ্রিয়তা। ২০২১ সালে তিনি ফের সফল হলেন বটে, তবে তৃণমূলের টিকিটে নয়, এবার ভারতীয় জনতা পার্টির প্রার্থী। পরাজিত করলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দে্যাপাধ্যায়কে। কেন মমতা নন্দীগ্রামে সেদিন লড়তে গিয়েছিলেন তা এখনও অজানা। ২০২৬-এ শুভেন্দু নন্দীগ্রামের পাশাপাশি প্রার্থী হন ভবানীপুরেও– মমতার বিরুদ্ধে। দু’টিতেই জেতেন। ছাড়তেই হত একটি
অাসন। ভবানীপুর রাখলেন। সেই প্রেক্ষিতে নন্দীগ্রামে ভোট।
মুখ্যমন্ত্রী তাদের সরকারের সঙ্গে থাকার ‘সুযোগ’-এর সদ্ব্যবহারের ডাক দিয়েছেন।
নন্দীগ্রামে এবারও বিজেপির জয় নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূলের সংগঠন ভেঙে গিয়েছে। নেতা-কর্মীরা বসে যাওয়ায় বুথে বুথে এজেন্ট দেওয়া হবে সমস্যার। মুখ্যমন্ত্রীর ছেড়ে দেওয়া অাসনে কত বেশি ভোটে পদ্মফুলের জয় হবে, অালোচনা তা নিয়েই। বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন বিরোধী দলনেতা থাকার সময় শুভেন্দুবাবুর অাপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা হাসি রথ। নন্দীগ্রামে সংখ্যালঘুরা একসময় ঢেলে শুভেন্দুকে ভোট দিত। তিনি বিজেপি প্রার্থী হওয়ার পর তাতে ভাঙন ধরে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুরা অার এককাট্টা হয়ে তৃণমূলকে ভোট দেবে কি না সন্দেহ।
মুখ্যমন্ত্রী তাদের সরকারের সঙ্গে থাকার ‘সুযোগ’-এর সদ্ব্যবহারের ডাক দিয়েছেন। সংখ্যালঘু প্রধান রেজিনগরেও একই অাহ্বান রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী। যদিও সেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী ভোট ছত্রখান। যদি সব ঠিকঠাক চলে তাহলে বিরোধীদের থাকবে পঁাচজন প্রার্থী। হুমায়ুনের দল ছাড়াও সিপিএম ও কংগ্রেস প্রার্থী দিচ্ছে। দুই তৃণমূল ইতিমধে্যই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দিয়েছে। তার মানে দঁাড়াল– একের বিরুদ্ধে পঁাচ। তবু বিজেপি এই অাসন কঠিন ভাবছে তার কারণ সংখ্যালঘু ভোট ৭০ শতাংশেরও বেশি। মোট ভোটার ২ লক্ষ ৫৯ হাজার। সদ্য শেষ হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী পেয়েছিলেন ৬৪,৬৬০ হাজার ভোট, বা ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে হুমায়ুনের জনতা উন্নয়ন পার্টি পেয়েছিল প্রায় ৫২ শতাংশ ভোট। হুমায়ুন বাবরি মসজিদ গড়ার সেন্টিমেন্ট সামনে রেখে ভোটের মুখে তৃণমূল থেকে বিতাড়িত হন। তার জেরেই তিনি সংখ্যালঘুদের সমর্থন পেয়ে জয়ী হন বলেই রাজনৈতিক মহলের অনুমান। তিনি ভোট পেয়েছিলেন এক লক্ষ ২৩ হাজার। ২০২১ সালে তৃণমূলের পাওয়া ৫৬ শতাংশ ভোট নেমে অাসে ১৭ শতাংশে।
কিন্তু তৃণমূল জনতা কোনদিকে? তার অ্যাসিড টেস্ট হতে পারে এই উপনির্বাচন।
হুমায়ুনের পক্ষে সেন্টিমেন্ট শুধু নয়, জনপ্রিয় বিধায়ক রবিউল অালম চৌধুরিকে বাদ দেওয়ার জন্যও তৃণমূলের বিপর্যয় হয়েছে বলে মনে করা হয়। এবার সেই রবিউলকেই প্রার্থী করেছে মমতা শিবির। অার হুমায়ুনের প্রার্থী তঁারই ছেলে। যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঠিক এই অবস্থায় দঁাড়িয়ে রেজিনগরের ভোটের ফল নিয়ে কৌতূহল তুঙ্গে। রবিউলের হাত ধরে হারানো জমি কি ফেরাতে পারবে মমতার তৃণমূল? না কি হুমায়ুন অাবার বাজিমাত করবেন? না কি দু’পক্ষের অাড়াঅাড়ি বিভাজনের ফঁাক দিয়ে পদ্মফুল উঁকি দেবে। কংগ্রেস কি দাগ কাটতে পারবে? অন্তত চার মাস অাগের প্রেক্ষাপট যদি সামনে রাখা যায় তাহলে বাম ও কংগ্রেসের পক্ষে বলার মতো সমর্থন রেজিনগরে নেই। ঋতব্রত শিবিরও কিছুই করতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটে যে ভাঙন গত নির্বাচনে লক্ষ করা গিয়েছে রেজিনগরে অব্যাহত থাকলে হুমায়ুনের লাভ।
ভোটে হারের পর সংসদীয় ও পরিষদীয় দলে ভাঙনের পর এই প্রথম কোনও ভোট লড়তে নেমেছে তৃণমূল। যুযুধান দু’-পক্ষ সুপ্রিম কোর্ট থেকে নির্বাচন কমিশন, কে ‘অাসল’ সেই লড়াইয়ে। দলত্যাগী ২০ সাংসদের পদ থাকবে কি না তা নিয়ে ১৮ তারিখ শুনানি। অন্যদিকে, দুই শিবিরকেই ১৬ তারিখ অাবার তথ্য দিতে বলেছে কমিশন। সাংসদদের ভাগ্য ও দলের নাম, ‘প্রতীক’ অর্থ কার হাতে যাবে তা উপনির্বাচনের অাগেই স্পষ্ট হবে কি না তা জানা না-গেলেও টানাপোড়েন চলবে। এই নাটকীয় সমীকরণে একটি ভোট এসে যাওয়ায় একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে দাবিদাওয়া চলছে।
কিন্তু তৃণমূল জনতা কোনদিকে? তার অ্যাসিড টেস্ট হতে পারে এই উপনির্বাচন। এই পরিসরে একটি বিষয় লক্ষণীয়। অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বঞ্চিতদের গুরুত্ব দেওয়া শুরু হয়েছে কালীঘাটে। চার মাস অাগে রেজিনগরের বিধায়ক রবিউলকে তঁার অাসনে টিকিট দেওয়া হয়নি। ঠেলা হয় অন্যত্র। অাস্থা রাখতে হল তঁার উপরই। অপর দিকে, নন্দীগ্রামের বয়ালে পঞ্চায়েত প্রতিনিধি সঞ্চিতা দে’কেও দল দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। নিয়োগ দুর্নীতিতে চাকরি গেলেও তিনি কোর্টে জিতে চাকরি ফিরে পান। নন্দীগ্রামের পরিচিত কোনও মুখই যখন দলের বিপদে প্রার্থী হতে রাজি হলেন না, তখন সঞ্চিতা দেবী হারবেন জেনেও– রাজি। মহা দুঃসময়ে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বঞ্চিতদের উপর অাস্থা রাখা ছাড়া উপায়ও নেই কালীঘাট শিবিরের।
লড়াই করে অাসা পুরনোদের মনে অতৃপ্তি। বক্সিদাকে প্রতিদিনই অনুযোগ শুনতে হয়।
এই পরিসরে খুব মনে পড়ছে তৃণমূলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সির একটি গল্প। প্রায়
১০ বছর অাগের কথা। ভরা তৃণমূল ভবনে বসে সুব্রতবাবু। গ্রাম থেকে রোজ অাসেন পুরনো দিনের কর্মীরা। প্রত্যেকের সঙ্গেই সভাপতির পরিচয়। দল ক্ষমতায়। বিধানসভা লোকসভা-রাজ্যসভা, পুরসভা-পঞ্চায়েতে ভরা সংসার। নতুন নতুন লোক দলে এসেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তঁারা-ই ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। লড়াই করে অাসা পুরনোদের মনে অতৃপ্তি। বক্সিদাকে প্রতিদিনই অনুযোগ শুনতে হয়।
একদিন এক গ্রামীণ নেতা তঁার এলাকার এক নতুন নেতাকে নিয়ে অনেক অভিযোগ করলেন। সব শুনে বক্সিদা তঁাকে বললেন, ‘ভাই, একটু রোসো। সরকার ক্ষমতায়। পুলিশ-প্রশাসন হাতে। সবাই তাই তৃণমূল। এখন অামাদের দলে সোজা রথ চলছে। রথ সামনের দিকে যত এগচ্ছে তত ভিড়। সেই চাপে এখন তুমি রথের দড়ি ধরার সুযোগ পাবে না। একটু অপেক্ষা করো, কিছু দিন পরই উল্টোরথ শুরু হবে। তখন দেখবে মাঠ ফঁাকা, দড়ি ধরার লোক নেই। তখন পার্টিতে অাবার পুরনো জায়গা ফিরে পাবে।’
মিলে যাচ্ছে বক্সিদার কথা। দুর্দিনে সামনে থাকা মুখগুলো সরে যেতেই অবশিষ্ট পুরনোরা ভেসে উঠছে। এখন রথের দড়ি ধরার ভিড় নেই। সময় সতি্য কত নিষ্ঠুর! এই বিধানসভা নির্বাচনের অাগে ১০টি উপনির্বাচন দশে দশ করেছিল যারা, তাদের কাছে অাগামী দু’টি উপনির্বাচন কঠিন, কঠোর বন্ধুর এক পথ। সোজা অার উল্টোরথের সতি্যই কত ফারাক।
সর্বশেষ খবর
-
‘কমিউনিস্টরা ঠাকুর মানে’, স্বস্তিকার গণেশভক্তিতে ধেয়ে এল কটাক্ষ, মোক্ষম দিলেন নায়িকাও
-
এআই ছাড়া দিন চলে না? সাবধান, এই ৫ তথ্য ভুলেও জানাবেন না কৃত্রিম চ্যাটবটকে
-
শেষ মুহূর্তে সূচি বদল, পিছিয়ে গেল মোহনবাগান-মহামেডান মিনি ডার্বি, একই সময় শুরু তিন ম্যাচ
-
তৃণমূল নেতাকে কেন ডিম? যুবককে ফেলে বেধড়ক মার! রণক্ষেত্র রায়গঞ্জ আদালত চত্বর
-
এবার আরও দামি সুখটান! দাম বাড়ল একগুচ্ছ সিগারেটের, তালিকায় কোন কোন ব্র্যান্ড