Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৫ জুন ২০২৬
FIFA

কাপের নিচে অন্ধকার

কাতারে সাড়ে ছ’-হাজার পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়তো অচিরেই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবে।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: নভেম্বর ২২, ২০২২, ১৪:০৬

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: নভেম্বর ২২, ২০২২, ১৪:০৬

options
link
কাপের নিচে অন্ধকার zoom

বিশ্বকাপ আয়োজনে কাতারের রক্ষণশীলতা যতই থাকুক না কেন, ফিফা প্রেসিডেন্ট দেশটির পাশে দাঁড়িয়েছেন এই মর্মে যে, কাতার পরিযায়ী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তা অর্ধসত‌্য! গত ১২ বছরে বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে সে দেশে যে সাড়ে ছ’হাজার পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, তা ইতিমধ্যে বিস্মৃত। তার ৬৯ শতাংশ আবার ভারতীয়। পেট্রো-ডলারের দাপটে এসব তথ্য কি ধোপে টিকবে? কলমে সুতীর্থ চক্রবর্তী

 

Advertisement

মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে ফিফা-র প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট শেপ ব্লাটার দুনিয়াকে চমকে দিয়ে মন্তব‌্য করেছিলেন- ‘কাতারকে বিশ্বকাপ করতে দেওয়া এক বড় ভুল।’ ২০১০ সালে এই ব্লাটারই যখন প্রকাশ্যে খাম থেকে কার্ড বের করে ঘোষণা করেছিলেন- ২০২২ সালে বিশ্বকাপ কাতারে হবে, তখন অবাক হয়ে গিয়েছিল বিশ্ব। কারণ মরুভূমির মধ্যে এই ছোট্ট দেশটিতে না ছিল কোনও ফুটবল সংস্কৃতি, না ছিল ফুটবলের কোনও পরিকাঠামো। তখনই অভিযোগ ওঠে- শুধু টাকার জোরে কীভাবে একটি দেশ বিশ্বকাপের মতো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সংগঠনের দায়িত্ব পেতে পারে?

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ব্লাটার নিজেই বিতর্কটি উসকে দেওয়ায় ফিফা-র বর্তমান কর্তারা যে বেজায় অস্বস্তিতে পড়েছেন, তা বোঝাই গেল প্রথম ম‌্যাচের মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে দোহায় বসে ফিফা-র বর্তমান প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো-র সাংবাদিক বৈঠক দেখে। ১২ বছর আগে ব্লাটার যুক্তি দিয়েছিলেন, ফুটবলকে নতুন দেশে নিয়ে যাওয়ার। ইনফান্তিনো সমালোচকদের যে জবাব দিলেন, তা রাজনীতিতে ভরপুর। তিনি ইউরোপের ১০০ বছরের উন্নয়নের ইতিহাস টানলেন। জানালেন, তিনি নিজেও পরিযায়ী শ্রমিকের সন্তান এবং সমকামী। কাতারের পাশে দাঁড়িয়ে উন্নত দুনিয়ার বাসিন্দাদের প্রতি ইনফান্তিনোর তোপ, পরিবর্তন রাতারাতি আসে না। তিনি বললেন, ‘ইউরোপের একেকটি দেশ যখন দরিদ্র দেশগুলির পরিযায়ী শ্রমিকদের জন‌্য তাদের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন কাতার কিন্তু তার বুকে আশ্রয় দিচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিককে।’ কাতারের বাসিন্দাদের ৮৮ শতাংশই যে অভিবাসী, সেটাও বাস্তব!

[আরও পড়ুন: ইউক্রেন যুদ্ধে জটিল ভারসাম্যের খেলায় ভারত, কোন খাতে মোদির বিদেশনীতি?]

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে কাতার তাদের অর্থের জৌলুস প্রদর্শন করেছে। বিশ্বকাপ যত এগবে, তত হয়তো বিশ্বের নজর ফুটবলের উপর সীমাবদ্ধ হবে। ১২ বছরে সাতটি স্টেডিয়াম, মেট্রো রেলের নেটওয়ার্ক ও অসংখ‌্য হোটেল তৈরি করতে গিয়ে কাতারে যে সাড়ে ছ’-হাজার পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, তাঁরা হয়তো অচিরেই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবেন। মৃত এই সাড়ে ছ’-হাজার শ্রমিকের যে ৬৯ শতাংশ ভারতীয়, সেই তথ‌্য হয়তো আর প্রকাশ পাবে না এ-দেশের সংবাদমাধ‌্যমেও। কাতারের স্টেডিয়ামে বাডওয়াইজারের বিয়ার মিলছে কি না, সেই বিতর্কেও নজর দেওয়ার সময় মিলবে না কারও। সমকামীদের অধিকারের বিষয়টিও নিশ্চিত আড়ালে চলে যাবে। পোশাকবিধির কড়াকড়ির জন‌্য বহু পুরুষ ও মহিলা ফুটবল ভক্ত ইতিমধ্যেই কাতারকে বয়কট করেছে। কিন্তু পোশাকবিধির লক্ষ্মণরেখাকে উপেক্ষা করে যে দেড় লক্ষ ভক্ত কাতারে হাজির হয়ে গিয়েছে, তাদের উন্মাদনা-ই কয়েক দিনের মধ্যে মাতিয়ে দেবে বিশ্বকাপকে। ফলে ইনফান্তিনোর উদ্বেগের কিছু নেই। দিনের শেষে গিয়ে হয়তো দেখা যাবে যে, কাতার বিশ্বকাপ সবচেয়ে ব‌্যয়বহুল-ই শুধু নয়, সবচেয়ে সফলও।

তবুও কাতার বিশ্বকাপ যে প্রশ্নগুলি ক্রীড়াবিশ্বের সামনে নিয়ে এল, সেগুলি উপেক্ষা করার নয়। গ্রিস ও মিশরের সঙ্গে যৌথভাবে ২০৩০-এর বিশ্বকাপ সংগঠনের জন‌্য সৌদি আরব তৎপরতা শুরু করেছে বলে শোনা যাচ্ছে। কাতারের মতোই এই আরব দেশেও গণতন্ত্র নেই। এই দেশটিও নানা রক্ষণশীলতা ও বিধির বেড়াজালে অাবদ্ধ। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও এখানে ভূরি ভূরি। বিশ্বকাপের মতো একটি আনন্দযজ্ঞ আয়োজনের জন‌্য শুধুমাত্র পেট্রো-ডলারের শক্তিকে পরিমাপ করা সমীচীন কি না, তা কাতারের অভিজ্ঞতা থেকে বিচার্য হওয়া উচিত।

কাতারে বিশ্বকাপ করতে দেওয়া উচিত হয়নি বলে যে শোরগোল বিশ্বজুড়ে পড়েছে, তা বেনজির। বিশ্বে বড় বড় ক্রীড়ানুষ্ঠান সংগঠন করার ক্ষেত্রে রাজনীতিকে কখনওই এড়ানো সম্ভব হয়নি। ১৯৮০ সালে মস্কো অলিম্পিক যেভাবে আমেরিকা-সহ তার তাঁবেতে থাকা ৬৫টি দেশ বয়কট করেছিল, তা ইতিহাস হয়ে আছে। গত বিশ্বকাপ ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ায় হয়েছিল। পুতিনের রাশিয়ায় বিকিনি পরে রাস্তায় ঘোরা বা প্রকাশ্যে মদ‌্যপানের ক্ষেত্রে সমস‌্যা না থাকলেও সেখানে গণতন্ত্র কতটা রয়েছে, কাতারের পাশে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্ন তুলছে মার্কিন সংবাদমাধ‌্যমের একাংশ। তাদের কথায়, “রাশিয়াতে দাঁড়িয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষকে ‘যুদ্ধ’ বললেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এইরকম শ্বাসরোধকারী অবস্থা তো কাতারে নেই। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় যখন বিশ্বকাপ হয়েছিল, তখন তো সেখানে স্বৈরাচারী সামরিক শাসন। প্রতিবাদ করলে হেলিকপ্টার থেকে ছুড়ে ফেলা হত। তবুও তো ফিফা সেখানে বিশ্বকাপের আয়োজন করেছিল। চিনে অলিম্পিক-সহ বড় বড় ক্রীড়ানুষ্ঠান হয়। সেখানে শ্রমিকদের কি কোনও অধিকার রয়েছে?”

কাতারের বিরুদ্ধে অভিযোগ: সেখানে যে অসংখ‌্য ভারতীয়, পাকিস্তানি, বাংলাদেশি বা শ্রীলঙ্কার পরিযায়ী শ্রমিক স্টেডিয়াম-সহ বিশ্বকাপের পরিকাঠামো তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের ছুটি ছিল না, কাজ ছাড়ার অধিকার ছিল না, অসহ‌্য গরমে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। এর ফলে সাড়ে ছ’হাজার পরিযায়ী শ্রমিককে প্রাণ হারাতে হয়েছে। আর এখন বিতর্ক এড়াতে বিশ্বকাপের আগে এই পরিযায়ী শ্রমিকদেরই কাতার ছাড়তে বাধ‌্য করা হচ্ছে।

বিশ্বকাপের আগে যখন গণতন্ত্র, মানবাধিকার ইত‌্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তখন এটাও বাস্তব যে, বিশ্বজুড়ে ইদানীং বড় বড় ক্রীড়ানুষ্ঠানের অধিকাংশই গণতন্ত্রহীন দেশগুলিতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বর্তমান বছরে ৩৫ শতাংশ বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এমন দেশে হচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতা স্বৈরশাসকদের হাতে। এর পিছনেও কাজ করে অর্থনীতি। গণতান্ত্রিক দেশগুলি খরচের কারণে এই বড় বড় ক্রীড়ানুষ্ঠান করার আগ্রহ হারাচ্ছে। বিশ্বকাপ বা অলিম্পিকের জন‌্য যে-মানের স্টেডিয়াম বানাতে হয়, সেগুলি পরে আর সেভাবে কাজে লাগে না। ক্রীড়ানুষ্ঠান সংঘটিত করার বিপুল আর্থিক দায় গণতান্ত্রিক দেশগুলির সরকার নিতে চায় না, কারণ এক্ষেত্রে মানুষকে জবাবদিহি করার ব‌্যাপার থাকে। সামাজিক ক্ষেত্রে ব‌্যয় ছাঁটাই করে কোনও গণতান্ত্রিক সরকারই চাইবে না তা বিশ্বকাপ বা অলিম্পিকের জন‌্য খরচ করতে। বিশ্বকাপ করার জন‌্য কাতার ১৮ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করছে। যা ভারতের বার্ষিক বাজেটের অর্ধেক। বাজেটের অর্ধেক টাকা খরচ করে ভারত কি চাইবে বিশ্বকাপ করতে? কখনওই না। এটা করতে হলে কেন্দ্রীয় সরকারকে বন্ধ করে দিতে হবে সব সামাজিক প্রকল্প। গণতন্ত্রে এটা এক অবাস্তব ব‌্যাপার! ফলে এটাও বাস্তব যে, ফুটবলকে উন্নয়নশীল দুনিয়ায় ছড়াতে ফিফাকে দ্বারস্থ হতে হবে পেট্রো-ডলারে পুষ্ট এসব স্বৈরশাসকের কাছেই। আসলে শেষকথা বলে টাকা-ই। কাতার বিশ্বকাপ অাগামী একমাস ধরে অামাদের সে-কথাই বারবার স্মরণ করাবে।

[আরও পড়ুন: সংরক্ষণের সমীকরণ, দেশকে ফের নয়া সন্ধিক্ষণে দাঁড় করাতে পারে ‘ইডব্লিউএস’]

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.