BREAKING NEWS

০২ জ্যৈষ্ঠ  ১৪২৯  বৃহস্পতিবার ১৯ মে ২০২২ 

READ IN APP

Advertisement

Advertisement

‘আপ’ কি আদালত

Published by: Monishankar Choudhury |    Posted: January 28, 2022 1:53 pm|    Updated: January 28, 2022 3:49 pm

Congress easy prey, assumes AAP | Sangbad Pratidin

বিজেপি একদা ছিল যে কেজরিওয়ালের একনম্বর প্রতিদ্বন্দ্বী, ২০২২-এ এসে সে-ই অরবিন্দ কেজরিওয়ালই বুঝতে শিখেছেন- সাংগঠনিকভাবে দুর্বল কংগ্রেস দলকে আক্রমণ করা প্রভাবশালী বিজেপির তুলনায় অনেক বেশি সহজ। লিখছেন রাজদীপ সরদেশাই

 

ম্প্রতি দেশজুড়ে বিভিন্ন পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে বেশ তরজা চলছে। এই সময়ে আরও একটা পুরস্কারের কথা ভাবা যাক। গত দশকে গড়ে ওঠা, ‘সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক দল’- এইরকম একটা পুরস্কার যদি থাকত? কোনও দ্বিমত নেই, লড়াইয়ে ‘আম আদমি পার্টি’ (আপ) থাকত প্রথম স্থানে। অন্ধ্রপ্রদেশের ‘যুবজন শ্রমিক রাইথু কংগ্রেস পার্টি’-ও (ওয়াইএসআরসিপি) যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু প্রাথমিকভাবে তা মূল কংগ্রেস পার্টিরই চারা মাত্র। এত অল্প সময়ের মধ্যে আর কোনও রাজনৈতিক দলই এতটা নাটকীয় প্রভাব ফেলতে পারেনি, যতটা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন এই সংগঠন পেরেছিল।

সন্দেহ নেই যে, রাজধানীতে অবস্থিত হওয়ার কারণে অতিরিক্ত মিডিয়া-আনুকূল্যে ‘আপ’-এর এই ব্যাপ্তি আংশিকভাবে সক্ষম হয়েছে। এখন, জরুরি কিন্তু ঘ্যানঘ্যানে প্রশ্নটি হল, ‘আপ’ কি তাদের উচ্চাশা বাড়াতে পারবে এবং পক্ষীরাজ হয়ে ভারতব্যাপী তার ডানা ছড়াতে পারবে এবার? সেক্ষেত্রে ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচন আপের রাজনৈতিক যাত্রায় হয়ে উঠতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যে পাঁচটি রাজ্যে ভোট হতে চলেছে, তাদের মধ্যে তিনটিতে ‘আপ’ বড় খেলোয়াড়: পাঞ্জাবে ক্ষমতার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী, গোয়ার সম্ভাব্য ক্ষমতা-নির্ধারক এবং উত্তরাখণ্ডে খেলা-ঘোরানোর সম্ভাব্য ঘুঁটি। মজার বিষয় হল, প্রতিটি রাজ্যে, আপ নির্বাচনী সাফল্যের জন্য আলাদা আলাদা কৌশল গ্রহণ করেছে। পাঞ্জাবে কংগ্রেস-অকালি এই দুই দলের টানটান আধিপত্যের বিরুদ্ধে অ্যান্টি-এলিট এবং প্রান্তিক প্রতিক্রিয়াকে আকৃষ্ট করছে তারা। গোয়ায় আপ নিজেকে একটি আদর্শবাদী, মধ্যবিত্ত দল হিসাবে তুলে ধরছে, যে দল কিনা গোয়ার অর্থনৈতিক দুর্নীতি এবং কর্তব্যচ্যুত রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। এবং উত্তরাখণ্ডে, আপ স্থানীয় শাসনের মধ্যে দিল্লির মতো ‘শিক্ষা-স্বাস্থ্য’ মডেলকে আনার চেষ্টা করছে।

[আরও পড়ুন: আবিদ, শাহ, হাবিবুররা ছিলেন নেতাজির বিশ্বস্ত, বিজেপি যেন না ভোলে]

কিন্তু সর্বক্ষেত্রে আপ-এর রাজনীতিকে চিহ্নিত করে একটাই সাধারণ সূত্র! তা হল, প্রতিষ্ঠিত দলগুলির বিপরীতে একটি কার্যকর ‘বিকল্প’ হিসাবে নিজেদের উপস্থাপিত করা। আর এই উপস্থাপনের লক্ষ্যবস্তু হল হতাশ নাগরিকদের ভোটব্যাঙ্ক। যাঁরা দুর্নীতিতে জর্জরিত ‘রাজনীতি’-র বিকল্প খুঁজছেন। যদিও, এটাই পার্টির আসল ‘ইউএসপি’ ছিল, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভারত’- এনজিও স্টাইলের আন্দোলন থেকে রাতারাতি রূপান্তরে দিল্লির একটি ক্ষমতাসীন দলে পরিণত হওয়া। আপ-এর তিনজন মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থীর কথা অনুযায়ী, আপ এখনও ‘প্রতিষ্ঠান-বিরোধী বহিরাগত’ হিসাবে নিজেদের তকমাটি ধরে রাখতে চায়: পাঞ্জাবে প্রাক্তন কৌতুক অভিনেতা ভগবন্ত মান-কে মুখ্যমন্ত্রী পদে মনোনীত করা আসলে ‘গ্রামীণ লোকনায়ক বনাম সুরক্ষিত অভিজাত’-র আখ্যানকে আহ্বান করে। গোয়ায় অমিত পালেকার একজন আইনজীবী-সামাজিক কর্মী, যিনি জমি দখলের বিষয়গুলো নিয়ে লড়ছিলেন। অন্যদিকে উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রিত্বের মুখ কর্নেল অজয় ​​কোঠিয়াল- একজন প্রাক্তন সেনা, যিনি ২০১৩ সালের আকস্মিক বন্যার পরে কেদারনাথের আশপাশের অঞ্চলগুলির পুনর্গঠনে জড়িত ছিলেন।

তবুও এই ‘আপ’ পৃথক, নতুন। ২০১৩ সালে যে পার্টি নতুন রূপে এসেছিল, এবং পার্থক্য তৈরিতে সফল হয়েছিল, সে-ই আপের থেকে আজকের আপ অনেক আলাদা। এটা স্পষ্ট যে, আপ এখন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী কম বরং আর বাকি গড়পড়তা রাজনৈতিক দলের মতোই বেশি, যেখানে কেজরিওয়াল প্রশ্নাতীত সুপ্রিমো। আপ-এর সাম্প্রতিক বিতর্কিত আবগারি নীতি- দিল্লিতে ব্যক্তিগত মদ ব্যবসার তুমুল বিস্তার, বাণিজ্যিক বাস্তববাদকে প্রকাশ করে। যেখানে, সম্পদ সংগ্রহ-ই নৈতিক উৎসাহের উপরে অবস্থান করছে। আপ-এর রাজ্যচালনা ​​সংক্রান্ত মিশ্র রেকর্ড, প্রাক-নির্বাচন জনসমষ্টি এবং ভোট-পরবর্তী বাস্তবায়নের ব্যবধানকে প্রকাশ করে। দিল্লির বাতাসে ক্রমবর্ধমান অবনতি তার অন্যতম উদাহরণ।

যেখানে আগে আপ-কে একটি কট্টর ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শক্তি হিসাবে দেখা হত, আজ তার সমালোচকরা ২০২০ সালে দিল্লি দাঙ্গায় কার্যকরভাবে সক্রিয় না থাকাকে আপ-এর ব্যর্থতা হিসাবেই ইঙ্গিত করছে, বা শাহিনবাগে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতি আপ-এর উদাসীনতা দলটির ‘সংখ্যালঘু’ উদ্বেগ পরিত্যাগ করার প্রমাণ হিসাবে কাজ করছে। এই সমালোচনা এমনকী, আপ-কে বিজেপির ‘বি’ দল হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য কংগ্রেসকে প্ররোচিত করেছে- একটি ‘হিন্দুত্ব লাইট’ দল, যা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ক্রমবর্ধমান জোয়ারের সঙ্গে আদতে আপস করছে। কেজরিওয়াল যখন কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারকে সমর্থন করেন, দিল্লি নির্বাচনের আগে ‘হনুমান চালিসা’ পাঠ করেন, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য অযোধ্যায় বিনামূল্যে তীর্থযাত্রার ব্যবস্থা করেন, তখন তিনি রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য সচেতনভাবে ‘হিন্দু’ সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বার্থ গ্রহণ করার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে পড়েন।

তবু, নির্বাচনী সুবিধার উপর চোখ রেখে মূল্যবোধকেন্দ্রিক নৈতিক প্রকল্প থেকে আপ-এর রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হওয়ার নিরিখে এটির ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির পরিকল্পনাগুলি আন্দাজ করা যেতে পারে। ভারতের রাজনীতি কোনও পবিত্র নৈতিকতার খেলা নয়, এটি কেবল সমাজের জটিলতা এবং ভণ্ডামিকে প্রতিফলিত করে। যখন প্রতিটি দল এবং তাদের নেতারা বিভিন্ন মাত্রায় আদর্শগত সমঝোতার জন্য অভিযুক্ত হন, তখন কেন একা আপ-এর কাছ থেকে নিরবচ্ছিন্ন পুণ্যের পোশাক আশা করা যাবে? উদাহরণস্বরূপ, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কি কংগ্রেস পার্টির একক মালিকানা, যা বছরের পর বছর সাম্প্রদায়িক শিকারি এসে শিকার করে যাবে? এ কি খরগোশ আর শিকারির খেলা? সমসাময়িক রাজনীতিতে ‘হিন্দু-বিরোধী’ চিত্রকে প্রধান বাধা হিসাবে দেখা হয়। তাই তীব্র মেরুকরণের সমস্যাগুলির মুখে আপ-এর সূক্ষ্ম কর্মকাণ্ডগুলি ভারসাম্যমূলক কাজ হিসাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।

এক অর্থে, চতুর আইআইটি-প্রশিক্ষিত কেজরিওয়াল কৌশলগতভাবে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তাঁর আসল ভাবমূর্তির উপরে রেখেছেন, যা কিনা বাম উদারপন্থী সমর্থকদের সর্বজয়ী মধ্যবিত্ত নায়কের স্বরূপ। সেই আবেগপ্রবণ নেতা, যিনি ২০১৪ সালে দিল্লিতে ৪৪ দিন ক্ষমতায় থাকার পরে পদত্যাগ করেছিলেন, কারণ তিনি দুর্নীতিবিরোধী জন লোকপাল বিল পাস করতে পারেননি- সেসব দিন আর নেই। অথবা যে-ব্যক্তি তাড়াহুড়ো করে তাঁর রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের কয়েক মাসের মধ্যে ২০১৪ সালে বারাণসীতে নরেন্দ্র মোদিকে মোকাবিলা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অথবা সেই ‘নৈরাজ্যবাদী’ রাস্তার যোদ্ধা, যিনি ধরনায় বসতে বা উচ্চ ও পরাক্রমশালীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দ্বিধা করেন না। এমনকী, একবার প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘কাপুরুষ’ এবং ‘সাইকোপ্যাথ’ বলেও অভিহিত করেছেন। এসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ আর পাওয়া যাবে না। তাঁর সেই মধ্যবিত্ত সামাজিক কর্মী ভাবমূর্তির পরিবর্তে, আমাদের কাছে এখন আরও পরিপূর্ণ রাজনীতিবিদ হয়ে তিনি অধিষ্ঠান করছেন। এমন একজন কেজরিওয়াল, যিনি স্বীকার করেছেন যে, রাজনীতিতে ধৈর্যের চেয়ে বড় কোনও গুণ নেই।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি একদা ছিল যে কেজরিওয়ালের একনম্বর প্রতিদ্বন্দ্বী, ২০২২-এ এসে সে-ই কেজরিওয়ালই বুঝতে শিখেছেন- পরিচালনায় ও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল কংগ্রেস দলকে আক্রমণ করা প্রভাবশালী বিজেপির তুলনায় অনেক বেশি সহজ। যে-কারণে আপ রণপা ফেলে কংগ্রেসের প্রভাববিরচিত জায়গায় বলপূর্বক দখলের খেলায় নেমেছে: তা সে সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত গুজরাটে গত বছরে পুর নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করা হোক, তা সে যতই কংগ্রেস জিতুক না কেন! আর, পাঞ্জাব, গোয়া, উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যে দৃষ্টিনিক্ষেপ, যেখানে ভোটের একটা গরিষ্ঠ অংশ নিয়ে কংগ্রেস প্রধান দলগুলির একটি। এই পর্যায়ে বিজেপির উপর সর্বাত্মক আক্রমণ কেজরিওয়ালকে আবার মোদি-বিরোধী জায়গায় আর-এক বিক্ষুব্ধ বিরোধী নেতা হিসাবে ফিরিয়ে আনবে; যেখানে, মোদি-বিরোধী মুখের তো অভাব নেই! কংগ্রেসের ভোটারদের প্রথমে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে কংগ্রেসকে পরাস্ত করা এখন তাঁর লক্ষ্য। যার ফলে, বিজেপির প্রাথমিক বিরোধী ব্র্যান্ডকে দুর্বল করে বিজেপির ভবিষ্যৎ জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা উন্মুক্ত করবে কেজরিওয়াল তথা আপ-কে।

যার ফলে, আন্দাজ করাই যায়, কংগ্রেস এবং বিজেপি কেন কেজরিওয়ালের জাতীয় উচ্চাশা নিয়ে চিন্তিত। তদুপরি, বাস্তব পরিস্থিতিটিও দস্তুর: ২০১৯ সাধারণ নির্বাচনে, মাত্র ০.৪ শতাংশ ভোট নিয়ে আপ মাত্র একটি আসন জিতেছিল। প্রাচীন সেই ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’ ধরনের যুদ্ধরীতি কেজরিওয়ালের পছন্দ, যেখানে তিনি নিজেকে ‘ডেভিড’ হিসাবে দেখতে পছন্দ করেন। অর্থাৎ, ‘আন্ডারডগ’। কিন্তু, আপ-কে আরও অনেক পথ পেরতে হবে।

পুনশ্চ বিজেপি ব্যতীত অন্যান্য বিরোধী অবস্থান জয় করার ব্যাপারে আপ-এর এই অভিলাষ ও ‘লড়াই’ মোটেই জটিলতা-মুক্ত নয়। এর ফলে বিজেপি-বিরোধী ভোট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায় তো বটেই, তার সঙ্গে বিরোধী অবস্থানে আরও অনেক বেশি অস্থিরতা ও দ্বিধার জন্ম দেয়। একটা জোরদার প্রশ্ন উপস্থাপনা করা যাক এই পরিস্থিতিতে: গোয়া, পাঞ্জাব বা উত্তরাখণ্ড- এই তিন রাজ্যের কোনও একটায় যদি কোনওভাবে ত্রিশঙ্কু অবস্থা ঘটে? কিছু কিছু সমীক্ষার অনুমানে প্রকাশিত হচ্ছে এমনটা। এমন পরিস্থিতিতে আপ কি নিজেদের অক্ষত রাখতে পারবে? না কি, আপ এবং কংগ্রেস নির্বাচন-পরবর্তী জোটে রাজি হবে, যেমনটা তারা ২০১৩ সালে দিল্লিতে করেছিল।

[আরও পড়ুন: ঋষি সুনাক তৈরি, ব্রিটেন কি প্রস্তুত]

Sangbad Pratidin News App: খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
নিয়মিত খবরে থাকতে লাইক করুন ফেসবুকে ও ফলো করুন টুইটারে