BREAKING NEWS

১২ ফাল্গুন  ১৪২৭  বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ 

READ IN APP

Advertisement

কিশোর-বেদীর মতো প্রতিবাদী মানুষগুলি আজকের দুনিয়ায় কোথায় গেল?

Published by: Monishankar Choudhury |    Posted: February 12, 2021 4:13 pm|    Updated: February 12, 2021 4:26 pm

An Images

রাজদীপ সরদেশাই: অক্ষয় কুমারের বহু বহু আগে এদেশে আরেক কুমার ছিলেন। কিশোর কুমার। একাধারে এই গায়ক-অভিনেতা দেশের লাখ-লাখ মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তাঁর শিল্পের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তাঁর প্রতিভা কেবলই তাঁর অমন সুরেলা গলায় আটকে ছিল না। ১৯৭৫-এ ‘জরুরি অবস্থা’ যখন জারি হল দেশজুড়ে, ইন্দিরা গান্ধীর সরকার তাদের ‘২০ পয়েন্ট প্রোগ্রাম’ প্রোমোট করার জন্য বলিউডের তারকা-গোষ্ঠীকে কাছে টানার ছক কষেছিল। তারই অংশ হিসাবে সেই সরকার কিশোর কুমারকে যুব কংগ্রেসের একটি পথসভায় গান গাওয়ার জন্য আবেদন করে। তা প্রত্যাখ্যান করেন কিশোর কুমার। এবং, তারপরই, মার্কামারা প্রতিহিংসার বাণ ধেয়ে আসে কিশোর কুমারের দিকে। তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ভি সি শুক্লা রীতিমতো ‘অর্ডার’ জারি করে অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং দূরদর্শন-এ ব্যান করে দেন কিশোর কুমারকে। তাঁর কোনও গান চলবে না সেখানে, কোনও সিনেমা দেখানো হবে না! এই ‘নিষিদ্ধ’ তালিকায় ছিলেন দেব আনন্দ, মনোজ কুমার এবং শত্রুঘ্ন সিন্‌হার মতো বাঘা বাঘা শিল্পীও। এঁরাও প্রত্যেকে আদেশ বা হুকুম মতো ‘আজ্ঞে’ করতে অস্বীকার করেছিলেন।

[আরও পড়ুন: চাকরি পেলেন ও খোয়ালেন সাংবাদিক নিধি রাজদান]

তেমনই, আজকের ভারতীয় ক্রিকেট তারকাদের বিপ্রতীপে, ছিলেন আরেক ব্যতিক্রমী ক্রিকেটার- বিষেণ সিং বেদী। কিংবদন্তি এই বাঁহাতি স্পিনার শাসকের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন একাধিকবার, একাধিক প্রসঙ্গে। ১৯৭৪-এর কথা। সে-সময় বিদেশের মাটিতে ম্যাচের টুরে খেলোয়াড়দের অত্যন্ত কম মাইনে দেওয়ার বিষয়ে আওয়াজ তুলেছিলেন তিনি। ক্রিকেট বোর্ড তাঁকে একটা টেস্টে ব্যান করে দেয়। আর একবার চরম শীতের সিজনে খেলোয়াড়দের গরম জলের ব্যবস্থা করে না দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রীতিমতো কটুকথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটের কনট্রাক্ট তাঁকে খোয়াতে হয়েছিল। কারণ কী? না, ইংরেজ ফাস্ট বোলার জন লিভারের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ তুলেছিলেন মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে বলের গায়ে ভেসলিন লাগানোর জন্য! সাম্প্রতিক কালে, ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামে প্রাক্তন বিজেপি নেতা অরুণ জেটলির মূর্তি স্থাপনের বিরুদ্ধে তিনি সরব হয়েছিলেন। এমনকী, জেটলির নামে স্টেডিয়ামের একটি স্ট্যান্ডের নাম রাখার বিষয়েও প্রতিবাদ করেন তিনি। কেরিয়ারের সময়ে তো বটেই, সারা জীবন, বেদীকে আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে একজন রেবেলের ভূমিকায় দেখেছি বরাবর।

তাহলে সেই কিশোর-বেদী বা এঁদের সমতুল্য মানুষগুলি আজকের দুনিয়ায় কোথায় গেল? কেন আজকের সিনেমা ও ক্রীড়াজগতের মহাতারকারা রাষ্ট্রযন্ত্র বা প্রশাসনের যে কোনওরকম ক্ষমতাপ্রদর্শনের বিরুদ্ধে একচুলও দাঁড়াতে অপ্রস্তুত, অনিচ্ছুক? উলটে চাটুকারিতায় ভরা তোষামোদ করতেই তাঁরা যেন উদ্‌গ্রীব, বেয়াকুল। সম্প্রতি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে বিদেশি মানুষদের প্রতিবাদী টুইটের বিপ্রতীপে তাঁদের গড়পড়তা এক ছাঁচের টুইটের ধারা দেখে কি সেটাই পরিষ্কার হয় না? যাঁরা কস্মিনকালে সহস্র কৃষকের আত্মহত্যা নিয়ে একটাও কথা বললেন না, তাঁরা হঠাৎ কৃষক আন্দোলন নিয়ে চিন্তিত মতামত দিতে একেবারে উঠেপড়ে লাগলেন!

জনপ্রিয় পপ তারকা রিহানার কৃষকদের সমর্থনে একটিমাত্র টুইটের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার এই ক্লোন টুইটের বন্যা তো নির্দ্বিধায় কেন্দ্রীয় সরকার আয়োজিত সোশ্যাল মিডিয়া কাউন্টারব্লাস্ট! কিন্তু তা করতে গিয়ে আমাদের মহাতারকারা আসলে প্রমাণ করলেন, তাঁদের নিজেদের বিবেচনাবুদ্ধির কতখানি অভাব! তাঁরাও শেষমেশ কপি-পেস্ট প্রোপাগান্ডায় মাতলেন! নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হিমশিম খাওয়া ও মশগুল একটি প্রশাসনের কাছে এই বিপুল জনপ্রিয়তায় ঠাসা তারকারা হয়ে উঠেছেন ধারণা-দ্বন্দ্ব-অমঙ্গলের বোড়ে। সর্বেসর্বা রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে কাঠের পুতুল। ধনদৌলত-ভরা প্রাচুর্যময় কুক্ষিগত জীবনে নিজেদের বেড়া বাঁচাতে তারা যেন সমস্ত সত্তা বেচে দিয়েছেন, কারণ, পান থেকে চুন খসলেই, বিরোধিতার বিন্দুমাত্র আঁচ দেখালে তাঁদের অপ্রত্যাশিত মাশুল গুনতে হতে পারে!

তবে এসব আজকের এই ২০১৪-পরবর্তী রাষ্ট্রযন্ত্রকালের অভিনব ঘটনা নয়। পাল্লা দিতে কিংবা পপ কালচারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে তারকাদের সঙ্গে দোস্তি অথবা নজরে রাখাটা ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলির প্রিয়তম অবসর হয়ে আসছে সেই কোন কাল থেকেই। নেহরুভিয়ান কংগ্রেসের তো বহুকালীন ফুর্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে রাজত্ব চালানোটা। নেহরু ও ইন্দিরা উভয়েই রাজ কাপুর থেকে শুরু করে দিলীপ কুমার, নারগিসের মতো তারকাকে লালনপালন করেছিলেন রীতিমতো। বলরাজ সাহনি থেকে শুরু করে শাবানা আজমি- বামপন্থীদেরও একটা শক্তপোক্ত অবস্থান রয়েছে ফিল্ম ও থিয়েটার মহলে বহু দশক যাবৎ। কিন্তু এখন সমাজ যেখানে এতটাই মেরুকৃত, সেখানে সিনে-জগতের আদর্শগত ফাটলগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেকটি অনুপম খেরের উলটোদিকে একজন করে নাসিরুদ্দিন শাহ সেখানে উপস্থিত, প্রত্যেক কঙ্গনা রানাওয়াতের উলটোদিকে একজন তাপসী পান্নু রয়েছেন, একজন মধুর ভাণ্ডারকরের বিপরীতে অনুরাগ কাশ্যপ মিলবেই মিলবে। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন তার আদর্শের অনুগামীকে বাহবা দেয় এবং সমালোচককে বিশ্রীভাবে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়, তখন শক্তির কাছে মাথা নত করার জন্য প্ররোচিত হওয়া স্বাভাবিকভাবেই বৃহত্তর হয়ে ওঠে। এবং এই মাথা নত করা এতটাই বেহায়া ও নির্লজ্জতার সঙ্গে বেড়ে উঠেছে যে, আজ নিজস্ব মত বা আদর্শ, বিশেষত ভিন্নমত পোষণকারী স্বাধীনচেতা মানুষের যেন জায়গাই নেই। তাদের জন্য বরাদ্দ পরিসর এখন সংকুচিত।

এমন পরিস্থিতিতে তারকাদের হস্তগত করা এবং জো হুজুরি করানো তখন সহজ হয়ে যায়। কারণ, তারকাদের মনে তখন নেপথ্যে কাজ করে ‘কিছু যদি করে দেয়’-সুলভ আতঙ্ক। আর, বাধ্য করার এই প্রক্রিয়াকরণেই মুক্ত কণ্ঠ এবং গণতন্ত্রের নামে ফাঁপা সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট হয়ে যায়। একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্র তার দাঁত-নখ বের করে আনে এবং এমন চাপ সৃষ্টি করে যে সেখানে কেউ প্রায় তার প্রতিরোধ করতে পারে না।

ভি সি শুক্লার মতো নেতা আজ রাজনৈতিক সিস্টেমে গিজগিজ করছে, ক্ষমতার অপব্যবহার যাদের প্রায় স্বভাবে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ইনকাম ট্যাক্স ফাইল দাখিল করা থেকে শুরু করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের এফআইআর- এসবের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ম করে ধনী ও খ্যাতনামা মানুষদের জীবনের অন্দরমহলে ঢুকে পড়ে, হাঁড়ি ভাঙে। বাঁধনছাড়া রাষ্ট্রযন্ত্রের দৌরাত্ম্য কীভাবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে আতঙ্কিত করে দিতে পারে, গত বছর রিয়া চক্রবর্তীর ঘটনাই তার ধ্রুপদী উদাহরণ। দরজায় এনসিবির কড়ানাড়ার আতঙ্ক প্রায় সর্বত্র বিরাজমান।

আর, আজ শুধু ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক হর্তাকর্তারাই এই ভয় দেখানো ও হুমকি দেওয়ার অপরাধে অপরাধী নন, এই ভিড়ে ঢুকে পড়েছে আত্ম-শৈলীতে ভরপুর প্রহরী জনতাও। রাষ্ট্রযন্ত্রের লালনপালনে পরিপুষ্ট সোশ্যাল মিডিয়া আর্মি। কখনও বা এমনিই উড়ন্ত কোনও নাগরিক। যারা এঁড়ে বাক্যবাগীশ, ব্যক্তিগত আক্রমণে ‘মাহির’ এবং সাইবার অ্যাবিউস ও হিংসা ছড়ানোয় সিদ্ধহস্ত। আসলে এদের এমন ব্যাপক একত্র করেছে যে-শক্তি, তা হল: সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও তার কর্কশ পক্ষাবলম্বন। যার ফলে, সেই আদর্শের একচুল উলটোদিকে কোনও কথা উঠলেই, তা হয়ে যায় অ্যান্টি-ন্যাশনাল, দেশদ্রোহী। হলিউডে যেখানে মেরিল স্ট্রিপের মতো নায়িকা ক্ষমতার বিরুদ্ধে সত্য বলার জন্য অভিনন্দিত হন, পূজিত হন, ঠিক উলটোটাই ভারতে ঘটে। তাঁকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের তরফে।

মনে করুন, সমাজে বাড়তে থাকা অসহিষ্ণুতা নিয়ে সরব হওয়ার জন্য কিছু বছর আগে শাহরুখ খান এবং আমির খান কীভাবে অপদস্থ হয়েছিলেন। হিন্দুত্ববাদী আদর্শে পরিচালিত জনতার প্রতিবাদের ঢল নেমে পড়েছিল। তাঁদের পদবি লক্ষ্য করে ‘দেশপ্রেম’ নিয়ে প্রশ্নবাণ ছুড়েছিল তারা। এবং এর মধ্য দিয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামির এক দমবন্ধ পরিমণ্ডলে তাঁদের অবস্থান সংকটময় করে তুলেছিল এই গলা ফাটানো, এই প্রশ্নবাণ।

তাঁদের সিনেমা বয়কটের ডাক দিয়ে, তাঁদের অ্যাড স্পনসরদের তুলে নিতে বাধ্য করে এই প্রতিবাদীরা আসলে জেনেবুঝে এই তারকাদের পেটে লাথি মারার কাজই চালাচ্ছিল। একটা বড় ফিল্ম প্রোডাকশনে বিনিয়োগ মানে অনেক খরচ, ফলে তা নিয়ে ঝুঁকি নিতে কে-ই বা চাইবে। ফলে, এখান থেকে আন্দাজ করা যেতে পারে, কেন অন্যতম প্রোডিউসার-ডিরেক্টর করণ জোহরকে মারাঠি মনুস-এর আবেগে আঘাত দেওয়ার জন্য রাজ ঠাকরের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। এবং হয়েছিল তাঁর প্রযোজিত সিনেমা ‘ওয়েক আপ সিড’ রিলিজের ঠিক আগে আগে।

পরিহাস হল এই যে, আজ যেখানে শীর্ষস্থানীয় সেলিব্রিটিরা আওয়াজ তোলার বিষয়ে যতখানি নিজেদের বিরত করে রেখেছেন, উলটোদিকে ফেম ইন্ডাস্ট্রির অপেক্ষাকৃত কম-খ্যাতরা আজ তুলনায় বেশি সাহসী, স্পষ্টভাষী। সম্ভবত, তাঁরা অনুভব করেছেন যে, তাঁদের এই মোকামে খোয়ানোর জায়গা কম। এই যেমন, উত্তরোত্তর বেড়ে ওঠা স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানরা। কুণাল কামরা যেমন। সুপ্রিম কোর্টের কনটেম্পট নোটিসে মাথা নোয়াতে অগ্রাহ্য করেছেন। অথচ, অন্যদিকে একাধিক মানুষজন রয়েছেন, যাঁরা আরও বেশি খেলো ও বিদ্রুপী বিনোদনমূলক অ্যাক্ট করে চলেছেন। তাঁদের কিন্তু কোনওরকম নোটিস পাঠানো হচ্ছে না। কিন্তু যখন মুনাওয়র ফারুকি-র মতো স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রায় মাসখানেক জেলবন্দি রাখা হয় এমন এক কমেডির অভিযোগে, যা কিনা মুনাওয়র পারফর্মই করেননি, তখন আপনার নিজের কাছে আশ্চর্য প্রশ্ন জাগে- তাহলে কতক্ষণ আগে থেকে অভিযোগকারীরা ঢুকে বসে রয়েছিল ওই কমেডি অ্যাক্টের জায়গায়! হয়তো কিশোর কুমার হলে গাইতেন- ইয়ে কাঁহা আ গ্যয়ে হম!

পুনশ্চ: সিনে-তারকাদের বিভিন্ন কারণে শিরদাড়া শক্ত নয়, কিন্তু আমাদের চ্যাম্পিয়ন ক্রিকেটারদের কী হল? তাঁরা তো প্রশাসনের প্রতি সরাসরি নির্ভরশীল নন। আসলে ক্রিকেট বোর্ডে অন্যতম আধিকারিক যদি হন দেশের দ্বিতীয় সর্বোত্তম ক্ষমতাশালী মানুষটির পুত্র, তাহলে আমরা কি ক্রিকেটারদের থেকে কৃষি আইন ছাড়া আর অন্য কিছু নিয়ে কথা বলতে দেখতে পারি, তা-ও আবার ম্যাচের আগের টিম মিটিংয়ে!

[আরও পড়ুন: ‘সাধারণ মানুষ হতচ্ছাড়া জীব’]

Sangbad Pratidin News App: খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
নিয়মিত খবরে থাকতে লাইক করুন ফেসবুকে ও ফলো করুন টুইটারে

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement