গুমনামি বাবাই কি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু? এই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে (বর্তমান অযোধ্যা) নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো ‘গুমনামি বাবা’ বা ‘ভগবানজি’কে অনেকে নেতাজিই মনে করেন। তাহলে সত্যিটা আসলে কী? দীর্ঘ গবেষণায় অসংখ্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে, গুমনামি বাবার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বয়ান ঘেঁটে চমকে দেওয়া উত্তর পেয়েছেন দুই লেখক ও গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালে প্রকাশিত হচ্ছে সেই ধারাবিবরণী— ‘মহামানবের চরণতলে’।
অযোধ্যায় নির্মীয়মাণ মন্দিরের সংলগ্ন মাঠে বসে আমাদের আলোচনা চলছিল। কুণালদা ক্যামেরাবন্দি করছে মুহূর্তগুলো। একের পর এক প্রশ্নে রাজকুমারের চোখ দিয়ে বেদনাশ্রু নয়, যেন ঝরে পড়ছে সময়। আমাদের কাছে যা ইতিহাসের অনুসন্ধান, রাজকুমারের কাছে পাঁজরের একেকটা হাড়ের মতো জমানো স্মৃতিচিহ্ন। মা সরস্বতী দেবী শুক্লার শেষ জীবন নিয়ে বলছিলেন। সন্ন্যাসীর অন্তর্ধানের পরে যে দু’বছর বেঁচে ছিলেন, উদভ্রান্তের মতো পরিচিতজনদের কাছে ছুটে গিয়েছেন। বারবার আর্জি জানিয়েছেন, “সমরবাবুকে বলুন কিছু করতে!” উনি পারবেন।
সাংসদ সমর গুহের প্রতি অগাধ আস্থা ছিল সরস্বতী দেবীর। সন্ন্যাসীর সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ ছিল। ফরওয়ার্ড ব্লকের বিভিন্ন নেতৃত্বের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। উত্তরপ্রদেশে ফরওয়ার্ড ব্লক দলের স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করছিলেন, যাতে সুভাষচন্দ্রের সত্য প্রকাশ্যে আনা সম্ভব হয়। পুত্র রাজকুমার চোখের জল মুছতে মুছতে তার মায়ের শেষ ইচ্ছে কথা বলছিলেন। জ্বরে কাতর, কিন্তু বিরাম নেই উদ্যমে। “আপনাদের আমি অযোধ্যায় ভগবানজির আবাসস্থলগুলি আজকেই ঘুরিয়ে দেখাব। বহু বছর আগের কথা, আমি না গেলে সেসব বলার লোক আর নেই! সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে!”
আমি রাজকুমারজি এবং তাঁর স্ত্রীর হাতে তুলে দিলাম সাংবাদিক শ্রী অশোক ট্যাণ্ডনের লেখা সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে প্রথম গবেষণা গ্রন্থ “গুমনামি সুভাষ”-এর ইংরেজি অনুবাদ।
স্ত্রী মাধুরী শুক্লা বললেন, তিনিও যেতে চান। কিন্তু গাড়িতে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। “আপনারা কালকের দিনটা থেকে যান, আমার স্ত্রী আপনাদের পুরানি বস্তি অঞ্চলগুলো ঘুরিয়ে দেখাবে। অযোধ্যার সব জায়গাগুলো আমি আজ আপনাদের দেখাব।” জ্বরে চোখ ছলছল করছে। সেই অবস্থাতেও রাজকুমারজি আমাদের আতিথেয়তায় কোন কার্পণ্য করলেন না। আজও সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের প্রতি কী পরিমাণ আবেগ জমে রয়েছে, রাজকুমারজির পরিবারের সঙ্গে কথা বললে উপলব্ধি করা যায়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র কোনও পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পদ নন, নিপীড়িত শোষিত লাঞ্ছিত ভারতবর্ষের মানুষের মনে আশার আলো, অখণ্ড ভারতবর্ষ একদিন মাথা তুলে দাঁড়াবে বিশ্ব দরবারে! রাজনীতির ঘাত-প্রতিঘাত, দুর্নীতি প্রবঞ্চনা সবকিছু উপেক্ষা করে মানুষ আজও এই একজন নেতাকে কেন্দ্র করে স্বপ্ন দেখে!
“আপনারা ভগবানের সঙ্গে এতগুলো বছর থাকলেন, আপনাদের কখনও মনে প্রশ্ন এসেছে আপনারা কী পেলেন? কখনও মনে হয়নি আপনাদের আরও অনেক বেশি আর্থিক স্বচ্ছলতা, প্রভাব প্রতিপত্তি প্রত্যাশিত ছিল?”
আমার এমন প্রশ্ন শুনে, হাসলেন মাধুরীজি। “ভগবানের কাছাকাছি থাকতে পেরেছি, এরপর আর কি চাই জীবনে? তাছাড়া, ভগবানজি নিজেও তো আমাদের সঙ্গে এভাবেই থাকতেন ।” সৌম্য মন দিয়ে তিল দিয়ে গুড়ের মণ্ড খাচ্ছে, এলো এনামেলের গ্লাসে জল এবং গুড় দিয়ে বানানো চা। ঘরে আলো প্রবেশ করে না বিশেষ। ভিডিও রেকর্ড করার জন্য বাইরে কুণালদা সেটআপ করছে। চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে রাজকুমারজি বললেন, “তখন বোঝার বয়স হয়নি, আজ উপলব্ধি করতে পারি। কত বড় মনের মানুষ ছিলেন তিনি। আমাদের সঙ্গে এভাবে এতগুলো বছর কাটিয়ে গেলেন। ভারত সরকারের কাছে আর কিছু চাই না, ওঁর জীবন সত্যিটা মানুষের সামনে আসুক।”

কর্মরত মিস্ত্রিদের বলে রোদে খাটিয়া বিছানো হল। ‘আই অ্যাম বোস’ চ্যানেলের ইন্টারভিউ শুরু হয় রাজকুমারজির। “সরস্বতী দেবীর কোন ছবি পাওয়া যায়?” আমার প্রশ্ন শুনে সঙ্গে সঙ্গে মাধুরীজি বললেন, “আমার ফোনে আছে। আমরা ঠিক ফোন ব্যবহার করতে পারি না। আপনারা দেখে নিন।” মোবাইলের গ্যালারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে চমকে উঠলাম।” আপনারা এই ছবি আগে কাউকে দেননি?”
“কোই মাঙ্গা নেহি।” সরল অকপট স্বীকারোক্তি। হয়তো এতটা সরল বলেই ভগবানজি তাঁদের সঙ্গে থাকতে স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। আমি রাজকুমারজি এবং তাঁর স্ত্রীর হাতে তুলে দিলাম সাংবাদিক শ্রী অশোক ট্যান্ডনের লেখা সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে প্রথম গবেষণাগ্রন্থ ‘গুমনামি সুভাষ’-এর ইংরেজি অনুবাদ। “সালো সে ইয়েহি এক কিতাব থা, জো ভগবানজি কি বাত জিন্দা রখা!” রাজকুমারজির চোখের জলে ১৯৮৬ সালের স্মৃতি ভেসে উঠল।
ব্রহ্মকুণ্ড গুরুদ্বারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্মৃতিচিহ্নগুলির একটি। স্থানীয় শিখ ঐতিহ্য অনুযায়ী, গুরু নানকজি অযোধ্যায় এসে এই গাছের ছায়ায় বসেছিলেন এবং সেখানেই সাধনা ও ধর্মীয় আলোচনা করেছিলেন।
আমরা গাড়িতে রওনা দিলাম অযোধ্যায় ভগবানজির স্মৃতিধন্য স্থানগুলি অনুসন্ধান করতে। প্রথম গন্তব্য ব্রহ্মকুণ্ড গুরুদ্বার। রাস্তার ধারে একটা সরু গলিপথ ঢুকেছে। গলিতে ঢোকার আগে একটা পুরনো বাড়ি দেখিয়ে রাজকুমারজি বললেন, “গুরুদ্বারে স্থান পাওয়ার আগে এখানে আমরা ছিলাম। এখানে ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়ে উৎপাতের কারণে শেষে কোর্ট কেস পর্যন্ত হতে চলেছিল আমার মায়ের নামে। হঠাৎ একদিন প্রশাসনিক উচ্চ মহল থেকে কিছু হল। আমাদের বিবাদী পক্ষ ক্ষমা চেয়ে মামলা প্রত্যাহার করে নিল।” এ কথা সত্যি প্রশাসনিক স্তরে উচ্চমহলে ভগবানজির পরিচয় সুস্পষ্ট ছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তিনি প্রকাশ্যে এলেন না কেন?
উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের কথাবার্তা শুনে আমাদের যতটুকু ধারণা হয়েছে, হয়তো একটা সময় পর্যন্ত তিনি অজ্ঞাতবাস ছেড়ে সত্যি প্রকাশ্যে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অক্ষশক্তির পক্ষের অন্যান্য নেতৃত্ব স্থানীয়দের মতোই তিনি প্রকাশ্যে আসলে তখনই গ্রেট ব্রিটেন তাঁকে ওয়ার ক্রিমিনাল ঘোষণা করতো। তাছাড়া ভারতবর্ষের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এমন একজন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অভিজ্ঞ নেই- মানুষের বড় প্রয়োজন ছিল।
গলির ভেতরে গাড়িটা প্রবেশ করতে ডানদিকে বিশাল সেই ঐতিহাসিক স্থান। এই এলাকাটির নাম অযোধ্যার সাইনগর। লোহার গরাদ দেওয়া গেট, তার ওপারে ফাঁকা স্থানে একটা বড় বেলগাছ হয়েছে। ব্রহ্মকুণ্ড গুরুদ্বারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্মৃতিচিহ্নগুলির একটি। স্থানীয় শিখ ঐতিহ্য অনুযায়ী, গুরু নানকজি অযোধ্যায় এসে এই গাছের ছায়ায় বসেছিলেন এবং সেখানেই সাধনা ও ধর্মীয় আলোচনা করেছিলেন। আনুমানিক ১৫০০/১৫০১ সালে এখানে গুরু নানকের আবির্ভাব। গুরু নানকের পথ অনুগমনে নবম গুরু তেগ বাহাদুর এবং গুরু গোবিন্দ সিংও এই ঐতিহাসিক স্থানে পদার্পণ করেছিলেন। শিখ পরম্পরায় অযোধ্যায় সাইনগরের এই এলাকাটি অত্যন্ত পুণ্যস্থান। পাশেই উপাসনাগৃহে আমরা প্রবেশ করলাম। এক ধর্মপ্রাণ বৃদ্ধ আমাদের জানালেন, জনবিরল সময়ে রাতের বেলায় নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র এই উপাসনালয়ে এসে বসতেন। কোন সার্ভিলেন্সের আশঙ্কা ছিল না। অত্যন্ত নিশ্চিন্তে সরযূ নদীর তীরে এমন এক স্থান তিনি বেছে নিয়েছিলেন।

রাজকুমারজি গাড়ি থেকে নেমে সামনে এগিয়ে যেতেই গুরুদ্বারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি দূর থেকে দেখে প্রণাম জানায়। যখন এখানে রাজকুমারজি মায়ের সঙ্গে এসেছিলেন তখন অনেক ছোট। পুরনো সেই দিনের স্মৃতি তিনি আমাদের শোনাতে লাগলেন। তখন দেশজুড়ে এক উত্তাল পরিস্থিতি। ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনতা আন্দোলন চলছে। জনতা আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র। একথা পরে ডাক্তার তোমারের কাছে জেনেছি। সেই প্রসঙ্গে তা আপনাদের জানাব। প্রথমে আমরা ডানদিকে গুরু নানকের গাছের দিকটায় না গিয়ে বাঁ দিকে গুরুদ্বারের প্রধান অংশে প্রবেশ করলাম।
“আপ লোক কলকাতা সে আয়ে হ্যায়!” নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে জয়শ্রী পত্রিকার নাম বলতে সমর গুহ, লীলা রায় প্রমুখের নাম বললেন। কী আশ্চর্য, এত বছর পরেও এই নামগুলো তারা মনে রেখেছে? “আপনে দেখে থে ভগবানজিকো?” প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন চার পুরুষ ধরে সেই গুরুদ্বারের দায়িত্বে রয়েছেন তাঁরা। সুভাষচন্দ্র যখন এখানে এসেছিলেন তাঁর পিতা সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁদের পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে গদর পার্টি জড়িত। এই শব্দবন্ধ বিস্ফোরণের মতো বাজল আমার কানে। কেন? গদর পার্টির প্রসঙ্গটা এখানে বলা প্রয়োজন।
পাঞ্জাবের রাজনীতিতে বরাবরই একটা ত্রিমুখী সংগ্রাম ছিল। গদর পার্টি, বাবা গুরদ্বিত সিংয়ের কোমাগাতামারু দল এবং আহরার পার্টি। এই তিন দলের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর প্রভাব বিস্তার করছিল। এছাড়াও অনুশীলন সমিতির শাখা সংগঠনও ছিল। সুভাষচন্দ্র বুঝতে পেরেছিলেন এই সমস্ত দলকে একজোট না করতে পারলে ব্রিটিশ শাসনকে টলানো যাবে না। নওজওয়ান ভারত সভার প্রেসিডেন্ট থাকার সময় সুভাষচন্দ্র পাঞ্জাব প্রদেশে এসে যুব সমাজের উদ্দেশ্যে অনেক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। ভাবি ভারতবর্ষে যুব সমাজ ও পাঞ্জাবের স্থান কোথায় সেই নিয়ে বিস্তারিত বলেছিলেন। শহিদ ভগৎ সিংয়ের আত্মবলিদান এই ত্রিমুখী সংগ্রামের ইতি টানতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
১৯৪০ সালে দেশত্যাগের তোরজোর করছেন সুভাষচন্দ্র। এমন সময় পাঞ্জাবের রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে গোপন বৈঠকে তিনি জানিয়েছিলেন, পাঞ্জাবের একত্রিত থাকা প্রয়োজন দেশের স্বার্থে।
শহিদ যতীন দাসের মৃত্যু জাতীয়তাবাদী চিন্তার জাগরণ ঘটিয়ে এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়েছিল। হিমালয়ের এক গোপন গিরিখাত থেকে ভেসে এসেছিল ঘোষকের কণ্ঠস্বর। সুভাষ চন্দ্রের মহানিষ্ক্রমণকালে আম্বালাতে একদিনের অবস্থান বেশ অর্থবহ। এই আম্বালাতেই গদর পার্টির প্রেসিডেন্ট সোহম সিং ভাখনার বাড়ি। হিমালয়ের বিভিন্ন গিরিখাত থেকে অক্ষশক্তি এবং প্রধানত আজাদ হিন্দ রেডিওর যে ট্রান্সমিশন হত তার পিছনেও গদর পার্টির একটা বড় অবদান রয়েছে। ১৯৪০ সালে দেশত্যাগের তোড়জোড় করছেন সুভাষচন্দ্র। এমন সময় পাঞ্জাবের রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে গোপন বৈঠকে তিনি জানিয়েছিলেন, পাঞ্জাবের একত্রিত থাকা প্রয়োজন দেশের স্বার্থে।
তিন দলকে একত্রিত হয়ে একজন বিশেষ প্রতিনিধি নির্বাচনের কথা তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যিনি পাঞ্জাবের থেকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। সেই মতোই ঠিক হয়েছিল বলদেব সিংয়ের নাম। পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই বলদেব সিং মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে তিনিই ঘোষণা করেছিলেন সুভাষচন্দ্র শীঘ্রই প্রত্যাবর্তন করবেন ভারতে, বিশ্বস্ত সূত্রে এমনই সংবাদ রয়েছে। সামগ্রিকভাবে প্রেক্ষাপট বিচার করলে, রাজনৈতিক উত্তরণে সুভাষচন্দ্র বরাবরই গদর পার্টির সাহায্য পেয়েছেন। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের ভেতর দিয়ে দুর্ধর্ষ মহানিষ্ক্রমনে গদর পার্টির গোপন অন্তর্জাল তিনি ব্যবহার করেছিলেন। অযোধ্যা নগরীতে গুরু নানকের স্মৃতি বিজড়িত গদর পার্টির এই গোপন আস্তানায় ৭০ এর দশকে তিনি ফিরে আসবেন এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এই সত্য উঠে আসে। লীলা রায়, সমর গুহ, সুনীল দাস, দুলাল নন্দী, ডাক্তার পবিত্রমোহন রায় প্রমূখ ব্যক্তিত্ব অল্পবিস্তর সকলেই সুভাষ চন্দ্রের রাজনীতির অংশ ছিলেন। আজ বংশানুক্রমে চলে আসা এই ধর্মীয় স্থানের কর্তৃপক্ষের মুখে তাদের নাম শোনা এবং সত্তরের দশকে সন্ন্যাসীর কাছে তাঁদের আসার গল্প শোনা কি বাস্তবসম্মত নয়?

আমরা ক্রমশ সেই ঘরটার দিকে এগিয়ে গেলাম। ছোট ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের একটা ঘর, দুটো বিছানা করা। উপাসনালয় সংলগ্ন এই ঘরেই থাকতেন সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র। বাইরে একটা খোলা মুক্তাঞ্চল যেখানে দাঁড়িয়ে প্রাণ ভরে শ্বাস নেওয়া যায়। সেদিকে কোন জনবসতি নেই। আছে এক জলাধার। পাশেই একটা পাতকুয়ো যা তিনি ব্যবহার করেছিলেন। জয়শ্রী পত্রিকার প্রবীণদের কাছে এই জায়গার বর্ণনা শুনেছি। গুরুদ্বারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি জানালেন এই ঘর ভর্তি ছিল শুধু বই আর বই। সারাদিন তিনি ঘরেই থাকতেন এবং বই পড়তেন। দিনের আলো ফুরিয়ে আসলে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন এখানে। এমনও শোনা যায় এখানে একসময় ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন।
গুরুদ্বারের সেই ব্যক্তি আমাদের মুঠো ভর্তি আখরোট, কাজু, পেস্তা দিলেন প্রসাদ। সারাদিনের ছোটাছুটির পর আমরা পেট ভরে তা গ্রহণ করলাম। কলকাতার মানুষদের প্রতি তাদের এক অসীম ভালোবাসা আছে, তারা মনে করে কলকাতা মানেই সুভাষচন্দ্রের বাড়ি! গুরুদ্বারের সকলকে প্রণাম জানিয়ে আবার আমাদের যাত্রা শুরু হল। এবার গন্তব্য লখনৌহাথা মন্দির। সেখানে একসময় পড়ে গিয়ে সুভাষ বাবু পায়ে চোট পেয়েছিলেন বলে শোনা যায়।
“আভি সবকুছ খতম হো রাহা হ্যায়। ইতনা সময় বিত গ্যায়া। সব লোগ চলে গ্যায়ে।“ রাজকুমারজির আক্ষেপ বাতাসে অনুরণন তুলে বিষাদের সুর হয়ে বেজে রইল আমাদের মনে।
(পরবর্তী পর্ব ২৮ সেপ্টেম্বর, সোমবার)
সর্বশেষ খবর
-
নিজেকে রাজ্য পুলিশের ডিএসপি পরিচয় দিয়ে ৫ লক্ষ টাকা তোলাবাজির চেষ্টা, গ্রেপ্তার প্রতারক
-
চূড়ান্ত হয়ে গেল আগরকরের উত্তরসূরি! গম্ভীরের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে চার নির্বাচক
-
রেজিনগরে ঋত-তৃণমূলের ভোটের প্রচারে লজেন্স কুড়োতে গিয়ে দুর্ঘটনা! মৃত ৬ বছরের শিশু
-
প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর ইন্দ্রনীল সেনের বাড়ি থেকে বেরল ইডি, আগামিকাল তলব প্রাক্তন মন্ত্রীকে
-
‘ইন্ডির পিণ্ডি চটকে গিয়েছে, দিমাগি নকশালদের পরামর্শ দিতে দিল্লিতে মমতা’, বিস্ফোরক শুভেন্দু