Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৪ জুন ২০২৬
Winter

শীতের কুয়াশানেশা, ঢাকনাচাপা আলিঙ্গন

টি. এস. এলিয়ট যেভাবে বলেছেন, সেভাবে দেখলে– তুষারের ঢাকনার তলায় শীত ঘুম পাড়িয়ে রাখে আমাদের স্মৃতিকে। এ জীবনে আমি কিন্তু বারবার ফিরে পেতে চাই শীতের ঢাকনাচাপা আলিঙ্গন।

Advertisement
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: জানুয়ারি ১৩, ২০২৬, ১৬:০৮

link
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: জানুয়ারি ১৩, ২০২৬, ১৬:০৮

options
link
শীতের কুয়াশানেশা, ঢাকনাচাপা আলিঙ্গন zoom
শীতের ভোর। ফাইল ছবি

পাঁচটি ছোটগল্পাখ্যান নিয়ে সলমন রুশদি-র সাম্প্রতিক বই ‘দ্য ইলেভেনথ আওয়ার’। সেখানে ‘লেট’ গল্পে এমন একটি আকস্মিক শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন তিনি, যা আমাকে বলল, তিষ্ঠ ক্ষণকাল। ‘রিডিং স্যাডনেস’, লিখেছেন রুশদি। ‘পড়ুয়া বিষাদ’-এর কথা আর কোনও লেখক লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। এ সেই গল্প, যেখানে রুশদি লিখছেন, আদম আর ইভ সম্পূর্ণ উলঙ্গ। তারা পৃথিবীর শেষ কিনারে একটা বাগানে দঁাড়িয়ে দেখছে মহাবিশ্ব তাদের চোখের সামনে চুরচুর হচ্ছে। এ সেই গল্প, যে-গল্পে এক বাবা-মা ছেলের নাম রাখছে উইলিয়াম শেক্সপিয়র। আর, সেই ছেলে আজীবন বয়ে বেড়াচ্ছে তার নামের বেয়াড়া বিদ্রুপ, অভিমানী অভিশাপ, অসহনীয় সামাজিক লজ্জা এবং বাবা-মায়ের প্রতি হতাশ বিদ্বেষ গিলে ফেলছে সেই ছেলেকে।

শীতের রাত্রে একবার নয়, একাধিকবার পড়েছি এই গল্প, খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়েছি তার অন্তর-রহস্যে, গল্পের মধ্যে আগাগোড়া শীতার্ত মৃত্যুময়তায়, এবং বহু বছরের জীবন পেরিয়ে
প্রান্তে এসে এই প্রথম জানলাম, ‘পড়ুয়া বিষাদ’ বলে সত্যিই আছে এক অনুভব ও উপভোগ, যার নির্ভুল উপত্যকা শীতকাল। শীত ছাড়া ‘রিডিং স্যাডনেস’-এ নিবিড় হওয়া যায় না।
শীতের গভীর রাত্রে ডিলান থমাসের কবিতা যেভাবে চিৎকার করে আমাকে বলে: ‘Do not go gentle into that good night/ Old age should burn and rave at close of day’– তুমি অমন সুভদ্র নির্লিপ্ততায় চলে যেও না চিরবিদায়ে, বার্ধক্য জ্বলতে জ্বলতে মৃত্যুকে বলুক, এখনও লড়াই শেষ করিনি, যেতে পারি, কিন্তু যাব কেন? এই উচ্চারণ, ডিলান থমাস পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে, চারিধারে শুধু শীত, তুষার আর মৃত্যুময়তার মধ্যেই সম্ভব। কলকাতার এই শীতের মধ্যে পিছন ফিরে তাকিয়ে বুঝতে পারছি, ডিলান থমাস-ই সেই কবি, যিনি আমাকে প্রথম স্বাদ দিয়েছিলেন ‘রিডিং স্যাডনেস’-এর।

Advertisement

তখন অবশ্যই ওই অনুভবকে ‘পড়ুয়া বিষাদ’ বলে চিহ্নিত করতে পারিনি। সেই বিশেষ বোধ নিয়ে এল– এই বছরের শীত সলমন রুশদির সৌজন্যে। সেই সঙ্গে জাগাল অন্য এক তুষারধবল শীতের স্মৃতি। উল্‌ভারহ্যাম্পটন লন্ডন থেকে কিছু দূরের শহর। আসন্ন ক্রিসমাসের শীত সেখানে। আমি সবে চল্লিশ পেরিয়েছি। দ্বিতীয়বার চুরমার হয়েছে আমার বিয়ে, সংসার, বাড়িঘর। জীবন আমাকে নির্মমভাবে আরও একবার বুঝিয়ে দিয়েছে, আমি ভাসমান খড়কুটো। এক ঘাটের নিরাপদ একঘেয়েমিতে কিছুতেই আটকে থাকতে পারব না।

সেই বিশেষ বোধ নিয়ে এল– এই বছরের শীত সলমন রুশদির সৌজন্যে।

বছর চল্লিশের আমি তুষারে ঢেকে যাওয়া বিকেল বেলার উল্‌ভারহ্যাম্পটনে। সস্তার পাব-এ। একা। যত দূর কাচের দেওয়াল ভেদ করে দৃষ্টি যাচ্ছে, শিউলি ফুলের মতো ঝরছে তুষার, আকাশের অবারিত অাবছামি থেকে। আমার একমাত্র সঙ্গী ফায়ারপ্লেসের হলকা। ক্রমশ বুঝতে পারি আমি, শীতের মতো নস্টালজিয়া জাগানিয়া ঋতু আর নেই। বাইরের তুষার সাদা বিস্তারের উপর আমি হঠাৎ দেখতে পাই আমার দিকে হেঁটে আসছে ডিলান টমাসের ‘স্নো ব্লাইন্ড টোয়াইলাইট’।

তুষার-অন্ধ বিপুল শীতের গোধূলি, বিকেলবেলাতেই। কিন্তু বিকেলের শীতের আকাশ ব্যাপ্ত ঘোলাটে। আমি সেখানে তারার চিহ্ন দেখিনি। মহাকালের সেই রূপ বিলেতের ক্ষুধার্ত শীত পুরোপুরি গিলে ফেলে। তবু আমি সেই প্রসারিত ঘোলাটে টোয়াইলাইটের বুকে খুঁজি ডিলানের ‘দ্য স্টার্স ফলিং কোল্ড!’ আর, হঠাৎ আমার সদ্য ছেড়ে আসা স্ত্রীর জন্য তীব্র মনকেমন ছলছল করে ওঠে রবীন্দ্রনাথের সেকেলে উচ্চারণে: ‘আমার প্রিয়ার ছায়া আকাশে আজ ভাসে’।
সেকেলে রবীন্দ্রনাথ আর সেকেলে স্কচ– এদের আবেদন নষ্ট হওয়ার নয়। এদের তেষ্টাও মেটার নয়। আমার মতো সদা তেষ্টাকাতর বাঙালির শীতে যখন মিশে গিয়েছে কোনও দৈবযোগে বিলিতি পাবের অতুল অণিমা, মনে হয়েছে স্বপ্ন তবু সত্যি, শৌভিক বাস্তব। তীব্র শীতের নিঃসঙ্গ মনকেমন দঁাতের ব্যথার মতো।

পেনকিলার খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে সেই ব্যথার তীব্রতা কমে। কিন্তু ভিতরে কিছু একটা দপদপ করতে থাকে। আর আঙুলে একটু টিপলেই আবার জেগে ওঠে সেই ব্যথা। তখন বেশ লাগে। নিবিড় শীতের মধ্যে স্কচ-আবৃত একলা মনকেমনের মতো সুন্দর বোধহয় কিছু নেই। এই বেদন সুন্দর বলেই তাকে বারবার ফিরিয়ে আনতেও ইচ্ছে করে।

মনে পড়ছে, আমার বছর এগারোর ছেলের সঙ্গে কাঠমান্ডু থেকে আরও উপরে ধুলিখেল গ্রামে কিরণের হোমস্টে-তে কয়েক দিন কাটানোর স্মৃতি। এর কিছু পরেই আমার জীবন থেকে ও ছিটকে গেল। ওর পক্ষে ভালই হল। আমার ছন্নছাড়া মায়া-মমতা এই সংসার তেমন কাজের হয়নি। কিন্তু মিসিংয়ের ব্যথা ফিরে পেতে অনেকবার গিয়েছি দারুণ শীতের ঘোলা মেঘলা কুয়াশা আর বিষাদের ধুলিখেলে। ওই শীতের মধ্যে ছোট্ট খোলা বাগান। কাঠের আগুন। পুড়ছে মাংস। সঙ্গে নেপালি মদ।

রবীন্দ্রনাথের সেকেলে উচ্চারণে: ‘আমার প্রিয়ার ছায়া আকাশে আজ ভাসে’।

মধুর নস্টালজিয়া ফিরিয়া আনার এর থেকে নিশ্চিত উপায় আর নেই। তবু টি. এস. এলিয়ট শীতকালকে তঁার ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’ কাব্যের শুরুতেই বলছেন, ঘুমপাড়ানি ঋতু। কেন আমি এতক্ষণ যে-কথা বললাম, তার ঠিক উল্টো কথা বলছেন এলিয়ট? সেটা বুঝতে, সহজ বাংলায়, আটপৌরে করা যাক এলিয়টের শীতদর্শন এবং বসন্তরাগ। এলিয়ট শুরুতেই দিলেন মোক্ষম ধাক্কা: ‘এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্‌থ’। এবার বলছেন, অন্তত ইশারায়-ইঙ্গিতে এই বার্তাই নিবেদন করছেন: শীত, তুমি থাকো। তুমি যেও না। তুমিই তো রেখেছিলে আমাদের উষ্ণ। শৈত্যের উত্তাপে আরামে ঘুমিয়েছিলাম। তুমি পৃথিবীকে ঢেকে রেখেছিলে ‘ইন ফরগেটফুল স্নো’। এই পঙ্‌ক্তি বিশ-বাইশ বছর বয়সে প্রথম পড়ার চমক– স্মৃতিতে তেজি থাকবে আজীবন। কী করে ভুলতে পারি এলিয়টের সেই পঙ্‌ক্তি: ‘উইন্টার কেপ্ট আস ওয়ার্ম?’ শীত, তুমি তোমার তুষার মোড়কের তলায় অবাক উত্তাপে আমাদের ঘুম পাড়িয়ে রাখো। এপ্রিল যেন আর না আসে আমাদের জীবনে।

এপ্রিলেই শুরু হয় ইংল্যান্ডে বসন্ত ঋতু। ক্রমশ দেখা দেয় শীতের মৃত্যু। গলতে শুরু করে তুষার। মৃতভূমিতে ফিরে আসে শীতঘুম থেকে বেরিয়ে আসা কাঠবিড়াল। জীবনহীন দেশে ফুল ফোটে। জীবন মানেই তো বেদনা। জেগে ওঠে ঘুমিয়ে থাকা স্মৃতি। আর, জাগ্রত স্মৃতি ফিরিয়ে আনে বাসনা। স্মৃতি, বেদনা ও বাসনার মিশ্রণ জীবনের শুকনো শিকড় ভিজিয়ে দেয় বসন্তের উর্বর বৃষ্টিতে। কেটে যায় মেঘ। সরে যায় কুয়াশা। আড়াল থেকে দেখা দেয় সূর্য। জীবন ফিরিয়ে আনে স্মৃতি। আর, স্মৃতি অতীত খুঁড়ে জাগিয়ে তোলে দহন। মনে পড়ে গত বসন্তে সে ছিল। এই বসন্তে সে নেই। শীত, তুমি তুষারের ঢাকনার তলায় আমাদের ঘুম পাড়িয়ে আরামে রেখেছিলে। বসন্তের মতো নির্মম নও তুমি।

এলিয়ট যাই বলুন, বসন্তের বিরহবেদনা আর শীতের নিঃসঙ্গ আর্তির ‘ইন্টেস মিসিং’ এক নয়। শীতের একাকিত্ব ও মিসিংয়ে কুয়াশার মিশ্রণ। তার কাছে, অন্তত আমার জীবনে, বসন্তের উজাড় সমারোহ নিতান্ত তুচ্ছ। শীতের ফগ এবং স্মগ আমাকে বিচ্ছেদ মাধুরীর ঘোরের মধ্যে রাখে। শীতের সন্ধ্যায় আমি বিশেষ করে দূরে থাকার চেষ্টা করি সমারোহের আলিঙ্গন থেকে। আমি বেছে নিই মনকেমনের নিঃসঙ্গ বিষাদ। আমার ভাল লাগে শীতের রাতে হুইস্কির কাটগ্লাসে মিসিংয়ের কুয়াশা। শীতের কুয়াশায়, কেন জানি না, আমার মনে হয়– কোথাও আছে বিষাদের অ্যারিস্টোক্র্যাসি।

এপ্রিলেই শুরু হয় ইংল্যান্ডে বসন্ত ঋতু। ক্রমশ দেখা দেয় শীতের মৃত্যু। গলতে শুরু করে তুষার।

বসন্তের অফুরন্ত অবদানে যা আমি পাই না। বসন্তের আমন্ত্রণে আমি চিরদিনের আউটসাইডার। যে পরভার্যার প্রণয়ডাকে আমি কুয়াশার সঙ্গে ঘর বঁাধতে চেয়ে সমস্ত নিশ্চয়তার বাইরে পা ফেলেছিলাম, সে-ও চলে গিয়েছে চির কুয়াশার আড়ালে। ক’দিন আগে, এই শীতের মধ্যে, চলে গেলাম কালিম্পংয়ের এক চা-বাগানের কুয়াশা আচ্ছাদিত নিরালা নিলয়ে। এই শীত– অবসেশন, কুয়াশানেশা আমাকে কোনও দিন যেন ছেড়ে না যায়। শীতের বেলাশেষে তুষার আর কুয়াশার মধ্যে ‘দ্য ডায়িং অফ দ্য লাইট’ এবং ফায়ারপ্লেসে কাঠের আগুন, আর হুইস্কি গ্লাসের গায়ে বরফের মেঘ যেন আমৃত্যু আমাকে ডাকে।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.