বাংলায় পচা জিনিসের অভাব নেই। পাড়ায় পাড়ায় ‘পচা’ ডাকনামের মানুষ, তাও দু’-একজন মিলবে। এবং বাঙালির সমাজ-সংসারে আপদে-বিপদে এই পচাদাদের সাড়া ও কদর, তাও দেখেছি। বলতে গেলে পচা, দড়কচা, ভেজাল ও নকলের সঙ্গে আমরা নিত্য ঘর করছি। কিন্তু দোকানে দোকানে পচা ডিম ক্রেট-ক্রেট বিরাজমান, এ-কথা বাংলা ও বাঙালির অতি বড় নিন্দুকও বলতে পারবে না।
‘পেল্টিং রটেন এগ’। ঘেন্না করে কারও গায়ে পচা ডিম ছুড়ে অপমান করা, ব্রিটিশ ঘৃণা সংস্কৃতির অঙ্গ, শ’-পাঁচেক বছরের পুরনো। ‘এগ’ শব্দটাই তো এসেছে ইংরেজি ভাষায় ওল্ড নর্স ভাষার সৌজন্যে ৮০০ বছর আগে। তবে পচা ডিমের সযত্ন সংগ্রহ, অব্যর্থ নিক্ষেপ, দুঃসহ দুর্গন্ধের ব্যাপ্ত ব্যবহার শুরু হয় ইংল্যান্ডে, রানি প্রথম এলিজাবেথের শাসনকালে। ক্রমে লন্ডনের থিয়েটার পাড়া থেকে পচা ডিম ঢুকে পড়ে ব্রিটেনের রাজনীতিতে। হিংসা ও বিদ্বেষের ঘৃণা ও পচা ডিমের প্রসঙ্গ বারবার জড়িয়েছে শেক্সপিয়রের নাটকে। কিন্তু শেক্সপিয়রের প্রতিভা পচা ডিমকেও করে তুলেছে ভাষ্যিক প্রকাশে ভাস্বর। যেমন: ‘Beaten as addle as an egg’. ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’-এ পাওয়া গেল বুদ্ধিহীন ঘেঁটে যাওয়া মস্তিষ্কের এই নিখুঁত রূপক: পচা ডিমের মতো ঘোলাটে মাথা।
ইউরোপের অনুকরণে ভারত ডিম নিক্ষেপকে প্রথম ক্ষোভের ভাষা হিসাবে বেছে নেয় সম্ভবত ১৯৭৮ সালে। ডিমটি নিক্ষিপ্ত হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর দিকে, ‘জরুরি অবস্থা’-র প্রতিবাদে।
এমনকী, সরাসরি হত্যার রাজনীতিতেও শেক্সপিয়র টেনে এনেছেন ডিমের নির্ভুল ইঙ্গিত ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকে। সিজার যেভাবে ক্ষমতায় বিপজ্জনক ও দম্ভে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে, তাকে আর বাঁচিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, এতটাই বোঝালেন ব্রুটাস তাঁর সঙ্গীদের-সিজারের নাম একবারও উচ্চারণ না করে: এখনও লোকটা সারপেন্ট ‘স এগ, ভয়ংকর সাপের ডিম, ডিম ফাটিয়ে বেরিয়ে আসতে দিও না।

বাঙালি হেঁশেলে হাঁসের ডিম আগে ঢুকেছে। মুরগির ডিম বাঙালির রান্নাঘরে এসেছে কুণ্ঠায়,
অপরাধবোধ নিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে বাঙালি গেরস্থের সংসারে ডিমভাত বাজিমাত করেছে। বাচ্চাদের স্কুলে ডিমভাত বিকল্পবিহীন। তবে বঙ্গের নতুন সরকার একই দামে স্কুল-পড়ুয়াদের জন্য মাছভাতের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ‘ডিম্ভাত’, এই বানানে, অনেক ঊর্ধশ্বাস কেজো বাঙালি সংসারে এখনও নিত্যদিনের স্টেপল খানা। ডিমের প্রতি এত ভালবাসা ও নির্ভরতা সত্ত্বেও, ডিমকে বাঙালি তার ক্ষোভ ও ঘৃণাপ্রকাশের ভাষা ও অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে।
ইউরোপের অনুকরণে ভারত ডিম নিক্ষেপকে প্রথম ক্ষোভের ভাষা হিসাবে বেছে নেয় সম্ভবত ১৯৭৮ সালে। ডিমটি নিক্ষিপ্ত হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর দিকে, ‘জরুরি অবস্থা’-র প্রতিবাদে। ডিম নিক্ষেপ সংস্কৃতির সেই সংক্রমণ এখন বঙ্গে এপিডেমিক আকার ধারণ করেছে। ডিম রক্তপাত ঘটায় না। বিপজ্জনক আঘাত হানে না। কিন্তু কাপড়চোপড় নোংরা করে অপমানের ভাষায় তরল ক্লেদ ও আঁশটে দুর্গন্ধের মাত্রা যুক্ত করে। তবে এ আসলে ক্ষণিক উল্লাস। ক্ষুদ্র মাপের সামাজিক তর্জন ও শাসন। সম্পূর্ণ ভ্রান্ত দাদাগিরি। এর বেশি কিছু কি?
সর্বশেষ খবর
-
রামপুরহাটে পুরসভার চেয়ারম্যানের দাদার নার্সিংহোমে উদ্ধার পচাগলা দেহ, ঘনাচ্ছে রহস্য
-
হাত ফসকে মেঝেয় পড়ছে তেল কিংবা দুধ? বাস্তুশাস্ত্রের এই ইঙ্গিত ভুলেও এড়াবেন না!
-
ফিরবে ‘অবহেলিত’ পুলিশের হৃতগৌরব! শুভেন্দু সরকারের উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় রক্ষা ইউনিভার্সিটির সঙ্গে মউ স্বাক্ষর রাজ্য পুলিশের
-
‘সিএবি’তে দুর্নীতি নেই’, অভিষেকের চিঠির পরেই ক্রীড়ামন্ত্রীকে ‘আগ বাড়িয়ে’ বলে এলেন সৌরভ
-
দল হারতেই পলায়ন! এ যেন এক আশ্চর্য ‘শেষের কবিতা’