Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ৩ আষাঢ় ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১৯ জুন ২০২৬
Nature

দেশ গড়তে বন ধ্বংস, অর্থনীতির চক্রব্যূহে হারানো পথ!

জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনের সরকারি নীতিগুলি দীর্ঘ দিন ধরেই প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলির বিরোধিতার সম্মুখীন হয়ে আসছে। দৃষ্টান্ত হিসাবে, ‌‘এক্সনমবিল’-এর ইতিহাস ঘাঁটলেই বোঝা যায়, এই চক্রান্ত কতখানি সুদূরবিস্তৃত ও গভীর।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুন ১৯, ২০২৬, ১৭:০০

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুন ১৯, ২০২৬, ১৭:০০

options
link
দেশ গড়তে বন ধ্বংস, অর্থনীতির চক্রব্যূহে হারানো পথ! zoom
প্রাকৃতির কিছু সীমা রয়েছে, যা অতিক্রম করলে সভ্যতার বিপদ হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনের সরকারি নীতিগুলি দীর্ঘ দিন ধরেই প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলির বিরোধিতার সম্মুখীন। ‌‘এক্সনমবিল’-এর ইতিহাস ঘাঁটলেই বোঝা যায়, এই চক্রান্ত কতখানি সুদূরবিস্তৃত ও গভীর। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন আধুনিক রাষ্ট্র ও বাজার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে জেনেও স্বল্পমেয়াদি আর্থনীতিক লাভকে অগ্রাধিকার দেয়? লিখছেন অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।  

‘উন্নয়ন’ কথাটি যেন সর্বব্যাপী ধারণা হয়ে উঠেছে। এই উন্নয়নের মূল কথাটা কী? এক) আগামী বছরে এখনকার চেয়ে বেশি উৎপাদন হতে হবে। দুই) অর্থনীতি ক্রমাগত বৃহৎ হবে। তিন) প্রযুক্তি প্রতিটি সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবে। চার) প্রকৃতি হল মূলত সম্পদ আহরণের ক্ষেত্র। পাঁচ) বৃদ্ধি মানেই অগ্রগতি। উন্নয়নের এই শর্তগুলির মধ্যে যদি পরিবেশ-চিন্তা কদাচিৎ কারও মাথাতে এসে যায়, তাহলে মূলত তিনটি যুক্তির মধ্যেই আলোচনা শেষ হয়ে যায়।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

বেশিরভাগ মানুষ মনে করে, নবায়নযোগ্য শক্তি কিংবা সবুজ প্রযুক্তির সাহায্যে পরিবেশ ও আর্থনীতিক প্রবৃদ্ধি একসঙ্গে সম্ভব। অন্য গোষ্ঠী বলে, ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমি দেশগুলি দূষণ করেছে, তাই এর মূল্য আগে তারা চোকাতে রাজি হোক। আর, অন্তিম পক্ষের মত– অসীম প্রবৃদ্ধি সীমিত পৃথিবীতে অসম্ভব, সুতরাং পুঁজিবাদ হঠাও, প্রকৃতি বাঁচাও।

ইতিমধ্যে একটি ছবি স্পষ্ট। জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনের সরকারি নীতিগুলি দীর্ঘ দিন ধরেই প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলির বিরোধিতার সম্মুখীন হয়ে আসছে। দৃষ্টান্ত হিসাবে, ‌‘এক্সনমবিল’-এর ইতিহাস ঘাঁটলেই বোঝা যায়, এই চক্রান্ত কতখানি সুদূরবিস্তৃত ও গভীর। কে নেই সেখানে! বিজ্ঞানী, নামজাদা শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি আমলার মতো প্রভাবশালী প্রায় প্রত্যেকে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন আধুনিক রাষ্ট্র ও বাজার দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে জেনেও স্বল্পমেয়াদি আর্থনীতিক লাভকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে?
এটা তো ঠিক, পুঁজিপতিরা এ-কথা দিব্য অনুভব করছেন যে, পরিবেশ যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, একদিন-না-একদিন সভ্যতার অস্তিত্বের সংকট ঘটে যাবে। আপাতত হয়তো গরিব মানুষ এর মূল্য চোকাবে, কিন্তু পুঁজিপতিরাও চিরকাল বহাল তবিয়তে থাকবে না। পৃথিবী থেকে যদি পানীয় জলই উধাও হয়ে যায়, যদি বায়ু ব্যাপকভাবে শ্বাস-অযোগ্য হয়ে ওঠে, তাপ মাত্রাছাড়া হয়, তাহলে কত অর্থের বিনিময়ে, কত দিন তারা টিকে থাকতে পারবে– তা সবার জানা! তাহলে কেন প্রকৃতির উপর অত্যাচারে লাগাম টানা যাচ্ছে না?

যেহেতু একটি রাষ্ট্রের সাফল্য পরিমাপ করা হয় মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি-র বৃদ্ধির মাধ্যমে, ফলে যে কোনও মূল্যে লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করার দরুন পরিবেশের যে-ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, তা হিসাবের বাইরেই থেকে যায়।

‘কারণ’ হিসাবে যদি পুঁজিপতিদের অপরিমেয় অসীম লোভ বলা হয়, তাহলে একটি দায়সারা উত্তর মেলে ঠিকই, কিন্তু সত্য অধরা থেকে যাবে। এখানে সম্প্রতি ‘হার্ভার্ড বিসনেস স্কুল’ থেকে প্রকাশিত গবেষক জ্যারেড জে. ফিনেগান এবং জোনাস মেকলিংয়ের একটি গবেষণাপত্র উল্লেখযোগ্য। তাঁরা দেখিয়েছেন যে, পরিবেশবিরোধী আচরণের কারণ সবসময় ‘লোভ’ নয়, বরং আর্থিক ব্যবস্থার সময়-দিগন্ত এত ছোট হয়ে গিয়েছে যে, ক্ষুদ্রমেয়াদি লাভ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে গিয়েছে।

উপরোক্ত ব্যবস্থাটিকে যদি বহরে আর-একটু বাড়িয়ে রাজনৈতিক, আর্থনীতিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্তরে ভাঙা যায়– তাহলে একটা চক্রব্যূহের সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন, ধরা যাক, রাজনৈতিক দলগুলির কথা, গণতান্ত্রিক দেশে সরকার সাধারণত চার থেকে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। ফলে, রাজনৈতিক দলগুলি এমন নীতি নেয়, যা তাদের মেয়াদের মধ্যে দৃশ্যমান আর্থনীতিক উন্নতি (যেমন: কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি) দেখাতে পারে। সুতরাং, পঞ্চাশ বছর পরের জলবায়ু সুরক্ষার চেয়ে আগামী নির্বাচনের জয় তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

যেহেতু একটি রাষ্ট্রের সাফল্য পরিমাপ করা হয় মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি-র বৃদ্ধির মাধ্যমে, ফলে যে কোনও মূল্যে লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করার দরুন পরিবেশের যে-ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, তা হিসাবের বাইরেই থেকে যায়। কারণ, এই দলগুলি একদিক থেকে নিরুপায়। আন্তর্জাতিক বাজারে অন্য দেশের চেয়ে আর্থনীতিক ও সামরিকভাবে পিছিয়ে পড়ার আতঙ্কগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলিও তাই পরিবেশ ধ্বংস করে হলেও শিল্পায়ন ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনে বাধ্য হয়। এমন নয় যে, পরিবেশনীতি তাদের নেই, আছে। কিন্তু ওই কাগজে-কলমে, বাস্তবে ওগুলোর প্রয়োগ দেখা যায় না।

যেসব কোম্পানি যত বেশি শেয়ারহোল্ডারদের পে-আউট করে, তারা জলবায়ু নীতির বিরোধিতা তত বেশি করে। সুতরাং, জলবায়ু নীতির বিরোধিতা শুধুমাত্র কোনও নির্দিষ্ট শিল্পখাতের আর্থনীতিক স্বার্থের ফল নয়।

আধুনিক পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলিকে প্রতি তিন মাস পরপর লভ্যাংশ ও প্রবৃদ্ধির হিসাব দিতে হয়। ফলে, পরিবেশনীতির বল অর্থনীতির ‘ডিসকাউন্টিং’ পদ্ধতিতে আটকে যায়। ‘ডিসকাউন্টিং’ হল এমন পদ্ধতি যার মাধ্যমে দূর ভবিষ্যতের আর্থিক লাভের চেয়ে চটজলদি লাভকে বেশি মূল্যবান ধরা হয়। বহু বছর পরের পরিবেশগত বিপর্যয় রোধের আর্থিক মূল্য বর্তমানের বিনিয়োগ খরচের চেয়ে কম মনে হয়। ফিনেগান যেটা বলছেন, যেহেতু কোম্পানির মালিকানা অগণিত ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে, এর ব্যবস্থাপনা ক্রমাগত বাজারের চাপের মধ্যে দিয়ে যায়।

এইখানে দুই ধরনের বিনিয়োগকারীদের চিহ্নিত করা যায়। এক) সক্রিয়, দুই) নিষ্ক্রিয়। সক্রিয় বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দ্রুত মুনাফা, শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি এবং স্বল্পমেয়াদি আর্থিক ফলাফলের উপর জোর দেয়। কেবল বেসরকারি নয়, যেসব পাবলিক কোম্পানিতে এই ধরনের সক্রিয় বিনিয়োগকারীর অংশীদারিত্ব বেশি, তারাও জলবায়ু নীতির বিরোধিতা বেশি করে। তবে দেখা গিয়েছে, যেসব কোম্পানির মালিকানা কয়েকজন বড় অংশীদারের হাতে কেন্দ্রীভূত, তারা জলবায়ু নীতির বিরোধিতা তুলনামূলকভাবে কম করে (করে না, সেটা নয়)। যেখানে ছোট অংশীদাররা দ্রুত রিটার্ন চায়, সেখানে এদের ভূমিকা অন্যরকম। এদের অনেকেই মনে করে যে, বড় সূচকভিত্তিক তহবিল দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পক্ষে থাকে, কারণ সেগুলো পুরো বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কোনও কোম্পানিতে যত বেশি পরোক্ষ মালিকানা, তত বেশি নীতিবিরোধিতা বর্তমান। সুতরাং এই চক্রটি আবার সক্রিয় বিনিয়োগকারীদের পথেই চলে যায়, আর মুনাফার প্রশ্নে পরিবেশনীতির সঙ্গে পরস্পর-বিরোধী হয়ে ওঠে।

ফলে যেসব কোম্পানি যত বেশি শেয়ারহোল্ডারদের পে-আউট করে, তারা জলবায়ু নীতির বিরোধিতা তত বেশি করে। সুতরাং, জলবায়ু নীতির বিরোধিতা শুধুমাত্র কোনও নির্দিষ্ট শিল্পখাতের আর্থনীতিক স্বার্থের ফল নয়। এর একটি গভীর আর্থিক-প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রয়েছে, যেখানে, স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের চাপের মধ্যে থাকা কোম্পানিগুলি পরিবেশ রক্ষার খরচ বহন করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে। এক কথায়, সমস্যা শুধু পুঁজিবাদ নয়, আর্থিক পুঁজিবাদের স্বল্পমেয়াদিকরণ ব্যবস্থাও।

চিন, ভুটান, নিউজিল্যান্ড এবং ইউরোপের কিছু দেশ বিভিন্ন সময়ে ‘গ্রিন জিডিপি’ বা পরিবেশ-সামঞ্জস্যপূর্ণ জাতীয় হিসাব ব্যবস্থা (এসইইএ) চালুর চেষ্টা করেছে।

মনস্তাত্বিক দিক হোক, বা আমজনতা, বা ধনী, মোটের উপর তফাত উনিশ-বিশ। গরম তীব্রতর হলে যেমন আমজনতার গাছের কথা মনে পড়ে, ধনীরও সেটাই হয়। তফাত– আপাতত, আমজনতার আশ্রয় হিসাবে গাছতলা কম, তাই তারা গাছ পুঁতছে। আর ধনীর এসি আছে, তাই গাছ কাটছে। দীর্ঘমেয়াদে কারও কাছেই কিছু থাকবে না, একইরকম কষ্ট পেয়ে সকলকে মরতে হবে। তবে যেই না গরম কেটে গিয়ে একপশলা বৃষ্টি হয়, ব্যস, পরিবেশের কথা সবাই ভুলে যায়। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি খুব ধীর গতিতে ঘটে। মানুষের মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিক সংকট (যেমন: আর্থনীতিক মন্দা, বেকারত্ব ইত্যাদি) মোকাবিলা করতে যতটা সক্রিয়, সুদূরপ্রসারী অদৃশ্য ঝুঁকি নিয়ে ততটা উদ্বেলিত হয় না। আর যেহেতু হাওয়া, জল, বা খনিজের মতো প্রাকৃতিক সম্পদগুলি উন্মুক্ত– তাই কোনও একটি রাষ্ট্র বা বাজার একা ত্যাগস্বীকার করে এগুলি রক্ষা করতে চায় না, কেননা, তারা মনে করে অন্য পক্ষ ঠিকই এর অপব্যবহার করে আর্থনীতিকভাবে এগিয়ে যাবে, আর এদিকে কারও সরকার পড়ে যাবে তো কেউ বিশ্বের সেরা দশ ধনীর তালিকার বাইরে বেরিয়ে যাবে।

আমজনতা এখানে নিরুপায়, কারণ লক্ষ লক্ষ গাছ কেটে ফেলার ক্ষমতা যেমন তার নেই– তেমনই পরিবেশ ধ্বংসের কারিগরদের বিরুদ্ধে লড়াই করে পরিবেশ-রক্ষার উপায়ও তার নেই। উদাহরণ, আরাবল্লি পাহাড় দেখুন, কিংবা মনে করুন প্রাক্তন আইআইটি অধ্যাপক গুরুদাস আগরওয়ালের কথা, যিনি নদীর জন্য হরিদ্বারে ১১১ দিনব্যাপী অনশনের পর ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর পরলোকগমন করেন, কিন্তু সেসব আন্দোলনের ফলে কিছুই রক্ষা হয়নি। আরাবল্লি হোক বা মেঘালয়ের পাহাড়– এই আগ্রাসী ব্যবস্থার সামনে সবকিছুই ভাঙা পড়বে, থেকে যাবে কেবল সভ্যতার অসহ্য নিদারুণ যন্ত্রণাদগ্ধ মৃত্যু।

তাহলে কি কোনও উপায় নেই? আছে। তবে তা বামপন্থী আন্দোলনে নয়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যেই বর্তমান। দরকার কেবল প্রয়োগ করার সদিচ্ছা। মুনাফার রথ টিকিয়ে রেখেই সেটা সম্ভব। বিজ্ঞানী ও বহু পুঁজিপতি সেগুলি নিয়ে ভাবছেনও।

ধরা যাক, ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ কেট রাওয়ার্থের কথা। তিনি ২০১৭ সালে ‘ডোনাট ইকোনমিক্স’ মডেল প্রস্তাব করেন। মূল লক্ষ্য হল, এমন একটি অর্থনীতি তৈরি করা, যা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে, আবার পৃথিবীর পরিবেশগত সীমার ভেতরেও থাকবে। একটি ডোনাটের যেমন মাঝে একটি ছিদ্র থাকে এবং বাইরে একটি বৃত্ত থাকে– এই মডেলটিও ঠিক তেমনি দু’টি বৃত্ত নিয়ে গঠিত। ভেতরের বৃত্ত হল সামাজিক ভিত্তি, অর্থাৎ এটি মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম মানদণ্ড নিয়ে চিন্তা করে, যেমন: খাদ্য, বিশুদ্ধ জল, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বাসস্থান, শক্তি এবং লিঙ্গসমতা ইত্যাদি। সমাজের কেউ যেন এই বৃত্তের নিচে বা ডোনাটের মাঝের ছিদ্রে পড়ে না যায় (অর্থাৎ, অভাবের শিকার না হয়), এটাই লক্ষ্য।

অন্যটি বাইরের বৃত্ত অর্থাৎ পরিবেশগত ছাদ। পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলির এমন কিছু সীমা রয়েছে, যা অতিক্রম করলে সভ্যতা গুরুতর বিপদের সম্মুখীন হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্রের ধ্বংস, সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি, ওজোন স্তরের ক্ষয়, রাসায়নিক দূষণ, ভূমিক্ষয় এবং মিঠে জলের অতিরিক্ত ব্যবহার এই সীমাগুলির উদাহরণ। যদি আর্থনীতিক কর্মকাণ্ড এই সীমাগুলিকে অতিক্রম করে, তাহলে পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। ডোনাটের এই দু’টি বৃত্তের মাঝখানের অংশটিই হল মানুষের জন্য নিরাপদ এবং ন্যায়সংগত স্থান।
এই মডেলের ‘লক্ষ্য’ অবিরাম জিডিপি বৃদ্ধি করা নয়, বরং ডোনাটের ভেতরে থেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা। ডোনাট ইকোনমিক্সকে বাস্তবে প্রয়োগের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডাম। আমস্টারডাম ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কেট রাওয়ার্থের ডোনাট মডেলটি গ্রহণ করে, এবং ২০২৬ সালের বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত তাদের ‘সারকুলার ইকোনমি অ্যাকশন প্ল্যান’-এর মাধ্যমে ডোনাট মডেলটির বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

আর-একটা হল, উন্নয়নের পরিমাপক হিসাবে জিডিপির পরিবর্তে ‘গ্রিন জিডিপি’ চালু করা। প্রচলিত জিডিপি কোনও দেশের আর্থনীতিক কর্মকাণ্ডের আর্থিক মূল্য পরিমাপ করে, কিন্তু সেই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবেশের যে-ক্ষতি হয়, তার হিসাব করে না। ফলে একটি দেশ-বন ধ্বংস করে, নদী দূষিত করে, বা খনিজ সম্পদ নিঃশেষ করে বিপুল উৎপাদন করলেও– জিডিপি বৃদ্ধি পাবে। অথচ এই প্রবৃদ্ধির মধ্যে সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষয়মূল্য অধরা থেকে যাবে।

‘গ্রিন জিডিপি’ হল প্রচলিত জিডিপি থেকে প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয়জনিত ব্যয় ও পরিবেশ দূষণ রোধ ও পুনর্বাসন ব্যয় বিয়োগ করা। একটি দেশ যদি বন কেটে সেখানে কলকারখানা বানিয়ে কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করে, তবে প্রচলিত জিডিপি বাড়বে ঠিক। কিন্তু গ্রিন জিডিপি-র হিসাবে বন কাটার কারণে যে-পরিবেশগত ক্ষতি এবং কার্বন নিঃসরণ বাড়ল, তার আর্থিক মূল্য মোট আয় থেকে বাদ যাবে। ফলে, কোনও দেশে অর্থনীতিতে ধনী হতে পারে, এবং একই সঙ্গে পরিবেশগতভাবে দরিদ্রও হতে পারে। দুই মিলিয়ে সেই দেশের ‘র‍্যাঙ্ক’ বা অবস্থান।

চিন, ভুটান, নিউজিল্যান্ড এবং ইউরোপের কিছু দেশ বিভিন্ন সময়ে ‘গ্রিন জিডিপি’ বা পরিবেশ-সামঞ্জস্যপূর্ণ জাতীয় হিসাব ব্যবস্থা (এসইইএ) চালুর চেষ্টা করেছে। বেশ কিছু জটিলতা থেকে গিয়েছে, সেগুলি নিয়েই কাজ চলছে। ভবিষ্যতের টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য এই ধারণাগুলি কেবল ‘বিকল্প’ নয়, বরং ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে উঠছে। একবগ্‌গা ‘পুঁজিবাদ হঠাও’ স্লোগানের পরিণামে পৃথিবী থেকেই কমিউনিস্টরা উধাও হয়ে গিয়েছে, ভারতেও।

স্বাধীনতার পরে এই প্রথম কোনও রাজ্যে বামেদের সরকার থাকল না। সুতরাং, ওর মধ্যে কোনও ‌‘বিকল্প’ ব্যবস্থার আভাস নেই– এই পুঁজিবাদের মধ্যেই খুঁজে নিতে হবে আশ্রয়।
রাজস্থানের মরুভূমিতে আদানিদের বিরাট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কথাই ধরা যাক। সেও তো নবায়নযোগ্য একটি শক্তির পক্ষেই কাজ হচ্ছে, আর সেটি একজন পুঁজিপতিই লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে করছেন। সুতরাং, প্রত্যেকেই টের পাচ্ছে যে, অস্তিত্বরক্ষার জন্য পদক্ষেপ জরুরি, কিন্তু রাজনীতিবিদ, পুঁজিপতি, আমজনতা– এরা যেন এখন উপরোক্ত আর্থিক ব্যবস্থার চক্রব্যূহে ফেঁসে যাওয়া অভিমন্যু।

ঋত্বিক ঘটকের সিনেমার মতো বলছে– ‘দাদা আমি বাঁচতে চাই’।

(মতামত নিজস্ব)॥
লেখক প্রাবন্ধিক
[email protected]

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.