Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৬ জুন ২০২৬
Democracy

সম্পাদকীয়: গণতন্ত্রের কর্কট রোগ

গণতন্ত্র যে এখনও বেঁচে আছে, সেটা আমরাই বিশ্বাস করতে পারি না।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২১, ১৬:০৯

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২১, ১৬:০৯

options
link
সম্পাদকীয়: গণতন্ত্রের কর্কট রোগ zoom
ছবি: প্রতীকী

জয়ন্ত ঘোষাল: গণতন্ত্র নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা চলছে। প্রত্যেকেই আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। কিন্তু গণতন্ত্র যে এখনও বেঁচে আছে, সেটা আমরাই বিশ্বাস করতে পারি না।

[আরও পড়ুন: ব্যাংক বেসরকারিকরণের ফলে কি ‘রক্ষাকবচ’ হারাবে সাধারণ মানুষ?]

বেশ কয়েক বছর আগে ‘ওয়ার্ল্ড ভ্যালুজ সার্ভে’ একটা গবেষণামূলক সমীক্ষা করেছিল। সে গবেষণার ছাতায় এসেছিল ৫৭টি দেশের ৭৩,০০০ মানুষ। যখন মানুষকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন? দেশ শাসনের জন্য কি গণতন্ত্র প্রয়োজন?’– প্রায় শতকরা ৯২ ভাগ মানুষ উত্তর দিয়েছিলেন, ‘হ্যাঁ’। তাঁরা মনে করেছিলেন, গণতন্ত্রের সঠিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করা যায়।

Advertisement

এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। প্রায় ১২টি দেশে পুরোপুরি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংখ্যা ক্রমশ বাড়ে। ১৯৭২ সালে ৪৪টা রাষ্ট্রে ভোট মাধ্যম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ সালে এই সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৭২। পরবর্তীতে, ১৯৫টি দেশের মধ্যে ১১৭টি দেশে নির্বাচনী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

সেই ‘ওয়ার্ল্ড ভ্যালুজ সার্ভে’-র রিপোর্টই বলছে, পৃথিবীজুড়ে এই উৎসাহ কমছে। ফ‍্যাসিবাদ আমরা কেউ চাই না। মানুষের অধিকার এবং স্বাধীনতার জয়গান গাইতেই ভালবাসি আমরা। কিন্তু এটাও সমীক্ষা থেকে বেরিয়ে আসছে যে, মানুষের এই গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব‍্যবস্থার প্রতি অনাস্থাও ভয়ংকরভাবে বেড়ে গিয়েছে। সেই অনাস্থা এবং উদাসীনতা মানুষকে উগ্র ব‍্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের দিকে আরও বেশি করে ঠেলে দিচ্ছে। সমসাময়িক রাজনৈতিক জীবনকে আরও দুর্বল করছে। শতকরা ৮৯ ভাগ মানুষ মনে করছে, এই মুহূর্তে গণতন্ত্রের চিৎকার আছে। কিন্তু দাঁত নেই। অর্থাৎ, গণতন্ত্র দাঁত-ফোকলা এক বৃদ্ধে পরিণত।

অতএব আ-পৃথিবী গণতন্ত্রের সংকট। গণতন্ত্র থেকে মুক্তির পথ নিয়ে আলাপ-আলোচনা, লেখালিখি শুরু হয়েছে। ‘How Democracies Die’ শীর্ষক বইটি জনপ্রিয় হয়েছে। স্টিভেন লেভিটক্সি এবং ড‍্যানিয়েল জিব্ল‍াটের লেখা এই বইটিতে শুধু ট্রাম্প-প্রশাসন নয়, সামগ্রিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঙ্কাল যে কত ভঙ্গুর, সেটা তুলে ধরা হয়েছে নানাভাবে। যেমন, ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’ শেষ হওয়ার পর গণতান্ত্রিক ব‍্যবস্থার ভেঙে যাওয়া, সামরিক শাসনের উত্থান, ব‍্যক্তিস্বাধীনতার উপরে স্টিম রোলার চালিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠবাদের প্রকোপ, প্রলেপ।

কত যে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে! মায়ানমারের সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানের পাশাপাশি ২০১৪ সালের থাইল্যান্ডের ক্যু। ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের সামরিক অভ‍্যুত্থান। এসব ঘটনা আবার নতুন করে গণতন্ত্রকে ক্রসরোডে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ১৯৬০-’৭০ সালে যে সামরিক উত্থান খুব স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে উঠেছিল, সেই সংকট আবার নতুন করে দানা বাঁধতে শুরু করেছে। আরও দুঃখজনক একটি খবর পেলাম। আমেরিকার Freedom House এবং সুইডেনের V-Dem Institute বার্ষিক গণতন্ত্রের রিপোর্ট তৈরি করেছে। এই দু’টি সংস্থার রিপোর্টেই পৃথিবীর বিভিন্ন গণতন্ত্রের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভারত সম্পর্কে বলা হয়েছে, গণতন্ত্র এখানে যথেষ্ট বিপন্ন। নির্বাচনে জয়লাভকেই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় নির্ধারক হিসাবে দেখানো হয়। কিন্তু এই রিপোর্ট বলছে, গণতন্ত্র শুধুমাত্র নির্বাচনী জয়লাভের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় প্রতিটি মানুষের মধ্যে সমন্বয়সাধনে। মানুষের কাছে মৌলিক ও ন্যায্য অধিকার পৌঁছে দিয়ে। সুষম সমাজ গঠনের মধ্য দিয়ে।

সম্প্রতি, দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে এই সংকটজনক প্রেক্ষাপটে একটা অভিনব পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হয়েছে। সেটা হল, বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের ভোটে প্রত্যেক ভোটারের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া বিলুপ্ত করে লটারি ব‍্যবস্থার মাধ্যমে প্রধান ছাত্রনেতা এবং কমিটির সদস‍্যদের নির্বাচিত করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, গণতন্ত্রে দ্বিদলীয় ব‍্যবস্থাই হোক আর বহুদলীয় ব‍্যবস্থা হোক, ভোটের অধিকার প্রয়োগ করেও মানুষ যথার্থ মডেল, রাজনৈতিক ব‍্যবস্থা বা রাজনৈতিক নেতা খুঁজে পাচ্ছে না। ‘যে যায় লঙ্কায়, সে-ই হয় রাবণ’। এই দর্শন ভোটের ফলাফলের পরে ক্ষমতায় আসার পর শাসক দলের আচরণে প্রকাশিত। সর্বত্র ভোট হয় স্টেট ফান্ডিং না করে। বেসরকারিভাবে অর্থ জোগাড় করে। ভোট করার চেয়ে লটারি পদ্ধতিতে যে কোনও একজন ব‍্যক্তির হাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এভাবে তুলে দিলে খরচ তাই ব্যাপকভাবে কমবে। ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ পদ্ধতিতে রীতিমতো গবেষণা চলছে। ফল কী হবে, আমরা জানি না। তবে এই মুহূর্তে আমাদের কাছে অন্য সমাধান নেই।

ইউরোপের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ডেভিড ভ‍্যান রেব্রাউক সম্প্রতি ‘Against Elections: The Case For Democracy’ নামে একটি বই লিখেছেন। সে-বইতে তিনি দেখিয়েছেন, চলতি নির্বাচনী ব‍্যবস্থায় কীভাবে গণতন্ত্রকে আর প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না। তিনি জি-১০০০ নাগরিক সম্মেলন নামে একটি সংগঠন শুরু করেছেন। বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস- এসব দেশে গণতন্ত্রের অংশগ্রহণে নাগরিক অধিকার নিয়ে গবেষণার কাজ চালাচ্ছেন। তাঁর মতে, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলের প্রতি মানুষের আনুগত্য, সার্বিক দলীয় আনুগত্য, নেতার প্রতি আনুগত্য— এসব ক্রমশ কমে যাচ্ছে। জনগণ কখনও মনোলিথিক হতে পারে না। নেতৃত্ব মনোলিথিক হয়ে উঠছে। মানুষ তাহলে কী করবে? জনগণ কী করে মনোলিথিক হবে? সমাজ তো বহুত্ববাদী। সেই কারণে আজ সংবাদমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং অন্যান্য জনসংযোগ মাধ‍্যমের মধ্য দিয়ে একটা জনমত তৈরি করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইভেন্ট তৈরি করছে। এটা পারসেপশন তৈরি করার কর্মসূচি। ভোটের কর্মসূচি নেওয়ার আগে থেকেই এই কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে যায়। ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে বর্তমানের বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনেও জনমত উৎপাদনের এই খেলা চলছে।

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে একটা নতুন বই বাজারে এসেছে। মিশেল কার্ভিল ও ইয়েন মাকরের সে-বই থেকে জানা যাচ্ছে, ‘পিউ’ সমীক্ষা বলছে, আমেরিকাতে শতকরা ৮২ ভাগ মানুষ মনে করছে- সোশ্যাল মিডিয়া ভয়ংকর খারাপ জিনিস। এটাকে বর্জন করা উচিত। কারণ, তা নেশা হয়ে যাচ্ছে। যে নেশা থেকে বাঁচতে হবে। আর এতে আমরা একটা ভারচুয়াল রিয়্যালিটির মধ্যেও চলে যাচ্ছি। যেটা ‘পিপলি লাইভ’ সিনেমায় দেখেছিলাম। একজন গরিব মানুষকে নিয়ে কীভাবে সংবাদমাধ্যম পারসেপশন তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে। এই সমীক্ষার পাশাপাশি আর-একটি সমীক্ষা বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি এই অনাগ্রহ এবং বিরক্তির কথা শতকরা ৮২ ভাগ মানুষ বললেও, শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ এই সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। সুতরাং এই নেশার হাত থেকে তারা নিজেরা বাঁচাতেও পারছে না।

ভারতীয়দের একাংশের মনে হচ্ছে, অভিমন্যুর মতো মিডিয়ার তৈরি করা ভারচুয়াল রিয়্যালিটির চক্রব‍্যূহে আমরা বন্দি। এই অবস্থায় গণতন্ত্রকে ভালবাসছি। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করছি। আবার গণতন্ত্র যে সর্বস্তরের মানুষকে সাম্য এবং সমানাধিকার দিতে পারছে না সবসময়- তা-ও আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু এখনও সমাধানের পথ জানা নেই। সুতরাং, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কম-খারাপ রাজনৈতিক বিকল্পকে আমাদের বেছে নিতে হচ্ছে। ক‍্যানসারের থেকে টিবি অসুখটা নিশ্চয় ভাল। মানুষ এখন এরকমভাবে তুলনামূলক বিচার করে ভোট দেয়। মানুষের কাছে ‘মডেল’ রাজনৈতিক দল কই? আনুগত্য রাজনৈতিক আবেগের উপর প্রতিষ্ঠিত। আবেগের যখন ঘাটতি হয়, তখন বোধহয় কসমেটিকসের ব‍্যবহারও প্রবলভাবে বেড়ে যায়। বেড়ে যায় জনমত উৎপাদন করার এক ভয়ংকর খেলা। আশার কথা একটাই যে, বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের এই কর্কট রোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

[আরও পড়ুন: সম্পাদকীয়: তারকার সন্তান বলেই পদবির বোঝা কেন বইতে হবে অর্জুন তেণ্ডুলকরকে?]

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.