BREAKING NEWS

৪ আশ্বিন  ১৪২৭  সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ 

Advertisement

জনঅরণ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী

Published by: Sangbad Pratidin Digital |    Posted: June 1, 2016 10:25 am|    Updated: June 1, 2016 10:25 am

An Images

মাননীয় রাজ্যপালের উপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ করছেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ছবি: গোপাল দাস৷

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: রাজপথ ছেড়ে ক্লাব তাঁবুর সরু কেয়ারি-করা-পথ দিয়ে খানিকটা এগতেই হাঁক শুনে ডান দিকে তাকালাম৷ দেখি, সবুজ লনে পেতে রাখা খানকয়েক চেয়ারের একটিতে বসে নচিকেতা৷ সবান্ধব৷ কালোর সঙ্গে এত ‘কালারফুল’ মানুষ-নচিকেতার এমন স্বাভাবিক প্রেম কবে থেকে কে জানে? চোখে কালো রোদচশমা৷ গায়ে মিশকালো গেঞ্জি৷ তার ওপর বোতাম না-লাগানো ফুলকাটা শার্ট৷ নতুন সংযোজন একমুখ চাপচাপ কালো দাড়ি! সে নাকি প্রাণাধিক প্রিয় কন্যার আবদারে৷ কীরকম? না, মেয়ে বলেছে শাহরুখকে দাড়িতে খুব সুইট লাগে! তুমিও রাখো৷ অতএব…৷

নচিকেতার ডাকে লনে ঢুকে হাতে হাত ও বুকে বুক মেলালাম৷ কোনও ভনিতা না-করেই নচিকেতা বলল, ‘কী, বলেছিলাম না, কোত্থাও টেনশনের বিন্দুমাত্র কারণ নেই, অন্তত দু’শো সিট হবে?’

একচিলতে ছায়া খুঁজে বসতে-বসতে আমি হাসলাম ও মাথা নাড়লাম৷ সত্যিই বলেছিল৷ নচিকেতার টানে ততক্ষণে আমাদের ঘিরে ছোটখাটো একটা জটলা৷ সেখানে চোখ বুলিয়ে নচিকেতা আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘দিন পাঁচেক আগেই ফোনে আমাদের কথা হচ্ছিল৷ কলকাতা-দিল্লি৷ আমি বলেছিলাম, দু’শোর নীচে নামবে না৷’

গোটা শহরটাই প্রায় নীল-সাদা হয়ে রয়েছে৷ এই জায়গাটা তো আরও বেশি৷ লনের ওধারটায় নীল-সাদা পেল্লায় ঘেরাটোপ৷ সেখানে অতিথিদের জন্য জলখাবারের আয়োজন৷ লন টপকালেই প্রশস্ত রেড রোড৷ তার বাঁদিকে বিশাল মঞ্চ৷ মঞ্চের গভীরে শপথ গ্রহণের আয়োজন পাকা৷ একপাশে অতিথিদের বসার জায়গা, অন্যপাশে নতুন মন্ত্রীদের৷ সামনে রেড রোডে পাতা সারি-সারি সাদা জামা-পরা চেয়ার৷ বারোটা চল্লিশ বাজতে তখনও ঘণ্টা দেড়েক বাকি৷ আকাশে ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘের সঙ্গে সূর্যের চোর-পুলিশ খেলা চলছে৷ হাওয়া থমকে রয়েছে৷ যেন শপথের দমবন্ধ প্রতীক্ষা৷ গুমট গরমে আইঢাই করছে প্রাণ৷ দরদর করে ঘাম ঝরছে সবার৷ সেই ঘামে ক্ষয়ে যাচ্ছে সুন্দরীদের প্রসাধন৷ সামনের দিকে নিরন্তর ঠেলাঠেলি৷ চলছে মঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছনোর এক প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা৷ আর চলছে অন্য এক প্রতিযোগিতা, নীল-সাদা বেড়ার ধারে সারি দেওয়া মহীরুহগুলোর ছায়ায় শরীর ঢোকানোর৷ সেই ছায়ায় একটা হুইল চেয়ারে বসে ‘গীতশ্রী’ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়৷ এক তরুণী আমন্ত্রণপত্র নেড়ে-নেড়ে তাঁকে বিরামহীন হাওয়া করে চলেছে৷ তাঁরই পাশে কেউ-কেউ হাত ধরে নিয়ে এল দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়কে৷ একজন এগিয়ে দিল একটা চেয়ার৷ দেখে ভাল লাগল৷ মূল্যবোধ যতই তলানিতে ঠেকুক, গুরুজনেরা এখনও প্রাপ্য সম্মানটুকু থেকে বঞ্চিত হন না৷

আবহে বেজে চলেছে রবীন্দ্রসংগীত৷ কখনও কণ্ঠে, কখনও যন্ত্রে৷ চারিদিকে সব চেনা মুখের সারি৷ অবিরাম কুশলবিনিময়৷ নগর কলকাতার ‘হুজ হু’ চোখের সামনে৷ সবাই এই ঐতিহাসিক দিন ও মুহূর্তগুলির ‘সাক্ষী’ হতে এসেছে৷ দিল্লি থেকে এসেছি আমিও৷ পাঁচ বছর আগে রাজভবনের ঘেরাটোপে যে-মুহূর্তগুলো বন্দি ছিল, আজ প্রশস্ত রাজপথে তা সর্বজনীন৷ জনতার কাছের নেত্রী জনতাকে সাক্ষী রেখে জনতার মাঝে শপথ নিলেন ঠিক সেইভাবে, যেভাবে তিনি পরিচিত হয়ে এসেছেন এতগুলো বছর৷ বাহুল্যহীন৷ আটপৌরে৷ পলেস্তারাহীন, মলিন পাশের বাড়িটার মতোই অতি সাধারণ অথচ কী প্রাণবন্ত৷

আমি ডিঙি মেরে রেড রোডের দিকে নজর ঘোরালাম৷ যত দূর চোখ যায় জন-অরণ্য৷ মঞ্চের কাছাকাছি যাঁরা, তাঁদের অনেকের মধ্যে আরও কিছুটা কাছে যাওয়ার, আরও কিছু পাওয়ার আশা কপালে ও চিবুকে বিন্দু-বিন্দু ঘাম হয়ে জমে আছে৷ এঁদের অনেকেই বহু বছরের পরিচিত৷ কী অবলীলায় এঁদের কেউ-কেউ পরিবর্তনশীলতার উদাহরণ হয়ে গিয়েছেন! আপনার চেয়েও আপন হয়ে উঠেছেন তাঁরা৷ অভ্যাস বড় কঠিন ব্যাধি৷ ক্ষমতার অভ্যাস, ক্ষমতায় টিকে থাকার অভ্যাস, ক্ষমতা হারিয়ে অভ্যাসচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা মানুষকে পাগল-পাগল করে তোলে৷ সেই পাগলামির সাক্ষী আমি থেকেছি৷ নীল-সাদা বেড়ার ধার থেকে সেই পাগল-পাগল আচরণ আমি বেশ তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করতে লাগলাম৷ ক্যামেরার ধর্ম মানুষ ও মুহূর্ত খুঁজে ফেরা৷ কোনও-কোনও মানুষেরও ধর্ম হয়ে গিয়েছে ক্যামেরা খুঁজে বের করা৷ এঁদেরই কারও-কারও চোখে কিছু দিন আগেও পালাবদলের আশঙ্কার করুণ ভবিষ্যতের জেল্লাহীন ক্যানভাস দেখেছি৷ আজ দেখছি, সেই চোখে আরও পাঁচ বছরের নিশ্চিন্ততার প্রশান্তি৷ অথচ ওই দূরে যাঁরা, ক্ষমতার ঘ্রাণ পেতে কাছে আসার পাসওয়ার্ড তাঁদের অজানা৷ সর্বস্ব পণ রেখে তাঁরাই ‘দিদি’র জন্য বাজি ধরেন৷ ২৯৪ আসনে ওঁরা ‘দিদি’-কেই দেখেন৷ কিছু পাওয়ার আশায় নয়, ওঁরা আসেন কিছু দিতে৷ মন-প্রাণ উজাড় করে৷ ওঁরাই এ-দলের অন্তরাত্মা৷ ওঁদের জন্যই আগল খুলে শপথকে সর্বজনীন করে তোলা৷ এও হৃদয়ের এক অমোঘ তাগিদ!

এপাশ-ওপাশ কান পাতলেই ময়না তদন্ত৷ কেন জয়, কেন পরাজয় সেই তত্ত্বের ব্যাখ্যা৷ এত দিনে সব ব্যাখ্যাই সবার জানা৷ জোট কোথায় শেষ পারানির কড়ি, কোথায় ক্রোধের বহিপ্রকাশ, কোথায় ভরসার ভাণ্ড, কোথায়-বা প্রত্যাখ্যানের ঘেন্না যেমন জানা., তেমনই অজানা নেই দিদি-মাহাত্ম্যের মহিমাগাথা৷ বাংলা কেন এভাবে তাঁকে কোল পেতে দিল, জ্যৈষ্ঠের ওই প্রখর দ্বিপ্রহরে সেই উপাখ্যানে ভরপুর প্রশস্ত রাজপথ৷ ভালবাসার সেই রসায়নের তল্লাশিতে আসা আমার চোখে বিপন্ন্ মরালের মতো ধরা দিল একটি ড্রোন৷ উড়ে-উড়ে হয়তো-বা জনতার মনের জরিপ শেষে তা বিলীন হল জনারণ্যে৷

মানুষের মুখ দেখতে-দেখতে আটকা পড়ি এক বহু পরিচিত মুখের দুর্নিবার আকর্ষণে৷ সেই প্রখর দ্বিপ্রহরে তপ্ত রাজপথে সম্ভবত তিনিই মানানসই বেমানান৷ সহাস্য দেবপ্রসাদ রায়৷ উত্তরের এই কংগ্রেস নেতা যেন সেই ‘জলে আছি জলে নেই’ বিজ্ঞাপনের চলন্ত নিদর্শন৷ দল বয়কট করেছে যে-অনুষ্ঠান, সেখানে আক্ষরিক অর্থেই বুক ফুলিয়ে তাঁর উপস্হিতি যেন এক গর্বিত বিদ্রোহ৷ তথ্য জানার যে-অধিকারে আজ আমরা অলংকৃত, তার কৃতিত্বের অন্যতম দাবিদার এই মিঠু রায়ের হাসিতে দেখা গেল তথ্যাধিকারের সেই বিন্যাস৷ নিজের বিবেকের প্রতি সত্‍ থাকার অহংকার ও গর্ব ঠিকরে পড়ছিল সেই উপস্থিতিতে৷ ছিল সর্বজনীন ‘দিদি’-র আপসহীন চরিত্রের প্রতি চুঁইয়ে-পড়া প্রশ্নহীন আনুগত্য ও আস্হা৷ মমতার বিস্ময়কর ঋজু রাজনৈতিক উত্তরণের রসায়নের খোঁজে ভিড়ের মধ্যে একা হতে-হতে পিছিয়ে গেলাম আড়াই দশক আগে৷ তখনও তিনি সর্বজনীন ‘দিদি’ নন, তখন তিনি স্রেফ আমাদের পাশের বাড়ির শ্রীময়ী এক বঙ্গনারী৷ প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও তাঁকে প্রথমবারের মতো মন্ত্রী করেছেন৷ মন্ত্রী-নিবাস ৫, অশোকা রোডের প্রশস্ত বাংলো৷ সবুজ লনের একধারে পরিচারকদের থাকার ঠাঁই৷ অবিরাম হাঁটার অভ্যাস তখনও তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে নেশাগ্রস্ত করে তুলতে পারেনি৷ প্রাক-সন্ধ্যায় বাংলোর সীমান্তবর্তী মহীরুহে নীড়ে ফেরা পাখিদের কলতানে মোহিত হয়ে তখন তিনি কখনওসখনও চায়ের পেয়ালা হাতে অলস পায়চারি করতেন৷ কণ্ঠে গুনগুনিয়ে উঠতেন রবীন্দ্রনাথ৷

পারিবারিক এক বিপর্যয়ে সেই সময়ে দিল্লির হাসপাতাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার নিত্য ঠিকানা৷ সেই ঠিকানাতেই খোঁজ মেলে অজ্ঞাতকুলশীল এক গ্রামীণ বালিকা ও তার অসহায় মা-বাবার৷ একটি পা কাটা গিয়েছে সেই বালিকার৷ হাসপাতাল থেকে ছুটিও হয়ে যাবে আজ বা কাল৷ কিন্ত্ত সপ্তাহে দু’দিন করে তাকে হাজিরা দিতে হবে হাসপাতালে৷ টানা একটা মাস৷ কাটা পায়ের প্রয়োজনীয় ড্রেসিং আবশ্যক৷ না-হলে সংক্রমণের আশঙ্কায় প্রাণহানিও অসম্ভব নয়৷ মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার হাল বালিকাটির পরিবারের৷ উত্তরপ্রদেশের গ্রামে ফিরে গেলে হাসপাতালে হাজিরা অসম্ভব৷ দিন আনি দিন খাই পরিবারটির ভরসা বলতে অতঃপর ফুটপাথ৷ তাদের বোবা চাহনিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ও বাঁচার আকুল আর্তি মাখামাখি৷

মমতার কানে তুলেছিলাম সেই অসহায়তার কাহিনি৷ খালি পড়ে থাকা পরিচারকদের গৃহ ছিল প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত৷ চকিত সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর৷ ‘আপনি ওদের নিয়ে আসুন৷’ মুহূর্তে পরিচ্ছন্ন হয়ে গেল পরিবেশ৷ পরদিনই সেই বিপন্ন পরিবারের ঠাঁই হল মন্ত্রী-নিবাসে৷ তোশক-চাদর তো বটেই, বাসনপত্রের জোগানও দিয়েছিলেন মমতাময়ী মন্ত্রী৷ হুকুম ছিল, চিকিত্সা শেষ না-হলে ঠাঁইনাড়া না-করার৷ উত্তরপ্রদেশের সেই অজ্ঞাতকুলশীল গ্রাম্য অসহায় পরিবারটির চোখে সেদিনের অপার বিস্ময় কে জানে আজও হয়তো লেপ্টে আছে৷

কঠিন-কঠোর রাজনীতির পাটিগণিত তফাতে থাকুক৷ শাসকের হাতে দণ্ড থাকবেই৷ সে তো আবশ্যক৷ কিন্ত্ত একটা কুসুমকোমল মন আছে কি? রসায়নের খোঁজে পাগল-পাগল জনারণ্যে মিশে সেদিন এই চেতনাতেই আচ্ছন্ন হল মন৷

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement