রাজ্যে গত ২৫ বছরের উপর বড় কোনও পরিকাঠামো প্রকল্প বা শিল্প গড়ে উঠতে দেখা যায়নি। বড়জোর কয়েকটি চালু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। রুটিন রাস্তাঘাট নির্মাণ, সৌন্দর্যায়ন ইত্যাদি অর্থনীতিতে বড় ছাপ রাখতে পারে না। আগের প্রশাসন ‘জনবাদী’ ছিল কি না, সে বিচার ভবিষ্যৎ করবে। তবে বুলেট ট্রেনের মতো তুঙ্গ গতিতে এগিয়ে চলাই এখন এ রাজ্যের একমাত্র পথ।
উন্নয়নের পথে যাত্রার সূচনাতেই শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা বুলেট ট্রেনের ঘোষণা রাজে্য ডাব্ল ইঞ্জিন সরকারের পক্ষে সবচেয়ে বার্তাবহ। বুলেট ট্রেনের মতো ডাব্ল গতিতে ছোটাই যে এখন বাংলার একমাত্র ভবিতব্য, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। সিকি শতাব্দীর বেশি সময়কাল ধরে চলা স্থবিরতা কাটিয়ে বাংলাকে উন্নয়নের গতিপথে ফেরাতে ডাব্ল ইঞ্জিনকে বেছে নিয়েছে এ রাজে্যর মানুষই। ডাব্ল ইঞ্জিন যে বুলেট ট্রেনের গতিতে ছুটবে, প্রথম মাসেই রেলমন্ত্রীর ঘোষণার মাধ্যমে যেন সেই বার্তাই দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
রাজে্যর অার্থিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই স্থবির দশা যে সিকি শতাব্দীর উপর চলছে, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। ৪৯ বছর অাগে বাংলার শেষ ডাব্ল ইঞ্জিন সরকারের অবসানের পর জে্যাতি বসুর নেতৃত্বে যে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়েছিল, তারা রাজে্যর অর্থনীতিতে ও সমাজে কয়েকটি কাঠামোগত পরিবর্তন অানে। যার কিছু সুফল সেই সময় বাংলার গরিব ও মধ্যবিত্ত পায়। এর মধে্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি ছিল ‘ভূমি সংস্কার’ ও ‘অপারেশন বর্গা’। বামফ্রন্ট সরকার ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা খুব যত্ন করে রূপায়িত করেছিল।
সিকি শতাব্দীর বেশি সময়কাল ধরে চলা স্থবিরতা কাটিয়ে বাংলাকে উন্নয়নের গতিপথে ফেরাতে ডাব্ল ইঞ্জিনকে বেছে নিয়েছে এ রাজে্যর মানুষই।
বামফ্রন্টের কর্মসূচি তৎকালীন গ্রামীণ অর্থনীতির একটা চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন ঘটায়। যার একটি বড় উদাহরণ ছিল, গ্রাম থেকে ভিক্ষা করতে শহরে চলে অাসা দরিদ্র মানুষের লাইনটা ছোট হয়ে যাওয়া। ‘ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতি’ ব্যবস্থা গ্রামে বিপুল পরিমাণে সরকারি অর্থ পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিল। ভূমি সংস্কার ও অপারেশন বর্গা প্রাথমিকভাবে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। জে্যাতি বসুর সরকার সরকারি কর্মী, অধ্যাপক, শিক্ষক ইত্যাদি ‘হোয়াইট কলার’ সম্প্রদায়ের চাকরি সুরক্ষিত রাখা ও বেতন বৃদ্ধি করার মধ্য দিয়ে শহরাঞ্চলে একটি স্বচ্ছল় মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম দিতেও সফল হয়েছিল। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল, বক্রেশ্বর তাপবিদু্যৎ কেন্দ্র, সল্টলেকে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের কেন্দ্র, রাজারহাটে বিশাল উপনগরী, দ্বিতীয় হুগলি সেতু, বিবেকানন্দ ব্রিজ, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন, উন্নয়নের ক্ষেত্রে রাজে্যর এসব মাইলফলকও মূলত জে্যাতি বসুর সরকারেরই অবদান। দু’দশকের মধ্যেই জে্যাতি বসুর সরকারকেও ভয়াবহ জড়তা গ্রাস করে। রাজে্য নতুন কিছু হবে– এই স্বপ্ন ফেরি করেই তখন সিপিএম বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসিয়েছিল।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর শিল্পায়ন, উন্নয়ন ইত্যাদি নিয়ে বিস্তর হইচই হলেও তাঁর ১০ বছরের শাসনকালে শেষ পর্যন্ত রাজ্যে নতুন কোনও প্রকল্প বা সমাজ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন অানতে পারেনি। সিঙ্গুরে টাটাদের গাড়ি কারখানাটি চালু হলে হয়তো কিছু পরিবর্তন হলেও হতে পারত। কিন্তু সেটা ঘটেনি। প্রচুর রক্ত ঝরলেও নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব হয়নি। নয়াচরেও কোনও প্রকল্প করা যায়নি। শালবনিতে বারবার শিলান্যাস ছাড়া কিছু হয়নি। মমতা বন্দে্যাপাধ্যায়ের জমি অান্দোলনের ধাক্কায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সরকার শেষ ৩ বছর সম্পূর্ণ অচল হয়ে গিয়েছিল। সেই অচলাবস্থা মমতা বন্দে্যাপাধ্যায়ের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনকালে যে অাদৌ কাটেনি, তা বোঝার জন্য এখন কোনও সমাজতাত্ত্বিকের প্রয়োজন হচ্ছে না। জনাদেশই তা বলে দিচ্ছে। দেড় দশকে মমতা বন্দে্যাপাধ্যায়ের সরকার কোনও সুস্পষ্ট জমি নীতি গ্রহণ করতে পারেনি।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর শিল্পায়ন, উন্নয়ন ইত্যাদি নিয়ে বিস্তর হইচই হলেও তাঁর ১০ বছরের শাসনকালে শেষ পর্যন্ত রাজ্যে নতুন কোনও প্রকল্প বা সমাজ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন অানতে পারেনি।
প্রকল্প রূপায়ণের জন্য কোথাও সরকারকে জমি অধিগ্রহণ করতে দেখা যায়নি। মমতা বন্দে্যাপাধ্যায় ‘বিরোধী’ নেত্রী রূপে যে জমি-জটের ফঁাসে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সরকারকে অাটকে ফেলেছিলেন, নিজের সরকারকেও সেই ফঁাস থেকে আর মুক্ত করতে পারেননি। চেষ্টাও করেননি। ফলে এই সময়ে কোনও বড় কলকারখানা রাজে্য গড়ে ওঠেনি। এমনকী, রাস্তা বা সেতুর মতো বড় কোনও নতুন পরিকাঠামো প্রকল্পও গত দেড় দশকে রাজ্যকে রূপায়িত করতে দেখা যায়নি। মমতা বন্দে্যাপাধ্যায় তঁার শাসনকালে প্রধানত কিছু সামাজিক প্রকল্প রূপায়ণে জোর দিয়েছিলেন। তঁার সরকারের যাবতীয় তহবিল খরচ হয়েছে এই সামাজিক প্রকল্পগুলির রূপায়ণে। কিছু সমাজতাত্ত্বিক মমতা বন্দে্যাপাধ্যায়ের সরকারকে সেই কারণে ‘জনবাদী সরকার’ বলে অাখ্যা দিয়েছিলেন। সেটি কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল– তার মীমাংসা হয়তো অাগামীতে হবে। ভোট রাজনীতিতে সামাজিক প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েও তখন হয়তো প্রশ্ন উঠবে।
সার কথাটি হল, রাজে্য গত ২৫ বছরের উপর বড় কোনও পরিকাঠামো প্রকল্প বা শিল্প গড়ে উঠতে দেখা যায়নি। বড়জোর কয়েকটি চালু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। রুটিন রাস্তাঘাট নির্মাণ, সৌন্দর্যায়ন ইত্যাদি অর্থনীতিতে কোনও বড় ছাপ রাখতে পারে না। সেটি রাখেওনি। এই দীর্ঘ সময়ে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে কাজের সন্ধানে রাজে্যর বাইরে পাড়ি দিতে হয়েছে। রাজে্যর বাইরে যারা গিয়েছে, তারা বাংলার এই স্থবিরতাকে সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করতে পেরেছে। এই স্থবিরতাকে ভাঙতে ডাব্ল ইঞ্জিনের বুলেট ট্রেনের গতিই প্রয়োজন। নবান্নে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণোর সঙ্গে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রশাসনিক কর্তাদের টাইম টেবিল করে প্রকল্পের জমি দিতে বলেছেন। এটিই ডাব্ল ইঞ্জিন সরকারের সবচেয়ে সদর্থক পদক্ষেপ। ‘ডাব্ল ইঞ্জিন’ মানে যেমন একদিকে কেন্দ্র ও রাজে্যর সমন্বয়, তেমন লাল ফিতের ফঁাস থেকে মুক্তি। ডাব্ল ইঞ্জিন মানে বিপুল কেন্দ্রীয় অনুদান। যার ইঙ্গিত গত এক মাসে মিলেছে। নরেন্দ্র মোদি তঁার মন্ত্রীদের বাংলার পাশে দঁাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
বৈষ্ণোর ঘোষণামতো যদি রেল অাগামী কয়েক বছরে বাংলায় তাদের পরিকাঠামো উন্নয়নে লক্ষ কোটি টাকা খরচ করে, তাহলে সেটি রাজে্যর অর্থনীতির পক্ষে বিরাট সহায়ক হবে। এই বিপুল অর্থ রাজে্য ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি রাজে্য বিপুল টাকা খরচ করতে শুরু করলে বেসরকারি সংস্থাও রাজে্য লগ্নি করার অাস্থা পাবে। ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’-এর সূচক রাজে্যর ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বমুখী হবে। এটা অর্থনীতির খুবই সহজ নিয়ম। মাসিমা-পিসিমারাও বোঝেন। বৈষ্ণো জানিয়েছেন, রাজ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প অাসার সম্ভাবনা রয়েছে। স্মার্ট সিটি, পিএম অাবাস যোজনা, পিএম কিষান সম্মান বিধি ইত্যাদি কেন্দ্রের ফ্ল্যাগ শিপ প্রকল্প এখন রাজে্য পূর্ণ গতিতে চালু হওয়ার অপেক্ষায়। অানুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়ে গিয়েছে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ ও ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। এই সবেরই নিট ফল: রাজে্যর অর্থনীতিতে টাকার জোগান বেড়ে যাওয়া।
অাশা করা যায়, ডাব্ল ইঞ্জিন সরকার এবার যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিপন্নতা নিয়ে যাবতীয় অাশঙ্কা দূর করবে এবং ডাব্ল ইঞ্জিনের সুফল পুরোমাত্রায় রাজ্যবাসীকে পৌঁছে দিতে দুর্নীতিমুক্ত ও গতিশীল প্রশাসনের শর্তও পূরণ করবে। অাসলে মনে রাখতে হবে, বুলেট ট্রেনে সওয়ার হওয়ার প্রস্তুতি সবার অাগে নিতে হবে রাজ্য প্রশাসন ও শাসক দলকেই। সেই প্রস্তুতির চিত্র অন্তত অাজ, পরিবর্তনের প্রথম এক মাস পূর্তির দিনে যথেষ্ট দেখা যাচ্ছে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
সুজিত বসুর পর উজ্জ্বল বিশ্বাস, গ্রেপ্তার আরও এক প্রাক্তন মন্ত্রী, এবার ত্রাণচুরির অভিযোগ
-
রাজস্থানে বেআইনি বাজি কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ! ঝলসে মৃত অন্তত ৭
-
নীল-সাদা অতীত, নবান্নে এবার ‘রং দে তু মোহে গেরুয়া’
-
ভুরি ভুরি দুর্নীতি টাকিতে! হাই কোর্টে মামলা করে দাবি তৃণমূল কাউন্সিলরের
-
মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেসের রাজ্যসভা প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল, ভোটের আগেই ‘জয়’ বিজেপির