রোমানদের কাছে মধু ‘অ্যামব্রোসিয়া’ দেবতার ভোগ্য। আড়াই হাজার বছর আগের ডাক্তারবাবু হিপোক্রেটিস তাঁর প্রেসক্রিপশনে রাখতেন মধু, ঔষধি রূপে। তুতেনখামেনের সমাধিতে মিলেছে মধু। আগস্টের তৃতীয় শনিবারটি ‘ওয়ার্ল্ড হানি ডে’ রূপে পালিত হয়। লিখছেন সুমন প্রতিহার।
‘হানি বি রিসার্চ সেন্টার’ রয়েছে কানাডার গুয়েলফ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বলছেন প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকেই মানুষ ছিল মধুতে। লুসিয়ানা দা কোস্টা কারভালহো অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট। লুসিয়ানা বলছেন, আদিম সব মানব সভ্যতা মধুতে আসক্ত। ২০২১ সালে স্পেনের ‘ট্রাবাজোস ডি প্রিহিস্টোরিকা’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা জানিয়েছিল একটি আশ্চর্য ঘটনার কথা। গবেষণার কেন্দ্রে ছিল উত্তর-পূর্ব স্পেনের গুহায় আঁকা সাড়ে ৭ হাজার বছর আগের ছবি। মানুষের মধু সংগ্রহের গুহাছবি।
মিশরের হায়ারোগ্লিফিকও বলছে, ৫ হাজার বছর আগেই ও-দেশে মধুর চল। ২০২২ সালে ‘অ্যানিম্যাল’ জার্নাল প্রকাশিত আর-একটি গবেষণায় জানা যায়, নীল অববাহিকায় ফারাও যুগের শুরুতেও মানুষ মধুর ব্যবহার জানত। শিলালিপিতে নথিভুক্ত রয়েছে ২,৪০০ আগে ফারাও নিউসেরে ইনি-র সূর্য মন্দিরে মধু-ব্যস্ততা ছিল। মন্দিরের দেওয়ালে ৪টি ছবি। একটিতে মানুষ ও মৌচাক, দ্বিতীয়টিতে ৩ জন একটি পাত্রে মধু ঢালছে, তৃতীয় ছবি ২ জনে মধু নিয়ে ব্যস্ত, শেষ ছবিতে একজন ব্যক্তি মধু পাত্রের ঢাকা বন্ধ করছে। মিশরীয় ফারাওরা দাসদের জন্য কতখানি মধু বরাদ্দ করতেন, সে বিষয়েও আন্দাজ করা যায়। দাসদের সোনালি তরলের একচামচও হয়তো জুটত না।
সাড়ে ৭ হাজার বছর আগের প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতায়, মধু ‘খাদ্য’ রূপে শুধু নয়, ‘ঔষধি’ রূপেও ব্যবহৃত হত, এর প্রমাণ বিদ্যমান। ২০১৮ সালের ‘জার্নাল অফ এপিকালচার রিসার্চ’-এর গবেষণায়, উঠে এসেছে যে, চিনে আয়ুর্বেদ ও ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনে মধুর ব্যবহার। সুমেরীয়রা চোখ ও কানের সংক্রমণে মধু ব্যবহার করত। আবার মধুর সঙ্গে দুধ এবং ভেষজ নির্যাসের মেশানো চলত। মধুর প্রচলন ছিল পেটের গন্ডগোলে।
পৃথিবীর প্রাচীনতম সাহিত্য ঋগ্বেদে রয়েছে মধুর আয়ুর্বেদিক ব্যবহার, পঞ্চমৃতের এক।
মিশরীয় জনবিশ্বাস, প্রাচীন মিশরের সূর্যদেবতা রে-র অশ্রু থেকে মধু ঝরে। সোনালি তরল বিশুদ্ধতার প্রতীক। মিশরীয়রা রুটি দিয়ে মধু খেত তা-ই শুধু নয়, বিয়ার গোত্রের পানীয়ের সঙ্গেও মিশত মধু। মধু গাঢ়, রয়েছে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড। মধুতে ক্ষতর বেয়াড়া সংক্রমণ জব্দ থাকে। ১৮৬২ সালে, এডউইন স্মিথ একখানি প্যাপিরাস খুঁজে পান। জানা যায়, মিশরীয়রা সাড়ে ৩ হাজার বছর আগে পোড়া ও ক্ষত নিরাময়ে ব্যান্ডেজে দিত মধুর প্রলেপ। হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড কাজ করত অজান্তে।
রোমানদের কাছে মধু ‘অ্যামব্রোসিয়া’, দেবতার ভোগ্য। আড়াই হাজার বছর আগের ডাক্তারবাবু হিপোক্রেটিস তাঁর প্রেসক্রিপশনে রাখতেন মধু, ঔষধি রূপে। পৃথিবীর প্রাচীনতম সাহিত্য ঋগ্বেদে রয়েছে মধুর আয়ুর্বেদিক ব্যবহার, পঞ্চমৃতের এক। আহ-মুজেন-ক্যাব, মায়ানদের মধু ও মৌমাছি দেবতা। তাদের বিশ্বাস, মধুর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ সম্ভব। পিছিয়ে নেই কোরানও। লেখা হয়েছে আল্লার আশীর্বাদ, প্রাকৃতিক উপাচার। বাইবেলে মধুর উল্লেখ বারংবার। ‘প্রমিসল্যান্ড’ ইজরায়েল বোঝাতে বাইবেলে লেখা, যেখানে মধু আর দুধের নদী। বাইবেলে বলা হয়েছে, মধু ভগবানের মানব উপহার।
প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রে মধু! গ্রিসের গল্পে রয়েছে, ছোট্টবেলায় দেবতা জিউসের মুখে মধু দেওয়া হয়েছিল।
মিশরের সমাধি ঘরে মমির সঙ্গে সেরামিক পাত্রে পাওয়া গিয়েছে মধু। সেরামিক শুধু নয়, তামা ও ব্রোঞ্জের পাত্রে মধু রাখার রেওয়াজ ছিল। ১৯৫৪, দক্ষিণ ইতালিতে ভূগর্ভস্থ এক ব্রোঞ্জ সমাধির খোঁজ মেলে। অচেনা দেবতার উদ্দেশ্যে সেখানে রাখা হয়েছে ৮টি কর্ক-ঢাকা বয়াম। গবেষণা গভীরে গেলে জানা যায়, ওই অঞ্চলে ২,৬০০ বছর আগে গ্রিক জনবসতি ছিল। প্রতিটি বয়ামের ভিতরে চটচটে পদার্থের উপস্থিতি, গন্ধটাও কেমন মোম-মোম। ২০২৫ সালে ‘জার্নাল অফ আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি’ গবেষণা প্রকাশিত হলে জানা গেল, আড়াই হাজার বছর আগের ৮টি বয়ামে পাওয়া চটচটে পদার্থটি মধু।
প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রে মধু! গ্রিসের গল্পে রয়েছে, ছোট্টবেলায় দেবতা জিউসের মুখে মধু দেওয়া হয়েছিল। ২০২০-তে প্রকাশিত গবেষণায় আবার বলা হয়, জিউস শুধু নন, মধুতে জড়িয়ে আরও অনেক দেবতা। মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে মধুর নাকি চমৎকার ভূমিকা রয়েছে। সমাধিক্ষেত্রে বয়ামবন্দি মধু মেলে তাই অহরহ। আর-একটি বিশ্বাস এ ধারণাকে যোগ্য সঙ্গত করত– মধু নষ্ট হয় না। বন্ধ বয়ামে মধুর আয়ু নাকি ৩ হাজার বছর। গবেষণা বলছে, মৌমাছি মৌচাকে ফিরে ডানার ঝাপটে মকরন্দের জল প্রায় শুকিয়ে ফেলে। মধু অম্ল, ওখানে রয়েছে গ্লুকোনিক অ্যাসিড। এই অ্যাসিডের সঙ্গে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের আবির্ভাব। সব মিলিয়ে মধু নষ্ট হয় না সহজে। তুতেনখামেনর মমিতে পাওয়া সাদা জারে সংরক্ষিত চিটচিটে পদার্থটি মধু-ই!
মানুষ বিশ্বাস রেখেছে মধুতে, মধুর ঔষধিতে। নিউ জিল্যান্ডের প্রত্যন্ত সমুদ্রতীর-ঘেষা পাহাড়চূড়ায় ফোটে মানুকা ফুল। ওই ফুলের মকরন্দ খেয়েই মৌমাছিরা জমায় মানুকা মধু। পাহাড়ের খাঁজে মৌচাক খোঁজা বেজায় ঝক্কির। মধুর দাম কেজি প্রতি ৫০০ থেকে ২০০০ ডলার। দামের এমন ফারাক কেন! মানুকা মধুতে মেলে মিথাইলগ্লাইক্সাল, এই রাসায়নিক ব্যাকটেরিয়ার যম। মধুতে মিথাইলগ্লাইক্সালের মাত্রার কমা-বাড়ার সঙ্গে দামের ওঠা-নামা। ইয়ামেনে মরুভূমির উষ্ণতায় ফোটে সিডার গাছের সাদা ফুল। ফুলের অপেক্ষা থাকা মৌমাছি মকরন্দ নিয়ে মৌচাকে জমায় সিডার মধু, দাম কেজি ১ থেকে ৩ হাজার ডলার। ও মধুতে ইতিহাসের গন্ধ, মরুর ঘ্রাণ। সমুদ্র থেকে হাজার ৮০০ মিটার উপরে রয়েছে গুহা, আধো-আলো গুহার ছাদে বিশেষ ধরনের মৌমাছি বাসা বাঁধে, জমা করে এলভিস মধু, দাম? কেজি প্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার ডলার। এলভিস মধুতে পৃথিবীর গন্ধ। তুরস্কেই মেলে সেন্টওয়ারি মধু, ১ কেজি দাম ২৫ হাজার ডলার।
জীবনের ঝুঁকি রেখে মানুষের মধু-আসক্তি শুধু ব্যাকটেরিয়াকে সবক শেখাতে, ভাবলে ভুল হবে। রসনাতৃপ্তির জন্য মানুষ সব পারে। মধুময় জীবনের কথা মানুষ বরাবর ভেবেছে। এ পৃথিবীর ধূলি হোক মধুমাখা, কল্পনায় অনুভব করছে। আগস্ট মাসের তৃতীয় শনিবার পালিত হয় ‘ওয়ার্ল্ড হানি বি ডে’ রূপে। চাকভাঙা মধু ও হর্ষ জীবনে প্রতিপালিত হোক।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক
[email protected]
সর্বশেষ খবর
-
ফোনেই হত ‘ডিল’, রাত নামলেই পৌঁছে যেতেন মহিলারা! গরুমারার হোটেলে দেহব্যবসার চক্র ফাঁস
-
রাহুল নয়, প্রধানমন্ত্রী হবেন বিজয়! টিভিকের প্রচারে চটে লাল কংগ্রেস, ‘অসীম কল্পনা’, কটাক্ষ ডিএমকের
-
‘ছেলে যেন বিচার পায়’, বরুণ বিশ্বাস ‘খুনে’ সাক্ষ্য ৯২ বছরের বাবার, এজলাসেই অঝোরে কান্না
-
‘শুল্কবোমা’, ইরান যুদ্ধের থাবাতেও ভারতের অর্থনীতির স্বপ্নের দৌড়! প্রত্যাশারও বেশি জিডিপি বৃদ্ধি
-
বেআইনি বিলবোর্ড খুলতে পুলিশকে বাধা, অভিষেকের অফিসে তদন্তে লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ
